মুগ্ধর বলা শেষ কথা ‘চল’, তারপরই কপালে গুলি লাগে

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ১৪: ১১
মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

‘চল’!—বন্ধু নাঈমুর রহমান আশিককে বলা এটাই ছিল মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর শেষ কথা। কয়েক সেকেন্ড পরই একটি গুলি এসে বিদ্ধ করে তাঁর কপাল। হাতে তখনো ছিল আন্দোলনকারীদের জন্য আনা পানির বোতল আর বিস্কুটের প্যাকেট। বন্ধুকে বাঁচানোর জন্য যে তরুণ বিকেলজুড়ে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দিচ্ছিলেন, মুহূর্তেই তিনিই হয়ে যান আরেকজন রক্তাক্ত শরীর।

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী আজ। সময় পেরিয়েছে, কিন্তু পরিবারের কাছে মুগ্ধ আজও একজন স্বপ্নবাজ, মানবিক ও প্রাণবন্ত তরুণ, যিনি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে দেখতে নিজেই ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন।

মুগ্ধ যেদিন নিহত হন, সেদিন দুপুরে বন্ধু আশিককে নিয়ে তিনি উত্তরার আজমপুরে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। পুরোটা সময় আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণেই ব্যস্ত ছিলেন। সেদিনের স্মৃতি এখনো তাড়িয়ে বেড়ায় আশিককে।

আশিক স্ট্রিমকে বলেন, সেদিন বিকেলে আন্দোলনের মধ্যে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার সময় হঠাৎ চারদিকে ছোটাছুটি শুরু হয়। তখন মুগ্ধকে বলি, ‘চল দৌড় দেই।’ জবাবে মুগ্ধ শুধু বলেন, ‘চল।’ এরপর কয়েক কদম এগিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখি, মুগ্ধ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে।

আশিক আরও বলেন, ‘দেখি আমার বন্ধু বসা অবস্থা থেকেই মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে তখনো পানির বোতল আর বিস্কুটের পলিথিন। কপালে গুলির স্পষ্ট চিহ্ন। আমি চিৎকার করে উঠি—জাকির, মুগ্ধ গুলি খাইছে! তখন আমরা কয়েকজন তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে যাই। চিকিৎসকরা জানান, মুগ্ধ আর বেঁচে নেই।’

মুগ্ধ ও স্নিগ্ধ। ছবি: সংগৃহীত
মুগ্ধ ও স্নিগ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

ওইদিন সন্ধ্যায় খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান মুগ্ধর জমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল ও শুধু ঘুমিয়ে আছে। আমি ডাক্তারকে আবার ইসিজি করতে বলি। নিজের চোখে দেখার পরই বিশ্বাস করতে পারি, মুগ্ধ আর নেই।’

স্নিগ্ধ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ইন্টেরিম সরকারও করেনি, বর্তমান সরকারও করছে না। শহীদদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ছিটেফোঁটাও নেই। যে ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল, আমরা আবার সেই পুরোনো কাঠামোতেই ফিরে যাচ্ছি।’

জন্মের আগ থেকেই একসঙ্গে থাকা দুই ভাইয়ের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বেরও ঊর্ধ্বে। স্নিগ্ধ বলেন, ‘আমরা শুধু ভাই ছিলাম না, একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ছিলাম।’

মুগ্ধর স্বপ্ন ছিল পৃথিবী দেখা। মৃত্যুর আগে তিনি দেশের ৩৪টি জেলা ঘুরে দেখেছিলেন। ইচ্ছা ছিল ৬৪টি জেলা ঘোরা। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে নতুন নতুন দেশ দেখা। সেই লক্ষ্যেই তিনি আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে জানান স্নিগ্ধ।

ছোট ভাইকে শেষবারের মতো নিজ হাতে গোসলও করিয়েছেন স্নিগ্ধ। ব্যান্ডেজ খুলে তখনই দেখেন, কপাল ভেদ করে গুলি ডান কানের পেছন দিয়ে বেরিয়ে গেছে।

২০২৩ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক সম্পন্ন করার পর বিইউপিতে ভর্তি হন মুগ্ধ। পরিবার ও বন্ধুদের ভাষ্য, তিনি কখনো সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। আন্দোলনের দিনও মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

দুই বছর পরও মুগ্ধর অসমাপ্ত স্বপ্ন, শেষ বিকেলের স্মৃতি আর তার বলা শেষ শব্দ—‘চল’, বয়ে বেড়াচ্ছেন পরিবার, বন্ধু ও স্বজনরা। তাদের প্রত্যাশা, শুধু হত্যার বিচার নয়; যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে মুগ্ধসহ অসংখ্য তরুণ জীবন দিয়েছেন, তা যেন বাস্তবায়ন হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত