বাসডুবি

তদন্তের আগেই তড়িঘড়ি দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংস্কার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাজবাড়ী

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬, ২১: ৫০
বাসডুবির পর এক রাতেই ইট, সুরকি ও বালু ফেলে দৌলতদিয়া ফেরিঘাট সংলগ্ন সড়ক প্রশস্ত করা হয়। স্ট্রিম ছবি

শোকের ক্ষত এখনো তাজা। মায়ের জন্য কেঁদে ফিরছে সন্তান। সন্তানের জন্য মা-বাবা। স্বজনেরাও বাকরুদ্ধ। অথচ তড়িঘড়ি করে সংস্কার করা হচ্ছে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট। এই ঘাটেই তিন দিন আগে ২৫ মার্চ ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পল্টুন থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস পদ্মায় পড়ে গেলে ২৬ জনের মৃত্যু হয়। সন্ধান মেলেনি কয়েকজনের।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে পৃথক কমিটি করেছে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তড়িঘড়ি ফেরিঘাট সংস্কার করছে বিআইডব্লিওটিএ। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। তারা দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ ও প্রমাণ আড়াল হওয়ার আশঙ্কা করেছেন। দোষীদের দায়মুক্তি দিতেই তড়িঘড়ি করে সড়ক অ্যাপ্রোচ সড়ক মেরামত করা হচ্ছে।

সরেজমিন শনিবার (২৮ মার্চ) দেখা যায়, দুর্ঘটনাকবলিত তিন নম্বর ঘাটের ভাঙাচোরা, অস্বাভাবিক উঁচু ও সরু সড়ক রাতারাতি মহাসড়কের মতো চওড়া ও ঝকঝকে করা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, বাসডুবির মূল কারণ ঘাটের উঁচু অ্যাপ্রোচ সড়ক এবং পল্টুনে নিরাপত্তা বেষ্টনী (ব্যারিয়ার) না থাকা। এই প্রমাণ আড়াল করতে বৃহস্পতিবার রাতভর সড়ক সংস্কার করা হয়েছে।

দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবার বাসডুবিতে ঘরে গেছে ২৬ প্রাণ। স্ট্রিম ছবি
দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ফেরিঘাটে বুধবার বাসডুবিতে ঘরে গেছে ২৬ প্রাণ। স্ট্রিম ছবি

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঘাট এলাকার এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাট ছিল সরু ও ঢালু। এতদিন কোনো মেরামত করা হয়নি। দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়েছে। এরপর রাতারাতি প্রমাণ আড়াল করার জন্য অ্যাপ্রোচ সড়ক মেরামত করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হারুন ও জয়নাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ফেরিঘাটের অবস্থা নাজুক। কিন্তু হঠাৎ করে দেখছি ৩ নম্বর ফেরিঘাট মেরামত করা হচ্ছে। লোকমুখে শুনছি– তদন্ত কমিটির সদস্যরা আসবেন, তাদের দেখাতে এটি করা হয়েছে। এখন তো মনে হচ্ছে, কেন সংস্কার করা হচ্ছে, তার তদন্ত আগে হওয়া দরকার।

দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ফেরিঘাট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার যান পারাপার করা হয়। পদ্মার পানি কমে যাওয়ায় ঘাটের সব সংযোগ সড়ক স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ উঁচু হয়ে গেছে। এ কারণে প্রতিদিন ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ দিলেও গা করে না কর্তৃপক্ষ। এখন তারাই সৌহার্দ্য বাস ট্র্যাজেডির পর প্রমাণ লোপাটে নেমেছেন।

তড়িঘড়ি সড়ক ও ফেরিঘাট সংস্কার করেছে সংশ্লিষ্টরা। স্ট্রিম ছবি
তড়িঘড়ি সড়ক ও ফেরিঘাট সংস্কার করেছে সংশ্লিষ্টরা। স্ট্রিম ছবি

বাসচালক মো. সজিব, আলমগীর হোসেন ও আমিনুল ইসলাম বলেন, ফেরিঘাটে কোনো প্রতিবন্ধক (ব্যারিয়ার) নেই। পল্টুন ফাঁকা থাকার সময়ে ব্রেক ফেল করলেই গাড়ি চলে যাবে পদ্মা নদীতে। আগেও অনেকবার পল্টুন থেকে নদীতে ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান পড়েছে। ঘাট কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণেই এসব হচ্ছে।

রাজবাড়ীর বাসিন্দা ট্রাকচালক খায়ের উদ্দিন মিয়া বলেন, ‘এই ঘাটের কর্মকর্তারা বেশির ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাটান। তাদের দায়িত্ব পালন করে কর্মচারীরা। ঘাট ব্যবস্থাপনা বলে কিছুই নেই।’

এ ব্যাপারে দৌলতদিয়া বিআইডব্লিউটিসির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেও মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শন

বাসডুবির কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের করা ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আজ দুপুরে ফেরিঘাট পরিদর্শন করেন কমিটির সদস্যরা। কমিটির আহ্বায়ক ও রাজবাড়ী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে বলেন, ‘পল্টুন সরিয়ে দেখা হয়েছে। তদন্ত শেষে দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ জানা যাবে।’

নিখোঁজ একজনের সন্ধানে অভিযান চলেছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার বলেন, রোববার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি ফেরিঘাট পরিদর্শন করবে।

সম্পর্কিত