জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

মুখে মুখে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ, পাম্পে বাড়ছেই সারি

প্রকাশ : ০৯ মার্চ ২০২৬, ২২: ৪৬
পাম্পে তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। স্ট্রিম ছবি

কয়েক দিন ধরে রাজধানীর ফিলিং স্টেশনে বাড়ছে গ্রাহকদের লাইন। যদিও ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। গুজব-আতঙ্কে সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়মের কারণে বিক্রি কমে গেছে।

সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীর কয়েকটি পাম্প ঘুরে গ্রাহকের দীর্ঘ লাইনে দেখা যায়। কেউ ৩০ মিনিট, কেউ ঘণ্টার চেষ্টায় তেল নিতে পারছেন। লম্বা লাইন পাড়ি দিয়ে মোটরসাইকেল চালকেরা পাচ্ছেন ২ লিটার; প্রাইভেটকার পাচ্ছে ১০ লিটার তেল। প্রাইভেটকারের তুলনায় মোটরসাইকেলের লাইন দীর্ঘ। গ্রাহকরা তেল প্রাপ্তি নিয়ে হতাশার কথা জানিয়েছেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে কিছু পাম্প বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

বেলা সাড়ে ৩টার দিকে শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে দেখা যায়, পাম্প ও সাকুরা রেস্টুরেন্ট এলাকা ছাড়িয়ে লাইন ভেতরের গলি পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই লাইনে এক ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করে তেল নিতে পারেন খোরশেদ আলম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘রমজানে রাস্তায় খুব জ্যাম। তেল নেওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা লাগছে। পাম্পে দুই ঘণ্টা গেলে, অন্য কাজ কখন করব? অফিসের সময়ে তো তেল নিতে পারি না। ব্যক্তিগত সময় নষ্ট হচ্ছে।’

রাজধানীর বেশির ভাগ পাম্পে একই চিত্র দেখা গেছে। দুপুর দেড়টার দিকে নীলক্ষেতের কিউ জি সামদানি পাম্প দেখা যায়, মোটরসাইকেলের লাইন পলাশী মোড়ের দিকে গেছে। ৪৫ মিনিট অপেক্ষার পর তেল পান মোহাম্মদ নাজিম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘লাইনে সমস্যা না, তেল পাওয়া যাচ্ছে যৎ সামান্য। আমাদের মতো নিয়মিত বাইক চালকদের ভোগান্তিই বেশি হচ্ছে।’

মজুদ পর্যাপ্ত, কমেছে বিক্রি

জ্বালানি তেল ঘিরে সৃষ্ট বর্তমান পরিস্থিতিকে গুজব ও আতঙ্ক হিসেবে দেখছেন পাম্পমালিকেরা। তাঁরা বলছেন, পর্যাপ্ত তেল মজুদ আছে। তবে, হঠাৎ বিষয়টা ‘ভাইরাল’ হয়ে যাওয়ায় মানুষ আতঙ্ক পড়ে গেছে। কিন্তু সরকার নির্ধারিত সীমার বাইরে তেল বিক্রি করতে না পারায় বিক্রি অনেকটা কমে গেছে।

মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারের সহকারী ব্যবস্থাপক (বিক্রয়) আহমাদ রুশদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘তেলের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। দীর্ঘ লাইনও হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত নীতির কারণে কাউকে বেশি তেল দিতে পারছি না। ফলে তেল বিক্রি কমে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আগে দৈনিক ২৭ থেকে ২৮ হাজার লিটার জ্বালানি বিক্রি করতাম। এখন সেটা ২৩ থেকে ২৪ হাজারে নেমে এসেছে। আমরা এখনো ২৭ হাজার লিটার বিক্রির সক্ষমতা রাখি। তবুও এমন একটা হাইপ ক্রিয়েট হয়েছে, কোথাও কোনো তেল নেই।’

রমনা পেট্রোল পাম্পের মালিক ও বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘আগের পরিস্থিতিরি সঙ্গে বর্তমানের পরিস্থিতি পুরো উল্টো। আগে দৈনিক ২০ থেকে ২৫ হাজার লিটার বিক্রি হতো। কিন্তু এখন রেশন সিস্টেমে আমি কম পাচ্ছি, বিক্রিও করছি কম। অথচ আমার শ্রম বেশি যাচ্ছে।’

জ্বালানি নেওয়ার দীর্ঘ লাইন। স্ট্রিম ছবি
জ্বালানি নেওয়ার দীর্ঘ লাইন। স্ট্রিম ছবি

পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরও তেল নিয়ে আতঙ্কের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা হুজুগে ব্যপার। যথেষ্ট পরিমাণে অকটেন-পেট্রল আছে। প্রাইভেটকার নিয়ে আমাদের টেনশন নাই। টেনশন হলো মোটরসাইকেল নিয়ে। তাঁরা দিনে পাঁচবার তেল নিতে আসছে; মারামারিও করছে। এখান থেকে তেল নিয়ে, একটু রাস্তা ঘুরে আবার আসছে।’

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন, অতিরিক্ত দায়িত্ব) ইউসুফ হোসেন ভূঁইয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণ তেলের মজুদ আছে এবং দিনকে দিন বাড়ছে। মানুষের ভেতরে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে কেটে যাবে আশা করছি।’

কিছু কিছু পাম্প বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আগে যে পরিমাণে তেলের চাহিদা ছিল, এখন সেই চাহিদা অনেক বেড়েছে। ফলে অনেক পাম্পে তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর ডিপো থেকে তেল আনতেও তো একটা সময় লাগে। এটা সাময়িক কারণে বন্ধ হয়েছে। তেলের মজুদে কমতির কারণে না।’

নিরাপত্তা দাবি

সোমবার বিকেল ৪টার দিকে পরীবাগের পূর্বাচল ট্রেডার্স ফিলিং স্টেশন বন্ধ পাওয়া যায়। তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি বলে কর্মীরা জানান। তবে মূল কারণ গত শনিবার পাম্পে হামলা হয়। এক কর্মীকে আটকে রাখাসহ ভাঙচুরের পর বন্ধ রেখেছে কর্তৃপক্ষ।

পাম্পের ক্যাশিয়ার মোহাম্মদ দুলাল স্ট্রিমকে বলেন, ‘শনিবার শেষ রাতের দিকে পাম্পের তেল শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তখনো অনেক ভিড় ছিল। আমরা বিক্রি বন্ধ করে দিলে ক্রেতাদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। তারা আমাদের এক কর্মীকে আটকে রাখে। ক্যাশ কক্ষে ভাঙচুর করে। ৯৯৯-এ কল দিলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি শান্ত করে।’

বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক স্ট্রিমকে বলেন, ‘পেট্রল পাম্পমালিকদের বড় সমস্যা হলো নিরাপত্তা। পাম্পে যে ভিড়, হট্টগোলের মধ্যে কেউ দিয়াশলাই জ্বালালেই খেল খতম।’

অনাকাঙ্খিত ঘটনার সৃষ্টির আশঙ্কা জানিয়ে দেশের প্রধান ডিপোগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়নের অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। তিনি বলেছেন, জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো হতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ডিলারদের আকস্মিক বাড়তি চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছে না। এসব ক্ষেত্রে ডিপোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শঙ্কা রয়ে। দেশের জ্বালানি তেলের ডিপো কেপিআইভুক্ত স্থাপনা হওয়ায় এসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন।

সম্পর্কিত