কক্সবাজারে বন্যা-পাহাড়ধসে ঝরল ২২ প্রাণ, পানিবন্দি ৩ লাখ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০: ০৫
বন্যায় প্রায় ৩ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সংগৃহীত ছবি

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, মাতামুহুরী, পেকুয়া ও রামু উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টার পরিমাপে বাঁকখালী নদীর পানি ৫ দশমিক ৮৮ মিটার এবং মাতামুহুরী নদীর পানি ৬ দশমিক ৫৪ মিটারে পৌঁছেছে। চকরিয়ার কোনাখালী ইউনিয়নের বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ধসের ঘটনায় গত চার দিনে জেলায় অন্তত ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১৫ জন, কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়ায় দুইজন এবং পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে রয়েছেন।

বুধবার রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মোহছেনিয়াকাটা (ডবলতলী) এলাকায় পাহাড়ধসে দুই শিশু নিহত হয়। সম্পর্কে তারা আপন চাচাতো-জেঠাতো ভাইবোন। নিহতরা হলো—বরইতলী দাখিল মাদরাসার দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ও মোহাম্মদ কাজলের মেয়ে রুমি আক্তার (১৫) এবং স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ও আবদুল মজিদের ছেলে মোহাম্মদ তৌসিফ (১০)। এ ঘটনায় আরও একজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ছালেকুজ্জামান বলেন, ‘একদিকে ভয়াবহ বন্যা, অন্যদিকে পাহাড়ধস—দুই সংকটে মানুষ আতঙ্কিত। গত দুই দিন ধরে গ্রামের পর গ্রাম পানিতে তলিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু মর্মান্তিক।’

বন্যায় চকরিয়া উপজেলার বরইতলী, বমুবিলছড়ি, কাকারা, লক্ষ্যারচর, চিরিঙ্গা ও হারবাং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া, কোনাখালী, বিএমচর ও সাহারবিল ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পেকুয়া উপজেলার উজানটিয়া, মগনামা, বারবাকিয়া, মেহেরনামা এবং রামু উপজেলার ঈদগড়, গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল, রাজারকুল ও জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাদেক মাহমুদ সিমরান বলেন, ‘কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া ইউনিয়নের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি। বাড়িঘর ও সড়ক পানির নিচে থাকায় মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারছে না। বাজারঘাট বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হচ্ছে।’

চকরিয়ার বাসিন্দা করিম উল্লাহ বলেন, ‘পাঁচ দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে না। বৃষ্টি থামলেই মনে হয় পানি নামবে, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়।’

সাহারবিল এলাকার কৃষক মনির আহমেদ জানান, আমনের বীজতলা ও সবজিক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।

চকরিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মঈনউদ্দিন বলেন, ‘উজানের ঢলের পানিতে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়েছে। পৌরসভার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত। অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না, শুকনো খাবার খেয়ে দিন পার করছে।’

মাতামুহুরী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোয়ائبুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী ও মরণঘোনা এলাকার বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।’

দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি বিভিন্ন বিভাগ তৎপর রয়েছে। চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি অনেক বেড়েছে। তাই পাহাড়সংলগ্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে।’

পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অতিবৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে।’

চকরিয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার ইউএনও শাহীদ দেলোয়ার বলেন, ‘টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে মাইকিং হচ্ছে। পাশাপাশি পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোর স্লুইস গেট খোলা হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরি কন্ট্রোল রুমও চালু হয়েছে।’

কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, গত পাঁচ দিনে জেলায় মোট ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে এবং ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, জেলার ৬৪৮ আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কন্ট্রোল রুম চালু রয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

উত্তাল সাগরের কারণে টানা সাত দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার-মহেশখালী এবং পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত