টানা বৃষ্টি ও সাগর উত্তাল
স্ট্রিম সংবাদদাতা

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ধাক্কা কাটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচল হতে শুরু করলেও এর ধীরগতি ও জটের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের সাপ্লাই চেইনের চাপ তৈরি হয়েছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী ধীরগতি ও লজিস্টিকস খাতের ক্ষয়ক্ষতি ও জটের ক্ষত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা শুরু হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অপারেশনের যে গতি কমে গিয়েছিল, তার প্রভাব এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশীয় শিল্প উৎপাদনে।
দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা করা এই বন্দরে কয়েক দিনের এই ধীরগতি, কাস্টমসের শুল্কায়ন স্থবিরতা এবং অফ-ডকগুলোর জলাবদ্ধতা পুরো বাণিজ্য শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা দিয়েছে। লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টির পানি নেমে গেলেও জট ও আর্থিক ক্ষতির চাপ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে।
সাগরে অলস ২০ লাখ টন পণ্য, লোকসান ১০০ কোটি পার
সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারির কারণে বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করার কাজ গত কয়েক দিন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙরে বর্তমানে ৬০টিরও বেশি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে রয়েছে। এসব জাহাজে তৈরি পোশাকের তুলা ও সুতা, ভোজ্যতেল, চিনি, সার এবং রড-সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও স্ক্র্যাপ লোহাসহ প্রায় ২০ লাখ টন আমদানি পণ্য আটকে আছে।
বহির্নোঙরে এই অচলাবস্থার কারণে আমদানিকারকদের ঘাড়ে চেপেছে বিশাল জরিমানার বোঝা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, ‘বহির্নোঙরে আটকে থাকা প্রতিটি মাদার ভেসেলের জন্য প্রতিদিন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ (জরিমানা) গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে কনটেইনার যথাসময়ে ফেরত দিতে না পারায় যোগ হচ্ছে দৈনিক "কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ"। সব মিলিয়ে গত পাঁচ দিনেই মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাজারে প্রভাব ফেলবে।’
কাস্টমসের ধীরগতি ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ক্ষোভ
একই সঙ্গে কনটেইনার ইয়ার্ডে জলাবদ্ধতা এবং বৃষ্টির কারণে কাস্টমস হাউজের ফিজিক্যাল ইনস্পেকশন এবং শুল্কায়নের হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম (বিলু) বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে কাস্টমস কর্মকর্তারা কনটেইনার খোলা বা পণ্য পরীক্ষার কাজ করতে পারেননি। ফলে শত শত বিল অব এন্ট্রি আটকে ছিল। বন্দর সচল থাকার কথা বলা হলেও পেপারওয়ার্ক এবং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা বন্ধ থাকলে আমদানিকারকের কোনো লাভ হয় না। আমরা কাস্টমসের কার্যদিবস ও সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি।’
অফ-ডকে পণ্য ক্ষতি: দায় নিতে নারাজ বন্দর কর্তৃপক্ষ
সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে (অফ-ডক), যেখান দিয়ে দেশের সিংহভাগ রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে কয়েকটি ডিপোর নিচু এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় শেডে থাকা রপ্তানি পণ্যের কার্টন ভিজে গেছে। অনেক পণ্য নতুন কার্টনে পুনরায় প্যাকিং করতে হচ্ছে, যা বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় বাড়িয়েছে।’
এদিকে কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি ঢুকে আমদানিকৃত তুলা, সুতা ও রাসায়নিকের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যৌথভাবে ক্ষতিপূরণ ও তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি প্রাকৃতিকভাবে হওয়া দুর্যোগজনিত এবং প্রবিধান অনুযায়ী এটি ‘অ্যাক্ট অব গড’, তাই বন্দর কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামীম বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে জেটিতে কনটেইনার অপারেশন সচল আছে এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি দ্রুত নেমে গেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় এখন ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বহির্নোঙরের খালাস গতিশীল করা হচ্ছে।’
পোশাক ও শিল্পখাতে বহুমুখী সংকটের আশঙ্কা
এই ধীরগতির কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর চাপ এখন দ্বিগুণ। বিজিএমইএ-র পরিচালক ও ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তৈয়ব বলেন, ‘ডিপোতে জলাবদ্ধতা এবং কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতি কম থাকায় উৎপাদন ও শিপমেন্ট সূচি ইতিমধ্যে পিছিয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তৈরি পোশাক পৌঁছাতে না পারলে উদ্যোক্তাদের বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বিমানভাড়ায় পণ্য পাঠাতে হবে, যা অনেক কারখানার জন্য নিট লোকসান ডেকে আনবে।’
একইভাবে বড় আমদানিকারক ও শিল্পগ্রুপগুলোও পড়েছে সংকটে। মেঘনা গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী তিনটি বড় জাহাজ বহির্নোঙরে পাঁচ দিন ধরে অলস বসে আছে। প্রতিদিন আমাদের লাখ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। কারখানায় কাঁচামালের মজুত শেষ হয়ে আসছে, দ্রুত খালাস না হলে প্রোডাকশন লাইনে প্রভাব পড়বে।’
খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা ধসে নেমেছে ৫ শতাংশে
সাপ্লাই চেইনের এই ধীরগতির চেইন রিঅ্যাকশন দেখা গেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আছদগঞ্জে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন এখানে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও গত কয়েক দিনে বেচাকেনা প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ধসে গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক আসতে না পারায় এবং বহির্নোঙরে খালাস ধীর হওয়ায় পুরো পাইকারি বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে। দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে।’
সংকট উত্তরণে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের দাবি
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘মাদার ভেসেল বহির্নোঙরে অপেক্ষা করায় আমদানিকৃত শিল্প-কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাচ্ছে না। এই সংকট সামাল দিতে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে আগামী এক সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টা অতিরিক্ত জনবল নিয়ে বিশেষ "ক্র্যাশ প্রোগ্রাম" চালাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা এই সংকটের দিনগুলোর জন্য কাস্টমস ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করার এবং বন্দরের ডেমারেজ ও কনটেইনার স্টোরেজ রেন্ট সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।’
ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার ও বিজিএমইএর আবেদন
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি জমে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই ক্ষতির দায় নিতে রাজি নয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নৌপরিবহন মন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা চেয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং উত্তাল সাগরের কারণে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি ঢুকে নিচের সারিতে রাখা সুতা, কাপড়, তোয়ালে, ডাইং কেমিক্যালসহ তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামালের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএর পরিচালক এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘দুর্যোগের কারণে সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কনটেইনারে থাকা পণ্যও নষ্ট হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট করতে না পারায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতির পরিমাণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার ও তৈরি পোশাক খাতের সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে আবেদন জানিয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সচিব গোলাম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই ক্ষতি ব্যবসায়ীদের কোনো অবহেলার কারণে হয়নি। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।’
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ‘অ্যাক্ট অব গড’-এর কারণে হওয়া ঘটনা। তাই এ ধরনের ক্ষতির দায় বন্দর কর্তৃপক্ষের নয়। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ব্যবসায়ীরা।
এশিয়ান গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খন্দকার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা বন্দরের সেবাগ্রহীতা। সেই সেবা গ্রহণের সময় যদি আমরা ক্ষতির মুখে পড়ি, তাহলে দায়ভার পুরোপুরি অস্বীকার করা বা তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।’
এদিকে সাগর উত্তাল থাকায় গত সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সাতটি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল। সময়মতো কাঁচামাল খালাস না হওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ধাক্কা কাটিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর সচল হতে শুরু করলেও এর ধীরগতি ও জটের কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের সাপ্লাই চেইনের চাপ তৈরি হয়েছে।
দুর্যোগ-পরবর্তী ধীরগতি ও লজিস্টিকস খাতের ক্ষয়ক্ষতি ও জটের ক্ষত আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানামা শুরু হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অপারেশনের যে গতি কমে গিয়েছিল, তার প্রভাব এখন বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও দেশীয় শিল্প উৎপাদনে।
দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ সমুদ্রপথের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনা করা এই বন্দরে কয়েক দিনের এই ধীরগতি, কাস্টমসের শুল্কায়ন স্থবিরতা এবং অফ-ডকগুলোর জলাবদ্ধতা পুরো বাণিজ্য শৃঙ্খলে বড় ধাক্কা দিয়েছে। লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বৃষ্টির পানি নেমে গেলেও জট ও আর্থিক ক্ষতির চাপ দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিচ্ছে।
সাগরে অলস ২০ লাখ টন পণ্য, লোকসান ১০০ কোটি পার
সাগরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত জারির কারণে বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে লাইটার জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করার কাজ গত কয়েক দিন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বহির্নোঙরে বর্তমানে ৬০টিরও বেশি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় অলস বসে রয়েছে। এসব জাহাজে তৈরি পোশাকের তুলা ও সুতা, ভোজ্যতেল, চিনি, সার এবং রড-সিমেন্টের কাঁচামাল ক্লিংকার ও স্ক্র্যাপ লোহাসহ প্রায় ২০ লাখ টন আমদানি পণ্য আটকে আছে।
বহির্নোঙরে এই অচলাবস্থার কারণে আমদানিকারকদের ঘাড়ে চেপেছে বিশাল জরিমানার বোঝা। বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ আরিফ হোসেন বলেন, ‘বহির্নোঙরে আটকে থাকা প্রতিটি মাদার ভেসেলের জন্য প্রতিদিন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ (জরিমানা) গুনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে কনটেইনার যথাসময়ে ফেরত দিতে না পারায় যোগ হচ্ছে দৈনিক "কনটেইনার ডিটেনশন চার্জ"। সব মিলিয়ে গত পাঁচ দিনেই মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এই বিশাল ব্যয় শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বাজারে প্রভাব ফেলবে।’
কাস্টমসের ধীরগতি ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের ক্ষোভ
একই সঙ্গে কনটেইনার ইয়ার্ডে জলাবদ্ধতা এবং বৃষ্টির কারণে কাস্টমস হাউজের ফিজিক্যাল ইনস্পেকশন এবং শুল্কায়নের হার প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে। চট্টগ্রাম বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী মাহমুদ ইমাম (বিলু) বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে কাস্টমস কর্মকর্তারা কনটেইনার খোলা বা পণ্য পরীক্ষার কাজ করতে পারেননি। ফলে শত শত বিল অব এন্ট্রি আটকে ছিল। বন্দর সচল থাকার কথা বলা হলেও পেপারওয়ার্ক এবং মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা বন্ধ থাকলে আমদানিকারকের কোনো লাভ হয় না। আমরা কাস্টমসের কার্যদিবস ও সময় বাড়ানোর দাবি জানিয়েছি।’
অফ-ডকে পণ্য ক্ষতি: দায় নিতে নারাজ বন্দর কর্তৃপক্ষ
সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোগুলোতে (অফ-ডক), যেখান দিয়ে দেশের সিংহভাগ রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিং হয়। বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইসিডিএ) মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে কয়েকটি ডিপোর নিচু এলাকায় পানি জমে যাওয়ায় শেডে থাকা রপ্তানি পণ্যের কার্টন ভিজে গেছে। অনেক পণ্য নতুন কার্টনে পুনরায় প্যাকিং করতে হচ্ছে, যা বাড়তি সময় ও শ্রম ব্যয় বাড়িয়েছে।’
এদিকে কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি ঢুকে আমদানিকৃত তুলা, সুতা ও রাসায়নিকের ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো যৌথভাবে ক্ষতিপূরণ ও তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এক গণবিজ্ঞপ্তিতে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি প্রাকৃতিকভাবে হওয়া দুর্যোগজনিত এবং প্রবিধান অনুযায়ী এটি ‘অ্যাক্ট অব গড’, তাই বন্দর কোনো ক্ষতিপূরণ দেবে না।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রিফায়েত হামীম বলেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক কারণ আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে জেটিতে কনটেইনার অপারেশন সচল আছে এবং আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে পানি দ্রুত নেমে গেছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় এখন ক্র্যাশ প্রোগ্রামের মাধ্যমে বহির্নোঙরের খালাস গতিশীল করা হচ্ছে।’
পোশাক ও শিল্পখাতে বহুমুখী সংকটের আশঙ্কা
এই ধীরগতির কারণে তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর চাপ এখন দ্বিগুণ। বিজিএমইএ-র পরিচালক ও ইন্ডিপেনডেন্ট অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু তৈয়ব বলেন, ‘ডিপোতে জলাবদ্ধতা এবং কারখানায় শ্রমিক উপস্থিতি কম থাকায় উৎপাদন ও শিপমেন্ট সূচি ইতিমধ্যে পিছিয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে তৈরি পোশাক পৌঁছাতে না পারলে উদ্যোক্তাদের বাধ্য হয়ে চড়া মূল্যে বিমানভাড়ায় পণ্য পাঠাতে হবে, যা অনেক কারখানার জন্য নিট লোকসান ডেকে আনবে।’
একইভাবে বড় আমদানিকারক ও শিল্পগ্রুপগুলোও পড়েছে সংকটে। মেঘনা গ্রুপের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের ভোগ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামালবাহী তিনটি বড় জাহাজ বহির্নোঙরে পাঁচ দিন ধরে অলস বসে আছে। প্রতিদিন আমাদের লাখ লাখ টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। কারখানায় কাঁচামালের মজুত শেষ হয়ে আসছে, দ্রুত খালাস না হলে প্রোডাকশন লাইনে প্রভাব পড়বে।’
খাতুনগঞ্জে বেচাকেনা ধসে নেমেছে ৫ শতাংশে
সাপ্লাই চেইনের এই ধীরগতির চেইন রিঅ্যাকশন দেখা গেছে দেশের অন্যতম বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ, চাক্তাই ও আছদগঞ্জে। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন এখানে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার লেনদেন হলেও গত কয়েক দিনে বেচাকেনা প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত ধসে গেছে।
খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আমিনুর রহমান বলেন, ‘নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্যবাহী ট্রাক আসতে না পারায় এবং বহির্নোঙরে খালাস ধীর হওয়ায় পুরো পাইকারি বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে। দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা নেই বললেই চলে।’
সংকট উত্তরণে ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের দাবি
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘মাদার ভেসেল বহির্নোঙরে অপেক্ষা করায় আমদানিকৃত শিল্প-কাঁচামাল সময়মতো কারখানায় পৌঁছাচ্ছে না। এই সংকট সামাল দিতে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে আগামী এক সপ্তাহ ২৪ ঘণ্টা অতিরিক্ত জনবল নিয়ে বিশেষ "ক্র্যাশ প্রোগ্রাম" চালাতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা এই সংকটের দিনগুলোর জন্য কাস্টমস ও ব্যাংকিং প্রক্রিয়া সহজ করার এবং বন্দরের ডেমারেজ ও কনটেইনার স্টোরেজ রেন্ট সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি জানিয়েছেন।’
ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার ও বিজিএমইএর আবেদন
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম বন্দরের বিভিন্ন কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি জমে তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও রপ্তানিযোগ্য পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এই ক্ষতির দায় নিতে রাজি নয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারসহ শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো নৌপরিবহন মন্ত্রীর কাছে লিখিতভাবে ক্ষতিপূরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা চেয়েছে।
অবিরাম বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা এবং উত্তাল সাগরের কারণে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কনটেইনার ইয়ার্ডে পানি ঢুকে নিচের সারিতে রাখা সুতা, কাপড়, তোয়ালে, ডাইং কেমিক্যালসহ তৈরি পোশাক শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামালের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
বিজিএমইএর পরিচালক এম আবু তৈয়ব বলেন, ‘দুর্যোগের কারণে সময়মতো ডেলিভারি দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে কনটেইনারে থাকা পণ্যও নষ্ট হয়ে গেছে। নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট করতে না পারায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। এই ক্ষতির পরিমাণ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।’
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পক্ষে সরকারের সহযোগিতা চেয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার ও তৈরি পোশাক খাতের সংগঠনগুলো ইতিমধ্যে আবেদন জানিয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সচিব গোলাম মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এই ক্ষতি ব্যবসায়ীদের কোনো অবহেলার কারণে হয়নি। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারের কাছে লিখিত আবেদন জানানো হয়েছে।’
অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ‘অ্যাক্ট অব গড’-এর কারণে হওয়া ঘটনা। তাই এ ধরনের ক্ষতির দায় বন্দর কর্তৃপক্ষের নয়। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন ব্যবসায়ীরা।
এশিয়ান গ্রুপের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খন্দকার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘আমরা বন্দরের সেবাগ্রহীতা। সেই সেবা গ্রহণের সময় যদি আমরা ক্ষতির মুখে পড়ি, তাহলে দায়ভার পুরোপুরি অস্বীকার করা বা তা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।’
এদিকে সাগর উত্তাল থাকায় গত সোমবার (১৩ জুলাই) পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সাতটি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল। সময়মতো কাঁচামাল খালাস না হওয়ায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমেও চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
.png)

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামের চন্দনাইশের দোহাজারিতে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণের সময় ভেঙে পড়েছে অনুষ্ঠানের মঞ্চ। শুক্রবার (১৭ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মঞ্চে অতিরিক্ত লোক ওঠায় এই ঘটনা ঘটে। তবে কেউ হতাহত হননি।
২২ মিনিট আগে
চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কনফিডেন্স লবণ কারখানায় আগুনে দগ্ধ ১০ জনের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তারা।
৪০ মিনিট আগে
হামের উপসর্গে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত শিশুটির হাম শনাক্ত হয়নি। শুক্রবার (১৭ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ সময়ে দেশে ৮৭৩ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে।
৪৪ মিনিট আগে
বান্দরবানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করা হবে এবং ব্যাংক ও এনজিওর ক্ষুদ্রঋণের কিস্তি এক মাস মওকুফ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর হেলাল উদ্দিন।
১ ঘণ্টা আগে