শার্লক হোমসকে মেরে ফেলেছিলেন ডয়েল, আবার কেন ফেরাতে হলো

বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল। গতকাল ছিল তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী। ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বপ্ন দেখা এই লেখককে কেন বাধ্য হয়ে বারবার লিখতে হয়েছিল শার্লকের গল্প? আর কোন আক্রোশ থেকে বিরক্ত হয়ে তিনি মেরে ফেলেছিলেন শার্লককে? অথচ ভক্তদের তীব্র রোষানলে পড়ে কেনই বা আবার ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল?

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৮: ৪৬
শার্লক হোমসকে মেরে ফেলেছিলেন ডয়েল, আবার কেন ফেরাতে হলো? স্ট্রিম গ্রাফিক

আর্থার কোনান ডয়েল নামটি অনেকের কাছেই অপরিচিত লাগতে পারে। তবে বিশ্ববিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসের নাম শোনেনি, এমন লোকের সংখ্যা খুব কম। এই চরিত্রের স্রষ্টা তিনিই।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শার্লক হোমস চরিত্রটি জটিল সব রহস্যের সমাধান করে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। তবে তা কোনো কাকতালীয় ঘটনা বা অতিপ্রাকৃত গুণাবলীর মাধ্যমে নয়। বরং তুখোড় পর্যবেক্ষণ আর নিখুঁত যৌক্তিক চিন্তাধারার মাধ্যমে শার্লক হোমস ভক্তদের কাছে হয়ে ওঠে বাস্তব চরিত্র। এই গোয়েন্দা চরিত্র নিয়ে ডয়েল মোট চারটি উপন্যাস এবং ৫৮টি ছোট গল্প লিখেছিলেন। ১৮৮৭ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয় এই লেখাগুলো।

১৮৮৭ সালে ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যে প্রথমবারের মতো আত্মপ্রকাশ ঘটে শার্লক হোমসের। প্রথম উপন্যাস ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ থেকে অবশ্য শুরুতে খুব বেশি আয় করতে পারেননি কোনান ডয়েল। সেটি বিক্রি করে ২৫ পাউন্ড ঢুকেছিল পকেটে, ছিল না কোনো রয়্যালটির বন্দোবস্তও। কপালে অল্পবিস্তর প্রশংসাবাণী জোটায় ডয়েল সাহস করে শার্লককে নিয়ে আরও একটি উপন্যাস লিখে ফেলেন। সেটিও পাঠকসমাজের একাংশ সাদরে গ্রহণ করলে লেখকও সাহস পেয়ে শার্লককে নিয়ে একের পর এক ছোটগল্প লিখতে শুরু করেন ‘দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন’-এ। তবে ডয়েল ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি, এই শার্লকই একদিন এত জনপ্রিয়তা অর্জন করবে যে, সেজন্য ভুগতে হবে নিজেকেই।

শার্লককে মারার যত চেষ্টা

আসলে কোনান ডয়েল নিজেকে একজন ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক হিসেবে ভাবতেই বেশি পছন্দ করতেন। সারাজীবন গোয়েন্দা ঘরানার লেখক পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার ইচ্ছা কখনোই ছিল না তাঁর।

তবে শার্লক হোমস চরিত্রটি যে অধ্যাপক জোসেফ বেলের আদলে তৈরি, সে কথা ডয়েল কখনো গোপন করেননি। ড. বেলের সঙ্গে পরিচয়ের ঠিক ১০ বছর পর, ১৮৮৭ সালে ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ উপন্যাসের মাধ্যমে প্রথম পাঠকদের সামনে আসেন শার্লক হোমস।

কিন্তু একপর্যায়ে আবিষ্কার করলেন, নিজের মূল লক্ষ্য থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছেন। অন্য কিছু লিখলেও পাঠক সেগুলোতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কেবলই শার্লক! প্রকাশকেরাও বারবার শার্লক নিয়ে গল্প লিখতেই তাগাদা দিতেন। আর পেটের দায়ে ডয়েলকেও বাধ্য হয়ে একই কাজ করতে হতো বারবার।

একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের গণ্ডির মধ্যে বন্দি থাকা তাঁর জন্য এক প্রকার মানসিক অত্যাচারের মতো হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, আর শার্লক নিয়ে লিখবেন না। তবে সরাসরি না বলে তিনি প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রতি গল্পের জন্য ৫০ পাউন্ড দাবি করে বসলেন! তিনি ভেবেছিলেন, এত টাকা চাওয়ায় প্রকাশকরা রাজি হবে না এবং তিনি এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবেন। কিন্তু ‘দ্য স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন’ উল্টো তাঁর এই দাবি মেনে তো নিলই, উপরন্তু আরও ছয়টি নতুন গল্পের চুক্তি করে বসল!

এই ছয়টি গল্পের চুক্তি শেষ হওয়ার পর ডয়েল ভাবলেন অনেক হয়েছে, আর না। কিন্তু এবারও প্রকাশকেরা পিছু ছাড়ল না। এবারও সরাসরি ‘না’ না করে পরের বারোটি গল্পের জন্য এক হাজার পাউন্ড চেয়ে বসলেন। এবারও এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল দ্য স্ট্র্যান্ড। লিখতে শুরু করলেন নতুন বারোটি গল্প।

এই বারোটি গল্পের চুক্তি শেষ হওয়ার পর তিনি শার্লক হোমসের চরিত্রটিকেই চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চাইলেন, যাতে কেউ আর তাঁকে শার্লকের গল্প লেখার জন্য চাপ দিতে না পারে। মাকে লেখা এক গোপন চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি ঠিক করে ফেলেছি, খুন করব ওকে। চিরতরে শেষ করে দেব ওর চিহ্ন।’

চিঠি পড়ে মা তাঁকে কড়া ভাষায় নিষেধ করলেও ডয়েল নিজের সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ফাইনাল প্রবলেম’ নামের সেই বারোটি গল্পের শেষ গল্পে তিনি শার্লকের মৃত্যুদৃশ্য লিখলেন। গল্পের শুরুতে তিনি লিখেছিলেন, ‘খুবই দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে শেষবারের মতো কলম ধরেছি। আমার অসাধারণ বন্ধু শার্লক হোমসের কথা লিখে রেখে যেতে চাই।’ গল্পের শেষে সত্যি সত্যিই শার্লক হোমসের মৃত্যু হলো। ডয়েল হাফ ছেড়ে বাঁচলেন, ভাবলেন—এবার বুঝি শান্তি!

একটি নির্দিষ্ট চরিত্রের গণ্ডির মধ্যে বন্দি থাকা তাঁর জন্য এক প্রকার মানসিক অত্যাচারের মতো হয়ে দাঁড়ায়। তাই তিনি অনেক ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিলেন, আর শার্লক নিয়ে লিখবেন না। তবে সরাসরি না বলে তিনি প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রতি গল্পের জন্য ৫০ পাউন্ড দাবি করে বসলেন!

কিন্তু পাঠকরা এই মৃত্যুকে কোনোভাবেই মেনে নিল না। শার্লকের জনপ্রিয়তার কাছে আবারও হার মানতে বাধ্য হলেন কোনান ডয়েল। আট বছর পর ১৯০১ সালে শার্লককে নিয়ে নতুন গল্প লিখলেন কোনান ডয়েল। ‘দ্য হাউন্ড অভ দ্য বাস্কারভিলস’ নামের সেই উপন্যাসে বর্ণিত হলো শার্লকের মৃত্যু-পূর্ববর্তী সময়কালের রোমাঞ্চকর কাহিনী। এরপর ১৯০৩ সালে ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অভ দি এম্পটি হাউজ’ গল্পের মাধ্যমে তিনি শার্লককে আবার জীবিতই ফিরিয়ে আনলেন! অর্থাৎ, শার্লককে চিরতরে শেষ করার বা অবসর দেওয়ার তাঁর সমস্ত প্রচেষ্টাই শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিল।

যাদের ছায়ায় গড়ে ওঠে শার্লক হোমস

১৮৭৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব এডিনবরা মেডিকেল স্কুলে পড়ার সময় আর্থার কোনান ডয়েলের পরিচয় হয় জোসেফ বেল নামের এক শিক্ষকের সঙ্গে। ড. বেলের চোখের দৃষ্টিতে সবসময় এক অদ্ভুত বুদ্ধিমত্তার দীপ্তি থাকত। ডয়েলের মেডিকেল জীবনের দ্বিতীয় বর্ষের শেষ দিকে ড. বেল তাঁকে নিজের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে বেছে নেন। আর ঠিক তখনই জোসেফ বেলের অসাধারণ পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান ডয়েল। ড. বেল ল্যাব বা হাসপাতালে আসা রোগীদের কথার সামান্য উচ্চারণ বা টোন শুনেই বলে দিতে পারতেন তারা কোন এলাকার মানুষ। এমনকি রোগীর হাতের চামড়া দেখেই তিনি নির্ভুল বলে দিতে পারতেন লোকটি কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি নাকি গির্জার ঘণ্টা বাজানোর লোক।

কোনান ডয়েল তাঁর কালজয়ী গোয়েন্দা চরিত্র ‘শার্লক হোমস’-এর মধ্যে এই গুণগুলোই ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে শার্লক হোমস চরিত্রটি যে তাঁর এই অধ্যাপক জোসেফ বেলের আদলে তৈরি, সে কথা ডয়েল কখনো গোপন করেননি। ড. বেলের সঙ্গে পরিচয়ের ঠিক ১০ বছর পর, ১৮৮৭ সালে ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ উপন্যাসের মাধ্যমে প্রথম পাঠকদের সামনে আসেন শার্লক হোমস। এই গোয়েন্দা চরিত্রটির প্রতি স্বয়ং ড. বেলেরও দারুণ আগ্রহ ছিল। এমনকি সাবেক ছাত্র ডয়েলকে বিভিন্ন রহস্যের সমাধান নিয়ে তিনি মাঝে মাঝে পরামর্শও দিতেন। তবে সেই পরামর্শগুলো বাস্তবের সাথে মেলে না মনে করে ডয়েল বিনীতভাবে তা ফিরিয়ে দিতেন।

অবশ্য শার্লক হোমস চরিত্রটি তৈরিতে স্কটল্যান্ডের আরেক বিখ্যাত ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ লিটল জনেরও বড় ভূমিকা ছিল। কোনান ডয়েল যখন মেডিকেল স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন, তখন জোসেফ বেল এবং লিটল জন—দুজনই সেখানে বেশ পরিচিত মুখ ছিলেন। পুলিশ কোনো জটিল মামলার তদন্তে ফেঁসে গেলে লিটল জনের সাহায্য নিত। বিশেষ করে কোথাও কোনো রহস্যজনক মৃত্যু হলে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য তাঁকে ডাকা হতো। অনেক জটিল কেসে ড. বেল ও লিটল জন একসঙ্গেও কাজ করেছেন। কোনান ডয়েল অবশ্য হোমস চরিত্রটির পেছনে লিটল জনের অবদানের কথা প্রথম প্রকাশ করেন ১৯২৯ সালে, অর্থাৎ এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের মৃত্যুর কয়েক বছর পর।

তবে জোসেফ বেল নিজে কখনো চাননি মানুষ তাঁকে শার্লক হোমসের সাথে মেলাক। কারণ, বুদ্ধিমত্তা বা প্রজ্ঞার বিষয়টি ছাড়া বাস্তব জীবনে বেলের সাথে হোমসের চরিত্রের তেমন কোনো মিল ছিল না। তাঁদের চেহারায়ও ছিল আকাশ-পাতাল তফাত। তাছাড়া হোমসের মতো ড. বেলের কোকেনের নেশা ছিল না, তিনি ভায়োলিনও বাজাতেন না। তাই এই অমর চরিত্র সৃষ্টির সমস্ত কৃতিত্ব তিনি তাঁর ছাত্র কোনান ডয়েলকেই দিয়েছেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত