আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটি সামনে রেখে নতুন সরকারের নারী-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি, প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং ক্ষমতার কাঠামোয় নারীদের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের ইশতেহার ও অঙ্গীকারে নারীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ যাতায়াতের কথা বলেছিল। সরকার গঠনের পর এর কিছু বিষয়ে উদ্যোগ দেখা গেলেও মন্ত্রিসভা, সংসদ ও দলীয় কাঠামোয় নারীর উপস্থিতি এখনো সীমিত।
নতুন সরকারের নারী-সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতির মধ্যে কিছু দৃশ্যমান উদ্যোগ আছে, বিশেষ করে সামাজিক সুরক্ষার অংশে। কিন্তু প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে চিত্রটি দুর্বল—মন্ত্রিসভায় নারী কম, সংসদে নারী কম, আর দলগুলোর শীর্ষ পর্যায়ে নারী আরও কম। ফলে নারী দিবসে মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে: নারীদের জন্য ঘোষিত কর্মসূচি কি শেষ পর্যন্ত তাদের বাস্তব ক্ষমতায়নেও রূপ নেবে, নাকি তা কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
ইশতেহারে কী ছিল
নারী ভোটারদের সামনে বিএনপির সবচেয়ে আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’। এ কর্মসূচির আওতায় নারী কার্ডধারীদের মাসে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা অথবা চাল, ডাল, তেল, লবণের মতো নিত্যপণ্য দেওয়ার কথা বলা হয়। প্রাথমিকভাবে ৫০ লাখ নারীকে এর আওতায় আনার লক্ষ্যও জানানো হয়।
এর বাইরে নারীদের জন্য শহর ও গুরুত্বপূর্ণ রুটে আলাদা বাসসেবা, প্রায় এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী রাখা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাতৃ ও নবজাতকসেবা জোরদার করা এবং স্বল্পশিক্ষিত গ্রামীণ নারী ও গৃহিণীদের জন্য দক্ষতা প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ ও যন্ত্রপাতি সহায়তার কথাও বলা হয়েছিল।
বিএনপির ৭ ফেব্রুয়ারির পূর্ণাঙ্গ ইশতেহারেও ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে নয়টি অগ্রাধিকার প্রতিশ্রুতির একটি হিসেবে রাখা হয়। সেখানে পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থানমুখী শিক্ষা ও সেবাখাত শক্তিশালী করার কথাও উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ, নারীদের নিয়ে দলটির নির্বাচনী বার্তা শুধু কল্যাণমূলক সহায়তায় সীমাবদ্ধ ছিল না; কর্মসংস্থান ও সেবাপ্রাপ্তির বিষয়টিও সেখানে ছিল।
নতুন সরকার কী করেছে
সরকার গঠনের পর দৃশ্যমানভাবে সবচেয়ে এগিয়েছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। এ কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে নারী কর্মসংস্থান, নিরাপদ গণপরিবহন, স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসূচি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ইশতেহারের বড় অংশই এখনো ঘোষণার স্তরেই আছে, আর মাঠপর্যায়ে কার্যকর অগ্রগতি সীমিত।
ক্ষমতার কাঠামোয় নারীরা কোথায়
নতুন মন্ত্রিসভায় মোট সদস্য ৪৯ জন—এর মধ্যে নারী মাত্র ৩ জন। এই প্রতিনিধিত্ব সাম্প্রতিক কয়েকটি মন্ত্রিসভার তুলনায়ও কম। অর্থাৎ, নারীদের জন্য আলাদা প্রতিশ্রুতি থাকলেও সরকারের শীর্ষ সিদ্ধান্তগ্রহণ কাঠামোয় তাদের উপস্থিতি খুবই সীমিত।
সংসদে নারীদের উপস্থিতির চিত্রও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি সাধারণ আসনে নির্বাচিত হয়েছেন ৭ জন নারী; তাঁদের মধ্যে ৬ জন বিএনপি-মনোনীত এবং ১ জন স্বতন্ত্র।
অন্যদিকে নির্বাচনী তথ্য বলছে, মোট ভোটারের মধ্যে নারী ছিলেন ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। অর্থাৎ ভোটার হিসেবে নারীদের উপস্থিতি বিশাল হলেও প্রার্থী ও নির্বাচিত প্রতিনিধির হিসাবে সেই উপস্থিতি খুবই কম।
দলীয় কাঠামোয়ও একই বৈষম্য চোখে পড়ে। বিএনপির শীর্ষ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির একমাত্র নারী সদস্য সেলিমা রহমান। অর্থাৎ, শীর্ষ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি সেখানে সীমিত।
অন্য দলগুলোর অবস্থানও খুব আলাদা নয়। জামায়াতে ইসলামীর নীতিগত কাঠামোয় নারীরা শীর্ষ নেতৃত্বে যেতে পারেন না। এনসিপির শীর্ষ ১০ নেতার মধ্যে নারী একজন। অর্থাৎ বড় দলগুলোর ভেতরে নারীদের উপস্থিতি থাকলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ এখনো অনেকটাই সংকীর্ণ।
এ ব্যাপারে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার নাসরীন সুলতানা মিলি স্ট্রিমকে বলেন, মন্ত্রিপরিষদ দেখলেই বুঝা যায় যে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের অবস্থান কেমন। এটা আনফরচুনেট যে, এত কম সংখ্যক নির্বাচিত সংসদ সদস্য আগে কখনও দেখিনি। নারীদের নিয়ে অনেক চর্বিত চর্বন শুনি, কিন্তু অ্যাকশন দেখি না। দলীয় পর্যায়েও নারীদের তেমন অংশগ্রহণ নেই।
নাসরীন সুলতানা বলেন, নারীরা এগিয়ে যেতে চায়, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারলে অনিরাপদভাবে কেন রাজনীতি করতে যাবে। সরকারের পদক্ষেপ ওই অর্থে এখনও তেমনটা দেখিনি। তবে শঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটনা দেখেছি। যেমনটা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখেছি, কর্মক্ষেত্রে নারী নিরাপদ নয়। ফ্যামিলি কার্ডের মতো অনেক সুবিধার কথা বর্তমান সরকার বলছে। কিন্তু আমি মনে করি নিরাপত্তায় জোর দেওয়া দরকার। নারীদের নির্যাতনের ঘটনার বিচার নিশ্চিতেও সরকার দ্রুত ভূমিকা নেবে বলে আশা করি।
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা স্ট্রিমকে বলেন, তারেক রহমানের ফ্যামিলি কার্ডের প্রতিশ্রুতিটা আলোড়ন তৈরি করেছিল। ফ্যামিলি কার্ডটা নারীদের হাতে দেওয়া হবে। কারণ নারীর নিরাপত্তা এবং নারীকে স্বাবলম্বী করার জন্য। ইতিমধ্যে সেটার কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছে। এইটা নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী যে এটা বাস্তবায়ন করা হবে। এবং ৩১ দফায় যে বলা হয়েছিল যে নারীরা তাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নারীদের শিক্ষা দিকে যত্নশীল হওয়া এবং নারীর অধিকারের ব্যাপারে, আমি খুবই আশাবাদী।
তিনি আরও বলেন, নারীকে সম্মান দেখাতে গিয়েই তো তিনি স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন। এটা কিন্তু আমাদের দেশে একটা নজিরবিহী উদাহরণ যে তিনি এভাবে নারীদেরকে নিয়ে, মানে নিজের স্ত্রী, নিজের মেয়েকে যে মূল্যায়নটা দিচ্ছেন তার মানে হলো উনিও শিখাচ্ছেন যে হ্যাঁ নারীদেরকে উনি ইচ্ছা করলে উনার ওয়াইফকে উনার মেয়েকে ঘরে রেখে আসতে পারতেন। তিনি কিন্তু সেটা করছেন না, তিনি কিন্তু সাথে নিয়ে আসছেন। তার মানে তিনি নারীর প্রতি যথেষ্ট সচেতন। সেই সচেতনতা রেখেই তিনি আসলে এই কাজগুলো করছেন, এই কর্মসূচিগুলি করছেন।