ককরোচদের হাত ধরে কি ভারতে গণঅভ্যুত্থান হতে পারে

কাজী নিশাত তাবাসসুম
কাজী নিশাত তাবাসসুম

প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ১৮: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক

দিল্লির যন্তর মন্তরে হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে স্লোগান। তবে এই প্রতিবাদ কোনো পরিচিত রাজনৈতিক দলের নয়। নেতৃত্ব দিচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন, যার জন্ম সোশ্যাল মিডিয়ায়।

এনইইটি-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষাখাতে অনিয়মের অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে গতকাল শনিবার (৬ জুন) এই আন্দোলন হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনটি ক্রমশ এত বড় হচ্ছে যে, এর মাধ্যমে ভারতে গণঅভ্যুত্থান ঘটে যেতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও তুলছেন অনেকে। বিষয়টি বুঝতে হলে এর শক্তি ও সীমাবদ্ধতা দুটিই বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আসলে কী

এটি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়। মূলত এটি একটি প্রতীকী প্রতিবাদ। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যে ব্যবহৃত ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকা শব্দটি থেকেই এর উৎপত্তি। তেলাপোকা যেমন যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারে, তেমনই এই নামটি দিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবে এমন এক রাজনৈতিক শক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যাকে কোনো সমালোচনা বা সংকট সহজে টলাতে পারে না। অভিজিৎ দীপকে নামের এক তরুণের হাত ধরে শুরু হওয়া এই আন্দোলনটি এখন ভারতের তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের পক্ষে যা বলা হচ্ছে

একসময় রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা ছিল লিফলেট, দেয়াল লিখন বা সমাবেশ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে মিম, রিলস এবং ডিজিটাল কনটেন্ট। একটি দীর্ঘ বক্তৃতা বা জটিল প্রবন্ধ যে বার্তা দিতে পারে না, একটি তীক্ষ্ণ মিম কয়েক সেকেন্ডে লাখো মানুষের কাছে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে পারে। ককরোচ পার্টির তরুণেরা এই ভাষাকেই ব্যবহার করছে।

যেকোনো বড় পরিবর্তনের আগে জনমত তৈরি হওয়া আবশ্যক। মিম ও অনলাইন প্রচারণা ক্ষমতাসীনদের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, দুর্নীতির বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় তুলে ধরতে এবং একটি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক আলোচনায় যুক্ত করতে অত্যন্ত কার্যকর।

২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় ফেসবুক ও টুইটারের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আন্দোলনকারীদের সংগঠিত করতে এবং খবর ছড়িয়ে দিতে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশেও গণঅভ্যুত্থানের পেছনে সোশ্যাল মিডিয়ার বড় ভূমিকা দেখা গেছে। অনলাইন থেকে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভই মানুষকে রাস্তায় নামিয়ে এনেছিল।

গণঅভ্যুত্থানের বিপক্ষে যা বলা হচ্ছে

অনেকেই ফেসবুকে একটি মিম শেয়ার করে বা ক্ষোভ প্রকাশ করেই নিজের রাজনৈতিক দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেন। এই ডিজিটাল সক্রিয়তা অনেক সময় বাস্তব আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় না। একে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘স্ল্যাকটিভিজম’ বলেন। অর্থাৎ, মানুষ অনলাইনে প্রতিবাদ করে মানসিক তৃপ্তি পেলেও মাঠের সংগঠিত কর্মসূচিতে অংশ নেয় না।

আবার একটি সফল গণঅভ্যুত্থানের জন্য কেবল ক্ষোভই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সুস্পষ্ট নেতৃত্ব, কৌশল এবং দেশব্যাপী একটি মজবুত সাংগঠনিক কাঠামো। ‘ককরোচ পার্টি’ মূলত একটি বিকেন্দ্রীভূত অনলাইন আন্দোলন। এর কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা দেশজুড়ে কাজ করার মতো সংগঠন নেই, যা একটি আন্দোলনকে টেকসই করতে অপরিহার্য।

এছাড়া ভারতের ভৌগোলিক বিশালতা, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং শক্তিশালী রাষ্ট্রযন্ত্রের কারণে এখানে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করা অত্যন্ত কঠিন। আরব বসন্ত বা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর তুলনায় ভারতের পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল। একটি ভাইরাল মিম হয়তো সাময়িক আলোড়ন তুলতে পারে, কিন্তু তা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

অভ্যুত্থান নাকি প্রতীকী বিদ্রোহ

‘ককরোচ পার্টি’ আন্দোলনকে ‘গণঅভ্যুত্থান’-এর পূর্বাভাস বলাটা হয়তো বাড়াবাড়ি হবে। এটি সরাসরি ক্ষমতার পতন ঘটাবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে এটি নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী ‘প্রতীকী বিদ্রোহ’।

এই আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার বিরুদ্ধে একটি নতুন ভাষা তৈরি করছে। এটি তরুণ প্রজন্মকে শেখাচ্ছে কীভাবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে ব্যঙ্গের মাধ্যমে শক্তিশালী বার্তা দিতে হয়।

এই অনলাইন ক্ষোভ যদি ভবিষ্যতে কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি বা নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, তবেই এর বাস্তব প্রভাব দেখা সম্ভব। অন্যথায়, এটি কেবল ডিজিটাল দুনিয়ায় ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপায় হয়েই থাকবে, যা মাঝেমধ্যে আলোড়ন তুলবে, কিন্তু ক্ষমতার দেয়ালে বড় কোনো আঁচড় কাটতে পারবে না।

তথ্যসূত্র: ইন্ডিয়া টুডে, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও কাউন্সিল অন দ্য ফরেন রিলেশনস

সম্পর্কিত