ড. মো. আবু সালেহ

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১১ সালের ৩০ জুন পাস হওয়া 'সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১' একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিকে আবর্তিত করেছে। এই সংশোধনীর মূল নির্যাস ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা' বিলোপ এবং নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের অন্যতম হাতিয়ার 'গণভোট' ব্যবস্থার অবসান। তবে এই আইনি পরিবর্তনের পেছনে যে ঐতিহাসিক ও বিচারবিভাগীয় পটভূমি ছিল, তা অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক বিতর্কে জারিত।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পর ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি গভীর অনাস্থাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, যাতে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলো এই ব্যবস্থার অধীনে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পায়।
তবে ২০০৬-০৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (যা '১/১১-এর সরকার' নামে পরিচিত) অভিজ্ঞতার পর, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ও এর অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে সমীকরণ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতা ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি সমূলে উৎপাটন করা হয়। একই সঙ্গে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা 'গণভোট' ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়। পূর্ববর্তী বিধান অনুযায়ী, সংবিধানের প্রস্তাবনা বা কোনো মৌলিক ধারা পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতির (গণভোট) প্রয়োজন হতো। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের এই প্রত্যক্ষ রায় দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের একচ্ছত্র ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ রোধের কঠোর আইনি ঢাল
পঞ্চদশ সংশোধনীর পক্ষের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল ভবিষ্যতে যেন কোনো অসাংবিধানিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে না পারে, তার জন্য সংবিধানে একটি স্থায়ী ও দুর্ভেদ্য আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে সংবিধানে '৭ক' এবং '৭খ' নামক দুটি নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭ক-এ বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় এই সংবিধান বা এর কোনো অনুচ্ছেদ রদ, স্থগিত বা বাতিল করেন কিংবা তা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করেন, তবে তার এই কাজ 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবেন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়।
আপাতদৃষ্টিতে একে গণতন্ত্র সুরক্ষার একটি আইনি ঢাল হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও, পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে, এটি মূলত ক্ষমতাসীন দলের শাসনকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থেকে সুরক্ষিত করার এবং ক্ষমতার রদবদলকে অসম্ভব করে তোলার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হকের ভূমিকা ও নৈতিকতার সংকট
পঞ্চদশ সংশোধনীর আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত রায়ের ওপর ভর করে। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) মামলার শুনানি শেষ করে। ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত আকারে সংক্ষিপ্ত আদেশ ঘোষণা করেন। বিচারপতি খায়রুল হকের এই সংক্ষিপ্ত আদেশের মূল দিকটি ছিল দ্বিমুখী। রায়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে 'অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী' ঘোষণা করলেও, দেশের সামগ্রিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় সত্ত্বেও পরবর্তী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারকদের বাদ দিয়ে পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই অনুষ্ঠিত হতে পারে।’
অর্থাৎ, সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি সুষ্পষ্টভাবে আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার আইনি ও বাস্তবসম্মত সুযোগ দিয়েছিলেন।
তবে নৈতিক ও বিচারবিভাগীয় বিতর্কের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন বিচারপতি খায়রুল হক ২০১১ সালের মে মাসে অবসরে যান এবং তার অবসরের দীর্ঘ ১৬ মাস পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত রায় প্রকাশ করেন। বিস্ময়করভাবে দেখা যায়, এই বিস্তারিত রায়ে সংক্ষিপ্ত আদেশের 'আগামী দুই মেয়াদের ছাড়' দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে তাৎক্ষণিকভাবে ও চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়।
আইনি নৈতিকতা ও বিচারিক প্রথার আলোকে এটি একটি নজিরবিহীন ও চরম বিতর্কিত ঘটনা। একজন বিচারক অবসরে যাওয়ার পর বিচারক হিসেবে তার সাংবিধানিক ও আইনি কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। অবসরে যাওয়ার পর সংক্ষিপ্ত আদেশের মূল চেতনাকে বদলে দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বিস্তারিত রায় প্রদান করা বিচারিক আচরণের চরম লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আইনবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন। বিচারপতি খায়রুল হকের এই বিতর্কিত রায়কে মূল পুঁজি করেই তৎকালীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত বনাম রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পূর্বে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি 'সংসদীয় বিশেষ কমিটি' গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের প্রায় প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই প্রক্রিয়া বয়কট করলেও, সংলাপে অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল, এমনকি সরকারের শরিক দলগুলো (যেমন ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ) এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত জোরালোভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। খোদ বিশেষ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এবং কমিটির কো-চেয়ারম্যানও প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল কাঠামো ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে, কোনো এক অদৃশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ মহলের একমুখী সিদ্ধান্তের চাপে কমিটির পূর্ববর্তী সমস্ত সুপারিশ ও অংশীজনদের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সিংহভাগ জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে তোয়াক্কা না করে, কেবল বিচারিক রায়ের বিতর্কিত অংশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করা হয়, যা পরবর্তী ১৩ বছর ধরে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তোলে।
রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন (২০১১-২০২৪)
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ২০১১ সালে যে পরিবর্তনের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাষ্ট্র কাঠামোর গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সাধারণ আইনি রদবদল ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বড় ধরনের আঘাত, যা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়িষ্ণুতাকে ত্বরান্বিত করে।
পারস্পরিক চরম অনাস্থা ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ রুদ্ধ হওয়া
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ নিয়ে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় প্রধান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এই গভীর ও যৌক্তিক আশঙ্কা তৈরি হয় যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এর ফলে তৈরি হয় এক চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনাস্থার সংস্কৃতি, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি সাধারণ নির্বাচনে।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দলগুলো ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে। ফলস্বরূপ, ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া (বিনা ভোটে) সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে জনগণের ভোটাধিকার হরণের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার আশায় সব দল নির্বাচনে অংশ নিলেও, নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভূতপূর্ব ও কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে। নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম পক্ষপাতমূলক আচরণে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
পূর্ববর্তী নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালেও প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর জন্য ক্ষমতাসীন দল নিজস্ব ‘ডামি’ ও ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে একটি সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রত্যক্ষ পরিণতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যা দেশের রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী-উত্তর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন এর বিখ্যাত গ্রন্থ পলিটিকাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ (১৯৬৮)-এ বর্ণীত তত্ত্বের আলোকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। হান্টিংটন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা বোঝার জন্য দুটি মূল ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন– ১.রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ২. রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।
হান্টিংটনের মতে কোন সমাজে যদি "রাজনৈতিক অংশগ্রহণ" বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই অনুপাতে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী "রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান" (যেমন: স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংসদ) গড়ে না ওঠে বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেখানে একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। হান্টিংটন এই অবস্থাকেই 'রাজনৈতিক পতন' বা রাজনৈতিক অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা, জটিলতা, স্বায়ত্তশাসন এবং সংহতি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
নির্বাচন কমিশন, যা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেটি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নের একটি আজ্ঞাবহ দপ্তরে পরিণত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দলের শাসন টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। হান্টিংটনের পরিভাষায়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হারিয়ে কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ক্ষমতার স্বার্থে কাজ করে, তখন তাদের 'প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ' বা স্থায়িত্ব নষ্ট হয় এবং সমাজ ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ বা ‘প্রজাতান্ত্রিক অবক্ষয়’ এর দিকে ধাবিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর জনগণ ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার ও দাবি আদায়ের গতি তীব্রতর হলেও, রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেটিকে ধারণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখনই একটি গোষ্ঠী ক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার শুরু করে, তখন শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য বিলুপ্ত হয়।
গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের বা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ (নির্বাচন) বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, রাজনৈতিক দল ও জনগণের ক্ষোভ এবং অংশগ্রহণ রাজপথের সহিংসতা এবং পরবর্তীতে চরম গণ-অসন্তোষের দিকে ধাবিত হয়। হান্টিংটন স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যখন চরম মাত্রায় পৌঁছায়, তখন শাসনব্যবস্থা আর সাধারণ নিয়মে চলে না; তা শেষ পর্যন্ত চরম কর্তৃত্ববাদ, বলপ্রয়োগ এবং গণ-অভ্যুত্থানের দিকে পতিত হতে বাধ্য।
২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দৃশ্যপট ছিল হান্টিংটনের এই 'রাজনৈতিক পতন' তত্ত্বের এক নিখুঁত ও বাস্তব উদাহরণ। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি করা আইনি জটিলতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো শাসনব্যবস্থাকে একটি ভঙ্গুর ও কর্তৃত্ববাদী সংকটের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করেছিল।
অনমনীয় সংবিধান ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী আইনি ক্ষতটি লুকিয়ে ছিল এর চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক চরিত্রকে এমনভাবে বদলে দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রকে একটি চরম অনমনীয় ও একনায়কতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে বন্দি করে ফেলে। জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের অধিকার বা গণভোট বাতিল করে একদিকে যেমন জনগণের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা হয়েছিল, অন্যদিকে সংবিধানের সামান্যতম সমালোচনাকেও 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করার আইনি ফাঁদ তৈরি করে নাগরিকদের কণ্ঠ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়।
সাধারণত একটি গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানের কিছু অংশ পরিবর্তনশীল রাখা হয়, যাতে সময়ের প্রয়োজনে এবং জনআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তাতে পরিমার্জন আনা যায়। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে '৭খ' অনুচ্ছেদটি সংযোজন করে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে চিরতরে অপরিবর্তনীয় ও অনমনীয় করে তোলা হয়। অনুচ্ছেদ ৭খ-তে ঘোষণা করা হয় যে, ১৪২ অনুচ্ছেদে (যা সংবিধান সংশোধনের নিয়মাবলী সংক্রান্ত) যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের ১ম ভাগ (প্রজাতন্ত্র), ২য় ভাগ (রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি), ৩য় ভাগ (মৌলিক অধিকার) এবং ১১শ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদ সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের বিধানাবলী কোনো অবস্থাতেই কোনো সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন, পরিমার্জন বা বিলোপ করা যাবে না। ৷
আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় “ইটার্নাল ক্লোজ” বা চিরন্তন অনুচ্ছেদ। এর মাধ্যমে তৎকালীন সংসদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত বেঁধে দিয়েছিল। একটি সংসদ কোনোভাবেই ভবিষ্যৎ সংসদ বা প্রজন্মের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না যে তারা নিজেদের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে কি পারবে না। এই চরম অনমনীয়তা সংবিধানকে জনগণের জীবন্ত দলিল হিসেবে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে একটি জবরদস্তিমূলক দলিলে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’
জনগণের এই ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক হাতিয়ার ছিল 'গণভোট' ব্যবস্থা। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী বিধান অনুসারে, সংবিধানের প্রস্তাবনা বা কোনো মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের (গণভোট) মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হতো।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই গণভোটের বিধানটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। সংবিধানের মতো একটি জাতীয় সনদের মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি "হ্যাঁ" বা "না" বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর সংসদের সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে, মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ আসনপ্রাপ্ত যেকোনো দল জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও সংবিধানের যেকোনো অংশ পরিবর্তন করার একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভ করে, যা প্রকারান্তরে জনগণের সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল উৎস ছিল, সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায় দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান পুনরায় সংবিধানে বহাল রাখার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে এক নতুন ও ইতিবাচক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে একতরফা এবং কর্তৃত্ববাদী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিক রায় সেই ভুল পথ থেকে রাষ্ট্রকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে একটি রায় কেবল একটি আইনি পথরেখা এঁকে দিতে পারে; সেই পথ বেয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ জনগণের ওপরই বর্তায়।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই রায়ের চেতনাকে ধারণ করা অপরিহার্য। আমাদের এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে বুলেটের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমে, যেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব থাকবে চির অক্ষুণ্ন এবং যেখানে সংবিধান কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর ঢাল না হয়ে হবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের রক্ষাকবচ। তবেই এই ঐতিহাসিক রায় এবং দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।

বাংলাদেশের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১১ সালের ৩০ জুন পাস হওয়া 'সংবিধান (পঞ্চদশ সংশোধন) আইন, ২০১১' একটি টার্নিং পয়েন্ট। এই সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার মৌলিক কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পরবর্তী এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিকে আবর্তিত করেছে। এই সংশোধনীর মূল নির্যাস ছিল ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে প্রবর্তিত 'তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা' বিলোপ এবং নাগরিকদের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের অন্যতম হাতিয়ার 'গণভোট' ব্যবস্থার অবসান। তবে এই আইনি পরিবর্তনের পেছনে যে ঐতিহাসিক ও বিচারবিভাগীয় পটভূমি ছিল, তা অত্যন্ত জটিল এবং বহুমাত্রিক বিতর্কে জারিত।
১৯৯৬ সালে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পর ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল একটি গভীর অনাস্থাপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করা, যাতে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলো এই ব্যবস্থার অধীনে তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে স্বীকৃতি পায়।
তবে ২০০৬-০৮ সালের সামরিক বাহিনী সমর্থিত দীর্ঘমেয়াদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (যা '১/১১-এর সরকার' নামে পরিচিত) অভিজ্ঞতার পর, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই ব্যবস্থার দুর্বলতা ও এর অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে সমীকরণ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতা ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থাটি সমূলে উৎপাটন করা হয়। একই সঙ্গে, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে থাকা 'গণভোট' ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়। পূর্ববর্তী বিধান অনুযায়ী, সংবিধানের প্রস্তাবনা বা কোনো মৌলিক ধারা পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতির (গণভোট) প্রয়োজন হতো। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জনগণের এই প্রত্যক্ষ রায় দেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সংবিধান সংশোধনের একচ্ছত্র ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত করা হয়।
অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা গ্রহণ রোধের কঠোর আইনি ঢাল
পঞ্চদশ সংশোধনীর পক্ষের অন্যতম প্রধান যুক্তি ছিল ভবিষ্যতে যেন কোনো অসাংবিধানিক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে না পারে, তার জন্য সংবিধানে একটি স্থায়ী ও দুর্ভেদ্য আইনি প্রতিরোধ গড়ে তোলা। এই উদ্দেশ্যে সংবিধানে '৭ক' এবং '৭খ' নামক দুটি নতুন অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। অনুচ্ছেদ ৭ক-এ বলা হয়, যদি কোনো ব্যক্তি শক্তি প্রদর্শন বা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা অন্য কোনো অসাংবিধানিক পন্থায় এই সংবিধান বা এর কোনো অনুচ্ছেদ রদ, স্থগিত বা বাতিল করেন কিংবা তা করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ বা ষড়যন্ত্র করেন, তবে তার এই কাজ 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য হবে এবং ওই ব্যক্তি রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে দোষী হবেন। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে প্রচলিত আইনে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়।
আপাতদৃষ্টিতে একে গণতন্ত্র সুরক্ষার একটি আইনি ঢাল হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও, পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায় যে, এটি মূলত ক্ষমতাসীন দলের শাসনকে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ থেকে সুরক্ষিত করার এবং ক্ষমতার রদবদলকে অসম্ভব করে তোলার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল।
বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হকের ভূমিকা ও নৈতিকতার সংকট
পঞ্চদশ সংশোধনীর আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত বিতর্কিত রায়ের ওপর ভর করে। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী (তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা) মামলার শুনানি শেষ করে। ২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ. বি. এম. খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত আকারে সংক্ষিপ্ত আদেশ ঘোষণা করেন। বিচারপতি খায়রুল হকের এই সংক্ষিপ্ত আদেশের মূল দিকটি ছিল দ্বিমুখী। রায়ে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকের মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে 'অবৈধ ও সংবিধান পরিপন্থী' ঘোষণা করলেও, দেশের সামগ্রিক শান্তি, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ দেন। তিনি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ‘দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই রায় সত্ত্বেও পরবর্তী দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারকদের বাদ দিয়ে পূর্ববর্তী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই অনুষ্ঠিত হতে পারে।’
অর্থাৎ, সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি সুষ্পষ্টভাবে আগামী দুই মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার আইনি ও বাস্তবসম্মত সুযোগ দিয়েছিলেন।
তবে নৈতিক ও বিচারবিভাগীয় বিতর্কের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন বিচারপতি খায়রুল হক ২০১১ সালের মে মাসে অবসরে যান এবং তার অবসরের দীর্ঘ ১৬ মাস পর ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরের দিকে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত রায় প্রকাশ করেন। বিস্ময়করভাবে দেখা যায়, এই বিস্তারিত রায়ে সংক্ষিপ্ত আদেশের 'আগামী দুই মেয়াদের ছাড়' দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে তাৎক্ষণিকভাবে ও চূড়ান্তভাবে বাতিল করা হয়।
আইনি নৈতিকতা ও বিচারিক প্রথার আলোকে এটি একটি নজিরবিহীন ও চরম বিতর্কিত ঘটনা। একজন বিচারক অবসরে যাওয়ার পর বিচারক হিসেবে তার সাংবিধানিক ও আইনি কর্তৃত্বের অবসান ঘটে। অবসরে যাওয়ার পর সংক্ষিপ্ত আদেশের মূল চেতনাকে বদলে দিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বিস্তারিত রায় প্রদান করা বিচারিক আচরণের চরম লঙ্ঘন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আইনবিদদের বড় একটি অংশ মনে করেন। বিচারপতি খায়রুল হকের এই বিতর্কিত রায়কে মূল পুঁজি করেই তৎকালীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে।
সংসদীয় বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত বনাম রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব
পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের পূর্বে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি 'সংসদীয় বিশেষ কমিটি' গঠন করা হয়েছিল। এই কমিটি দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, বুদ্ধিজীবী এবং দেশের প্রায় প্রতিটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এই প্রক্রিয়া বয়কট করলেও, সংলাপে অংশ নেওয়া অন্যান্য প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দল, এমনকি সরকারের শরিক দলগুলো (যেমন ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ) এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অত্যন্ত জোরালোভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। খোদ বিশেষ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য এবং কমিটির কো-চেয়ারম্যানও প্রথমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মূল কাঠামো ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে, কোনো এক অদৃশ্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নির্বাহী বিভাগের শীর্ষ মহলের একমুখী সিদ্ধান্তের চাপে কমিটির পূর্ববর্তী সমস্ত সুপারিশ ও অংশীজনদের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়। দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও সিংহভাগ জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে তোয়াক্কা না করে, কেবল বিচারিক রায়ের বিতর্কিত অংশকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন এক কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করা হয়, যা পরবর্তী ১৩ বছর ধরে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ অকার্যকর করে তোলে।
রাজনীতির গতিপথ পরিবর্তন (২০১১-২০২৪)
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে ২০১১ সালে যে পরিবর্তনের বীজ বপন করা হয়েছিল, তা পরবর্তী দেড় দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণ ও রাষ্ট্র কাঠামোর গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সিদ্ধান্তটি কেবল একটি সাধারণ আইনি রদবদল ছিল না; বরং এটি ছিল বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বড় ধরনের আঘাত, যা দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অনাস্থাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়িষ্ণুতাকে ত্বরান্বিত করে।
পারস্পরিক চরম অনাস্থা ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ রুদ্ধ হওয়া
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘নির্বাচনকালীন সরকার’ নিয়ে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়। ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় প্রধান বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এই গভীর ও যৌক্তিক আশঙ্কা তৈরি হয় যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে কোনোভাবেই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। এর ফলে তৈরি হয় এক চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও অনাস্থার সংস্কৃতি, যার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি সাধারণ নির্বাচনে।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে বিরোধী দলগুলো ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করে। ফলস্বরূপ, ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনেই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়া (বিনা ভোটে) সংসদ সদস্যরা নির্বাচিত হন। এটি বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে জনগণের ভোটাধিকার হরণের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক ধাপ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে তীব্র আন্দোলনের মুখে এবং রাজনৈতিক সমঝোতার আশায় সব দল নির্বাচনে অংশ নিলেও, নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করার অভূতপূর্ব ও কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটে। নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম পক্ষপাতমূলক আচরণে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনগণের ন্যূনতম বিশ্বাসটুকুও ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
পূর্ববর্তী নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালেও প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনকে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর জন্য ক্ষমতাসীন দল নিজস্ব ‘ডামি’ ও ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী দাঁড় করিয়ে একটি সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করে। পঞ্চদশ সংশোধনীর প্রত্যক্ষ পরিণতিতে বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়, যা দেশের রাজনীতিতে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়।
পঞ্চদশ সংশোধনী-উত্তর বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটকে মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন এর বিখ্যাত গ্রন্থ পলিটিকাল অর্ডার ইন চেঞ্জিং সোসাইটিজ (১৯৬৮)-এ বর্ণীত তত্ত্বের আলোকে খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। হান্টিংটন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা বোঝার জন্য দুটি মূল ধারণার ওপর জোর দিয়েছেন– ১.রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, ২. রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ।
হান্টিংটনের মতে কোন সমাজে যদি "রাজনৈতিক অংশগ্রহণ" বা ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সেই অনুপাতে নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী "রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান" (যেমন: স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংসদ) গড়ে না ওঠে বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে সেখানে একধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। হান্টিংটন এই অবস্থাকেই 'রাজনৈতিক পতন' বা রাজনৈতিক অবক্ষয় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোজন ক্ষমতা, জটিলতা, স্বায়ত্তশাসন এবং সংহতি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর পর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বায়ত্তশাসন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।
নির্বাচন কমিশন, যা একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল, সেটি ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক ইচ্ছা বাস্তবায়নের একটি আজ্ঞাবহ দপ্তরে পরিণত হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট দলের শাসন টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। হান্টিংটনের পরিভাষায়, যখন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য হারিয়ে কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির ক্ষমতার স্বার্থে কাজ করে, তখন তাদের 'প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ' বা স্থায়িত্ব নষ্ট হয় এবং সমাজ ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব’ বা ‘প্রজাতান্ত্রিক অবক্ষয়’ এর দিকে ধাবিত হয়।
তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের পর জনগণ ও বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক অধিকার ও দাবি আদায়ের গতি তীব্রতর হলেও, রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেটিকে ধারণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। যখনই একটি গোষ্ঠী ক্ষমতার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় সংস্থাসমূহকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার শুরু করে, তখন শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতার ভারসাম্য বিলুপ্ত হয়।
গণতান্ত্রিক উপায়ে দাবি আদায়ের বা শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সাংবিধানিক পথ (নির্বাচন) বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, রাজনৈতিক দল ও জনগণের ক্ষোভ এবং অংশগ্রহণ রাজপথের সহিংসতা এবং পরবর্তীতে চরম গণ-অসন্তোষের দিকে ধাবিত হয়। হান্টিংটন স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা যখন চরম মাত্রায় পৌঁছায়, তখন শাসনব্যবস্থা আর সাধারণ নিয়মে চলে না; তা শেষ পর্যন্ত চরম কর্তৃত্ববাদ, বলপ্রয়োগ এবং গণ-অভ্যুত্থানের দিকে পতিত হতে বাধ্য।
২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দৃশ্যপট ছিল হান্টিংটনের এই 'রাজনৈতিক পতন' তত্ত্বের এক নিখুঁত ও বাস্তব উদাহরণ। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তৈরি করা আইনি জটিলতা রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার বদলে প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত পুরো শাসনব্যবস্থাকে একটি ভঙ্গুর ও কর্তৃত্ববাদী সংকটের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত করেছিল।
অনমনীয় সংবিধান ও জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর সবচেয়ে ভয়াবহ এবং সুদূরপ্রসারী আইনি ক্ষতটি লুকিয়ে ছিল এর চতুর্থ অধ্যায়ে বর্ণিত পরিবর্তনগুলোর মধ্যে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক চরিত্রকে এমনভাবে বদলে দেওয়া হয়, যা রাষ্ট্রকে একটি চরম অনমনীয় ও একনায়কতান্ত্রিক আইনি কাঠামোর মধ্যে বন্দি করে ফেলে। জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত প্রকাশের অধিকার বা গণভোট বাতিল করে একদিকে যেমন জনগণের সার্বভৌমত্ব খর্ব করা হয়েছিল, অন্যদিকে সংবিধানের সামান্যতম সমালোচনাকেও 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করার আইনি ফাঁদ তৈরি করে নাগরিকদের কণ্ঠ সম্পূর্ণ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়।
সাধারণত একটি গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধানের কিছু অংশ পরিবর্তনশীল রাখা হয়, যাতে সময়ের প্রয়োজনে এবং জনআকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তাতে পরিমার্জন আনা যায়। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে '৭খ' অনুচ্ছেদটি সংযোজন করে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে চিরতরে অপরিবর্তনীয় ও অনমনীয় করে তোলা হয়। অনুচ্ছেদ ৭খ-তে ঘোষণা করা হয় যে, ১৪২ অনুচ্ছেদে (যা সংবিধান সংশোধনের নিয়মাবলী সংক্রান্ত) যা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের ১ম ভাগ (প্রজাতন্ত্র), ২য় ভাগ (রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি), ৩য় ভাগ (মৌলিক অধিকার) এবং ১১শ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদ সহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদের বিধানাবলী কোনো অবস্থাতেই কোনো সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন, পরিমার্জন বা বিলোপ করা যাবে না। ৷
আইনি পরিভাষায় একে বলা হয় “ইটার্নাল ক্লোজ” বা চিরন্তন অনুচ্ছেদ। এর মাধ্যমে তৎকালীন সংসদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাত বেঁধে দিয়েছিল। একটি সংসদ কোনোভাবেই ভবিষ্যৎ সংসদ বা প্রজন্মের অধিকার কেড়ে নিতে পারে না যে তারা নিজেদের প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে কি পারবে না। এই চরম অনমনীয়তা সংবিধানকে জনগণের জীবন্ত দলিল হিসেবে টিকিয়ে রাখার পরিবর্তে একটি জবরদস্তিমূলক দলিলে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭(১) অনুচ্ছেদে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’
জনগণের এই ক্ষমতার প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশের অন্যতম প্রধান সাংবিধানিক হাতিয়ার ছিল 'গণভোট' ব্যবস্থা। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের পূর্ববর্তী বিধান অনুসারে, সংবিধানের প্রস্তাবনা বা কোনো মৌলিক চরিত্র পরিবর্তনের জন্য সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের পাশাপাশি দেশের সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের (গণভোট) মাধ্যমে অনুমোদন নিতে হতো।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই গণভোটের বিধানটি সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। সংবিধানের মতো একটি জাতীয় সনদের মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের সরাসরি "হ্যাঁ" বা "না" বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। জনগণের সার্বভৌমত্বের ওপর সংসদের সার্বভৌমত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে, মাত্র দুই-তৃতীয়াংশ আসনপ্রাপ্ত যেকোনো দল জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও সংবিধানের যেকোনো অংশ পরিবর্তন করার একচ্ছত্র ক্ষমতা লাভ করে, যা প্রকারান্তরে জনগণের সার্বভৌমত্বকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল।
দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে পঞ্চদশ সংশোধনী দেশের রাজনৈতিক সংকটের মূল উৎস ছিল, সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায় দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা এবং গণভোটের বিধান পুনরায় সংবিধানে বহাল রাখার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে এক নতুন ও ইতিবাচক মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী যেভাবে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথকে একতরফা এবং কর্তৃত্ববাদী সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, সুপ্রিম কোর্টের এই সাম্প্রতিক রায় সেই ভুল পথ থেকে রাষ্ট্রকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। তবে একটি রায় কেবল একটি আইনি পথরেখা এঁকে দিতে পারে; সেই পথ বেয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের দায়িত্ব দেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ জনগণের ওপরই বর্তায়।
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই রায়ের চেতনাকে ধারণ করা অপরিহার্য। আমাদের এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে বুলেটের পরিবর্তে ব্যালটের মাধ্যমে, যেখানে জনগণের সার্বভৌমত্ব থাকবে চির অক্ষুণ্ন এবং যেখানে সংবিধান কোনো নির্দিষ্ট শাসকগোষ্ঠীর ঢাল না হয়ে হবে দেশের প্রতিটি নাগরিকের অধিকারের রক্ষাকবচ। তবেই এই ঐতিহাসিক রায় এবং দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পূর্ণতা পাবে।
লেখক: গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক।
.png)

গত কয়েক দশকে গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন অনেক স্বৈরশাসক। কিন্তু পালানোর পর তাদের বেশিরভাগই দেশে ফিরতে পারেননি। আমৃত্যু নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। আর হাতেগোনা যে কয়জন ফিরতে পেরেছেন, তাদের কেউই রাজনীতিতে নিজেকে পুনর্বাসন করতে পারেননি। দেশে ফিরতে পারলেও জীবনের বাকি সময় কারাগারেই পার করতে হয়েছে।
৩৪ মিনিট আগে
গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ নতুন সংসদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। মতপার্থক্যের মূল বিষয়টি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং সেই সংস্কারের প্রক্রিয়া। সরকার মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানের আওতায়...
১৯ ঘণ্টা আগে
পার্বত্য চট্টগ্রামকে সাধারণত আমরা দুর্গম, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জের চোখ দিয়ে দেখি। কিন্তু এই ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে আমাদের উচ্চমূল্যের কৃষি, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র।
২০ ঘণ্টা আগে