মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যেভাবে বিশ্বকে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা জানিয়েছিলেন সাইমন ড্রিং

বালাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের সেই বিভীষিকা যখন শুরু হয়, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনী সব বিদেশি সাংবাদিকদের বন্দুকের মুখে ঢাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একজন সাংবাদিক থেকে গেলেন এই মৃত্যুপুরীতে। তিনি সায়মন ড্রিং। কীভাবে তিনি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন বাঙালির ওপর চলা পৈশাচিকতার কথা?

মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে যেভাবে বিশ্বকে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা জানিয়েছিলেন সাইমন ড্রিং। স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের সকাল। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের একটি স্যুইটে বসে আছেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। মুখে আশঙ্কার ছাপ, একের পর এক সিগারেট টানছেন। মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো নিজের জীবনের পরিণতি নিয়ে হতাশায় ভুগছেন। একই সঙ্গে ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর ফলাফল কী হতে পারে, তা নিয়েও চিন্তিত।

সাংবাদিক সাইমন ড্রিং-এর চোখে এভাবেই ধরা দিয়েছিল একাত্তরের ২৬ মার্চের সকাল। তিনিও তখন ঢাকার শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই অবস্থান করছিলেন। সাইমন ড্রিং সে সময় ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও ভুট্টো রাজি হননি।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন নানা দেশের অসংখ্য মানুষ। যুদ্ধের মাঠ থেকে শরণার্থী শিবিরে, প্রতিবাদে থেকে গানে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদেরই একজন সাইমন ড্রিং।

পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নির্মম গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিস্তারিত বিবরণ উঠে আসে সাইমন ড্রিং-এর বিখ্যাত প্রতিবেদন ‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’-এ। লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’ পত্রিকায় ৩০ মার্চ এটি প্রকাশিত হয়। মূলত এই প্রতিবেদন থেকে বিশ্ববাসী বিশদে জানতে পারে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতার কথা।

‘মেজর, সেদিন রাতে ধরা পড়ে গেলে আমার কী হতো?’

১৮ বছর বয়স থেকে সংবাদপত্র ও টেলিভিশনে সাংবাদিকতা শুরু করেন সাইমন ড্রিং। নিজের ক্যারিয়ারে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ২২টি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব। একাত্তরের মার্চে তিনি কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেনে কাজ করছিলেন। সে সময় লন্ডনের সদর দপ্তর থেকে তাঁকে ফোন করে বলা হলো, ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভীষণ উত্তপ্ত। সেখানে বড় কিছু ঘটতে যাচ্ছে, তুমি দ্রুত ঢাকা চলে যাও।’

দীর্ঘদিন লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে কাজ করায় এই অঞ্চল সম্পর্কে সাইমনের ভালো ধারণা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান বা পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। তবুও পেশাগত প্রয়োজনে তিনি মার্চের ৬ তারিখে কম্বোডিয়া থেকে ঢাকায় চলে আসেন।

সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন, ৩০ মার্চ ১৯৭১। ছবি: সংগৃহীত
সাইমন ড্রিংয়ের প্রতিবেদন, ৩০ মার্চ ১৯৭১। ছবি: সংগৃহীত

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করার আগেই ঢাকায় অবস্থানরত সব বিদেশি সাংবাদিককে ওই হোটেলে অবরুদ্ধ করে ফেলে। সেদিনের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাইমন ড্রিং এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সেদিন একজন মেজর এসে আমাকে বলেছিলেন হোটেল ছাড়তে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম এটা কি কোনো ‘নির্দেশ?’ তিনি বলেছিলেন, ‘এটি নির্দেশ নয়।’ আমি তাঁকে বললাম, তাহলে যদি হোটেল না ছাড়ি তাহলে কী ঘটবে? উত্তর পেলাম, ‘এটা তোমার ব্যাপার। কিন্তু তোমার নিরাপত্তার জন্যই হোটেল ছাড়াটা জরুরি।’ আমি তাঁর সিদ্ধান্তের বিপরীতে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বললাম যে আমি ঢাকা শহরে থেকে যেতে চাই। তিনি মুখে একটা ক্রূর হাসি টেনে জানালেন, ‘নিশ্চয়, আপনি চাইলে অবশ্যই থাকবেন। তবে সে ক্ষেত্রে আপনার জন্য বিশাল সংবর্ধনার আয়োজন করা হবে।’

পরদিন সকালেই সব সাংবাদিককে বিমানবন্দরে নিয়ে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা সাইমন ড্রিংকে আর খুঁজে পায়নি। এই অভিজ্ঞতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাইমন বলেন, ‘নিচে তাকিয়ে দেখছিলাম সব সাংবাদিককে ট্রাকে উঠিয়ে বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। রাত নয়টার মতো বাজে তখন। মনে হচ্ছিল যেকোনো মুহূর্তে আমি ধরা পড়ে যাব। ট্রাক চলে যাওয়ার আরও এক ঘণ্টা পর চুপিসারে আমি নিচে নেমে আসি।’

২৭ মার্চ সকালে সাময়িকভাবে কারফিউ তুলে নেওয়া হলে হোটেলের কর্মচারীদের সাহায্যে ছোট একটি মোটরভ্যানে করে তিনি পুরো ঢাকা শহর ঘুরে দেখেন। তিনি যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, রাজারবাগের পুলিশ ব্যারাক এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে গিয়ে তিনি ছাত্রদের সারিবদ্ধ মরদেহ দেখতে পান।

পরবর্তী তিন দিন সাইমন ড্রিং হোটেলের কয়েকজন সাহসী কর্মচারীর সাহায্যে ওখানেই লুকিয়ে থাকেন। পরে তিনি জানতে পারেন, ফরাসি তরুণ আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্টও হোটেলের একটি আলমারির ভেতর লুকিয়ে আছেন। এই তিন দিনে পাকিস্তানি সেনারা বারবার হোটেলে তল্লাশি চালাতে এলেও কর্মচারীরা সাহসের সঙ্গে এই দুইজনকে আড়াল করে রাখেন।

মজার ব্যাপার হলো, সাইমনকে হোটেল ছেড়ে চলে যেতে বলা সেই মেজরের সঙ্গে যুদ্ধের এক বছর পর তাঁর আবারও দেখা হয়েছিল। সাক্ষাৎকারে সাইমন বলেন, ‘ওই মেজরের সঙ্গে আমার আবারও দেখা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে ক্যান্টনমেন্টে। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, মেজর, সেদিন রাতে আমি ধরা পড়ে গেলে আমার কী হতো?’ তিনি বলেছিলেন, ‘তুমি মারা পড়তে পারতে।’

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় অবস্থানরত ছাত্রদের ধারণা ছিল তাঁদের কেবল গ্রেফতার করা হবে’

২৭ মার্চ সকালে সাময়িকভাবে কারফিউ তুলে নেওয়া হলে হোটেলের কর্মচারীদের সাহায্যে ছোট একটি মোটরভ্যানে করে তিনি পুরো ঢাকা শহর ঘুরে দেখেন। তিনি যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হল, রাজারবাগের পুলিশ ব্যারাক এবং পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে গিয়ে তিনি ছাত্রদের সারিবদ্ধ মরদেহ দেখতে পান। এরপর চারুকলায় গিয়ে জানতে পারেন, সেখানেও চালানো হয়েছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ। ঢাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখার পর তিনি লেখেন সেই ঐতিহাসিক প্রতিবেদন—‘ট্যাংকস ক্র্যাশ রিভোল্ট ইন পাকিস্তান’।

সাইমন ড্রিং। সংগৃহীত ছবি
সাইমন ড্রিং। সংগৃহীত ছবি

সাইমন ড্রিং তাঁর প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, ‘ছাত্রদের আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সেদিন রাতে যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে ছিলেন, তাঁরা মনে করেছিলেন যে পাকিস্তানি সেনারা শুধু গ্রেফতার করবে। কিন্তু রাত বেশি গভীর হবার আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এম-২৪ ট্যাংক নিয়ে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে। এই ট্যাঙ্কগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্যবহৃত হয়েছিল। মধ্যরাতের পরপরই একদল সৈন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে ব্রিটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর আশপাশের হলগুলোকে লক্ষ্য করে গুলি চালাতে শুরু করে। এই আকস্মিক হামলায় ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) প্রায় ২০০ জন ছাত্র নিহত হন। হলের ভবনে গোলার আঘাত লাগে এবং কক্ষগুলোর ভেতরে মেশিনগান দিয়ে নির্বিচারে গুলি চালানো হয়।’

সাইমন এই প্রতিবেদনে আরও লেখেন, শুধু ঢাকাতেই অন্তত সাত হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম হয়তো মাঝপথেই থেমে যাবে। এ বিষয়ে সাইমন ড্রিং এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। সত্যিকার অর্থে হোটেলের যে লোকগুলো আমাকে লুকিয়ে রেখে আশাতীত সাহসের পরিচয় দিয়েছেন, তাঁদের মানসিক শক্তির কথা আমি ভাবতে পারতাম। আমার বোঝা উচিত ছিল যে সংগ্রামের পথে সাধারণ বাঙালির মনোবল ও ক্ষমতা তখনো অটুট ছিল। প্রকৃতপক্ষে ওটাই ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে স্বাধীনতাসংগ্রামে জয়ী হওয়ার প্রধান কারণ।’

জুতার মোজা আর টুথপেস্ট টিউবে ছবির ফিল্ম এবং রিপোর্টিং নোট লুকিয়ে রেখেছিলেন

ঢাকা ছেড়ে সাইমন ড্রিংকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হয়। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ফরাসি আলোকচিত্রী মিশেল লরেন্ট। ঢাকা বিমানবন্দরে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। তখন সব যাত্রীর ব্যাগ কঠোরভাবে তল্লাশি করা হচ্ছিল। কর্মকর্তারা সাইমনের ব্যাগে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মানচিত্র খুঁজে পান। এতে বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের সন্দেহ আরও বেড়ে যায় এবং শুরু হয় জেরা। সাইমন কৌশলে অফিসারকে বলেন যে তাঁরা কেবলই পর্যটক, পূর্ব পাকিস্তান ভ্রমণে এসেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জেরা পর্ব পার হয়ে কোনোমতে তাঁরা ঢাকা ছাড়তে সমর্থ হন।

সংগৃহীত ছবি
সংগৃহীত ছবি

১৯৭১ সালে ভারতের আকাশসীমায় পাকিস্তানি বিমান চলাচল নিষিদ্ধ ছিল। তাই পাকিস্তানের বাণিজ্যিক বিমানগুলো কলম্বো হয়ে যাতায়াত করত। সাইমন ঢাকা থেকে প্রথমে সিলন (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) পৌঁছান। সেখানে এক ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। তিনি সাহায্যের জন্য ওখানকার ব্রিটিশ হাইকমিশনে ফোন করলেও কোনো লাভ হয়নি। হাইকমিশন থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘দুঃখিত, আপনাকে সাহায্য করার কোনো সুযোগ আমাদের নেই।’

নিরুপায় হয়ে সাইমন ও মিশেল করাচিগামী বিমানে উঠে পড়েন। সেখানে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল আরও বড় বিপদ। করাচি বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাঁদের সব লাগেজ খুলে তন্নতন্ন করে তল্লাশি করা হয়। সেখানকার কর্মকর্তারা তাঁদের সাংবাদিক বলে সন্দেহ করেছিলেন। সাইমনকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে জেরা করা হয়, এমনকি তাঁর শরীরও নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করা হয়। তবে সাইমন বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের জুতার মোজা দুটি আগেই খুলে একপাশে রেখে দিয়েছিলেন। কারণ সেই মোজা আর টুথপেস্টের টিউবের ভেতরেই লুকিয়ে রাখা ছিল ঢাকায় হওয়া গণহত্যার কিছু ছবির ফিল্ম আর রিপোর্টিং নোট।

করাচি থেকে লন্ডনের বিমানে ওঠার পর, বিমানের ভেতরে বসেই জুতার ভেতর থেকে সেই চিরকুটগুলো বের করে প্রতিবেদন লিখতে শুরু করেন সাইমন ড্রিং। ২৯ মার্চ ব্যাংককে পৌঁছে ডেইলি টেলিগ্রাফ–এ প্রতিবেদন পাঠান। ৩০ মার্চ প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রথম বিশদভাবে জানতে পারে ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাদের নির্মম গণহত্যার খবর।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত