খাজা আহমদ আব্বাসের গল্প
প্রগতিশীল লেখক, সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা খাজা আহমদ আব্বাস (১৯১৪–১৯৮৭) বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। সাংবাদিকতায় ১৯৩৫ সালে শুরু করা দীর্ঘস্থায়ী ‘লাস্ট পেজ’ কলাম ও রাজ কাপুরের কালজয়ী সিনেমার চিত্রনাট্যকার হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন। ‘ধরতি কে লাল’-এর মতো সামাজিক বাস্তববাদী চলচ্চিত্রের নির্মাতা এই শিল্পী সাহিত্য ও চলচ্চিত্রে তিনটি ভাষায় ৭৪টি বই ও ৯০টি ছোটগল্প লিখেছেন। সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে তাঁর ঐতিহাসিক আইনি লড়াই ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃজনশীল স্বাধীনতার প্রধান ভিত্তি হিসেবে আজও স্বীকৃত
জাভেদ হুসেন

তার নাম ছিল রহিম খান। রহিম মানে দয়ালু। কিন্তু তার মতো জালিম আশে-পাশের পাঁচ গ্রামের মধ্যে আর কেউ ছিল না। পুরো গ্রাম তার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। মানুষ বা পশু—কারও ওপরই তার একটুও দয়া-মায়া ছিল না। একদিন রামু কামারের ছেলে তার বলদের লেজে কাঁটা বেঁধে দিয়েছিল। সে ছেলেটিকে মারতে মারতে প্রায় আধমরা করে ফেলেছিল। পরদিন জেলদারের ঘোড়াটা তার ক্ষেতে ঢুকে পড়ায় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সেটিকে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।
লোকে বলত— হতভাগাটার কি খোদার ভয়ও নেই? মাসুম বাচ্চা থেকে অবলা পশু কাউকেই সে ছাড় দেয় না। নিশ্চিত ব্যাটা জাহান্নামে জ্বলবে। তবে এসব কথা মানুষ তার পেছনেই বলত। সামনে মুখ খোলার সাহস কারও ছিল না।
একদিন বিন্দুর কপালে খারাপি ছিল, সে বলেই ফেলল, ‘আরে ভাই রহিম খান, তুমি বাচ্চাদের মারো কেন?’ ব্যস, সেই বেচারার ওপর যে অত্যাচার করল রহিম তাতে সেই দিন থেকে লোকে তার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। কে জানে, কখন কোন কথায় সে ক্ষেপে যায়! কারও বা ধারণা ছিল, তার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। ওকে পাগলখানায় পাঠানো উচিত। কেউ বলত, এবার যদি কাউকে মারে, তবে থানায় রিপোর্ট করা হবে। কিন্তু কার এমন সাহস যে তার বিরুদ্ধে বয়ান দিয়ে শত্রুতা ডেকে আনবে?
গোটা গ্রাম তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল। কিন্তু তাতে রহিম খানের কোনো বিকার নেই। ভোরবেলা কাঁধে লাঙল নিয়ে সে নিজের ক্ষেতের দিকে যেত। পথে কারও সাথে কথা বলত না। ক্ষেতে গিয়ে বলদ দুটোর সাথে মানুষের মতো কথা বলত। সে একটার নাম নথু, অন্যটার নাম ছদ্দু। লাঙল চালানোর সময় বলতে থাকত, ‘কিরে নথু, সোজা চলবি না? এই ক্ষেত আজ তোর বাপ পুরো করবে। আর কিরে ছদ্দু, তোরও বুঝি দিন ফুরিয়েছে?’ আর তারপরই শুরু হতো সেই বেচারাদের ওপর অত্যাচার। সুতোর রশির পিটুনিতে দুটো বলদের কোমরই জখম হয়ে গিয়েছিল।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সে বউ-বাচ্চাদের ওপর রাগ ঝাড়ত। ডাল বা তরকারিতে লবণ বেশি হলে বউকে মারতে মারতে হাড়গোড় ভেঙে দিত। কোনো ছেলে দুষ্টুমি করলে তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে সেই বলদ পেটানোর রশি দিয়ে মেরে অজ্ঞান করে ফেলত। এক কথায়, প্রতিদিন ঘরে একটা কেয়ামত লেগে থাকত। আশেপাশের ঝুপড়ির লোকেরা রাতে রহিম খানের গালিগালাজ, তার স্ত্রী-সন্তানের আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত। কিন্তু বেচারারা কী আর করবে! কেউ নিষেধ করতে গেলে সে তাকেও পিটিয়ে অবস্থা খারাপ করে দিত।
মার খেতে খেতে তার বউ প্রায় আধমরা হয়ে গিয়েছিল। চল্লিশ বছর বয়সেই তাকে ষাট বছরের বুড়ির মতো লাগত। বাচ্চারা ছোট থাকতে মার খেত। কিন্তু বড় ছেলে যখন বারো বছরের হলো, একদিন মার খেয়ে ঘর থেকে পালিয়ে আর ফিরল না। পাশের গ্রামেই এক সম্পর্কের চাচা থাকত। সেই চাচা তাকে নিজের কাছে রেখে দিল। একদিন বউ ভয়ে ভয়ে বলেছিল, ‘বিলাসপুরের দিকে যাও, নূরুকে নিয়ে এসো।‘ ব্যস, অমনি রহিম খান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল—‘আমি ওই বদমাশটাকে আনতে যাব? ও যদি নিজেও ফিরে আসে, তবে ওর পা দুটো ভেঙে গলায় ঝোলাব!’
কেন ওই ছেলে মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসতে যাবে? দুই বছর পর ছোট ছেলে বিন্দুও পালিয়ে বড় ভাইয়ের কাছে চলে গেল। রহিম খানের রাগ ঝাড়ার জন্য শুধু বউই অবশিষ্ট ছিল। বেচারি মার খেতে খেতে এখন এসবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একদিন সে এমনই মার খেল যে আর সইতে পারল না। রহিম খান যখন ক্ষেতে, সুযোগ বুঝে সে তার ভাইকে ডেকে তার সাথে বাপের বাড়ি চলে গেল। প্রতিবেশী মহিলাকে বলে গেল—সে এলে যেন বলে দেয়, সে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি রামপুর যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় রহিম খান বলদ নিয়ে ফিরলে প্রতিবেশী মহিলা ভয়ে ভয়ে জানাল যে তার বউ কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। রহিম খান স্বভাববিরুদ্ধ শান্তভাবে কথাটা শুনল। তারপর বলদগুলোকে বাঁধতে চলে গেল। সে জানত, তার বউ আর কোনোদিন ফিরবে না।
উঠোনে বলদ বেঁধে ঝুপড়ির ভেতরে গিয়ে দেখল একটা বিড়াল মিউ মিউ করছে। আর কাউকে না পেয়ে সে বিড়ালটার লেজ ধরে দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। উনুনের কাছে গিয়ে দেখল আগুন নিভে আছে। রান্না করার কেউ নেই। না খেয়েই সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে রহিম খান যখন ঘুম থেকে উঠল, বেলা অনেক হয়েছে। কিন্তু আজ আর ক্ষেতে যাওয়ার তাড়া নেই। ছাগলের দুধ দুইয়ে খেয়ে হুক্কা নিয়ে সে খাটিয়ার ওপর বসল। ঝুপড়িতে রোদ এসে পড়েছে। এক কোণায় দেখল মাকড়সার জাল। ভাবল, সাফাই করি। একটা বাঁশে কাপড় জড়িয়ে জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে খড়ের চালের নিচে একটা চড়ুই পাখির বাসা দেখতে পেল। দুটো পাখি উড়ছে। প্রথমে সে ভাবল, বাঁশ দিয়ে বাসাটা ভেঙে ফেলব। কিন্তু কী ভেবে যেন থামল। একটা টুল এনে সেটার ওপর দাঁড়িয়ে বাসার দিকে ঝুঁকে দেখল—ভেতরে দুটো লালচে রঙের বাচ্চা চুঁচুঁ করে ডাকছে। আর তাদের মা-বাবা সন্তানদের রক্ষার জন্য তার মাথার ওপর চক্কর কাটছে। সে বাসার দিকে হাত বাড়াতেই মা পাখিটি তার ঠোঁট দিয়ে আক্রমণ করল।
‘আরে, চোখ কানা করে দিবি দেখছি’, সে তার ভয়ঙ্কর অট্টহাসি দিয়ে বলল। তারপর টুল থেকে নেমে এল। চড়ুইয়ের বাসাটা অক্ষত রইল।
পরদিন থেকে সে আবার ক্ষেতে যাওয়া শুরু করল। গ্রামবাসী আজও কেউ তার সাথে কথা বলে না। সারাদিন লাঙল চষত, জল দিত বা ফসল কাটত। কিন্তু সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার ঠিক আগে আগে সে বাড়ি চলে আসত। হুক্কা হাতে খাটিয়ায় শুয়ে চড়ুইয়ের বাসার দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন বাচ্চা দুটোও উড়তে শিখেছে।
সে নিজের দুই ছেলের নামেই চড়ুই বাচ্চা দুটোর নাম রাখল—নূরু আর বিন্দু। এখন পৃথিবীতে তার বন্ধু বলতে এই চার চড়ুই। গ্রামবাসী অবাক হচ্ছিল। অনেকদিন থেকে কেউ আর তাকে বলদ পেটাতে দেখেনি। নথু আর ছদ্দু এখন শান্ত। তাদের পিঠের জখমও প্রায় শুকিয়ে এসেছে।
রহিম খান একদিন ক্ষেত থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল। পথে কয়েকজন বাচ্চা তাকে দেখে জুতো ফেলেই দৌড়ে পালালো। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আরে, আমি কাউকে মারছি নাকি?’ আকাশে মেঘ জমেছে। দ্রুত বলদ তাড়িয়ে সে বাড়ি পৌঁছাল। বলদ বাঁধতে না বাঁধতেই মেঘের গর্জনে বৃষ্টি শুরু হলো।
ভেতরে গিয়ে কপাট বন্ধ করে প্রদীপ জ্বালাল। প্রতিদিনের মতো বাসি রুটির টুকরো ভেঙে চড়ুইয়ের বাসার কাছে একটা তাকে রেখে দিল। ডাকল—‘আরে ও বিন্দু! আরে ও নূরু!’ কিন্তু কেউ বেরোল না। বাসায় ঝুঁকে দেখল, চারজনই পালকের নিচে মুখ গুঁজে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে। ঠিক যেখানে ছাদের নিচে বাসাটা, সেখানে একটা ছিদ্র ছিল, সেখান থেকে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ছে।
যদি কিছুক্ষণ জল এভাবে পড়ে, তবে বাসাটা ভেঙে পড়বে আর চড়ুইয়ের বেঘর হয়ে যাবে। এই ভেবে সে কপাট খুলে ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যেই মই লাগিয়ে ছাদে উঠল। মাটি দিয়ে ছিদ্রটা বন্ধ করে যখন নিচে নামল, ততক্ষণে সে পুরো ভিজে জবুথবু। খাটিয়ায় শুতেই কয়েকবার হাঁচি হলো। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করল না। ভেজা কাপড় নিংড়ে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। পরদিন সকালে যখন উঠল, তখন পুরো শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা আর তীব্র জ্বর। কে তার সেবা করবে, কে ওষুধ দেবে? দুদিন সেই অবস্থাতেই সে পড়ে রইল।
রহিম খানকে দুদিন ক্ষেতে না দেখে গ্রামবাসীরা চিন্তায় পড়ল। কালু জোলা আর কয়েকজন কৃষক সন্ধ্যায় তার ঝুপড়িতে দেখতে এল। উঁকি দিয়ে দেখল, সে বিছানায় পড়ে আপনমনে বকছে—‘আরে বিন্দু! আরে নূরু! কোথায় মরলি? আজ তোদের খাবার কে দেবে?’ চড়ুইগুলো ঘরের ভেতর ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
কালু জোলা মাথা নেড়ে বলল, ‘বেচারা পাগল হয়ে গেছে। সকালে হাসপাতালের লোকেদের খবর দিতে হবে। ওরা বোধহয় পাগলখানায় দিয়ে আসবে।‘
পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা হাসপাতালের লোকজন নিয়ে এল। ঝুপড়ির দরজা খুলে দেখল রহিম খান মারা গেছে। তার পায়ের কাছে চারটে চড়ুই মাথা নিচু করে শান্ত হয়ে বসে ছিল।
(উর্দু আবাবিল থেকে অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন)

তার নাম ছিল রহিম খান। রহিম মানে দয়ালু। কিন্তু তার মতো জালিম আশে-পাশের পাঁচ গ্রামের মধ্যে আর কেউ ছিল না। পুরো গ্রাম তার ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। মানুষ বা পশু—কারও ওপরই তার একটুও দয়া-মায়া ছিল না। একদিন রামু কামারের ছেলে তার বলদের লেজে কাঁটা বেঁধে দিয়েছিল। সে ছেলেটিকে মারতে মারতে প্রায় আধমরা করে ফেলেছিল। পরদিন জেলদারের ঘোড়াটা তার ক্ষেতে ঢুকে পড়ায় লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সেটিকে রক্তাক্ত করে দিয়েছিল।
লোকে বলত— হতভাগাটার কি খোদার ভয়ও নেই? মাসুম বাচ্চা থেকে অবলা পশু কাউকেই সে ছাড় দেয় না। নিশ্চিত ব্যাটা জাহান্নামে জ্বলবে। তবে এসব কথা মানুষ তার পেছনেই বলত। সামনে মুখ খোলার সাহস কারও ছিল না।
একদিন বিন্দুর কপালে খারাপি ছিল, সে বলেই ফেলল, ‘আরে ভাই রহিম খান, তুমি বাচ্চাদের মারো কেন?’ ব্যস, সেই বেচারার ওপর যে অত্যাচার করল রহিম তাতে সেই দিন থেকে লোকে তার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিল। কে জানে, কখন কোন কথায় সে ক্ষেপে যায়! কারও বা ধারণা ছিল, তার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে। ওকে পাগলখানায় পাঠানো উচিত। কেউ বলত, এবার যদি কাউকে মারে, তবে থানায় রিপোর্ট করা হবে। কিন্তু কার এমন সাহস যে তার বিরুদ্ধে বয়ান দিয়ে শত্রুতা ডেকে আনবে?
গোটা গ্রাম তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিল। কিন্তু তাতে রহিম খানের কোনো বিকার নেই। ভোরবেলা কাঁধে লাঙল নিয়ে সে নিজের ক্ষেতের দিকে যেত। পথে কারও সাথে কথা বলত না। ক্ষেতে গিয়ে বলদ দুটোর সাথে মানুষের মতো কথা বলত। সে একটার নাম নথু, অন্যটার নাম ছদ্দু। লাঙল চালানোর সময় বলতে থাকত, ‘কিরে নথু, সোজা চলবি না? এই ক্ষেত আজ তোর বাপ পুরো করবে। আর কিরে ছদ্দু, তোরও বুঝি দিন ফুরিয়েছে?’ আর তারপরই শুরু হতো সেই বেচারাদের ওপর অত্যাচার। সুতোর রশির পিটুনিতে দুটো বলদের কোমরই জখম হয়ে গিয়েছিল।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সে বউ-বাচ্চাদের ওপর রাগ ঝাড়ত। ডাল বা তরকারিতে লবণ বেশি হলে বউকে মারতে মারতে হাড়গোড় ভেঙে দিত। কোনো ছেলে দুষ্টুমি করলে তাকে উল্টো করে ঝুলিয়ে সেই বলদ পেটানোর রশি দিয়ে মেরে অজ্ঞান করে ফেলত। এক কথায়, প্রতিদিন ঘরে একটা কেয়ামত লেগে থাকত। আশেপাশের ঝুপড়ির লোকেরা রাতে রহিম খানের গালিগালাজ, তার স্ত্রী-সন্তানের আর্তনাদ আর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেত। কিন্তু বেচারারা কী আর করবে! কেউ নিষেধ করতে গেলে সে তাকেও পিটিয়ে অবস্থা খারাপ করে দিত।
মার খেতে খেতে তার বউ প্রায় আধমরা হয়ে গিয়েছিল। চল্লিশ বছর বয়সেই তাকে ষাট বছরের বুড়ির মতো লাগত। বাচ্চারা ছোট থাকতে মার খেত। কিন্তু বড় ছেলে যখন বারো বছরের হলো, একদিন মার খেয়ে ঘর থেকে পালিয়ে আর ফিরল না। পাশের গ্রামেই এক সম্পর্কের চাচা থাকত। সেই চাচা তাকে নিজের কাছে রেখে দিল। একদিন বউ ভয়ে ভয়ে বলেছিল, ‘বিলাসপুরের দিকে যাও, নূরুকে নিয়ে এসো।‘ ব্যস, অমনি রহিম খান তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল—‘আমি ওই বদমাশটাকে আনতে যাব? ও যদি নিজেও ফিরে আসে, তবে ওর পা দুটো ভেঙে গলায় ঝোলাব!’
কেন ওই ছেলে মৃত্যুপুরীতে ফিরে আসতে যাবে? দুই বছর পর ছোট ছেলে বিন্দুও পালিয়ে বড় ভাইয়ের কাছে চলে গেল। রহিম খানের রাগ ঝাড়ার জন্য শুধু বউই অবশিষ্ট ছিল। বেচারি মার খেতে খেতে এখন এসবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু একদিন সে এমনই মার খেল যে আর সইতে পারল না। রহিম খান যখন ক্ষেতে, সুযোগ বুঝে সে তার ভাইকে ডেকে তার সাথে বাপের বাড়ি চলে গেল। প্রতিবেশী মহিলাকে বলে গেল—সে এলে যেন বলে দেয়, সে কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি রামপুর যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় রহিম খান বলদ নিয়ে ফিরলে প্রতিবেশী মহিলা ভয়ে ভয়ে জানাল যে তার বউ কয়েকদিনের জন্য বাপের বাড়ি গেছে। রহিম খান স্বভাববিরুদ্ধ শান্তভাবে কথাটা শুনল। তারপর বলদগুলোকে বাঁধতে চলে গেল। সে জানত, তার বউ আর কোনোদিন ফিরবে না।
উঠোনে বলদ বেঁধে ঝুপড়ির ভেতরে গিয়ে দেখল একটা বিড়াল মিউ মিউ করছে। আর কাউকে না পেয়ে সে বিড়ালটার লেজ ধরে দরজা দিয়ে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। উনুনের কাছে গিয়ে দেখল আগুন নিভে আছে। রান্না করার কেউ নেই। না খেয়েই সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে রহিম খান যখন ঘুম থেকে উঠল, বেলা অনেক হয়েছে। কিন্তু আজ আর ক্ষেতে যাওয়ার তাড়া নেই। ছাগলের দুধ দুইয়ে খেয়ে হুক্কা নিয়ে সে খাটিয়ার ওপর বসল। ঝুপড়িতে রোদ এসে পড়েছে। এক কোণায় দেখল মাকড়সার জাল। ভাবল, সাফাই করি। একটা বাঁশে কাপড় জড়িয়ে জাল পরিষ্কার করতে গিয়ে খড়ের চালের নিচে একটা চড়ুই পাখির বাসা দেখতে পেল। দুটো পাখি উড়ছে। প্রথমে সে ভাবল, বাঁশ দিয়ে বাসাটা ভেঙে ফেলব। কিন্তু কী ভেবে যেন থামল। একটা টুল এনে সেটার ওপর দাঁড়িয়ে বাসার দিকে ঝুঁকে দেখল—ভেতরে দুটো লালচে রঙের বাচ্চা চুঁচুঁ করে ডাকছে। আর তাদের মা-বাবা সন্তানদের রক্ষার জন্য তার মাথার ওপর চক্কর কাটছে। সে বাসার দিকে হাত বাড়াতেই মা পাখিটি তার ঠোঁট দিয়ে আক্রমণ করল।
‘আরে, চোখ কানা করে দিবি দেখছি’, সে তার ভয়ঙ্কর অট্টহাসি দিয়ে বলল। তারপর টুল থেকে নেমে এল। চড়ুইয়ের বাসাটা অক্ষত রইল।
পরদিন থেকে সে আবার ক্ষেতে যাওয়া শুরু করল। গ্রামবাসী আজও কেউ তার সাথে কথা বলে না। সারাদিন লাঙল চষত, জল দিত বা ফসল কাটত। কিন্তু সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার ঠিক আগে আগে সে বাড়ি চলে আসত। হুক্কা হাতে খাটিয়ায় শুয়ে চড়ুইয়ের বাসার দিকে তাকিয়ে থাকত। এখন বাচ্চা দুটোও উড়তে শিখেছে।
সে নিজের দুই ছেলের নামেই চড়ুই বাচ্চা দুটোর নাম রাখল—নূরু আর বিন্দু। এখন পৃথিবীতে তার বন্ধু বলতে এই চার চড়ুই। গ্রামবাসী অবাক হচ্ছিল। অনেকদিন থেকে কেউ আর তাকে বলদ পেটাতে দেখেনি। নথু আর ছদ্দু এখন শান্ত। তাদের পিঠের জখমও প্রায় শুকিয়ে এসেছে।
রহিম খান একদিন ক্ষেত থেকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছিল। পথে কয়েকজন বাচ্চা তাকে দেখে জুতো ফেলেই দৌড়ে পালালো। সে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আরে, আমি কাউকে মারছি নাকি?’ আকাশে মেঘ জমেছে। দ্রুত বলদ তাড়িয়ে সে বাড়ি পৌঁছাল। বলদ বাঁধতে না বাঁধতেই মেঘের গর্জনে বৃষ্টি শুরু হলো।
ভেতরে গিয়ে কপাট বন্ধ করে প্রদীপ জ্বালাল। প্রতিদিনের মতো বাসি রুটির টুকরো ভেঙে চড়ুইয়ের বাসার কাছে একটা তাকে রেখে দিল। ডাকল—‘আরে ও বিন্দু! আরে ও নূরু!’ কিন্তু কেউ বেরোল না। বাসায় ঝুঁকে দেখল, চারজনই পালকের নিচে মুখ গুঁজে ভয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছে। ঠিক যেখানে ছাদের নিচে বাসাটা, সেখানে একটা ছিদ্র ছিল, সেখান থেকে বৃষ্টির জল চুঁইয়ে পড়ছে।
যদি কিছুক্ষণ জল এভাবে পড়ে, তবে বাসাটা ভেঙে পড়বে আর চড়ুইয়ের বেঘর হয়ে যাবে। এই ভেবে সে কপাট খুলে ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যেই মই লাগিয়ে ছাদে উঠল। মাটি দিয়ে ছিদ্রটা বন্ধ করে যখন নিচে নামল, ততক্ষণে সে পুরো ভিজে জবুথবু। খাটিয়ায় শুতেই কয়েকবার হাঁচি হলো। কিন্তু সেদিকে খেয়াল করল না। ভেজা কাপড় নিংড়ে একটা চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল। পরদিন সকালে যখন উঠল, তখন পুরো শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা আর তীব্র জ্বর। কে তার সেবা করবে, কে ওষুধ দেবে? দুদিন সেই অবস্থাতেই সে পড়ে রইল।
রহিম খানকে দুদিন ক্ষেতে না দেখে গ্রামবাসীরা চিন্তায় পড়ল। কালু জোলা আর কয়েকজন কৃষক সন্ধ্যায় তার ঝুপড়িতে দেখতে এল। উঁকি দিয়ে দেখল, সে বিছানায় পড়ে আপনমনে বকছে—‘আরে বিন্দু! আরে নূরু! কোথায় মরলি? আজ তোদের খাবার কে দেবে?’ চড়ুইগুলো ঘরের ভেতর ডানা ঝাপটাচ্ছিল।
কালু জোলা মাথা নেড়ে বলল, ‘বেচারা পাগল হয়ে গেছে। সকালে হাসপাতালের লোকেদের খবর দিতে হবে। ওরা বোধহয় পাগলখানায় দিয়ে আসবে।‘
পরদিন সকালে প্রতিবেশীরা হাসপাতালের লোকজন নিয়ে এল। ঝুপড়ির দরজা খুলে দেখল রহিম খান মারা গেছে। তার পায়ের কাছে চারটে চড়ুই মাথা নিচু করে শান্ত হয়ে বসে ছিল।
(উর্দু আবাবিল থেকে অনুবাদ করেছেন জাভেদ হুসেন)
.png)

উপমহাদেশে মাংস কেনার সংস্কৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশ্বাস জড়িয়ে আছে। চোখের সামনে পশু জবাই হবে, কাটা হবে, এরপর তা ঘরে নেওয়া হবে। অনেকের কাছে এটিই ছিল ‘ফ্রেশ’ বা ‘টাটকা’ মাংসের সংজ্ঞা।
৪ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘দেলুপি’ এবার জায়গা করে নিয়েছে ইতালির কারাওয়ান ফেস্ট ২০২৬-এর মূল প্রতিযোগিতা বিভাগে। উৎসবের ১৪তম আসরে উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসেবেও নির্বাচিত হয়েছে ছবিটি। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক পোস্টারে স্থান পেয়েছে সিনেমার একটি দৃশ্য।
১৯ ঘণ্টা আগে
বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই লেখককে কেন বাধ্য হয়ে বারবার লিখতে হয়েছিল শার্লকের গল্প? আর কোন আক্রোশ থেকে বিরক্ত হয়ে তিনি মেরে ফেলেছিলেন শার্লককে? অথচ ভক্তদের তীব্র রোষানলে পড়ে কেনই বা আবার ফির
১ দিন আগে
চকলেট খেতে পছন্দ করে না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম। ভালোবাসা প্রকাশ কিংবা অভিমান ভাঙাতে চকলেটের চেয়ে ভালো কোনো উপহার হতেই পারে না! বিশেষ করে, নারীদের কাছে চকলেট দারুণ জনপ্রিয়। মনে হয়, এটি যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। যেন যুগ যুগ ধরে এমনটাই চলে আসছে। কিন্তু ইতিহাস বলছে ভিন্ন কথা।
০৭ জুলাই ২০২৬