জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

এনসিটি পরিচালনায় দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তিতে বাধা নেই: আপিল বিভাগ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১২ মার্চ ২০২৬, ১৫: ১৭
চট্টগ্রাম বন্দরের একটি চিত্র। ছবি: সংগৃহীত ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে দীর্ঘ আইনি বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ঘটেছে সুপ্রিম কোর্টে। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তির চলমান প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে জারি করা রুল খারিজ করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এর ফলে এনসিটি পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ‘ডিপি ওয়ার্ল্ডের’ (দুবাই সরকার) সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের আর কোনো আইনি বাধা থাকল না বলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ রিটকারীদের লিভ টু আপিল খারিজ করে এই আদেশ দেন। আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন জ্যেষ্ঠ অ্যাডভোকেট জমির উদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও অ্যাডভোকেট মাহবুব উদ্দিন খোকন। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।

আদেশের পর আইনি ও কাঠামোগত দিকটি ব্যাখ্যা করেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দুবাই সরকারের যে ব্যবস্থাপনা চুক্তিটি হতে যাচ্ছিল, তার স্বচ্ছতা চ্যালেঞ্জ করে এই রিট দায়ের করা হয়েছিল। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে করা লিভ টু আপিলটি খারিজ করে দিয়েছেন।

চুক্তির আইনি ভিত্তি সম্পর্কে রাষ্ট্রের এই আইন কর্মকর্তা বলেন, “বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে দুবাই গভর্নমেন্টের একটি জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) চুক্তি হয়। এর সঙ্গে প্রাইভেট পার্টনারশিপ অ্যাক্ট যুক্ত রয়েছে, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কাজ করার একটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো প্রদান করে। পাশাপাশি, চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটির নিজস্ব আইনের বিধানেও সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে তারা যেকোনো কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশিদের ব্যবস্থাপনায় (ম্যানেজমেন্টে) পরিচালনা করার জন্য দিতে পারবে।”

প্রকল্পের আর্থিক মূল্যায়নের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ সরকার এখানে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করেছিল। কিন্তু যথাযথ মূল্যায়নের (ইভ্যালুয়েশন) পর দেখা যায় এটি ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকার প্রকল্প। এরপর দুবাই সরকার ওই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে টার্মিনালটির আধুনিকায়ন, সংস্কার এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে সম্মত হয়।

হাইকোর্টে দ্বিধাবিভক্ত রায় ও তৃতীয় বেঞ্চের পর্যালোচনা
এই চুক্তির প্রক্রিয়া চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেছিল ‘বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। হাইকোর্টে এই মামলার বিচারিক ইতিহাস ছিল বেশ ঘটনাবহুল। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, হাইকোর্টে বিচারপতি ফাতেমা নজীব এবং বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে শুনানি শেষে একটি ‘স্প্লিট জাজমেন্ট’ বা দ্বিধাবিভক্ত রায় আসে। ওই রায়ে বিচারপতি ফাতেমা নজীব রুলের সারবত্তা খুঁজে পেয়ে রুলটি ‘অ্যাবসলিউট’ (যথাযথ) ঘোষণা করেন। তাঁর অভিমত ছিল, চুক্তিতে স্বচ্ছতা ছিল না এবং যথাযথ আইন অনুসরণ করা হয়নি।

বিপরীতে, বেঞ্চের অপর বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রুল খারিজ করে মত দেন যে সকল আইন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে চুক্তিটি সঠিকভাবেই করা হয়েছে। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, যাঁরা রিট পিটিশন দায়ের করেছেন তাঁদের ‘লোকাস স্ট্যান্ডাই’ (মামলা করার এখতিয়ার বা অধিকার) নেই।

নিয়ম অনুযায়ী, দ্বিধাবিভক্ত রায়ের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য তৃতীয় বিচারক হিসেবে বিচারপতি জাফর আহমেদের একক বেঞ্চে পাঠান। সেখানে প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৯ জানুয়ারি দেওয়া রায়ে বিচারপতি জাফর আহমেদ চুক্তির চলমান প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করেন। ওই রায়ের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে অনীক আর হক বলেন, “বিচারপতি জাফর আহমেদ বলেন যে এই চুক্তির ব্যাপারে যা যা আইনগত প্রক্রিয়ার উপাদান (ইনগ্রেডিয়েন্ট) ছিল, সরকার তার প্রত্যেকটি অনুসরণ করেছে। ফলে এই চুক্তি করতে কোনো বাধা নেই এবং কোনো অস্বচ্ছতা তিনি খুঁজে পাননি। আপিল বিভাগও সবকিছু শুনে নিশ্চিত হয়েছেন যে এখানে কোনো আইনের ব্যত্যয় ঘটেনি এবং রিটকারীদের এই মামলাটি করার এখতিয়ার নেই।”

মামলার পূর্বাপর ও রুল জারির প্রেক্ষাপট
এর আগে, গত ৩০ জুলাই বিচারপতি হাবিবুল গনি ও বিচারপতি শেখ তাহসিন আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এনসিটি পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন। একই সঙ্গে, যেকোনো অপারেটরকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি অনুসারে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান (পাবলিক বিডিং) নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, রুলে তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইনের করা ওই রিটে নৌসচিব, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়। গত ২৬ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে ‘নিউমুরিং টার্মিনালে সবই আছে, তবু কেন বিদেশির হাতে যাচ্ছে’ শীর্ষক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর যুক্ত করে এই জনস্বার্থমূলক রিটটি দায়ের করা হয়েছিল। আপিল বিভাগের আদেশের মধ্য দিয়ে সেই আইনি প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত