ad

চার মহাতারকার শেষ অধ্যায়

কারও বিদায়ের ট্র্যাজেডি, কারও জয়ের রূপকথা

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৩: ৩৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

ফুটবল মাঠের লড়াই থামে ৯০ মিনিটে, কখনোবা টাইব্রেকারে। রেফারি বাজান শেষ বাঁশি। ম্যাচের স্কোর আর গ্যালারির গর্জন আচমকা থমকে যায়। রেকর্ডের খাতা হয় নিস্তব্ধ। কোটি টাকার তারকাখ্যাতি কিংবা বিজ্ঞাপনী জৌলুস মুহূর্তেই ধুয়েমুছে যায়। সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকা মহাতারকারা তখন কেবল রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে ধরা দেন।

চলতি বিশ্বকাপ ঠিক তেমনই চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে পুরো বিশ্বকে। চার মহাতারকার ভেজা চোখ ফুটবলকে নিছক খেলার গণ্ডি থেকে বের করে এনেছে। বলেছে, কারও কান্না বিদায়ের আর কারও কান্না বিজয়ের।

মদ্রিচের নিঃশব্দ প্রস্থান

বিশ্বকাপের এই মহাকাব্যে প্রথম ঐতিহাসিক বিদায়ের ঘটনা ঘটে রাউন্ড অব ৩২-এর লড়াইয়ে। পর্তুগালের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ক্রোয়েশিয়া। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় লুকা মদ্রিচের বিশ্বকাপ অভিযান। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই মদ্রিচ কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দেখাননি কোনো নাটকীয় প্রতিক্রিয়া। শুধু চোখের কোণে জমে থাকা জল বলে দিচ্ছিল এক যুগের সমাপ্তির কথা।

বছরের পর বছর ক্রোয়েশিয়া দলের ভার যেন একাই বইছিলেন মদ্রিচ। সেই মদ্রিচের বিদায়টি যেন নিঃশব্দেই হয়ে গেল। বিশ্বকাপ ট্রফি তাঁর হাতে ওঠেনি। ২০১৮ বিশ্বকাপে রানার্সআপ এবং ২০২২-এ তৃতীয় স্থান অর্জন মদ্রিচকে অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছিল।

নেইমারের চোখের জলে দেড় যুগের ভার

শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে হেরে যায় ব্রাজিল। সেই সঙ্গে শেষ হয় নেইমারের বর্ণিল জাতীয় দল ক্যারিয়ার। হলুদ জার্সি গায়ে শেষবারের মতো মাঠ ছাড়ার সময় নেইমারের চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই জলে পরাজয়ের গ্লানির চেয়ে হয়তো অভিমানই ছিল বেশি।

ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সি বরাবরই স্পেশাল। পেলে, জিকো ও রোনালদিনহোদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া এই জার্সি কোটি মানুষের আবেগের প্রতীক। সেই জার্সির সঙ্গে চার বিশ্বকাপ ও নিজের দীর্ঘ পথচলার সমাপ্তি টানেন নেইমার। নেইমারের অশ্রু মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের অধ্যায় যতই গৌরবময় হোক না কেন, প্রতিটি সুন্দর যাত্রার সমাপ্তি থাকে।

নেইমারের শতচেষ্টার পর ট্রফি না পাওয়ার যাত্রাকে কবিতার ভাষায় বললে— ‘পাহাড় ডিঙিয়ে শেষ, শূন্য হাতে ফিরে আসা; বৃথা গেল যত শ্রম, বৃথা গেল মোর হাজারও চেষ্টা।’

রোনালদোর একাকিত্ব ও সময়ের কাছে পরাজয়

শেষ ১৬-র আরেক ম্যাচে যোগ করা সময়ে মিকেল মেরিনোর গোলে পর্তুগালের বিরুদ্ধে ১-০ গোলে জয় পায় স্পেন। আসরের অন্যতম ফেভারিট পর্তুগাল থেমে গেল শেষ ১৬ তেই। দেশটির মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তখন মাথা নিচু করে মাঠে দাঁড়িয়ে। তাঁর চারপাশে শত শত ক্যামেরার লেন্স আর লাখো মানুষের চোখ। অথচ রোনালদো তখন পৃথিবীর সবচেয়ে একা মানুষ। চোখের জল আড়াল করার কোনো চেষ্টাই তিনি করলেন না।

করবেন বা কীভাবে। তাঁর অশ্রুসিক্ত চোখ মোছার জন্য কোনো সতীর্থ এগিয়ে এলেন না। দেখে মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো কোনো নির্জন বিচ্ছিন্ন দ্বীপে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। তাঁর এই কান্না নিছক ম্যাচের হারের কান্না নয়, সময়ের কাছে পরাজয়ের স্বীকারোক্তি।

ছয় বিশ্বকাপে গোলের অনন্য রেকর্ড করা রোনালদোর ক্যাবিনেট ট্রফি আর প্রাপ্তিতে ঠাসা। কিন্তু ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসেও বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটা তাঁর ছোঁয়া হলো না।

খাদের কিনারা থেকে মেসির পুনর্জন্ম

গল্পের স্ক্রিপ্ট যখন বিষাদের চাদরে ঢাকা, ঠিক তখনই ফুটবল দেখায় তার চিরচেনা প্রত্যাবর্তনের রূপকথা। মিসরের বিপক্ষে বাঁচামরার লড়াইয়ে আর্জেন্টিনা তখন ২-০ গোলে পিছিয়ে। কোটি সমর্থক তখন বিদায়ের আশঙ্কায় অশ্রুসিক্ত। মনে হচ্ছিল হয়তো আরও এক কিংবদন্তির বিদায়।

কিন্তু ফুটবল তো আর কোনো যৌক্তিক নিয়ম মেনে চলে না। প্রথমে এক গোল শোধ করে আর্জেন্টিনা। তারপর আসে সমতা। সবশেষে ১৪ মিনিটের মধ্যে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য জয় তুলে নেয় তারা। শেষ বাঁশি বাজতেই লিওনেল মেসি মাঠের মাঝে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। সতীর্থরা ছুটে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। মেসির চোখ বেয়ে তখন নামছিল আনন্দ আর স্বস্তির ধারা।

মেসি তো বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিতে চার বছর আগেই চুমু খেয়েছেন। এই জয়ের পর তাঁর কান্নাটা হয়তো মায়ার। পরাজয়ের মুখ থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনার স্বস্তি ছিল সেখানে। ফুটবলকে সবটুকু দিয়ে দেওয়া মানুষটি হয়তো ভাবতেই পারেন তাঁর এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

এই জল রোনালদোর মতো স্বপ্নভঙ্গের ছিল না। নেইমারের মতো শেষ বিদায়ের কিংবা মদ্রিচের মতো নিঃশব্দের বিদায়ও ছিল না। এই জল ছিল পুনর্জন্মের। কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটি চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিলেন, তিনি ফিরে পেলেন নতুন ভোরের আলো।

Ad 300x250

সম্পর্কিত