জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

জিয়াউলের বিচার: শেষ হলো সাবেক সেনাপ্রধানের জেরা, সাক্ষ্য ৯ মার্চ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৩ মার্চ ২০২৬, ২১: ০০
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। স্ট্রিম ছবি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম সাক্ষী সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়ার জেরা সম্পন্ন হয়েছে। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) চতুর্থ দিনের মতো জেরা শেষে ট্রাইব্যুনাল-পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৯ মার্চ দিন ধার্য করেছেন।আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় এই বিচার চলছে।

ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই বিচারকাজ অনুষ্ঠিত হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী ।

এদিন সকালে কারাগার থেকে জিয়াউল আহসানকে হাজির করা হয় এবং তিনি কাঠগড়ায় উপস্থিত থেকে নিজ আইনজীবীদের সহযোগিতা করেন। এদিকে আসামিপক্ষের দাবি, তদন্ত কর্মকর্তার শেখানো মতে সাক্ষী এই জবানবন্দি দিয়েছেন।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামিম ও শাইখ মাহদী।

কেনাকাটায় দুর্নীতি ও সেনাপ্রধানের এখতিয়ার

মঙ্গলবার আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসান সাক্ষীকে জেরা করেন। জেরার মূল বিষয়বস্তু ছিল দুর্নীতি ও সেনাপ্রধানের আইনি এখতিয়ার।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০১২ সালের ১৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৪ জুন পর্যন্ত) সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করা ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি সেনাপ্রধান থাকাকালে কেনাকাটা-সংক্রান্ত দুর্নীতি হয়েছিল। তবে তা আমার এখতিয়ারের বাইরে বিধায় আমি এই বিষয়ে তদন্ত করি নাই।’

দুর্নীতির সঙ্গে তার নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম ভূঁইয়া তা সরাসরি অস্বীকার করে বলেন, তিনি কেনাকাটা-সংক্রান্ত বিষয়ে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নন। এবং দুর্নীতির তদন্ত না করার সঙ্গে তার জড়িত থাকার বিষয়টি অমূলক।

ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের অবৈধ আয়ের উৎস সম্পর্কে অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘অনেক সিনিয়র অফিসার ছিলেন, তবে তাদের নাম তার মনে নেই।’ তিনি বলেন, অফিসারদের বিরুদ্ধে অবৈধ আয়ের উৎস শনাক্ত করে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করি নাই। কারণ, তা আমার এখতিয়ারের বাইরে ছিল।

বিগত জেরা: সাত খুন, র-এর উপস্থিতি ও পদোন্নতি

এর আগে ১৮ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি এবং ১ মার্চ সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের অপর আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ইকবাল করিম জানান, তার সময়কালে জিয়াউল আহসান ওই মামলার তদন্ত করেছিলেন কি না, তা তিনি জানেন না। এই তদন্ত নিয়ে জিয়াউলকে প্রভাবিত করার চেষ্টা এবং এর ফলে বৈরী সম্পর্ক তৈরির অভিযোগও তিনি সত্য নয় বলে নাকচ করেন।

ডিজিএফআই সদর দপ্তরে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর উপস্থিতি থাকার বিষয়ে জবানবন্দিতে দেওয়া তথ্যের বিষয়ে জেরায় তিনি জানান, ডিজিএফাইয়ের সদর দপ্তর ঢাকা সেনানিবাসের অভ্যন্তরে অবস্থিত হলেও এবং সেনাপ্রধানের আংশিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকলেও তিনি কোনো তদন্ত করতে পারেননি। কারণ, ডিজিএফআই সেনাপ্রধানের নিয়ন্ত্রণের বাইরের একটি প্রতিষ্ঠান।

সাবেক এই সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে জেরায় বেশ কিছু ব্যক্তিগত অভিযোগ তোলা হয়। কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল থাকাকালে খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাসা থেকে উচ্ছেদ, মহাখালী ডিওএইচএসে নিয়মের বাইরে এক কাঠা বেশি সম্পত্তি নেওয়া, পাওয়ার প্ল্যান্ট পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়া, ফেসবুকে জিয়াউলকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ পোস্ট দেওয়া এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারের সুবিধা নিয়ে সম্পত্তি বহুগুণ বৃদ্ধির সবকটি অভিযোগ তিনি সত্য নয় বলে উল্লেখ করেন।

জিয়াউল আহসানের পদোন্নতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার সময়ে জিয়াউল কেবল একটি পদোন্নতি (লেফটেন্যান্ট কর্নেল থেকে কর্নেল) পান। ইকবাল করিম বলেন, ‘আমি মেজর জেনারেল মোমেনকে ডেকে বলেছি যে, জিয়াউল আহসান একজন সিরিয়াল কিলার। আমি তার পদোন্নতি দেওয়ার পক্ষে নই। তুমি পদোন্নতি সভায় এভাবেই উপস্থাপন করবে।’ তবে বোর্ডের অধিকাংশ সদস্য নিজেদের ভবিষ্যৎ স্বার্থ চিন্তা করে জিয়াউলকে ভালো কর্মকর্তা অভিহিত করে পদোন্নতির সুপারিশ করেন। ইকবাল করিমের মতে, জিয়াউল স্টাফ কলেজ বা কোনো ব্যাটালিয়ন কমান্ড করেননি বলে পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন না। পদোন্নতি সভায় জিয়াউলকে সেভাবে উপস্থাপন করায় মেজর জেনারেল মোমেনকে কিছুদিন পর প্রেষণে বাহরাইনের রাষ্ট্রদূত করে ডাম্পিং পোস্টে পাঠানো হয়।

জবানবন্দি: র‍্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্তির দাবি

গত ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে দেওয়া মূল জবানবন্দিতে সাবেক সেনাপ্রধান গুম-খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আয়নাঘর সংস্কৃতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে র‍্যাব ও ডিজিএফআইয়ের বিলুপ্তি দাবি করেন। তিনি বলেন, এই সংগঠনটি (ডিজিএফআই) আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পর টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে। র‍্যাব বিলুপ্ত করা সম্ভব না হলে সেনাসদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফেরত আনার দাবি জানান তিনি।

২০০৩ সালে র‍্যাব গঠনকে তিনি একটি মারাত্মক ও ভয়াবহ সিদ্ধান্ত আখ্যা দেন। তার মতে, ফায়ারিং রেঞ্জে মানুষ আকৃতির টার্গেটে গুলি চালিয়ে সেনাসদস্যদের ডিহিউম্যানাইজ বা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অমানবিকীকরণ করা হয়; তাই তাদের বেসামরিক পুলিশের সঙ্গে মেশানো ঠিক হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সেনাবাহিনী থেকে পেশাদার অফিসারদের র‍্যাবে পাঠানো হতো এবং তারা সেখান থেকে পেশাদার খুনি হয়ে ফিরতেন। কিলিং মিশন শেষে এক জুনিয়র অফিসার মানসিক অনুশোচনা থেকে প্রতি খুনের জন্য পাওয়া ১০ হাজার টাকা গ্রামের মসজিদে দান করে দিয়েছিলেন- এমন একটি রোমহর্ষক ঘটনার উদাহরণও তিনি দেন। এছাড়া, ২০০২ সালের অপারেশন ক্লিন হার্ট এবং ২০০৩ সালের ইনডেমনিটি আইনকে তিনি হত্যার লাইসেন্স বলে মন্তব্য করেন।

জবানবন্দিতে তিনি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গড়ে ওঠা চারটি নেক্সাস বা চক্রের কথা উল্লেখ করেন—অপরাধ চক্র, ডিপ স্টেট, কেনাকাটা চক্র এবং সামরিক প্রকৌশলী চক্র।

তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা তার আত্মীয় মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়োগ দেন, যিনি অচিরেই সুপার চিফ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ডিজিএফআই, এনএসআই, র‍্যাব ও এনটিএমসিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন।

বেনজীর আহমেদ র‍্যাবের ডিজি হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও বদলায় এবং জিয়াউল আহসান সেনাপ্রধানের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করেন। ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বললেও তা চাপা দেওয়া হচ্ছিল। জিয়াউলকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চাপ আসে বলেও তিনি জানান।

উল্লেখ্য, গত ১৪ জানুয়ারি জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। এর মধ্যে ২০১১ সালের ১১ জুলাই গাজীপুরের পুবাইলে সজলসহ তিনজনকে হত্যা এবং ২০১০ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে বরগুনা ও বাগেরহাটে কথিত বনদস্যু দমনের নামে ১০০ জনকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে।

সম্পর্কিত