আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণমাধ্যম অনেক ক্ষেত্রেই তার শক্তিশালী অবস্থান বজায় রাখতে পারেনি। একের পর এক প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে এবং আমরা যারা সংবাদকর্মী, তারা সেগুলো প্রত্যক্ষ করেছি। আমরা সংবাদও করেছি—কীভাবে আগের রাতে ভোট হয়ে যাওয়ার মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যম তার যে ‘ওয়াচডগ’ বা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা থাকার কথা ছিল, তা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এর পেছনে কিছু বাস্তবিক কারণও ছিল।
যখন একটি শক্তিশালী সরকার বারবার ক্ষমতার বলয় তৈরি করে জেঁকে বসে, তখন গণমাধ্যমের পক্ষে একলা শক্ত অবস্থান নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, সেই সরকারের পতন কীভাবে হবে বা আদৌ হবে কি না, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ধারণা কারও ছিল না। যেহেতু প্রতিটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে দলীয় সরকারের অধীনে হচ্ছিল, তাই একটি বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হয়েছিল যে ক্ষমতাসীনরাই আবার ফিরে আসবে। বাস্তবে সেটিই ঘটেছে বারবার।
গণমাধ্যম চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা ছিল পাহাড়সম। গণমাধ্যমের নিজস্ব ব্যবসায়িক স্বার্থ, মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ সবসময়ই ছিল। সব ক্ষেত্রে সেই চাপ মোকাবিলা করা সম্ভব হয় না। আমি তখন যে সংবাদপত্রে কাজ করতাম, সেখানে আমরা সাধ্যমতো সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই, সব সত্য সবসময় প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এই যে না পারা বা না বলা সত্যগুলো জমে জমে জনমনে এক ধরনের ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমের ওপর মানুষের প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। মানুষ ভেবেছিল, এবার অন্তত গণমাধ্যম তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করবে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এবারের নির্বাচনের প্রাক্কালে গণমাধ্যমের যে ভূমিকা আমরা দেখছি, তা বিগত সময়ের চেয়েও অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। অতীতে বিভিন্ন সংকটেও গণমাধ্যমকে যতটুকু নিরপেক্ষ দেখেছি, এখন যেন তারা তার চেয়েও বেশি একপেশে অবস্থানে চলে গেছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন মতবিনিময় সভা বা সংবাদ সম্মেলনে গণমাধ্যমকর্মীদের যে আচরণ ও অভিব্যক্তির প্রকাশ আমরা দেখছি, তাতে সংবাদ পরিবেশনের নিরপেক্ষতা একটি বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। সংবাদকর্মীরা যখন নিজেই পক্ষভুক্ত হয়ে পড়েন, তখন সাংবাদিকতা তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।
আরও উদ্বেগের বিষয়, সম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি একটি নির্দিষ্ট দলের প্রধানের মিডিয়া উইংয়ে বা তাদের নির্বাচনী প্রচারণার কাজে সরাসরি অনেক সাংবাদিক যুক্ত হচ্ছেন, যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। একজন সাংবাদিক যখন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারণার অংশ হয়ে যান, তখন তিনি কীভাবে সেই দলের ভুল বা নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করবেন? এ অবস্থায় এবারের নির্বাচন গণমাধ্যম কীভাবে কভার করবে, ভোটের প্রকৃত চিত্র কী হবে এবং শেষ পর্যন্ত কী লেখা হবে—তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে।
অবাক হয়ে দেখছি, গণমাধ্যমের অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে বলে বেড়াচ্ছেন যে একটি নির্দিষ্ট দলই (বিএনপি) ক্ষমতায় আসছে এবং এ ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। টেলিভিশনের টকশো থেকে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তাদের এমন বক্তব্য শোনা যাচ্ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে যে কেউ তার ধারণা প্রকাশ করতে পারেন, কিন্তু যখন একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বলেন, ‘আপনারাই ক্ষমতায় আসছেন, আপনারাই আমাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’ বা ‘আপনার কোনো বিকল্প নেই’—তখন সেখানে আর সাংবাদিকতা থাকে না। এ ধরনের চাটুকারিতা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে সমূলে বিনাশ করে দেয়।
মনে রাখতে হবে, আধুনিক যুগের মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা গণমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং যথেষ্ট সমালোচনামুখী। তিক্ত হলেও সত্য, মানুষ এখন মূলধারার গণমাধ্যমকে খুব কমই বিশ্বাস করছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা পত্রিকা বা টেলিভিশনের চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও টেলিভিশনের সংবাদের সঙ্গে ভিডিও ফুটেজ থাকে বলে তার গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা টিকে আছে তবুও আস্থার জায়গাটি নড়বড়ে।
সাংবাদিক যখন সুযোগ-সুবিধার লোভে বা রাজনৈতিক অভিলাষ মেটাতে ব্যস্ত থাকেন, তখন পত্রিকা বা টেলিভিশন ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়। মানুষ তখন বাধ্য হয়ে বিকল্প মাধ্যমের দিকে ঝোঁকে। আজ সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবে যে অপতথ্যের ছড়াছড়ি, তার জন্য অনেকাংশেই মূলধারার গণমাধ্যমের ব্যর্থতা দায়ী।
এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের প্রকৃত ভূমিকা আসলে কী হওয়া উচিত? অনেকে পশ্চিমা বিশ্বের উদাহরণ টানেন। আমেরিকার নির্বাচনের কথা যদি ধরি, সেখানে ফক্স নিউজ ছাড়া প্রায় সব বড় গণমাধ্যমই ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তবে তাদের সেই অবস্থানের সঙ্গে আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা চলে না। আমেরিকার গণমাধ্যমগুলো কোনো রাখঢাক না রেখেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে, কিন্তু তারা তথ্য বিকৃত করে না। তারা তথ্য দেয় এবং সেই তথ্যের ওপর সম্পাদকীয় মতামত দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে সংবাদেই মতামত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সংবাদ আর প্রচারণার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকছে না। যদি কোনো পত্রিকার প্রথম পাতা খোলেন বা টেলিভিশনের নিউজ বুলেটিন দেখেন, তবে সহজেই বুঝবেন কোনো একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সংবাদ সাজানো হচ্ছে। কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে একই ঘটনার ওপর পরপর ছয়টি স্টোরি চালানো হচ্ছে শুধু একটি নির্দিষ্ট পক্ষকে তুষ্ট করতে বা অন্য পক্ষকে ঘায়েল করতে।
এ ধরনের অপসাংবাদিকতার পরিণাম হলো গণমাধ্যমেরই ক্ষতি। সাংবাদিকতা নিয়ে মানুষ যখন প্রশ্ন তুলবে, তখন এই পেশার প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ ও এর প্রভাব দুই-ই হ্রাস পাবে। মানুষ ভাববে, গণমাধ্যম কেবল সুবিধাবাদী একটি গোষ্ঠী, যারা পরিস্থিতি বুঝে চলে। এটি দীর্ঘমেয়াদে সাংবাদিকতার জন্য একটি অশনিসংকেত। এর ফলে ভবিষ্যতে যদি কোনো সংবাদমাধ্যম বড় কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা জাতির সামনে কোনো বড় সত্যও নিয়ে আসে, মানুষ তা বিশ্বাস করতে চাইবে না।
আমাদের গণমাধ্যমের এ অপূরণীয় ক্ষতিটা এরই মধ্যে হয়ে গেছে। গত ৫ আগস্টের পর গণমাধ্যমের ওপর যে একের পর এক হামলা ও হেনস্তা ঘটছে, এর একটি বড় কারণ হলো তাদের বিগত দিনের ভূমিকা। সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর মতো প্রতিষ্ঠান হামলার শিকার হয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকেই অনেক গণমাধ্যম আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা সাংবাদিকরা আজও ঐক্যবদ্ধ হতে পারিনি। আওয়ামী লীগ আমলেও যখন গণমাধ্যম আক্রান্ত হয়েছে, তখনও আমরা বিভক্ত ছিলাম বলে সম্মিলিত কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের এ বিভক্তিই রাজনৈতিক অপশক্তিকে সুযোগ করে দিচ্ছে।
এ অরাজক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন নির্বাচনটিও যদি আমরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে না পারি এবং গণমাধ্যম সেখানে সঠিক ভূমিকা রাখতে না পারে, তবে আমাদের অবস্থা আরও শোচনীয় হবে। এবারের নির্বাচনকে এমনিতেই পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক বলা যাচ্ছে না। একটি বড় রাজনৈতিক দল মাঠের বাইরে রয়েছে, যার পেছনে হয়তো যৌক্তিক কারণ আছে। কিন্তু এখন যারা মাঠে আছে, তাদের মধ্যেও যদি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা না হয় এবং গণমাধ্যম সেখানে সত্য গোপন করে, তবে ক্ষমতার পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। তখন ক্ষমতাচ্যুত শক্তি বলার সুযোগ পাবে যে, ‘তোমরাও তো আমাদের মতোই, একটি নির্বাচন করতে পারলে না।’ সাধারণ মানুষের মনেও এ প্রশ্ন জাগবে যে, তবে পরিবর্তনের প্রয়োজন কী ছিল?
এবারের নির্বাচন আমাদের সবার জন্য, বিশেষ করে সাংবাদিকদের জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষা। সাংবাদিকতার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার এটি এক বড় সুযোগ। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গিয়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার জন্য ধর্ণা দেই, তদবির করি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, স্বাধীনতা কেউ কাউকে দেয় না; স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়। যারা সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতে চায়, তাদের মোকাবিলা করতে হবে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা দিয়েই। চাটুকারিতা করে কখনও স্বাধীন সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
যদি আমরা সঠিকভাবে সাংবাদিকতা করতে ব্যর্থ হই, তবে সমাজ ও রাষ্ট্র যে অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে, সেখান থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। সাংবাদিক যখন সুযোগ-সুবিধার লোভে বা রাজনৈতিক অভিলাষ মেটাতে ব্যস্ত থাকেন, তখন পত্রিকা বা টেলিভিশন ম্যাড়ম্যাড়ে হয়ে যায়। মানুষ তখন বাধ্য হয়ে বিকল্প মাধ্যমের দিকে ঝোঁকে। আজ সোশ্যাল মিডিয়া ও ইউটিউবে যে অপতথ্যের ছড়াছড়ি, তার জন্য অনেকাংশেই মূলধারার গণমাধ্যমের ব্যর্থতা দায়ী। বিগত ১৫ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে অনেক খবর মালিকের চাপে, বিজ্ঞাপনের চাপে বা সরকারের ভয়ে চেপে যাওয়া হয়েছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে সোশ্যাল মিডিয়া। এ কারণে মানুষ এখন অপতথ্য আর সঠিক তথ্যের পার্থক্য করতে পারছে না।
নির্বাচন কমিশনের জন্য যেমন এটি চ্যালেঞ্জ, তেমনি আমাদের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হলো এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব মোকাবিলা করা। কিন্তু সব চ্যালেঞ্জের ঊর্ধ্বে হলো সাংবাদিকতার নীতি ও আদর্শের চ্যালেঞ্জ। গণমাধ্যম কতটা নির্ভুল তথ্য, অনুসন্ধানী ও নিরপেক্ষ খবর দিতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করছে এ পেশার টিকে থাকা। আমরা যদি আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারি, তবেই সাংবাদিকতা সার্থক হবে। অন্যথায় ইতিহাসের পাতায় আমরা সুযোগ সন্ধানী হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকব।
লেখক: সাংবাদিক, যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘জিআইজেএন’- এর বাংলা বিভাগের সম্পাদক