ইসলামী ব্যাংকে দিনভর উত্তেজনা, গ্রাহকদের বিক্ষোভে পর্ষদ সভা বাতিল, লাঠিচার্জ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গ্রাহকদের বিক্ষোভে পর্ষদ সভা বাতিল হয়েছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

ইসলামী ব্যাংকের নতুন চেয়ারম্যানের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে গ্রাহকদের বিক্ষোভে পর্ষদ সভা বাতিল হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে অনলাইনে সভা করার চেষ্টা করা হলেও গ্রাহকদের তোপের মুখে তাও সম্ভব হয়নি।

সোমবার (১ জুন) মতিঝিলে প্রধান কার্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপে অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন।

‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’–এর ব্যানারে ব্যাংকটির কয়েক শ গ্রাহক প্রধান কার্যালয়ের সামনে এই আন্দোলন চালান। আন্দোলন দমাতে পুলিশের লাঠিচার্জ, জলকামান ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনায় অন্তত ২৫ জন গ্রাহক আহত হয়েছেন।

পুলিশের লাঠিচার্জ ও সাউন্ড গ্রেনেড, আহত ২৫

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৮টা থেকেই পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। সকাল ৯টার দিকে প্রায় ৫০০ গ্রাহক সেখানে জড়ো হয়ে নতুন চেয়ারম্যানকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। আন্দোলনকারীরা সাবেক বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার এবং পাচার করা অর্থ ফেরতের দাবিতে বিভিন্ন ফেস্টুন প্রদর্শন করেন। একই সঙ্গে তাঁরা বর্তমান গভর্নরের পদত্যাগও দাবি করেন।

সকাল ১০টার আগেই পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড এবং লাঠিচার্জ করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। গ্রাহক ফোরামের দাবি, পুলিশের হামলায় লোকাল শাখার আতিকুর রহমান ও আগারগাঁও শাখার রেজাউল করিমসহ প্রায় ২৫ জন গ্রাহক আহত হয়েছেন। তবে মতিঝিল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুস সালাম জানান, সড়ক অবরোধ করায় পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দিয়েছে।

অনলাইনেও হলো না পর্ষদ সভা

দুপুর আড়াইটায় নতুন চেয়ারম্যান মো. খুরশীদ আলমের সভাপতিত্বে এবং এমডি ওমর ফারুক খানের পদত্যাগপত্র অনুমোদনের লক্ষে পর্ষদ সভা ডাকা হয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের কারণে কোনো পরিচালক ব্যাংকে আসেননি।

পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক অনলাইনে সভা করার অনুমতি দিলে ভারপ্রাপ্ত এমডি আলতাফ হোসেনের ওপর পুলিশ ও ডিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সভা করার জন্য চাপ দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে গ্রাহকেরা এমডির কক্ষের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করলে রাত ৯টা পর্যন্ত কোনো সভা করা সম্ভব হয়নি।

গ্রাহক ফোরামের সভাপতি নূরুন্নবী মানিক বলেন, 'ফ্যাসিবাদের দোসর খুরশীদ আলমের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। ২০১৭ সালে ঠিক যেভাবে জোরপূর্বক ব্যাংক দখল করা হয়েছিল, এবারও পুলিশ-ডিবি দিয়ে অনলাইনে সভা করিয়ে সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা তা সফল হতে দেব না।'

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর বার্তা

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, 'একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে। কোনো ব্যাংকেই এমন রাজনৈতিক প্রভাব মেনে নেওয়া হবে না।' তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে সড়কে আন্দোলন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনি সিদ্ধান্তে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না।

খাদের কিনারায় ইসলামী ব্যাংক

২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকেই এর আর্থিক অবস্থা ক্রমান্বয়ে ভেঙে পড়ে। ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ব্যাংকটির মুনাফা ছিল ৪৪৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে নেমে এসেছে মাত্র ১৩৭ কোটি টাকায়। আগে খেলাপি ঋণ ৪.২৫ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ শতাংশে। ব্যাংকটির ৯৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ এখন খেলাপি। এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব ৬৩ শতাংশ থেকে কমে মাত্র ১৭.৯১ শতাংশে নেমে এসেছে।

বর্তমানে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা থাকা প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার জব্দ করে রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

পরবর্তী কর্মসূচি

আজকের ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার দেশের সব জেলার ইসলামী ব্যাংকের শাখার সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দিয়েছে ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’।

সম্পর্কিত