ইমরান হোসাইন

বিশ্বের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধস। ১১ শ ৭৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও হাজারো শ্রমিকের পঙ্গুত্ববরণের ১৩ বছর পার হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়নি। এই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ধীরগতিতে চললেও, রাজউকের ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় কেবল অভিযোগ গঠন শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বাদীর খোঁজ না থাকায় স্থবির হয়ে আছে শ্রম আদালতের আরও ১১টি মামলা।
দীর্ঘ এক যুগ পরেও দোষীদের সাজা না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে আহত শ্রমিক পারুল বলেন, ‘গার্মেন্টস মালিকরা সবাই গ্রেপ্তার হলেও এখন জামিনে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, শুধু ভবনমালিক সোহেল রানা আটকে আছে। সরকারি উকিলরা ঠিকমতো কাজ করলে ১৩ বছর ধরে বিচার ঝুলে থাকত না। আমরা দোষীদের দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
আহত জেসমিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গরিবের কথা কেউ শোনে না। দোষীরা দিব্যি জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমরা জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি। সরকারি উকিলরা মাসের পর মাস বেতন নিচ্ছে, কিন্তু সঠিক বিচার করছে না।’
সরকারের কাছে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো মারাই যাচ্ছি, কোনো কাজ করতে পারি না। আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া হোক। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আর আমার অবুঝ বাচ্চাটার দায়িত্ব যেন সরকার নেয়। ওর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে সরকার যেন ওকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলে, যাতে আমার মৃত্যুর পর ওকে পথে বসতে না হয়।’
আরেক ভুক্তভোগী রাশেদা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের যারা জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না—এটা দেখলে খুব খারাপ লাগে। এভাবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে সেদিন মরে গেলেই ভালো হতো।’
এতদিনেও বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আহত শ্রমিক শিলা বলেন, ‘সোহেল রানাসহ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী গার্মেন্টস মালিকরা এতগুলো মানুষের জীবন কেড়ে নিল, অথচ কারও ফাঁসি হলো না। একজন খুন করলে ফাঁসি হয়, আর এখানে হাজার হাজার মানুষ খুন হওয়ার পরও বিচার নেই।’
আহত শ্রমিক মাসুদাও বিচারের পাশাপাশি রানা প্লাজার জায়গায় মার্কেট তৈরি করে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা এবং সরকারি হাসপাতালে হয়রানি ছাড়া সুচিকিৎসার দাবি জানান।
কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের জন্য চালু হওয়া এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (ইআইএস) থেকে রানা প্লাজার ভুক্তভোগীদের বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা হলাম এই স্কিমের উদ্যোক্তা বা কারণ, অথচ আমাদেরকেই এই স্কিম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে! আমাদেরও এই স্কিমের অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
সোহেল রানা ছাড়া সব আসামি জামিনে বা পলাতক
বর্তমানে একাধিক আদালতে রানা প্লাজা ধস সংক্রান্ত ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ফৌজদারি আদালতে ৩টি এবং শ্রম আদালতে ১১টি মামলা চলছে।
পরিকল্পিত হত্যা এবং ইমারত বিধি না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৫ সালে দুটি মূল মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়। সাভার মডেল থানার হত্যা মামলাটি তদন্ত করেন সাভার থানার এসআই কাইসার মাতুব্বর, ডিবির মীর শাহীন শাহ পারভেজ এবং সিআইডির বিজয় কৃষ্ণ কর। দুই মামলা মিলিয়ে মোট আসামি ছিলেন ৪২ জন। এর মধ্যে সোহেল রানাসহ ১৭ জন উভয় মামলারই অভিন্ন আসামি। দীর্ঘ এই সময়ে সোহেল রানার বাবা আব্দুল খালেকসহ ৩ জন মারা গেছেন। বর্তমানে ৩৮ আসামির মধ্যে একমাত্র সোহেল রানা কারাগারে থাকলেও বাকিরা জামিনে বা পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি ও পদোন্নতি
দাখিলকৃত চার্জশিটে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) ৫ জন কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শ্রম মন্ত্রণালয় আইনিব্যবস্থার মঞ্জুরি না দেওয়ায় তারা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদের মধ্যে ৫ নম্বর আসামি মো. আব্দুস সামাদ, ৬ নম্বর আসামি মো. জামশেদুর রহমান এবং ৯ নম্বর আসামি মো. সহিদুল ইসলাম অবসরে গেছেন। ৭ নম্বর আসামি মো. বেলায়েত হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ৮ নম্বর আসামি মো. ইউসুফ আলী উল্টো পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে জামালপুরে উপমহাপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণে ধীরগতি ও ৫০০ সাক্ষীর বোঝা
দণ্ডবিধির অধীনে দায়ের করা দুটি হত্যা মামলার বিচার ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে চলছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দিলেও, ২৭ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নিতে সক্ষম হয়েছে।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বর্তমান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), সিনিয়র আইনজীবী ইকবাল হোসেন ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিগত সময়ে দায়িত্ব পালনকারী পিপিরা সাক্ষ্য গ্রহণে কিছুটা অনীহা দেখিয়েছিলেন। সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের তৎপরতা ও কার্যকারিতা কম ছিল, যে কারণে মামলাটিতে এত দিন ব্যাকলগ বা জট তৈরি হয়েছিল।’
শতাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পরও মামলার কার্যক্রম শেষ না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে এই পিপি বলেন, ‘এখনো কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি আছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই আমরা যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) পর্যায়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আগামী ৩০ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।’
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর অধীনে দায়ের করা তৃতীয় মামলাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, ‘মামলাটি ১৪ জুন ২০১৬ তারিখে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেননি। এই মামলাটিরও সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ আগামী ৩০ এপ্রিল ধার্য রয়েছে।’
এ ছাড়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ) বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর অধীনে ১১টি মামলা দায়ের করেছে, যার সবই বর্তমানে ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে মামলার বাদী ডাইফ পরিদর্শকদের কোনো খোঁজ ও তৎপরতা না থাকায় এই মামলাগুলোর কার্যক্রমও কার্যত আটকে আছে।
রানা প্লাজার মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘ব্যাকলগ শুধু রানা প্লাজা মামলার ক্ষেত্রে নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার (জুডিশিয়ারি) সমস্যা। আগামী দুই-চার বছরে এই ব্যাকলগ থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ আমি দেখছি না। এর সমাধানের জন্য কোর্ট এবং সরকারের একটি মহাপরিকল্পনা দরকার। কারণ ব্যাকলগ কমাতে হলে বিচারক লাগবে, তাঁদের বসার জায়গা ও লজিস্টিক সাপোর্ট লাগবে—যা সরকার ছাড়া কেউ দিতে পারবে না।’
প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগের বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, "প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়, কিন্তু বিচার বিভাগের ব্যাপারে কারও কোনো উদ্যোগ নেই। দেশে বিচারকের সংখ্যা এমনিতেই কম। অনেক জায়গায় সকালে এক বিচারক যে চেয়ারে বসেন, বিকেলে আরেকজন এসে সেখানে বসেন। অথচ দেশের কোনো ইউএনও বা এসিল্যান্ডের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায় না। ঢাকা কোর্টে এই গরমের মধ্যেও তিন ভাগের দুই ভাগ বিচারকের এসির ব্যবস্থা নেই। বিচার বিভাগকে একেবারে গরিবের আস্তানার মতো বানিয়ে ফেলা হয়েছে।’
রানা প্লাজা মামলায় আসামিদের জামিন পাওয়া এবং অধস্তন আদালতের প্রতি হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রসঙ্গে মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘বিচারের ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর বা ল্যাকুনা থাকলে আসামির অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে তারা উচ্চ আদালতে যেতেই পারে। এক হাজার লোক মারা গেছে বলে ইমোশনাল হয়ে ফাঁসি দেওয়ার সুযোগ আইনে নেই। অবহেলা প্রমাণ করতে হবে। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা স্থগিত হয়ে থাকলে, তা দ্রুত শুনানি করে নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব প্রসিকিউশনের।’
চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বাবুল বলেন, ‘চার্জশিটে বিপুলসংখ্যক সাক্ষী থাকলেও সব সাক্ষী হাজির করা বাস্তবসম্মত নয়। অনেক সাক্ষী অনুপস্থিত, কেউ মারা গেছেন, আবার কেউ সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী নন। তাই যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের মাধ্যমেই মামলাটি দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এড়ানোর পথ বাতলে দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যদি আদালত মনে করে যে পর্যাপ্ত ও শক্তিশালী সাক্ষ্য উপস্থাপিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষের আর সাক্ষীর প্রয়োজন নেই, তাহলে সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ করে মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। সব সাক্ষী নেওয়ার চেষ্টা করলে এই মামলা শেষ হতে আরও বহু বছর সময় লাগতে পারে।’
রানা প্লাজা মামলার দীর্ঘসূত্রতায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বা স্টে অর্ডার প্রসঙ্গে পিপি বাবুল বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট আসামির ক্ষেত্রে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকলে তা শুধু তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) একজন আইনজীবী হাইকোর্টের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জানান, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা নিয়ে করা জনস্বার্থমূলক রিট এবং একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলার শুনানি হাইকোর্টে একসঙ্গে চললেও বারবার বেঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় এর কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
আসামির সম্পত্তি ক্রোকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রানা প্লাজার মালিকের সম্পত্তি ক্রোক করতে এবং সেগুলো যেন বিক্রি করা না যায়—সে বিষয়ে আইজিপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।’
শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম সুজন জানান, ‘আমরা ২৪ এপ্রিলকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে “গার্মেন্টস শ্রমিক শোক দিবস” ঘোষণার দাবি জোরালোভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরব।’

বিশ্বের পোশাকশিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা সাভারের রানা প্লাজা ধস। ১১ শ ৭৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু ও হাজারো শ্রমিকের পঙ্গুত্ববরণের ১৩ বছর পার হলেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়নি। এই ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ ধীরগতিতে চললেও, রাজউকের ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় কেবল অভিযোগ গঠন শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বাদীর খোঁজ না থাকায় স্থবির হয়ে আছে শ্রম আদালতের আরও ১১টি মামলা।
দীর্ঘ এক যুগ পরেও দোষীদের সাজা না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করে আহত শ্রমিক পারুল বলেন, ‘গার্মেন্টস মালিকরা সবাই গ্রেপ্তার হলেও এখন জামিনে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, শুধু ভবনমালিক সোহেল রানা আটকে আছে। সরকারি উকিলরা ঠিকমতো কাজ করলে ১৩ বছর ধরে বিচার ঝুলে থাকত না। আমরা দোষীদের দ্রুত ও সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।’
আহত জেসমিন আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘গরিবের কথা কেউ শোনে না। দোষীরা দিব্যি জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমরা জিন্দা লাশ হয়ে বেঁচে আছি। সরকারি উকিলরা মাসের পর মাস বেতন নিচ্ছে, কিন্তু সঠিক বিচার করছে না।’
সরকারের কাছে নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো মারাই যাচ্ছি, কোনো কাজ করতে পারি না। আমাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দেওয়া হোক। দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হোক। আর আমার অবুঝ বাচ্চাটার দায়িত্ব যেন সরকার নেয়। ওর লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে সরকার যেন ওকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলে, যাতে আমার মৃত্যুর পর ওকে পথে বসতে না হয়।’
আরেক ভুক্তভোগী রাশেদা আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘আমাদের যারা জোর করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না—এটা দেখলে খুব খারাপ লাগে। এভাবে কষ্ট পাওয়ার চেয়ে সেদিন মরে গেলেই ভালো হতো।’
এতদিনেও বিচার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আহত শ্রমিক শিলা বলেন, ‘সোহেল রানাসহ এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী গার্মেন্টস মালিকরা এতগুলো মানুষের জীবন কেড়ে নিল, অথচ কারও ফাঁসি হলো না। একজন খুন করলে ফাঁসি হয়, আর এখানে হাজার হাজার মানুষ খুন হওয়ার পরও বিচার নেই।’
আহত শ্রমিক মাসুদাও বিচারের পাশাপাশি রানা প্লাজার জায়গায় মার্কেট তৈরি করে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা এবং সরকারি হাসপাতালে হয়রানি ছাড়া সুচিকিৎসার দাবি জানান।
কর্মক্ষেত্রে আহত শ্রমিকদের জন্য চালু হওয়া এমপ্লয়মেন্ট ইনজুরি স্কিম (ইআইএস) থেকে রানা প্লাজার ভুক্তভোগীদের বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমরা হলাম এই স্কিমের উদ্যোক্তা বা কারণ, অথচ আমাদেরকেই এই স্কিম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে! আমাদেরও এই স্কিমের অন্তর্ভুক্ত করা হোক।’
সোহেল রানা ছাড়া সব আসামি জামিনে বা পলাতক
বর্তমানে একাধিক আদালতে রানা প্লাজা ধস সংক্রান্ত ১৪টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ফৌজদারি আদালতে ৩টি এবং শ্রম আদালতে ১১টি মামলা চলছে।
পরিকল্পিত হত্যা এবং ইমারত বিধি না মেনে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৫ সালে দুটি মূল মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়। সাভার মডেল থানার হত্যা মামলাটি তদন্ত করেন সাভার থানার এসআই কাইসার মাতুব্বর, ডিবির মীর শাহীন শাহ পারভেজ এবং সিআইডির বিজয় কৃষ্ণ কর। দুই মামলা মিলিয়ে মোট আসামি ছিলেন ৪২ জন। এর মধ্যে সোহেল রানাসহ ১৭ জন উভয় মামলারই অভিন্ন আসামি। দীর্ঘ এই সময়ে সোহেল রানার বাবা আব্দুল খালেকসহ ৩ জন মারা গেছেন। বর্তমানে ৩৮ আসামির মধ্যে একমাত্র সোহেল রানা কারাগারে থাকলেও বাকিরা জামিনে বা পলাতক জীবন কাটাচ্ছেন।
সরকারি কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি ও পদোন্নতি
দাখিলকৃত চার্জশিটে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডাইফ) ৫ জন কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর শ্রম মন্ত্রণালয় আইনিব্যবস্থার মঞ্জুরি না দেওয়ায় তারা এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এদের মধ্যে ৫ নম্বর আসামি মো. আব্দুস সামাদ, ৬ নম্বর আসামি মো. জামশেদুর রহমান এবং ৯ নম্বর আসামি মো. সহিদুল ইসলাম অবসরে গেছেন। ৭ নম্বর আসামি মো. বেলায়েত হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ৮ নম্বর আসামি মো. ইউসুফ আলী উল্টো পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে জামালপুরে উপমহাপরিদর্শক হিসেবে কর্মরত আছেন।
সাক্ষ্যগ্রহণে ধীরগতি ও ৫০০ সাক্ষীর বোঝা
দণ্ডবিধির অধীনে দায়ের করা দুটি হত্যা মামলার বিচার ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা আদালতে চলছে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ গত ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শেষ করার নির্দেশ দিলেও, ২৭ মাস অতিবাহিত হওয়ার পর ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্য নিতে সক্ষম হয়েছে।
মামলার সর্বশেষ অবস্থা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বর্তমান পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি), সিনিয়র আইনজীবী ইকবাল হোসেন ঢাকা স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিগত সময়ে দায়িত্ব পালনকারী পিপিরা সাক্ষ্য গ্রহণে কিছুটা অনীহা দেখিয়েছিলেন। সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে তাঁদের তৎপরতা ও কার্যকারিতা কম ছিল, যে কারণে মামলাটিতে এত দিন ব্যাকলগ বা জট তৈরি হয়েছিল।’
শতাধিক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পরও মামলার কার্যক্রম শেষ না হওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করলে এই পিপি বলেন, ‘এখনো কয়েকজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও চিকিৎসকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি আছে। এসব গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ পাওয়ার পরই আমরা যুক্তিতর্ক (আর্গুমেন্ট) পর্যায়ে যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। আগামী ৩০ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।’
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর অধীনে দায়ের করা তৃতীয় মামলাটি সম্পর্কে জানতে চাইলে এই পাবলিক প্রসিকিউটর বলেন, ‘মামলাটি ১৪ জুন ২০১৬ তারিখে ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্থানান্তর করা হয়। ১৬ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাক্ষী সাক্ষ্য দেননি। এই মামলাটিরও সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ আগামী ৩০ এপ্রিল ধার্য রয়েছে।’
এ ছাড়া কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ) বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এর অধীনে ১১টি মামলা দায়ের করেছে, যার সবই বর্তমানে ঢাকার দ্বিতীয় শ্রম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। তবে মামলার বাদী ডাইফ পরিদর্শকদের কোনো খোঁজ ও তৎপরতা না থাকায় এই মামলাগুলোর কার্যক্রমও কার্যত আটকে আছে।
রানা প্লাজার মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘ব্যাকলগ শুধু রানা প্লাজা মামলার ক্ষেত্রে নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থার (জুডিশিয়ারি) সমস্যা। আগামী দুই-চার বছরে এই ব্যাকলগ থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো পথ আমি দেখছি না। এর সমাধানের জন্য কোর্ট এবং সরকারের একটি মহাপরিকল্পনা দরকার। কারণ ব্যাকলগ কমাতে হলে বিচারক লাগবে, তাঁদের বসার জায়গা ও লজিস্টিক সাপোর্ট লাগবে—যা সরকার ছাড়া কেউ দিতে পারবে না।’
প্রশাসনিক ও বিচার বিভাগের বৈষম্য তুলে ধরে তিনি বলেন, "প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায় সমস্যাগুলো সমাধান করা হয়, কিন্তু বিচার বিভাগের ব্যাপারে কারও কোনো উদ্যোগ নেই। দেশে বিচারকের সংখ্যা এমনিতেই কম। অনেক জায়গায় সকালে এক বিচারক যে চেয়ারে বসেন, বিকেলে আরেকজন এসে সেখানে বসেন। অথচ দেশের কোনো ইউএনও বা এসিল্যান্ডের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায় না। ঢাকা কোর্টে এই গরমের মধ্যেও তিন ভাগের দুই ভাগ বিচারকের এসির ব্যবস্থা নেই। বিচার বিভাগকে একেবারে গরিবের আস্তানার মতো বানিয়ে ফেলা হয়েছে।’
রানা প্লাজা মামলায় আসামিদের জামিন পাওয়া এবং অধস্তন আদালতের প্রতি হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ প্রসঙ্গে মনজিল মোরশেদ বলেন, ‘বিচারের ক্ষেত্রে আইনি ফাঁকফোকর বা ল্যাকুনা থাকলে আসামির অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, ফলে তারা উচ্চ আদালতে যেতেই পারে। এক হাজার লোক মারা গেছে বলে ইমোশনাল হয়ে ফাঁসি দেওয়ার সুযোগ আইনে নেই। অবহেলা প্রমাণ করতে হবে। ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে মামলা স্থগিত হয়ে থাকলে, তা দ্রুত শুনানি করে নিষ্পত্তি করার দায়িত্ব প্রসিকিউশনের।’
চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (সিজেএম) আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবীর বাবুল বলেন, ‘চার্জশিটে বিপুলসংখ্যক সাক্ষী থাকলেও সব সাক্ষী হাজির করা বাস্তবসম্মত নয়। অনেক সাক্ষী অনুপস্থিত, কেউ মারা গেছেন, আবার কেউ সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী নন। তাই যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের মাধ্যমেই মামলাটি দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।’
মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এড়ানোর পথ বাতলে দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যদি আদালত মনে করে যে পর্যাপ্ত ও শক্তিশালী সাক্ষ্য উপস্থাপিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রপক্ষের আর সাক্ষীর প্রয়োজন নেই, তাহলে সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ করে মামলাটি রায়ের জন্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। সব সাক্ষী নেওয়ার চেষ্টা করলে এই মামলা শেষ হতে আরও বহু বছর সময় লাগতে পারে।’
রানা প্লাজা মামলার দীর্ঘসূত্রতায় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ বা স্টে অর্ডার প্রসঙ্গে পিপি বাবুল বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট আসামির ক্ষেত্রে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকলে তা শুধু তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধে মামলার কার্যক্রম চলতে পারে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) একজন আইনজীবী হাইকোর্টের প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে জানান, ২০১৩ সালে রানা প্লাজা নিয়ে করা জনস্বার্থমূলক রিট এবং একটি স্বতঃপ্রণোদিত মামলার শুনানি হাইকোর্টে একসঙ্গে চললেও বারবার বেঞ্চ ভেঙে যাওয়ায় এর কোনো নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
আসামির সম্পত্তি ক্রোকের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘রানা প্লাজার মালিকের সম্পত্তি ক্রোক করতে এবং সেগুলো যেন বিক্রি করা না যায়—সে বিষয়ে আইজিপিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।’
শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম সুজন জানান, ‘আমরা ২৪ এপ্রিলকে সরকারি গেজেটের মাধ্যমে “গার্মেন্টস শ্রমিক শোক দিবস” ঘোষণার দাবি জোরালোভাবে সরকারের কাছে তুলে ধরব।’

হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে শুক্রবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে তিনজন এবং সন্দেহজনক হাম নিয়ে মারা গেছে চার শিশু।
১ ঘণ্টা আগে
দেশের অন্য এলাকার মতো বন্দরনগরী চট্টগ্রামও পুড়ছে বৈশাখের তীব্র তাপদাহে। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নিম্নআয়ের শ্রমিকজীবীদের উপর। গরমের কারণে অনেকে কাজে যেতে পারছেন না। গেলেও কিছুক্ষণ পর হাঁপিয়ে উঠছেন। এতে তাদের আয় উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।
১ ঘণ্টা আগে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে শিবির-ছাত্রদল সংঘর্ষের ঘটনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সব পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে প্রশাসন। এ ঘটনায় তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠনসহ সবাইকে দেয়াললিখন থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করা হয়েছে।
১ ঘণ্টা আগে
ফ্যামিলি কার্ডসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রচারে সারা দেশে বিলবোর্ড স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১২ কোটি টাকা।
৩ ঘণ্টা আগে