‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনার

বাংলাদেশ-চীন একাধিক বিনিয়োগ চুক্তি, ২২ কোটি ডলারের বিনিয়োগ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২৫ জুন ২০২৬, ১৯: ৫৯
‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ সেমিনারে বক্তৃতা দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বিনিয়োগ সেমিনার। এ সময় দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ২২ কোটি মার্কিন ডলারের নতুন শিল্প বিনিয়োগের ঘোষণাও এসেছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), চীনে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং চায়না কাউন্সিল ফর দ্য প্রোমোশন অব ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডের (সিসিপিআইটি) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারে চীনের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়িক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাইয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজন ছিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাষ্ট্রীয় সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থনৈতিক সংস্কার, সুশাসন ও বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধির নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত এবং আমাদের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী।’

তিনি বলেন, বৈশ্বিক উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চীন ক্রমেই উচ্চমূল্য সংযোজনভিত্তিক শিল্পে অগ্রসর হচ্ছে। এর ফলে উৎপাদন ব্যবস্থার একটি বড় অংশ নতুন, প্রতিযোগিতামূলক ও নির্ভরযোগ্য গন্তব্য খুঁজবে। বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাময় গন্তব্যগুলোর একটি হতে পারে উল্লেখ করে তিনি চীনা কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে তাদের বৈশ্বিক ভ্যালু চেইন সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করতে চারটি নতুন উদ্যোগের ঘোষণাও দেন প্রধানমন্ত্রী। এগুলো হলো বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, চীনে বিডার প্রথম বিদেশি বিনিয়োগ অফিস চালু, বিনিয়োগকারীদের সহায়তায় ‘চায়না রিলেশনশিপ ডেস্ক’ প্রতিষ্ঠা এবং চীনা ভাষাভিত্তিক ডিজিটাল সেবা প্ল্যাটফর্ম ‘চায়না ইনভেস্টমেন্ট গেটওয়ে’ চালু।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে টেকসই শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধিই হবে আগামী দিনের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি।

তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য বাংলাদেশকে একটি উচ্চ আয়ের, রপ্তানিমুখী ও শিল্পভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। এজন্য একটি স্থিতিশীল, পূর্বানুমানযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার কাজ চলছে।

চীনের আস্থা পুনর্ব্যক্ত

চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উন্নয়নের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান সিসিপিআইটির চেয়ারম্যান রেন হংবিন বলেন, টানা ১৬ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার এবং বর্তমানে দ্বিতীয় বৃহত্তম বিনিয়োগ উৎস। বাংলাদেশে চীনা অর্থায়নে প্রায় ৭০০ নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

তিনি বলেন, দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ আরও জোরদারে সিসিপিআইটি কাজ করছে। একই সঙ্গে আরও বেশি বাংলাদেশি পণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ এবং সক্ষম চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণে উৎসাহিত করা হবে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বাংলাদেশের বড় ভোক্তা বাজার, প্রতিযোগিতামূলক শ্রমশক্তি, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ধারাবাহিক সংস্কার কর্মসূচি দেশটিকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।

তিনি জানান, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সরকার নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানো, অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিগত সংস্কারে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাক, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প, ইলেকট্রনিক্স, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ ও স্বাস্থ্যসেবা, অটোমোটিভ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে তুলে ধরেন।

একাধিক বিনিয়োগ চুক্তি

সেমিনারে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ-সংক্রান্ত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

এর মধ্যে বাগেরহাটের মোংলা বন্দরের পাশে চীন-বাংলাদেশ মোংলা পোর্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি)-এর সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর ও বিনিময় করা হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশে বিনিয়োগ প্রচার, ব্যবসায়িক সংযোগ বৃদ্ধি এবং চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা জোরদারে বিডা ও সিসিপিআইটির মধ্যে একটি সহযোগিতাবিষয়ক সমঝোতা স্মারক সই হয়।

সেমিনারে কেরানীগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের অনুকূলে জমির প্রভিশনাল বরাদ্দও সম্পন্ন হয়। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে ২২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে একটি নতুন কারখানা স্থাপন করবে, যা থেকে প্রায় ১৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এর আগে প্রতিষ্ঠানটি চট্টগ্রামের মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগে প্রথম কারখানা স্থাপন করেছে। সেখানে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।

সেমিনারের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেএমকে গ্রুপ, হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজসহ চীনের বিভিন্ন শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত