৪০ বছর পর হঠাৎ বাস্তুচ্যুত ৭৫০ পরিবার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজশাহী

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬, ২১: ৫৭
উচ্ছেদের পরে রাজশাহী নগরীর পাঁচ মহল্লার পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের আশ্রয় গাছতলায়। স্ট্রিম ছবি

ভূমিহীন সাইফুল ইসলাম রিকশা চালান। নিজের জমি নেই। প্রায় ৪০ বছর আগে ‘অর্পিত সম্পত্তিতে’ বাড়ি করে মেয়ে-জামাই নিয়ে থাকতেন। গতকাল রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে এক সিদ্ধান্তে সাইফুল ঘরহীন হয়ে পড়েন। পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন জানেন না তিনি।

রাজশাহী নগরীর পাঁচটি মহল্লায় সাইফুলের মতো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ এখন বাস্তুচ্যুত। চার দশক ধরে এসব এলাকায় প্রায় ৭৫০ পরিবার বসবাস করে আসছেন। নগরীর বড়বন গ্রামের সাইফুল ইসলাম জানান, তিনি এতদিন জানতেন– অর্পিত সম্পত্তিতে ঘর গড়েছেন। কেউ কখনো মালিকানা দাবি করেননি। তিনি বলেন, হঠাৎ প্রশাসন আদালতের দোহাই দিয়ে বাড়িঘর ভেঙে দিল। অথচ আদালত থেকে কোনোর নোটিশও আমরা পাইনি।

একই মহল্লার আরও সাতটি বাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। মোট পাঁচ মহল্লার পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ উচ্ছেদের মুখে পড়েছেন। আবুল হাসেম ও মাইনুল হক নামে প্রয়াত দুই ব্যক্তির ওয়ারিশরা জায়গার মালিকানা দাবি করছেন।

তারাই অ্যাডভোকেট কমিশন ও পুলিশ নিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালান। বাসিন্দারা জানান, তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুটি মহল্লার ২৩টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন মহল্লার বাসিন্দারা। তারা সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে উচ্ছেদ বন্ধ হলেও এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।

পরিবারগুলোর বসবাস নগরের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের রায়পাড়া, বড়বনগ্রাম, চকপাড়া, ভাড়ালিপাড়া ও পাবনাপাড়া মহল্লায়। এর মধ্যে বড়বন গ্রামে ৮, চকপাড়ায় ২৫ এবং রায়পাড়া, ভাড়ালিপাড়া ও পাবনা পাড়ায় প্রায় সাত শতাধিক পরিবারের বসবাস।

রোববার দুপুরে প্রথমে বড়বন গ্রামের ১৮ কাঠা জমিতে শুরু হয় অভিযান। বিকেলের মধ্যে আটটি বাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পাবনাপাড়ারও ১৫ বাড়ি ভেঙে ফেলা হয়।

স্থানীয়রা জানান, নগরের ষষ্ঠীতলা এলাকার মৃত মাইনুল হকের ছেলে আজমল হক সাচ্চু এই জমি দখলে নিচ্ছেন। তবে উচ্ছেদ মামলার নথিপত্রে দেখা গেছে, মামলায় মোট বাদী ২০ জন। বিবাদী করা হয়েছে ১৩২ জনকে। তবে মহল্লাবাসীর দাবি, তারা যে এমন মামলার বিবাদী, তা নিজেরাও জানেন না। কখনো নোটিশও পাননি।

উচ্ছেদের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেন মহল্লার বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি
উচ্ছেদের প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেন মহল্লার বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

আজমল হক সাচ্চু জানান, ওইসব এলাকায় তাদের মোট ৭৬ বিঘা জমি রয়েছে। এর মধ্যে ২০ বিঘার মতো নিজেদের দখলে আছে। ১৭ বিঘা জমি অর্পিত সম্পত্তি হয়ে যায়। সেখানে লোকজন বাড়ি নির্মাণের নামে আরও প্রায় ৪০ বিঘা জমি দখলে নেন।

তিনি বলেন, রিট করলে ১৭ বিঘা জমি বুঝিয়ে দিতে উচ্চ আদালতে জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেন। আর অর্পিত সম্পত্তি না হলেও বেদখল হওয়া ৪০ বিঘা জমির দখল পেতে আদালতে উচ্ছেদের মামলা করেছিলাম। এর রায়ও পক্ষে এসেছে।

গত ১৫ এপ্রিল জেলা জজ কার্যালয়ের নেজারত বিভাগের সিভিল সিনিয়র জজ দখল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পদমর্যাদার ৬০ পুলিশ সদস্য মোতায়েনে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনারকে একটি চিঠি দেন।

এতে বলা হয়, পুলিশ খরচাবাবদ ডিক্রিদার ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫৫৪ টাকা জমা দিয়েছেন। ১৯, ২০ ও ২১ এপ্রিল উচ্ছেদ অভিযান চলবে। এই কার্যক্রমে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আদালত থেকে নাসির আহমেদ নামের একজনকে অ্যাডভোকেট কমিশন নিয়োগ করা হয়। উচ্ছেদ অভিযান চলাকালে তাঁকে কেউ কেউ ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে প্রচার করেন। এরপরও মহল্লার বিক্ষুব্ধরা তাঁর মাথা ফাটিয়ে দেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে।

সোমবার (২০ এপ্রিল) বড়বন গ্রাম এলাকায় দেখা যায়, ১৮ কাঠা জমিতে কোনো ঘর অবশিষ্ট নেই। মহল্লাবাসী গরু-ছাগল ও ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে পাশের আমবাগানে আশ্রয় নিয়েছেন। মহল্লার বাসিন্দা রিনা বেগম জানান, রোববার দুপুরে তাঁর ভাত রান্না শেষ হয়েছিল। তরকারি রান্না চলছিল। সেটি শেষ করতে পারেননি। সব গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মহল্লার আরেক বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা রিনা বেগমের প্রশ্ন, ‘এই ভরপুয়াতি অবস্থায় আমি এখুন কোথায় উঠব?’

অর্পিত সম্পত্তির দখল পেতে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি। স্ট্রিম ছবি
অর্পিত সম্পত্তির দখল পেতে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ঘরবাড়ি। স্ট্রিম ছবি

সকালে পাবনাপাড়া মহল্লার বাসিন্দারা রাস্তায় জড়ো হন। সেখানে রুবি বেগম বলেন, ‘আমরা কি রোহিঙ্গা? আমাদের থাকার অধিকার নাই? আমরা ভূমিহীন। আমরা খাসজমিতে থাকতে চাই। আমার ছেলে মারা গেছে, স্বামী নাই। ২০০ টাকা দিনে আয় করি ভাঙারি বেচে। সেই টাকায় খাব কি, আর ঘর ভাড়া দিব কি? আমরা জীবন দিব, কিন্তু জমি ছাড়ব না।’

মহল্লাবাসীর সঙ্গেই ছিলেন স্থানীয় সমাজসেবক শামীম রায়হান। তিনি বলেন, এতগুলো মানুষের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে উচ্ছেদ খুবই অমানবিক। রাজশাহীর মিজানুর রহমান মিনু ভূমিমন্ত্রী, আমরা তাঁর সুনজর চাই।

নগরীর বোয়ালিয়া থানা ভূমি অফিসের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফ হোসেন বলেন, উচ্ছেদ অভিযানে জেলা প্রশাসনের কেউ ছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে আদালতে মামলা থাকায় আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। ১৭ বিঘা অর্পিত সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে আদালতের কোনো নির্দেশনাও আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি।

সম্পর্কিত