সাকিব আনোয়ার

গত কয়েক দশকে গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন অনেক স্বৈরশাসক। কিন্তু পালানোর পর তাদের বেশিরভাগই দেশে ফিরতে পারেননি। আমৃত্যু নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। আর হাতেগোনা যে কয়জন ফিরতে পেরেছেন, তাদের কেউই রাজনীতিতে নিজেকে পুনর্বাসন করতে পারেননি। দেশে ফিরতে পারলেও জীবনের বাকি সময় কারাগারেই পার করতে হয়েছে। গত কয়েক দশকের ইতিহাসের দিকে তাকালে এরকম বেশ কিছু উদাহরণ খুঁজে পাব।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোস, চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশে, পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জাইন এল-আবিদিন বেন আলি, বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস, আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি, শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আর প্রধানমন্ত্রী তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে। গণঅভ্যুত্থানে দেশত্যাগকারী স্বৈরশাসকদের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ।
আশির দশকে ভয়ানক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন। অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই দেশটির প্রেসিডেন্ট মার্কোসের। সেই সংকটের মধ্যেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে চিত্রকর্ম সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসও ব্যক্তিগত মনোরঞ্জনে ব্যয় করছিলেন লাখ লাখ ডলার। মত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। সরকারি বাহিনীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন প্রায় ৩ হাজার নাগরিক। এমনি এক পরিস্থিতিতে মার্কোসের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে ফিলিপাইনের হাজার হাজার নাগরিক। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৮৬ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে আশ্রয় নেন মার্কোস। তিন বছরের মাথায় নির্বাসনেই মৃত্যু ঘটে তাঁর।
স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলি তিউনিসিয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন ২৩ বছর। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। আরব বসন্তের সূচনাকারী হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়ার অভ্যুত্থানটি খ্যাতি পায় ‘জেসমিন রেভল্যুশন’ নামে। সপরিবারে সৌদি আরবে পালিয়ে যান বেন আলি। আর দেশে ফিরতে পারেননি। নির্বাসিত অবস্থায় ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৮৩ বছর বয়সে সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
আফগানিস্তানের ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন আশরাফ গানি। ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে বলে ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক শহর দখলের অভিযান শুরু করে তালেবান। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা রাজধানী কাবুলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি চলে আসে। দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন আশরাফ গানি। হেলিকপ্টার ভরে নগদ অর্থ নিয়ে ওমান হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে যান। তখন থেকে সেখানেই ‘মানবিক আশ্রয়ে’ আছেন।
সামরিক অভ্যুত্থানে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। এরপর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন ২০০১ সালে। একইভাবে ২০০৪ সালে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেন। সংবিধান স্থগিত করে শাসনকালকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেন। ২০০৭ সালের শেষ দিকে হামলায় নিহত হন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন মোশাররফ। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার দলের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। পার্লামেন্টে অভিশংসনের মুখে পড়েন পারভেজ মোশাররফ। বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন তিনি। দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন বারবার। কিন্তু সফল হননি। বেশ কয়েকটি দেশে আশ্রয় নিয়ে শেষে গত বছর দুবাইয়ের এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসকদের কেউ কেউ নিজ দেশে ফিরতে পারলেও রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। নিজ দেশে করুণ পরিণতিও বরণ করতে হয়েছে। বলিভিয়ার স্বৈরশাসক ইভো মোরালেসের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। শুরুতে ছিলেন জনপ্রিয়। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে হয়ে ওঠেন স্বৈরশাসক। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে পাতানো নির্বাচনে আবারও ক্ষমতা দখল করতে চাইলেন তিনি। শুরু হয় বিক্ষোভ। গণআন্দোলনের মুখে মেক্সিকোতে পালিয়ে যান তিনি। পরে দেশে ফিরলেও রাজনীতিতে আর সেভাবে ফিরতে পারেননি।
চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পরিণতি হয়েছিল আরও করুণ। দেশে ফিরতে পারলেও জীবনের বাকি সময় কারাগারেই পার করতে হয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১০ অক্টোবর স্প্যানিশ একটি আদালতের পরোয়ানায় লন্ডন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেও তাকে দেশে ফেরত পাঠায় ব্রিটিশ সরকার। হত্যা, গুম, নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট ঘটনায় মামলার দায় নিয়ে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পিনোশে যখন মারা যান, তখনো তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ৩০০ ফৌজদারি মামলা চলছিল।
এবার অতিসাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় আলোকপাত করা যাক। ২০২২ সাল। শ্রীলঙ্কা নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করল। দেশটির প্রেসিডেন্ট তখন গোতাবায়া রাজাপাকসে আর প্রধানমন্ত্রী তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে। দেউলিয়া ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই জনরোষের মুখে পড়ে রাজাপাকসে পরিবার। শ্রীলংকার অর্থনীতির মারাত্মক পরিণতির জন্য দায়ী করা হয় এ পরিবারকেই। দেশটির অর্থনীতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ছিল তাদের অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতা ছেড়ে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রথমে মালদ্বীপ, পরে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। সেখানে তাকে ১৪ দিনের ‘ভিজিট পাস’ দেওয়া হয়। সেখানে অবস্থানকালেই পদত্যাগপত্র দেশে পাঠান তিনি। এরপর থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। এর প্রায় দেড় মাস পর ‘বিশেষ নিরাপত্তা’ নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। তবে এখনো রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি গোতাবায়া রাজাপাকসে।
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগেও ৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালান তিনি। এর আগে পরপর তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরমভাবে হরণ করা হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের নামে দেওয়া হয় লাখ লাখ মামলা। স্বজনতোষী নীতির আওতায় একটা অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি হয়, যাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় অর্থনীতি। বিপুল অর্থ পাচার হয়। এসব কাজে স্বয়ং শেখ হাসিনা ও তার পরিবার যুক্ত। এসব চলতে থাকে প্রকাশ্যে। নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে একটা কলায় পরিণত করেছিলেন তিনি। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত ও ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ডে’র মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। এ অবস্থায় সাড়ে ১৫ বছর ধরে চলা লড়াই গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয় কোটা সংস্কার ঘিরে। এর চাপে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তার সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের অনেকে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপে পাড়ি জমান। দেশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। এখন দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা মূলত অনলাইনে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অবশ্য এ বছরের ডিসেম্বরে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের কথা জানান। গত ২৮ জুন ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। ওই বক্তব্য ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন সভার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছেন। তবে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাই বেশি আলোড়ন তুলেছে। ঘোষণাটি কতখানি বাস্তবসম্মত, নাকি শুধু নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার কৌশল, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাকে; দুই বছর পর এসেও সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতর দলটির কার্যক্রম পরিচালনা আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় কার্যকরের ব্যাপারে সরকারি, বিরোধী দলসহ সব ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলেই ঐকমত্য রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কৌশল, তা নিয়ে দলটির ভেতরেই সংশয় রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি না, তার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন—বর্তমান বাস্তবতায় সেই ঝুঁকি নিতে শেষ পর্যন্ত কতজন নেতা-কর্মী প্রস্তুত আছেন।
এছাড়া দেশে দলটির ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থক আছে বলে ধরে নিলেও বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে। ফলে ‘অস্তিত্ব সংকটে’ থাকা সেই ৩০ শতাংশ এ মুহূর্তে একত্র হয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। তবে কোনো কোনো আইনজ্ঞ বলছেন, রায় হওয়ার পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও শেখ হাসিনা যখনই ফিরুন না কেন; আত্মসমর্পণ করে তাঁর আপিল করার সুযোগ আছে। ফেরার পর প্রথমেই তাকে আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে। কিন্তু তিনি সেই চ্যালেঞ্জ নেবেন বলে মনে হয় না। তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে একটাই পন্থা হতে পারে–যদি আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন। আশ্রয় দিলেও ধরে নেওয়া যায়, সময়ের সাথে তিনি ভারতের জন্যও দায়ে পরিণত হচ্ছেন। ভারতও চাইবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ‘শেখ হাসিনার দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্য বা সাক্ষাৎকারের কারণে এই বিষয়ে ভারতের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেকোনো ধরনের প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং এটি প্রচলিত আইন ও বিচারিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি করা হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বাস্তব কোনো পরিস্থিতি নেই।
স্বৈরশাসকরা ফেরত আসতে না পারার কারণ হলো, দেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে– সেটা তাদের অনুকূলে থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে। নিজের দল ক্ষমতায় এলেও নেতারা একজন আরেকজনের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চান না। এজন্য বিদেশে একবার চলে গেলে নিজ দলের সরকার থাকলেও দেশে আসা সম্ভব হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ চায় না তারা ফিরুক। জনগণ তাদের ফেরাতে চায় কেবল বিচারের মুখোমুখি করতে। এ কারণে ফেরত এলেও রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন ঘটে না।
এ ধরনের ঘটনায় রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ থাকে, যদি দল হিসেবে তারা খুবই শক্তিশালী হয়। আওয়ামী লীগ এখন সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নয়। তাদের শক্তি ছিল একজনের মধ্যে। আর তাকে ঘিরে ছিল অলিগার্ক শ্রেণী। ২০১৪, ১৮ ও ২৪-এর ভুয়া নির্বাচন এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা এবং বিরোধী মত দমনে রাজনৈতিক দলের নামে সন্ত্রাসী বাহিনী লালন আওয়ামী লীগকে দেউলিয়া করেছে। যে নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে; দুর্নীতির মাধ্যমে যেভাবে অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, তাতে তারা কয়েক প্রজন্মের সমর্থন হারিয়েছে।
আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ এবং তার সরকার যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে স্মরণ করিয়েছে। এই দল এখন মানুষের কাছে বিভীষিকা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফিরলেও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই বললেই চলে। আর সব স্বৈরশাসকের মতো শেখ হাসিনার জন্যও সম্ভবত করুণ পরিণতিই অপেক্ষা করছে।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক

গত কয়েক দশকে গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন অনেক স্বৈরশাসক। কিন্তু পালানোর পর তাদের বেশিরভাগই দেশে ফিরতে পারেননি। আমৃত্যু নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। আর হাতেগোনা যে কয়জন ফিরতে পেরেছেন, তাদের কেউই রাজনীতিতে নিজেকে পুনর্বাসন করতে পারেননি। দেশে ফিরতে পারলেও জীবনের বাকি সময় কারাগারেই পার করতে হয়েছে। গত কয়েক দশকের ইতিহাসের দিকে তাকালে এরকম বেশ কিছু উদাহরণ খুঁজে পাব।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোস, চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশে, পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফ, তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জাইন এল-আবিদিন বেন আলি, বলিভিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস, আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি, শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে আর প্রধানমন্ত্রী তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে। গণঅভ্যুত্থানে দেশত্যাগকারী স্বৈরশাসকদের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের শেখ হাসিনা এবং সিরিয়ার বাশার আল আসাদ।
আশির দশকে ভয়ানক অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ফিলিপাইন। অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই দেশটির প্রেসিডেন্ট মার্কোসের। সেই সংকটের মধ্যেই বিপুল অর্থ ব্যয়ে চিত্রকর্ম সংগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তাঁর স্ত্রী ইমেলদা মার্কোসও ব্যক্তিগত মনোরঞ্জনে ব্যয় করছিলেন লাখ লাখ ডলার। মত প্রকাশের কোনো সুযোগ ছিল না। সরকারি বাহিনীর হাতে নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন প্রায় ৩ হাজার নাগরিক। এমনি এক পরিস্থিতিতে মার্কোসের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে ফিলিপাইনের হাজার হাজার নাগরিক। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ১৯৮৬ সালে দেশ থেকে পালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে আশ্রয় নেন মার্কোস। তিন বছরের মাথায় নির্বাসনেই মৃত্যু ঘটে তাঁর।
স্বৈরশাসক জাইন এল আবিদিন বেন আলি তিউনিসিয়ার ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন ২৩ বছর। গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি ক্ষমতাচ্যুত হন তিনি। আরব বসন্তের সূচনাকারী হিসেবে পরিচিত তিউনিসিয়ার অভ্যুত্থানটি খ্যাতি পায় ‘জেসমিন রেভল্যুশন’ নামে। সপরিবারে সৌদি আরবে পালিয়ে যান বেন আলি। আর দেশে ফিরতে পারেননি। নির্বাসিত অবস্থায় ২০১৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ৮৩ বছর বয়সে সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর।
আফগানিস্তানের ২০১৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেন আশরাফ গানি। ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মার্কিন সেনারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে বলে ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন। এর সঙ্গে সঙ্গেই একের পর এক শহর দখলের অভিযান শুরু করে তালেবান। কয়েক দিনের মধ্যেই তারা রাজধানী কাবুলে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছাকাছি চলে আসে। দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন আশরাফ গানি। হেলিকপ্টার ভরে নগদ অর্থ নিয়ে ওমান হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পালিয়ে যান। তখন থেকে সেখানেই ‘মানবিক আশ্রয়ে’ আছেন।
সামরিক অভ্যুত্থানে ১৯৯৯ সালে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। এরপর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন ২০০১ সালে। একইভাবে ২০০৪ সালে আরেকটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করেন। সংবিধান স্থগিত করে শাসনকালকে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেন। ২০০৭ সালের শেষ দিকে হামলায় নিহত হন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো। বিক্ষোভের দাবানল ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন মোশাররফ। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার দলের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। পার্লামেন্টে অভিশংসনের মুখে পড়েন পারভেজ মোশাররফ। বাধ্য হয়ে পদত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেন তিনি। দেশে ফেরার চেষ্টা করেছেন বারবার। কিন্তু সফল হননি। বেশ কয়েকটি দেশে আশ্রয় নিয়ে শেষে গত বছর দুবাইয়ের এক হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসকদের কেউ কেউ নিজ দেশে ফিরতে পারলেও রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি। নিজ দেশে করুণ পরিণতিও বরণ করতে হয়েছে। বলিভিয়ার স্বৈরশাসক ইভো মোরালেসের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। দেশটির ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী থেকে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। শুরুতে ছিলেন জনপ্রিয়। কিন্তু অবৈধভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে হয়ে ওঠেন স্বৈরশাসক। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পর ২০১৯ সালে পাতানো নির্বাচনে আবারও ক্ষমতা দখল করতে চাইলেন তিনি। শুরু হয় বিক্ষোভ। গণআন্দোলনের মুখে মেক্সিকোতে পালিয়ে যান তিনি। পরে দেশে ফিরলেও রাজনীতিতে আর সেভাবে ফিরতে পারেননি।
চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পরিণতি হয়েছিল আরও করুণ। দেশে ফিরতে পারলেও জীবনের বাকি সময় কারাগারেই পার করতে হয়েছে। ক্ষমতা হারানোর পর লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১০ অক্টোবর স্প্যানিশ একটি আদালতের পরোয়ানায় লন্ডন পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। আইনি লড়াই চালিয়ে গেলেও তাকে দেশে ফেরত পাঠায় ব্রিটিশ সরকার। হত্যা, গুম, নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট ঘটনায় মামলার দায় নিয়ে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। পিনোশে যখন মারা যান, তখনো তাঁর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ৩০০ ফৌজদারি মামলা চলছিল।
এবার অতিসাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় আলোকপাত করা যাক। ২০২২ সাল। শ্রীলঙ্কা নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করল। দেশটির প্রেসিডেন্ট তখন গোতাবায়া রাজাপাকসে আর প্রধানমন্ত্রী তার ভাই মাহিন্দা রাজাপাকসে। দেউলিয়া ঘোষণার কিছুদিনের মধ্যেই জনরোষের মুখে পড়ে রাজাপাকসে পরিবার। শ্রীলংকার অর্থনীতির মারাত্মক পরিণতির জন্য দায়ী করা হয় এ পরিবারকেই। দেশটির অর্থনীতির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ছিল তাদের অলিগার্কদের নিয়ন্ত্রণে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়েছিল। মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অপরাধের অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে। ক্ষমতা ছেড়ে সেনাবাহিনীর কাছে আশ্রয় নেন মাহিন্দা রাজাপাকসে। গোতাবায়া রাজাপাকসে প্রথমে মালদ্বীপ, পরে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। সেখানে তাকে ১৪ দিনের ‘ভিজিট পাস’ দেওয়া হয়। সেখানে অবস্থানকালেই পদত্যাগপত্র দেশে পাঠান তিনি। এরপর থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। এর প্রায় দেড় মাস পর ‘বিশেষ নিরাপত্তা’ নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। তবে এখনো রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি গোতাবায়া রাজাপাকসে।
দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগেও ৫ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া গণঅভ্যুত্থানে দেশ ছেড়ে পালান তিনি। এর আগে পরপর তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চরমভাবে হরণ করা হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের নামে দেওয়া হয় লাখ লাখ মামলা। স্বজনতোষী নীতির আওতায় একটা অলিগার্ক শ্রেণি তৈরি হয়, যাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় অর্থনীতি। বিপুল অর্থ পাচার হয়। এসব কাজে স্বয়ং শেখ হাসিনা ও তার পরিবার যুক্ত। এসব চলতে থাকে প্রকাশ্যে। নির্লজ্জ মিথ্যাচারকে একটা কলায় পরিণত করেছিলেন তিনি। গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত ও ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ডে’র মতো মানবাধিকার লঙ্ঘন স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়। এ অবস্থায় সাড়ে ১৫ বছর ধরে চলা লড়াই গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরিত হয় কোটা সংস্কার ঘিরে। এর চাপে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এখনো সেখানেই অবস্থান করছেন।
শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতা, তার সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং তৃণমূলের অনেক নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। তাঁদের অনেকে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপে পাড়ি জমান। দেশে থাকা অনেক নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়। এখন দলটির রাজনৈতিক তৎপরতা মূলত অনলাইনে। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করলেও তা উল্লেখযোগ্য নয়।
সম্প্রতি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা অবশ্য এ বছরের ডিসেম্বরে বিদেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের নিয়ে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণের কথা জানান। গত ২৮ জুন ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি চলতি বছরের মধ্যে দেশে ফেরার কথা বলেছিলেন। ওই বক্তব্য ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। গত সপ্তাহে আওয়ামী লীগের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ অনলাইন সভার পর দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যেও আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি ডিসেম্বরে ফেরার কথা বলেছেন। তবে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণাই বেশি আলোড়ন তুলেছে। ঘোষণাটি কতখানি বাস্তবসম্মত, নাকি শুধু নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখার কৌশল, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা চলছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে যে পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হয়েছিল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাকে; দুই বছর পর এসেও সেই পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। গত বছরের নভেম্বরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার আগে একই বছরের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় আওয়ামী লীগ এবং এর সব সহযোগী ও অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অধ্যাদেশ জারি করে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি ক্ষমতায় এলে সেই অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই দেশের ভেতর দলটির কার্যক্রম পরিচালনা আইন অনুযায়ী সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় কার্যকরের ব্যাপারে সরকারি, বিরোধী দলসহ সব ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলেই ঐকমত্য রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবসম্মত কোনো পরিকল্পনা, নাকি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার কৌশল, তা নিয়ে দলটির ভেতরেই সংশয় রয়েছে। শেখ হাসিনা নিজে ফিরবেন কি না, তার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন—বর্তমান বাস্তবতায় সেই ঝুঁকি নিতে শেষ পর্যন্ত কতজন নেতা-কর্মী প্রস্তুত আছেন।
এছাড়া দেশে দলটির ৩০ শতাংশ অনুগত সমর্থক আছে বলে ধরে নিলেও বাকি ৭০ শতাংশ তাদের বিরুদ্ধে। ফলে ‘অস্তিত্ব সংকটে’ থাকা সেই ৩০ শতাংশ এ মুহূর্তে একত্র হয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নেই। তবে কোনো কোনো আইনজ্ঞ বলছেন, রায় হওয়ার পর আপিলের নির্ধারিত সময় পার হলেও শেখ হাসিনা যখনই ফিরুন না কেন; আত্মসমর্পণ করে তাঁর আপিল করার সুযোগ আছে। ফেরার পর প্রথমেই তাকে আইনি লড়াইয়ে যেতে হবে। কিন্তু তিনি সেই চ্যালেঞ্জ নেবেন বলে মনে হয় না। তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে একটাই পন্থা হতে পারে–যদি আন্তর্জাতিকভাবে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেন। আশ্রয় দিলেও ধরে নেওয়া যায়, সময়ের সাথে তিনি ভারতের জন্যও দায়ে পরিণত হচ্ছেন। ভারতও চাইবে বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারটির প্রসঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, ‘শেখ হাসিনার দেওয়া সাম্প্রতিক বক্তব্য বা সাক্ষাৎকারের কারণে এই বিষয়ে ভারতের নীতিগত অবস্থানে কোনো পরিবর্তন আসেনি। যেকোনো ধরনের প্রত্যর্পণ বা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং এটি প্রচলিত আইন ও বিচারিক কাঠামোর মধ্য দিয়েই নিষ্পত্তি করা হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বাস্তব কোনো পরিস্থিতি নেই।
স্বৈরশাসকরা ফেরত আসতে না পারার কারণ হলো, দেশে যে সরকার ক্ষমতায় থাকে– সেটা তাদের অনুকূলে থাকে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে। নিজের দল ক্ষমতায় এলেও নেতারা একজন আরেকজনের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে চান না। এজন্য বিদেশে একবার চলে গেলে নিজ দলের সরকার থাকলেও দেশে আসা সম্ভব হয় না। সবচেয়ে বড় কথা, জনগণ চায় না তারা ফিরুক। জনগণ তাদের ফেরাতে চায় কেবল বিচারের মুখোমুখি করতে। এ কারণে ফেরত এলেও রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন ঘটে না।
এ ধরনের ঘটনায় রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ থাকে, যদি দল হিসেবে তারা খুবই শক্তিশালী হয়। আওয়ামী লীগ এখন সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী নয়। তাদের শক্তি ছিল একজনের মধ্যে। আর তাকে ঘিরে ছিল অলিগার্ক শ্রেণী। ২০১৪, ১৮ ও ২৪-এর ভুয়া নির্বাচন এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলাতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীলতা এবং বিরোধী মত দমনে রাজনৈতিক দলের নামে সন্ত্রাসী বাহিনী লালন আওয়ামী লীগকে দেউলিয়া করেছে। যে নির্যাতন, হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে; দুর্নীতির মাধ্যমে যেভাবে অর্থনীতি ধ্বংস করেছে, তাতে তারা কয়েক প্রজন্মের সমর্থন হারিয়েছে।
আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগ এবং তার সরকার যে পন্থা অবলম্বন করেছে, তা মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে স্মরণ করিয়েছে। এই দল এখন মানুষের কাছে বিভীষিকা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফিরলেও তাঁকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। তার রাজনীতিতে পুনর্বাসনের সুযোগ নেই বললেই চলে। আর সব স্বৈরশাসকের মতো শেখ হাসিনার জন্যও সম্ভবত করুণ পরিণতিই অপেক্ষা করছে।
লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক
.png)

গত কয়েক দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যকর দাবি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, পাকিস্তানের বেলুচিস্তান শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে এবং ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে।
৪ ঘণ্টা আগে
সংবিধান সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধ নতুন সংসদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। মতপার্থক্যের মূল বিষয়টি সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নয়; বরং সেই সংস্কারের প্রক্রিয়া। সরকার মনে করে, বিদ্যমান সংবিধানের আওতায়...
২০ ঘণ্টা আগে
পার্বত্য চট্টগ্রামকে সাধারণত আমরা দুর্গম, পরিবেশগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এবং আর্থ-সামাজিক চ্যালেঞ্জের চোখ দিয়ে দেখি। কিন্তু এই ভাবনার আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের অন্যতম বড় এক অব্যবহৃত সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে পারে আমাদের উচ্চমূল্যের কৃষি, পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ এবং সবুজ অর্থনীতির প্রধান কেন্দ্র।
২০ ঘণ্টা আগে
মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল থেকে জুনের শেষে দুটি নৌকা ছেড়ে যায় কক্সবাজার ও রাখাইনের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে। উদ্দেশ্য অবৈধভাবে ভিনদেশে পাড়ি দেওয়া। একটি নৌকা যাত্রার পরপরই নিখোঁজ হয়, অন্যটি ডুবে যায় ৮ জুলাই আয়ারওয়াদি উপকূলে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার হিসাবে,
২১ ঘণ্টা আগে