স্থগিত গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা কমানোর সাকুর্লার

রাষ্ট্র চলে কার ইচ্ছায়—সরকারের, না আমলাতন্ত্রের?

এম এম মুসা
উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ১৬: ৩৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৬ সালের ২৯ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে একটি স্মারক (নং ০৭.১০১.০২০.০০.০০.০০৯.২০২২-১৪) জারি হয়, যেখানে বলা হয় সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনা কর্মকর্তাদের মাসিক গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৫০,০০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২৫,০০০ টাকা করার বিষয়ে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় নির্দেশনা’ রয়েছে। উপসচিব পর্যায় থেকে জারি হওয়া এই স্মারকটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে বাস্তবায়নের অনুরোধ জানিয়ে পাঠানো হয়। এরপর যা ঘটে তা বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র কীভাবে কাজ করে তার একটি ক্ষুদ্র নমুনা—আদেশটি বাস্তবায়ন হওয়ার বদলে স্থগিত হয়ে যায়। কারণ সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫০(১) ধারা অনুযায়ী কোনো সরকারি আদেশে ‘প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’ এমন উল্লেখ থাকতে পারে না; লিখতে হয় ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে’।

এই ঘটনাটিকে নিছক একটি প্রশাসনিক খুঁত হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও প্রশাসনিক তত্ত্বে সুপরিচিত একটি ঘটনার বাংলাদেশি সংস্করণ, যাকে বলা হয় ‘প্রক্রিয়াগত ভেটো’ (procedural veto) বা প্রাতিষ্ঠানিক জড়তার মাধ্যমে সংস্কার আটকে দেওয়া। প্রশ্নটা তাই খসড়ার ভাষাগত ত্রুটি নিয়ে নয়; প্রশ্নটা হলো, একটি রাষ্ট্রযন্ত্র কখন এবং কেন হঠাৎ নিজের এগারো বছরের ঘুমন্ত নিয়ম জাগিয়ে তোলে, ঠিক তখনই যখন সেই নিয়ম তার নিজেরই আর্থিক সুবিধা রক্ষা করে।

ওয়েবারীয় আমলাতন্ত্র বনাম আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা

ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্রকে দেখেছিলেন যুক্তিসংগত-আইনি কর্তৃত্বের (rational-legal authority) সবচেয়ে দক্ষ রূপ হিসেবে—নিয়মনির্ভর, নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন। কিন্তু ওয়েবার নিজেই সতর্ক করেছিলেন যে এই একই যন্ত্র একটি ‘লৌহ খাঁচা’ (iron cage) তৈরি করতে পারে, যেখানে নিয়ম নিজেই লক্ষ্য হয়ে ওঠে, আর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্য গৌণ হয়ে পড়ে। সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টন এই প্রবণতাকে নাম দিয়েছেন ‘গোল ডিসপ্লেসমেন্ট’ (goal displacement) বা ‘প্রশিক্ষিত অক্ষমতা’ (trained incapacity), যেখানে কর্মকর্তারা নিজের স্বার্থ রক্ষায় নিয়ম মান্য করাকেই চূড়ান্ত বিষয় বানিয়ে ফেলেন। ফলে নিয়মটি যে উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছিল তা ভুলে যাওয়া হয়, আর নিয়মটি নিজেই ব্যবহৃত হয় আত্মরক্ষার হাতিয়ার হিসেবে।

এটিই এক অর্থে আনুষ্ঠানিকতাবাদের ক্লাসিক লক্ষণ: নিয়ম প্রয়োগ নিয়মের নিজস্ব যুক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে কার স্বার্থ রক্ষা পাচ্ছে তার ওপর।

সচিবালয় নির্দেশমালার ১৫০ ধারা আসলে তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সাংবিধানিক অবস্থানকে ব্যক্তিগত খেয়ালখুশির ঊর্ধ্বে রাখার জন্য, যাতে প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তকে ‘সরকারের’ সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যায়, কোনো ব্যক্তির নয়। এটি একটি যুক্তিসংগত সাংবিধানিক নীতি। কিন্তু একনায়কতান্ত্রিক শাসনামলে যখন হাজারো ফাইল ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে’ নির্দ্বিধায় পাস হয়ে গেছে, তখন এই ধারা প্রয়োগ হয়নি। এখন, যখন এই একই ভাষাগত সূত্র ব্যবহার করে একটি ব্যয়সংকোচন আদেশ জারি হলো— তখনই ধারাটি ‘সক্রিয়’ হলো। এটিই এক অর্থে আনুষ্ঠানিকতাবাদের ক্লাসিক লক্ষণ: নিয়ম প্রয়োগ নিয়মের নিজস্ব যুক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে কার স্বার্থ রক্ষা পাচ্ছে তার ওপর।

ক্রোজিয়ে: নিয়মই যখন ক্ষমতার হাতিয়ার

ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী মিশেল ক্রোজিয়ে The Bureaucratic Phenomenon-এ যুক্তি দেখিয়েছিলেন, আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদস্থ বা মধ্যপদস্থ কর্মকর্তারাও প্রকৃত ক্ষমতা রাখেন; কারণ তাঁরা নিয়মের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘অনিশ্চয়তার অঞ্চল’ (zones of uncertainty) নিয়ন্ত্রণ করেন। যখনই প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কোনো পরিবর্তন আনতে চায় যা আমলাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়, তখন কর্মকর্তারা আনুষ্ঠানিক অবাধ্যতা না দেখিয়েও নিয়মের প্যাঁচে ফেলে সেই পরিবর্তনকে অকার্যকর করে দিতে পারেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে— কেউ প্রকাশ্যে আদেশ অমান্য করেননি; বরং প্রশাসনিক formatting-এর একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি খুঁজে বের করে পুরো সিদ্ধান্তটি ‘স্থগিত’ করে দেওয়া হয়েছে। ক্রোজিয়ের ভাষায় এটি ‘নিয়মের রাজনীতিকীকরণ’—নিয়ম যখন প্রয়োগ হয় নির্বাচনীভাবে, ক্ষমতা রক্ষার জন্য।

প্রতিষ্ঠানিক পথনির্ভরতা ও নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান

অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থের বলেছেন, প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের পথ তার অতীত ইতিহাস দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে। একবার কোনো স্বার্থগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠার নিয়মকাঠামো নিজের অনুকূলে ব্যবহার করতে শিখে গেলে, সেই কাঠামো বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ যারা কাঠামো পরিচালনা করেন তারাই তা থেকে লাভবান হন।

ড্যারন আসেমোগলু ও জেমস রবিনসন তাঁদের Why Nations Fail গ্রন্থে এই ঘটনাকে বলেছেন ‘নিষ্কাশনমূলক প্রতিষ্ঠান’ (extractive institutions)—যেখানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে সবার জন্য সমান নিয়ম প্রয়োগ করার কথা বললেও, বাস্তবে একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে। এখানে যে বৈষম্য দেখা যাচ্ছে—নির্দিষ্ট ক্যাডার ও সামরিক কর্মকর্তারা গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা পান, একই গ্রেডের অন্য ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা পান না। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম সবার জন্য সমান নয়, বরং যাদের হাতে নিয়ম প্রণয়নের ক্ষমতা তাদের পক্ষে হেলে থাকে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা: সদিচ্ছা কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ ভাঙে

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, রাজনৈতিক সদিচ্ছা যথেষ্ট দৃঢ় হলে প্রাতিষ্ঠানিক জড়তা ভাঙা অসম্ভব নয়। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক।

ভারত, ২০১৭: মোদি সরকার একটি একক মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্তে কেন্দ্রীয় মোটরযান বিধিমালার একটি নির্দিষ্ট উপ-ধারা (১০৮-১(৩)) বাতিল করে রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সব মন্ত্রী, বিচারপতি ও আমলার গাড়িতে লালবাতির ব্যবহার নিষিদ্ধ করে দেয়। তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি স্পষ্ট বলেছিলেন— কোনো ব্যতিক্রম থাকবে না। এখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, প্রতীকী সুবিধা বাতিলের সিদ্ধান্তটি একটিমাত্র মন্ত্রিসভা বৈঠকে নেওয়া ও কার্যকর হয়েছিল—কোনো উপ-ধারার আড়ালে বছরের পর বছর ঝুলে থাকেনি।

জর্জিয়া, ২০০৪: ‘গোলাপ বিপ্লবের’ পর প্রেসিডেন্ট মিখাইল সাকাশভিলি দুর্নীতিগ্রস্ত ট্রাফিক পুলিশ বাহিনীর প্রায় ষোলো হাজার সদস্যকে এক রাতেই বরখাস্ত করেন এবং সম্পূর্ণ নতুন বাহিনী গঠন করেন। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী তখন একটি ট্রাফিক পুলিশ পদ কিনতে ঘুস লাগত ২,০০০ থেকে ২০,০০০ মার্কিন ডলার— অথচ সরকারি বেতন ছিল মাসে ১০-২০ ডলার। এই বৈপরীত্যই প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ কতটা গভীরভাবে প্রোথিত হতে পারে, আর তা ভাঙতে কতটা রাজনৈতিক সাহসের প্রয়োজন হয়।

যুক্তরাজ্য: ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিসে প্রথম নীতি হলো ‘পুল কার’ ব্যবহার বা গণপরিবহন; ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারকে ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করা হয়, আর সেক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট মাইলভিত্তিক হারে (বর্তমানে প্রতি মাইল ৪৫ পেন্স, বছরে প্রথম দশ হাজার মাইল পর্যন্ত) প্রতিদান দেওয়া হয়— বিলাসবহুল মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ভাতার কোনো সংস্কৃতি সেখানে নেই।

সিঙ্গাপুর: সিঙ্গাপুরের পরিবহননীতি সুস্পষ্টভাবে ‘কার-লাইট সমাজ’ গড়ার লক্ষ্যে পরিচালিত, যেখানে গাড়ির মালিকানা নিরুৎসাহিত করা একটি ঘোষিত রাষ্ট্রীয় নীতি, ব্যক্তিবিশেষের প্রশাসনিক মর্যাদা নির্বিশেষে। এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি মন্ত্রী নিয়মিত মেট্রোতে চড়েন—বাস্তবে এ নিয়ে সিঙ্গাপুরেও জনসমালোচনা আছে; কিন্তু কাঠামোগতভাবে রাষ্ট্রীয় গাড়িবহর সেখানে ন্যূনতম রাখার নীতি অনুসৃত হয়।

এই চারটি উদাহরণ অভিন্ন সূত্রে আবদ্ধ। প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ চিরন্তন নয়। এটি ভাঙা যায়—কিন্তু কেবল তখনই, যখন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়মের ভাষাগত ফাঁক বন্ধ করার সদিচ্ছা দেখায়, আর প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে ব্যাখ্যার সুযোগ না দিয়ে একবারেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে।

প্রিন্সিপাল-এজেন্ট সমস্যা ও তথ্য-অসমতা

এই ঘটনাটিকে আরও একটি তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তা হলো, অর্থনীতি ও প্রশাসন বিজ্ঞানে সুপরিচিত ‘প্রিন্সিপাল-এজেন্ট’ সমস্যা। এখানে নির্বাচিত বা অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ধরা যায় ‘প্রিন্সিপাল’, যিনি নীতিগত লক্ষ্য স্থির করেন; আর আমলাতন্ত্র হলো ‘এজেন্ট’, যাকে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সমস্যা তখনই দেখা দেয় যখন এজেন্টের কাছে প্রিন্সিপালের চেয়ে বেশি তথ্য থাকে (তথ্য-অসমতা বা information asymmetry)।

এক্ষেত্রে সচিবালয় নির্দেশমালার কোন ধারা কোথায় প্রযোজ্য, খসড়ার কোন শব্দচয়ন কোন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এসব খুঁটিনাটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়ে আমলাতন্ত্রই ভালো জানে। ফলে এজেন্ট চাইলে এই তথ্য-অসমতাকে কাজে লাগিয়ে প্রিন্সিপালের নির্দেশ কার্যকর না করেও দায় এড়াতে পারে। একে বলা হয় ‘শার্কিং’ (shirking) বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।

একজন উপসচিব ত্রিশ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনেন, মাসে পঞ্চাশ হাজার ভাতা নেন, আর তার ওপরও মন্ত্রণালয়ের রুটের গাড়ি, প্রকল্পের পাজেরো দিব্যি ব্যবহার করেন। তেল সরকারের, গাড়ি সরকারের, ভাতাটাও সরকারের। এ যেন কই মাছের তেলেই কই ভাজা।

এই কাঠামোতে সমাধান একটিই—প্রিন্সিপালকে তদারকির এমন প্রক্রিয়া তৈরি করতে হয় যা এজেন্টের ব্যাখ্যা-নির্ভরতা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ প্রতিটি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন সময়সীমা বেঁধে দেওয়া, ব্যর্থতার জন্য সুনির্দিষ্ট জবাবদিহি নির্ধারণ করা, এবং প্রয়োজনে খসড়া প্রণয়নের কাজটিও রাজনৈতিক পর্যায় থেকে সরাসরি তদারকি করা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনায় ঠিক এই তদারকিরই অভাব দেখা যায়। একটি স্মারক জারি হলো, তারপর তা ‘মিটিং না হয়েই’ স্থগিত হয়ে গেল। অথচ কে বা কারা এই স্থগিতাদেশের পেছনে সিদ্ধান্ত নিলেন, তার কোনো স্বচ্ছ জবাবদিহিমূলক ব্যাখ্যা প্রকাশ্যে আসেনি।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ফিরে আসা

উপরের তুলনায় বাংলাদেশের ঘটনাটি বিশেষভাবে আলাদা। কারণ এখানে সংস্কারের প্রশ্নটি অস্বীকার করা হয়নি, বরং একটি ভাষাগত ত্রুটির অজুহাতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছে। এটি প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানের চেয়েও কার্যকর কৌশল। কারণ এতে কাউকে প্রকাশ্যে দায়ী করা যায় না, অথচ সিদ্ধান্তটি কার্যত অচল হয়ে থাকে। যদি ত্রুটিটি সত্যিই কেবল দুই লাইনের খসড়া-সমস্যা হতো, তাহলে ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে’ শব্দগুচ্ছ বদলে ‘সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে’ বসিয়ে একই বিকেলে সংশোধিত স্মারক পুনরায় জারি করা সম্ভব ছিল। তা না করে পুরো আদেশটিকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা—প্রশাসনবিজ্ঞানে যাকে বলা হয় ‘প্রক্রিয়াগত বিলম্বন’ (proceduralist stalling)। এটি একটি সচেতন কৌশলগত পছন্দের ইঙ্গিত দেয়, নিছক অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির নয়।

একজন উপসচিব ত্রিশ লাখ টাকা সুদমুক্ত ঋণে গাড়ি কেনেন, মাসে পঞ্চাশ হাজার ভাতা নেন, আর তার ওপরও মন্ত্রণালয়ের রুটের গাড়ি, প্রকল্পের পাজেরো দিব্যি ব্যবহার করেন। তেল সরকারের, গাড়ি সরকারের, ভাতাটাও সরকারের। এ যেন কই মাছের তেলেই কই ভাজা। এই বিলাসিতা চলে আমার-আপনার করের টাকায়, যাদের ৯০ শতাংশই বাসে ঝুলে অফিসে যায়।

রাষ্ট্র কার গতিতে চলে?

বেতন ভাতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো নিয়মই আর কাজ করে না। সরকারের ইচ্ছা ছিলো ৫০% বেসিক, এবার সেটা সস্তা সফটওয়ারের যুক্তি দিয়ে ১০০% করে নিয়েছে আমলারা। প্রতিবার প্রস্তাবনা যা থাকে তা নিরীক্ষা করা হয়, সেটা ও করতে দেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকার জানেও না সম্ভবত এই কাজগুলা কিভাবে করতে হয়। এতই দুর্বল সরকার।

আর যে সংস্কার তাদের সুবিধায় হাত দেয়, সেটা কোনো না কোনো উপ-ধারায় আটকে যায়। জনগণের সরকার আসে যায়, কিন্তু স্থায়ী আমলাতন্ত্র বসে থাকে, আর তাদের অলিখিত নিয়ম একটাই, কিছু বাস্তবায়ন করতে হলে সেটা আগে ‘তাদের’ হয়ে যেতে হবে, তাদের মন রক্ষা করেই করতে হবে। এটা সব মিনিস্ট্রিতে, সব কাজে।

জুলাইয়ে মানুষ যে বদলের স্বপ্ন নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, সেই বদল আজ আমলাদের কাছে বন্দি। সবচেয়ে বড় ভয়টা এখানেই—একটা নির্বাচিত সরকারও যদি নিজের একটা সামান্য মিতব্যয়ী আদেশ বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে বড় সংস্কারগুলো করবে কীভাবে?

এই ঘটনাটি একটি বড় প্রশ্নের ছোট প্রতিচ্ছবি—একটি রাষ্ট্র নির্বাচিত বা জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্বকারী সরকারের গতিতে চলে, নাকি স্থায়ী আমলাতন্ত্রের ফাইলের গতিতে? এই সমস্যাটি ব্যক্তি-নির্ভর নয়, কাঠামোগত। কোনো একক কর্মকর্তা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত’ এই অর্থে দোষী নন যে তিনি ঘুস নিচ্ছেন। বরং পুরো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটিই এমনভাবে গঠিত যে তা নিজস্ব সুবিধা রক্ষার জন্য নিয়মকে নির্বাচনীভাবে সক্রিয় করতে সক্ষম।

ভারত, জর্জিয়া, যুক্তরাজ্য বা সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে এই জড়তা ভাঙা যায়। কিন্তু তা ভাঙতে কেবল নীতিগত সদিচ্ছা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন হয় প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে অবিচল রাজনৈতিক দৃঢ়তা, যা একটি একক ব্যাখ্যার ফাঁকও প্রতিরোধকারীদের হাতে ছেড়ে দেয় না। এই সাব-ক্লজের গল্প তাই কেবল একটি গাড়ি-ভাতার গল্প নয়— এটি প্রশ্ন তোলে, রূপান্তরকামী যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আদৌ কতটা টেকসই হতে পারে, যদি রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি উপধারায় বসে থাকা স্থায়ী স্বার্থগোষ্ঠী রূপান্তরের প্রতিটি পদক্ষেপকে প্রক্রিয়াগত কৌশলে নিষ্ক্রিয় করে দিতে সক্ষম থাকে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত