সেকালের ঢাকার অর্থনীতি
প্রধানত ১৮৬২ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যকার ঢাকা জেলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার তথ্য জানায় এই লেখাটি। সেকালে বিভিন্ন সময়ে চালের দাম কীভাবে ওঠানামা করত? তখনকার জীবনযাত্রা কেমন ছিল? সাধারণ মানুষের মজুরি কিংবা একটি বাড়ি বানানোর খরচই বা কত লাগত? জমির দাম ও খাজনা কত ছিল? সমাজে কারা ছিলেন সবচেয়ে ধনী এবং কৃষকেরা কীভাবে ঋণের ফাঁদে পড়তেন? উনিশ শতক ও বিশ শতকের শুরুর সেই ঢাকার অর্থনীতির এমনই সব অজানা উত্তর মিলবে এই লেখায়।
গৌতম কে শুভ

১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)’ যেন এক বিস্ময়কর সময়দর্পণ। এর পাতা উল্টালেই ধরা পড়ে এক শতাব্দীরও বেশি আগের ঢাকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি কারা ছিল, কৃষকদের জীবনযাত্রা কেমন, বাজারে চালের দাম কত, জমির খাজনা কোথায় কত হারে আদায় হতো, শ্রমিক কত মজুরি পেত কিংবা একটি সাধারণ বাড়ি নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হতো? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে ব্রিটিশ প্রশাসনের কর্তাদের তৈরি গেজেটিয়ারে।
শতবর্ষ আগে কৃষিই ছিল অর্থনীতির কেন্দ্র। কিন্তু একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পাটচাষের বিস্তার সমাজে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছিল। একদিকে ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণির হাতে সম্পদ জমা হচ্ছিল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল হচ্ছিল অন্যরা। কৃষকের ঘরে ফসল ছিল, ঋণের বোঝাও ছিল। সবকিছু মিলিয়েই ১৯১২ সালের গেজেটিয়ার আমাদের সামনে তুলে ধরে শতাব্দী আগের ঢাকার অর্থনীতির বহুমাত্রিক ছবি।
গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, ব্রিটিশরা ঢাকা জেলার মানুষকে মোটামুটি ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করেছিল। বড় জমিদার, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, কারিগর-তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ।

বড় জমিদারের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। তবে এই শ্রেণি ছিল পরিবর্তনশীল। ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন পেশায় সফল হয়ে পরে জমিদার হতে পারতেন। পেশাজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল বলার মতো। এর অন্যতম কারণ ছিল বিক্রমপুর এলাকা। গেজেটিয়ারে বিক্রমপুর ও এর আশেপাশের এলাকাকে বাঙালি মধ্যবিত্তের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি বলা হয়েছে। সেখানে অসংখ্য পরিবার বাস করত, যাদের সংসার চলত অন্য জেলা কিংবা আসামে কর্মরত বাবা, স্বামী বা ভাইদের পাঠানো টাকায়।
এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশই ছিলেন কেরানি। তাদের বেতন ছিল অল্প। ফলে ১৯০৬ সালে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে বড় আঘাত পড়ে এই চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের ওপর।
অন্যদিকে ঢাকা জেলার ব্যবসায়ী শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল হিন্দু সাহা সম্প্রদায়। তাদের পাশাপাশি তেলি (তিলি) সম্প্রদায়ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থান গড়ে তুলেছিল। মহাজনি ব্যবসা ও বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এই দুই সম্প্রদায়ের অনেকেই বড় জমিদারি কিনে নেন।
তবে পুরো ঢাকা জেলার অর্থনীতির প্রাণ ছিল কৃষক। গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচ ভাগের তিন ভাগেরও বেশি মানুষ সরাসরি কৃষি ও এ সংক্রান্ত কাজের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করতেন। তাই কৃষির অবস্থা, জমির খাজনা এবং জমিদার-প্রজার সম্পর্ক পুরো জেলার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত।
১০০-১৫০ বছর আগে ঢাকা অঞ্চলে জমির মূল্যের চেয়েও আলোচিত বিষয় ছিল জমির খাজনা। আবাদি জমিকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ভাগ করা হতো। বসতভিটার জন্য ছিল আলাদা খাজনা। এর বাইরে ছিল পতিত জমি এবং নিচু জলাভূমি। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির এই পার্থক্য দ্রুত কমে যাচ্ছিল। জুতসই না হলেও মানুষ বেশি খাজনা দিয়ে জমি নিতে রাজি হচ্ছিল। পানের বরজ, সবজির ক্ষেত এবং ছনের ঘাসের জমির জন্য আবার বিশেষ হারে খাজনা নেওয়া হতো।
আবার ভাওয়ালের জমির হিসাব ছিল আলাদা। সেখানে জমিকে ‘বাইদ’ ও ‘চাল্লা’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো। প্রতিটির আবার তিনটি আলাদা মান ছিল। নিচু ধরনের বাইদ জমিকেই সবচেয়ে উর্বর হিসেবে ধরা হতো। একসময় ভাওয়ালের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল জঙ্গলে ঢাকা। তখন নতুন বসতি গড়তে উৎসাহ দিতে কয়েক বছরের জন্য খাজনা মওকুফ করা হয়েছিল। এই অঞ্চলের স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোকেও খাজনামুক্ত জমি দেওয়া হতো। তবে গেজেটিয়ার জানাচ্ছে, পরে এই সুবিধা তুলে নেওয়া হয়।

পুরো ঢাকা জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাজনা ছিল বিক্রমপুরে। ১৯১২ সালে প্রকাশিত গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, তখন বিক্রমপুরে কোথাও কোথাও আবাদি জমির খাজনা প্রতি বিঘায় ৪ টাকা এবং বসতভিটার খাজনা ৮ টাকা ১২ আনা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে এর আগে দীর্ঘদিন প্রচলিত হার ছিল আবাদি জমিতে ১ টাকা ৪ আনা থেকে ২ টাকা এবং বসতভিটায় ৪ টাকা।
তখন মানিকগঞ্জ এলাকায় আবাদি জমির প্রতি বিঘার খাজনা ১২ আনা ছিল। বসতভিটার জন্য দিতে হতো ২ টাকা ৮ আনা থেকে ৩ টাকা।
বর্তমানের নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রতি কানি (৪০ শতক) আবাদি জমির খাজনা ছিল ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৪ আনা। তবে খাস মহলে তা কমে ৬ থেকে ৯ আনা পর্যন্ত নেমে আসত। শহরের আশপাশে সবজি চাষের জমির লিজ (ভাড়া) ছিল সবচেয়ে বেশি, প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১২ টাকা।
তবে খাজনাই জমিদারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল না। জমি বিক্রি হলে অনেক ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের এক-চতুর্থাংশ জমিদারকে দিতে হতো। নতুন কেউ জমিতে বসতি স্থাপনের করতে গেলে অনেক সময় এক বছরের খাজনার দশ গুণ পর্যন্ত মূল্য দিতে হতো।

এর পাশাপাশি ছিল নানা ধরনের অতিরিক্ত আদায়। রাস্তা ও গণপূর্তের কর অনেক সময় সরকারি নির্ধারিত হারের দ্বিগুণ আদায় করা হতো। ‘তহুরি’ নামে এক ধরনের কর প্রায় সর্বত্র প্রচলিত ছিল, যা আদায়কারী কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। কোথাও প্রজার বাড়িতে বিয়ে হলে জমিদারকে আলাদা অর্থ দিতে হতো। আবার কোনো কোনো জমিদারি স্কুল কিংবা দাতব্য চিকিৎসালয়ের খরচও প্রজাদের কাছ থেকেই তুলত।
গেজেটিয়ারের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৮৬২ সালে এক টাকায় প্রায় ৩২ সের (প্রায় ৩০ কেজি) চাল কেনা যেত। কিন্তু ১৮৬৬ সালের উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষে তা নেমে আসে এক টাকায় ১১ সের-এ (১০ কেজি)। অর্থাৎ মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে যায় প্রায় ৩ গুণ। অবশ্য এর দুই বছর পর ১৯৬৮ সালে পরিস্থিতি চালের দাম আবার আগের জায়গায় ফেরত যায়। তখন এক টাকায় ২৯ সের চাল মিলত।
১৮৮৯ সালেও এক টাকায় মিলত ১৪ সের চাল। আবার ১৮৯৭ সালের দুর্ভিক্ষে তা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ১০ সের-এ। তবে ১৮৯৯ সালে ভালো ফলনের কারণে আবার প্রায় ১৮ সের চাল পাওয়া যেত এক টাকায়। ১৯০৪ সালেও এক টাকায় মিলত প্রায় ১৫ সের চাল। এরপর ১৯০৭ সালে চালের বাজার আবার ভয়াবহ রূপ নেয়।
এই মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ ছিল ১৯০৬ সালের ভয়াবহ বন্যা। বন্যায় কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ঢাকায় প্রতি মণ চালের দাম ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা হয়। জেলার ভেতরের কিছু এলাকায় তা ৯ টাকা প্রতি মণ পর্যন্ত ওঠে।
পরে যোগাযোগ স্বাভাবিক হয় এবং মিয়ানমার (বার্মা) থেকে চাল আমদানি শুরু হলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। ১৯১০ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ চাল এক টাকায় ১৩ সের বিক্রি হচ্ছিল।
তবে শুধু বন্যা নয়, আরও কয়েকটি কারণে খাদ্যের দাম বাড়ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে অনেক জমি চাষের আওতায় আসে। এতে গড় উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে পাটচাষ দ্রুত বাড়তে থাকে। ধানের জমির একটি অংশ পাটের দখলে চলে যায়। পাট মানুষের হাতে নগদ অর্থ এনে দেয়। ফলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং সেটিও চালের বাজারদর বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

লবণের বাজারও ছিল সরকারের করনীতির ওপর নির্ভরশীল। ১৮৮২ সালে কর কমানোর পর এক টাকায় প্রায় ১৩ সের লবণ কেনা যেত। পরে কর বাড়ালে তা কমে ৯ সের হয়। ১৯০৫ সালে আবার কর কমানো হলে দাম নেমে আসে ১৩ সের-এ। গেজেটিয়ারের তথ্য মতে, এটি প্রায় আশি বছর আগের তুলনায় অর্ধেক দামে নেমে এসেছিল।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরিও কিছুটা বাড়ছিল। ১৮০৩ সালে একজন কৃষিশ্রমিক মাসে উপার্জন করতে পারতেন ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৮ আনা, সঙ্গে একবেলা খাবার। একজন কুলি পেতেন ৮ আনা থেকে ১ টাকা। ১৮৩৭ সালে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেড়ে দাঁড়ায় ২ টাকা ৪ আনা থেকে ৪ টাকা। ১৮৭৩ সালে মাসিক মজুরির গড় ছিল ৬ টাকা। ১৮৯৩ সালে তা বেড়ে ৮ থেকে ১০ টাকা হয়। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ১৯০৫ সালে কৃষিশ্রমিকের মাসিক মজুরি উঠে যায় ১০ থেকে ১২ টাকায়। তবে পাটের আগাছা পরিষ্কারের মতো মৌসুমি কাজে দিনে ৮ থেকে ১০ আনা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
গেজেটিয়ারের বর্ণনা অনুসারে, শত বছর আগের ঢাকার মানুষের জীবনযাপন ছিল অনেক সরল। শহরে ইটের দালান থাকলেও ঢাকা জেলার গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি ছিল বাঁশ, কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি। বন্যাপ্রবণ এলাকায় শুধু ভিটা উঁচু করতেই বড় ব্যয় হতো। সেখানে কৃষকের ঘর বানাতে প্রায় ৪০০ টাকা লাগত। অথচ জেলার উত্তরে তিন-চারটি ঘর নিয়ে একটি ভালো বসতবাড়ি তৈরি করা যেত মাত্র ১০০ টাকায়।
তুলনামূলত টাকা-পয়সাওয়ালা ধনী মানুষের ঘরেও আসবাব ছিল অল্প। একটি তক্তপোশ, সতরঞ্জি, কয়েকটি বালিশ—এতেই চলত। কৃষকের ঘরে থাকত কাঠের বাক্স, পিঁড়ি আর কয়েকটি মাদুর। ঢাকা জেলার গ্রামের মানুষের কাঁথা তৈরি হতো পুরোনো কাপড় জোড়া দিয়ে। রান্নার কাজে ব্যবহার হতো পিতল ও কাঁসার বাসন।
তবে বৃহত্তর ঢাকা জেলার কৃষকের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল ঋণ। গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ কৃষকই ঋণগ্রস্ত ছিলেন। সাধারণ সুদের হার ছিল মাসে ৩ টাকা ২ আনা শতাংশের কাছাকাছি। কোথাও তা বেড়ে ৬ শতাংশ, এমনকি ১২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত। ছোট ঋণ অনেক সময় শুধু কথার ভিত্তিতেই দেওয়া হতো, আর বড় ঋণের ক্ষেত্রে জমি বন্ধক রাখা হতো। পাটচাষিরা প্রায়ই আগাম টাকা নিয়ে পরে পুরো ফসল সেই মহাজনের কাছেই বিক্রি করতেন।
১৯১২ সালে প্রকাশিত গেজেটিয়ার অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলে ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণি ছিল সবচেয়ে ধনী। কৃষকদের অবস্থা সামগ্রিকভাবে তাঁতি, জেলে ও মাঝিদের চেয়ে ভালো ছিল। তবে কম বেতনের চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছিল। তবে মধ্যবিত্তের মধ্যে যে দারিদ্র্যের অনুভূতি বেড়েছিল, এর একটি কারণ ছিল নতুন ধরনের ভোগ্যপণ্যের প্রতি আকর্ষণ। গ্রামোফোন, সাইকেলের মতো জিনিস তখন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করতে শুরু করেছিল।

১৯১২ সালে প্রকাশিত ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার (ঢাকা)’ যেন এক বিস্ময়কর সময়দর্পণ। এর পাতা উল্টালেই ধরা পড়ে এক শতাব্দীরও বেশি আগের ঢাকার অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সমাজের প্রভাবশালী শ্রেণি কারা ছিল, কৃষকদের জীবনযাত্রা কেমন, বাজারে চালের দাম কত, জমির খাজনা কোথায় কত হারে আদায় হতো, শ্রমিক কত মজুরি পেত কিংবা একটি সাধারণ বাড়ি নির্মাণে কত টাকা ব্যয় হতো? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলেছে ব্রিটিশ প্রশাসনের কর্তাদের তৈরি গেজেটিয়ারে।
শতবর্ষ আগে কৃষিই ছিল অর্থনীতির কেন্দ্র। কিন্তু একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পাটচাষের বিস্তার সমাজে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছিল। একদিকে ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণির হাতে সম্পদ জমা হচ্ছিল, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল হচ্ছিল অন্যরা। কৃষকের ঘরে ফসল ছিল, ঋণের বোঝাও ছিল। সবকিছু মিলিয়েই ১৯১২ সালের গেজেটিয়ার আমাদের সামনে তুলে ধরে শতাব্দী আগের ঢাকার অর্থনীতির বহুমাত্রিক ছবি।
গেজেটিয়ারের তথ্যমতে, ব্রিটিশরা ঢাকা জেলার মানুষকে মোটামুটি ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করেছিল। বড় জমিদার, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, কারিগর-তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ।

বড় জমিদারের সংখ্যা খুব বেশি ছিল না। তবে এই শ্রেণি ছিল পরিবর্তনশীল। ব্যবসা কিংবা বিভিন্ন পেশায় সফল হয়ে পরে জমিদার হতে পারতেন। পেশাজীবী মানুষের সংখ্যা ছিল বলার মতো। এর অন্যতম কারণ ছিল বিক্রমপুর এলাকা। গেজেটিয়ারে বিক্রমপুর ও এর আশেপাশের এলাকাকে বাঙালি মধ্যবিত্তের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি বলা হয়েছে। সেখানে অসংখ্য পরিবার বাস করত, যাদের সংসার চলত অন্য জেলা কিংবা আসামে কর্মরত বাবা, স্বামী বা ভাইদের পাঠানো টাকায়।
এই মধ্যবিত্ত শ্রেণির বড় অংশই ছিলেন কেরানি। তাদের বেতন ছিল অল্প। ফলে ১৯০৬ সালে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে বড় আঘাত পড়ে এই চাকরিজীবী মধ্যবিত্তের ওপর।
অন্যদিকে ঢাকা জেলার ব্যবসায়ী শ্রেণির মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল হিন্দু সাহা সম্প্রদায়। তাদের পাশাপাশি তেলি (তিলি) সম্প্রদায়ও বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য অবস্থান গড়ে তুলেছিল। মহাজনি ব্যবসা ও বাণিজ্য থেকে অর্জিত অর্থ দিয়ে এই দুই সম্প্রদায়ের অনেকেই বড় জমিদারি কিনে নেন।
তবে পুরো ঢাকা জেলার অর্থনীতির প্রাণ ছিল কৃষক। গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, জেলার পাঁচ ভাগের তিন ভাগেরও বেশি মানুষ সরাসরি কৃষি ও এ সংক্রান্ত কাজের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করতেন। তাই কৃষির অবস্থা, জমির খাজনা এবং জমিদার-প্রজার সম্পর্ক পুরো জেলার অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করত।
১০০-১৫০ বছর আগে ঢাকা অঞ্চলে জমির মূল্যের চেয়েও আলোচিত বিষয় ছিল জমির খাজনা। আবাদি জমিকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণিতে ভাগ করা হতো। বসতভিটার জন্য ছিল আলাদা খাজনা। এর বাইরে ছিল পতিত জমি এবং নিচু জলাভূমি। কিন্তু জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির এই পার্থক্য দ্রুত কমে যাচ্ছিল। জুতসই না হলেও মানুষ বেশি খাজনা দিয়ে জমি নিতে রাজি হচ্ছিল। পানের বরজ, সবজির ক্ষেত এবং ছনের ঘাসের জমির জন্য আবার বিশেষ হারে খাজনা নেওয়া হতো।
আবার ভাওয়ালের জমির হিসাব ছিল আলাদা। সেখানে জমিকে ‘বাইদ’ ও ‘চাল্লা’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো। প্রতিটির আবার তিনটি আলাদা মান ছিল। নিচু ধরনের বাইদ জমিকেই সবচেয়ে উর্বর হিসেবে ধরা হতো। একসময় ভাওয়ালের বিস্তীর্ণ এলাকা ছিল জঙ্গলে ঢাকা। তখন নতুন বসতি গড়তে উৎসাহ দিতে কয়েক বছরের জন্য খাজনা মওকুফ করা হয়েছিল। এই অঞ্চলের স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোকেও খাজনামুক্ত জমি দেওয়া হতো। তবে গেজেটিয়ার জানাচ্ছে, পরে এই সুবিধা তুলে নেওয়া হয়।

পুরো ঢাকা জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাজনা ছিল বিক্রমপুরে। ১৯১২ সালে প্রকাশিত গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, তখন বিক্রমপুরে কোথাও কোথাও আবাদি জমির খাজনা প্রতি বিঘায় ৪ টাকা এবং বসতভিটার খাজনা ৮ টাকা ১২ আনা পর্যন্ত উঠেছিল। তবে এর আগে দীর্ঘদিন প্রচলিত হার ছিল আবাদি জমিতে ১ টাকা ৪ আনা থেকে ২ টাকা এবং বসতভিটায় ৪ টাকা।
তখন মানিকগঞ্জ এলাকায় আবাদি জমির প্রতি বিঘার খাজনা ১২ আনা ছিল। বসতভিটার জন্য দিতে হতো ২ টাকা ৮ আনা থেকে ৩ টাকা।
বর্তমানের নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রতি কানি (৪০ শতক) আবাদি জমির খাজনা ছিল ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৪ আনা। তবে খাস মহলে তা কমে ৬ থেকে ৯ আনা পর্যন্ত নেমে আসত। শহরের আশপাশে সবজি চাষের জমির লিজ (ভাড়া) ছিল সবচেয়ে বেশি, প্রতি বিঘায় ৮ থেকে ১২ টাকা।
তবে খাজনাই জমিদারের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল না। জমি বিক্রি হলে অনেক ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্যের এক-চতুর্থাংশ জমিদারকে দিতে হতো। নতুন কেউ জমিতে বসতি স্থাপনের করতে গেলে অনেক সময় এক বছরের খাজনার দশ গুণ পর্যন্ত মূল্য দিতে হতো।

এর পাশাপাশি ছিল নানা ধরনের অতিরিক্ত আদায়। রাস্তা ও গণপূর্তের কর অনেক সময় সরকারি নির্ধারিত হারের দ্বিগুণ আদায় করা হতো। ‘তহুরি’ নামে এক ধরনের কর প্রায় সর্বত্র প্রচলিত ছিল, যা আদায়কারী কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। কোথাও প্রজার বাড়িতে বিয়ে হলে জমিদারকে আলাদা অর্থ দিতে হতো। আবার কোনো কোনো জমিদারি স্কুল কিংবা দাতব্য চিকিৎসালয়ের খরচও প্রজাদের কাছ থেকেই তুলত।
গেজেটিয়ারের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ১৮৬২ সালে এক টাকায় প্রায় ৩২ সের (প্রায় ৩০ কেজি) চাল কেনা যেত। কিন্তু ১৮৬৬ সালের উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষে তা নেমে আসে এক টাকায় ১১ সের-এ (১০ কেজি)। অর্থাৎ মাত্র ৪ বছরের ব্যবধানে চালের দাম বেড়ে যায় প্রায় ৩ গুণ। অবশ্য এর দুই বছর পর ১৯৬৮ সালে পরিস্থিতি চালের দাম আবার আগের জায়গায় ফেরত যায়। তখন এক টাকায় ২৯ সের চাল মিলত।
১৮৮৯ সালেও এক টাকায় মিলত ১৪ সের চাল। আবার ১৮৯৭ সালের দুর্ভিক্ষে তা নেমে দাঁড়ায় প্রায় ১০ সের-এ। তবে ১৮৯৯ সালে ভালো ফলনের কারণে আবার প্রায় ১৮ সের চাল পাওয়া যেত এক টাকায়। ১৯০৪ সালেও এক টাকায় মিলত প্রায় ১৫ সের চাল। এরপর ১৯০৭ সালে চালের বাজার আবার ভয়াবহ রূপ নেয়।
এই মূল্যবৃদ্ধির বড় কারণ ছিল ১৯০৬ সালের ভয়াবহ বন্যা। বন্যায় কলকাতা থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেললাইন ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। ঢাকায় প্রতি মণ চালের দাম ৫ টাকা থেকে বেড়ে ৮ টাকা হয়। জেলার ভেতরের কিছু এলাকায় তা ৯ টাকা প্রতি মণ পর্যন্ত ওঠে।
পরে যোগাযোগ স্বাভাবিক হয় এবং মিয়ানমার (বার্মা) থেকে চাল আমদানি শুরু হলে বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হয়। ১৯১০ সালের জানুয়ারিতে সাধারণ চাল এক টাকায় ১৩ সের বিক্রি হচ্ছিল।
তবে শুধু বন্যা নয়, আরও কয়েকটি কারণে খাদ্যের দাম বাড়ছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ধীরে ধীরে অনেক জমি চাষের আওতায় আসে। এতে গড় উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে পাটচাষ দ্রুত বাড়তে থাকে। ধানের জমির একটি অংশ পাটের দখলে চলে যায়। পাট মানুষের হাতে নগদ অর্থ এনে দেয়। ফলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে এবং সেটিও চালের বাজারদর বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

লবণের বাজারও ছিল সরকারের করনীতির ওপর নির্ভরশীল। ১৮৮২ সালে কর কমানোর পর এক টাকায় প্রায় ১৩ সের লবণ কেনা যেত। পরে কর বাড়ালে তা কমে ৯ সের হয়। ১৯০৫ সালে আবার কর কমানো হলে দাম নেমে আসে ১৩ সের-এ। গেজেটিয়ারের তথ্য মতে, এটি প্রায় আশি বছর আগের তুলনায় অর্ধেক দামে নেমে এসেছিল।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে মজুরিও কিছুটা বাড়ছিল। ১৮০৩ সালে একজন কৃষিশ্রমিক মাসে উপার্জন করতে পারতেন ১ টাকা থেকে ১ টাকা ৮ আনা, সঙ্গে একবেলা খাবার। একজন কুলি পেতেন ৮ আনা থেকে ১ টাকা। ১৮৩৭ সালে কৃষিশ্রমিকের মজুরি বেড়ে দাঁড়ায় ২ টাকা ৪ আনা থেকে ৪ টাকা। ১৮৭৩ সালে মাসিক মজুরির গড় ছিল ৬ টাকা। ১৮৯৩ সালে তা বেড়ে ৮ থেকে ১০ টাকা হয়। মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ১৯০৫ সালে কৃষিশ্রমিকের মাসিক মজুরি উঠে যায় ১০ থেকে ১২ টাকায়। তবে পাটের আগাছা পরিষ্কারের মতো মৌসুমি কাজে দিনে ৮ থেকে ১০ আনা পর্যন্ত মজুরি পাওয়া অস্বাভাবিক ছিল না।
গেজেটিয়ারের বর্ণনা অনুসারে, শত বছর আগের ঢাকার মানুষের জীবনযাপন ছিল অনেক সরল। শহরে ইটের দালান থাকলেও ঢাকা জেলার গ্রামের অধিকাংশ বাড়ি ছিল বাঁশ, কাদা ও খড় দিয়ে তৈরি। বন্যাপ্রবণ এলাকায় শুধু ভিটা উঁচু করতেই বড় ব্যয় হতো। সেখানে কৃষকের ঘর বানাতে প্রায় ৪০০ টাকা লাগত। অথচ জেলার উত্তরে তিন-চারটি ঘর নিয়ে একটি ভালো বসতবাড়ি তৈরি করা যেত মাত্র ১০০ টাকায়।
তুলনামূলত টাকা-পয়সাওয়ালা ধনী মানুষের ঘরেও আসবাব ছিল অল্প। একটি তক্তপোশ, সতরঞ্জি, কয়েকটি বালিশ—এতেই চলত। কৃষকের ঘরে থাকত কাঠের বাক্স, পিঁড়ি আর কয়েকটি মাদুর। ঢাকা জেলার গ্রামের মানুষের কাঁথা তৈরি হতো পুরোনো কাপড় জোড়া দিয়ে। রান্নার কাজে ব্যবহার হতো পিতল ও কাঁসার বাসন।
তবে বৃহত্তর ঢাকা জেলার কৃষকের অন্যতম বড় সমস্যা ছিল ঋণ। গেজেটিয়ারের তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ কৃষকই ঋণগ্রস্ত ছিলেন। সাধারণ সুদের হার ছিল মাসে ৩ টাকা ২ আনা শতাংশের কাছাকাছি। কোথাও তা বেড়ে ৬ শতাংশ, এমনকি ১২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাত। ছোট ঋণ অনেক সময় শুধু কথার ভিত্তিতেই দেওয়া হতো, আর বড় ঋণের ক্ষেত্রে জমি বন্ধক রাখা হতো। পাটচাষিরা প্রায়ই আগাম টাকা নিয়ে পরে পুরো ফসল সেই মহাজনের কাছেই বিক্রি করতেন।
১৯১২ সালে প্রকাশিত গেজেটিয়ার অনুযায়ী, ঢাকা অঞ্চলে ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণি ছিল সবচেয়ে ধনী। কৃষকদের অবস্থা সামগ্রিকভাবে তাঁতি, জেলে ও মাঝিদের চেয়ে ভালো ছিল। তবে কম বেতনের চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছিল। তবে মধ্যবিত্তের মধ্যে যে দারিদ্র্যের অনুভূতি বেড়েছিল, এর একটি কারণ ছিল নতুন ধরনের ভোগ্যপণ্যের প্রতি আকর্ষণ। গ্রামোফোন, সাইকেলের মতো জিনিস তখন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল। নতুন প্রজন্ম তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করতে শুরু করেছিল।
.png)

বালাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের সেই বিভীষিকা যখন শুরু হয়, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সব বিদেশি সাংবাদিকদের বন্দুকের মুখে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন সাংবাদিক থেকে গেলেন এই মৃত্যুপুরীতে। তিনি সায়মন ড্র
৩ ঘণ্টা আগে
অভিনেতা বুলবুল আহমেদকে বলা হয় বাংলাদেশের ‘মহানায়ক’। হয়েছেন ‘দেবদাস’, হয়েছেন ‘শ্রীকান্ত’। সত্তর ও আশির দশকে সুদর্শন নায়ক হিসেবে তিনি অসংখ্য দর্শকের ভালোবাসা কুড়িয়েছেন। অভিনয়জগতের সবাই তাঁকে ‘ভদ্রলোক’ হিসেবেই জানে। ২০১০ সালে ১৫ জুলাই বুলবুল আহমেদের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চিত্রনায়ক র
১৫ জুলাই ২০২৬
শেষ পর্যন্ত থাংলিয়ানা একটি স্মৃতিকথার চেয়ে অনেক বেশি কিছু। পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীতকে নতুন চোখে দেখতে চাইলে, কিংবা ইতিহাসের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার ভাষা বুঝতে চাইলে, এই বই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
১৫ জুলাই ২০২৬
আজ ‘শার্ক অ্যাওয়ারনেস ডে’ বা আন্তর্জাতিক হাঙর সচেতনতা দিবস। হাঙর সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করা, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা তুলে ধরা এবং বিলুপ্তপ্রায় এই প্রাণীটিকে রক্ষা করাই এই দিবসের প্রধান লক্ষ্য। ভূ-পর্যটক তারেক অণু ২০১০ সালের জুনের শেষ দিকে গিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে। মহ
১৪ জুলাই ২০২৬