জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কাছে নাগরিক সমাজ আসলে কী চায়

এআই জেনারেটেড ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে এক নতুন বাংলাদেশ, যার মূল স্পন্দন হলো রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসন। বিগত দেড় দশকের রাজনৈতিক অচলায়তন, একদলীয় আধিপত্য এবং ভোটাধিকার হরণের যে গ্লানি জাতিকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে, তার অবসানে এই সংসদ এক বিশাল আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, এই সংসদ কেবল একটি সাধারণ আইনসভা হিসেবে কাজ করবে না, বরং এটি হবে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। একটি সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদ গঠনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের যে পুনর্জাগরণ শুরু হতে যাচ্ছে, তা যেন একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের পথ প্রশস্ত করে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন ছিল না, এটি ছিল বিদ্যমান জরাজীর্ণ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লড়াই। জুলাই-আগস্টের সেই দিনগুলোতে রাজপথে ঝরা রক্ত আর আত্মত্যাগ আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট ম্যান্ডেট হাজির করেছে—একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’।

এই নতুন বাংলাদেশে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে, তার প্রতিফলন ঘটাতে হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রতিটি কার্যক্রমে। জুলাই সনদ মূলত ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনার লিখিত অঙ্গীকারনামা।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের কাছে এই সনদের বাস্তবায়ন জাতির জন্য এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রত্যাশা। মূলত গণভোটের মাধ্যমে ‘হ্যাঁ/না’ প্রদানের মধ্য দিয়ে জনগণ তাদের সার্বভৌমত্বের যে বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে, তা এই সনদের কার্যকারিতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

পুরানো রাজনৈতিক সংস্কৃতি-যেখানে সংসদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হতো, তা পরিবর্তনের সময় এসেছে। নতুন ম্যান্ডেট অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের কেবল নিজ দলের প্রতি অনুগত থাকলে চলবে না, বরং তাদের প্রথম ও প্রধান দায়বদ্ধতা হতে হবে সাধারণ জনগণের প্রতি। যারা রাজপথে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, তাদের সেই স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা দিতে হবে এই সংসদকে। এটি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন নয়, বরং সব মত ও পথের সমন্বয়ে এক অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির সূচনা।

বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা নির্বাহী বিভাগের, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে ছিল। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান দাবি হলো ক্ষমতার এই ভারসাম্যহীনতা দূর করা। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

ত্রয়োদশ সংসদে প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা হ্রাস করে সংসদকে প্রকৃত অর্থেই নির্বাহী বিভাগের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৫(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকার কথা। এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতাকে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।

এছাড়া নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো যেন কোনো দলের অনুগত বাহিনীতে পরিণত না হয়, তার জন্য শক্তিশালী আইন ও নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। সংসদীয় তদারকির মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করাই হবে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম বড় পদক্ষেপ।

বিগত সংবিধানের যে ধারাগুলো একনায়কতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়েছিল, সেগুলো পরিবর্তন করা জরুরি। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বিলুপ্ত করা যাতে সংসদ সদস্যরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি প্রণয়নে বিবেকের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে।

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে বড় ব্যর্থতা ছিল সংসদকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ বা কেবল সরকারি সিদ্ধান্ত অনুমোদনের যন্ত্রে পরিণত করা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে এই দুর্নাম থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয়তা।

কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকির জন্য অতি দ্রুত কমিটি গঠন করতে হবে। এই কমিটিগুলোতে কেবল সরকারি দলের সদস্যদের আধিপত্য থাকলে চলবে না, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে বিরোধী দলের সিনিয়র সদস্যদের পাবলিক একাউন্টস কমিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোতে সভাপতির পদ দিতে হবে। সংসদীয় শুনানির সংস্কৃতি প্রবর্তন করে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে নিয়োগের আগে প্রার্থীদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা জনসমক্ষে যাচাই করার পদ্ধতি চালু করা যেতে পারে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই পারে জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে। জুলাই সনদের অন্যতম স্পন্দন ছিল ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ (সাবেক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী সকল ‘কালাকানুন’ পুরোপুরি বাতিল করা।

কমিটিগুলোর সকল হিয়ারিং সংসদ টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা এবং সংসদীয় ওয়েবসাইটে সেই ভিডিও ফুটেজসহ সকল রিপোর্ট সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, যাতে গবেষনার কাজে গবেষকগন সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। যখন কোনো মন্ত্রী বা সচিব সরাসরি সংসদীয় কমিটির কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন, তখনই কেবল সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।

একটি জীবন্ত গণতন্ত্রের প্রাণ হলো শক্তিশালী বিরোধী দল। অতীতে আমরা দেখেছি বিরোধী দলকে ‘শত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা, যা শেষ পর্যন্ত সংসদ বর্জন এবং রাজপথের সংঘাতকে উসকে দিয়েছে। ত্রয়োদশ সংসদে বিরোধী দলকে ‘বিকল্প সরকার’ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাদের সংসদে কথা বলার পর্যাপ্ত সময় এবং গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্বের অনেক উন্নত গণতন্ত্রে ‘শ্যাডো ক্যাবিনেট’ বা ছায়া মন্ত্রিসভার যে ধারণা রয়েছে, বাংলাদেশে তার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এর ফলে বিরোধী দল কেবল সমালোচনার জন্য সমালোচনা না করে বিকল্প নীতিমালা প্রস্তাব করতে পারবে। সংসদ বর্জন বা ওয়াকআউটের নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে গঠনমূলক বিতর্কে অংশ নেওয়া এবং সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখা এখন নাগরিক সমাজের প্রধান দাবি। সংসদে মতপার্থক্য থাকবেই, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের ব্যাধি হলো রাজপথের সহিংসতা। সাধারণ মানুষ চায় রাস্তার পরিবর্তে সংসদই হোক সকল জাতীয় সমস্যার আলোচনার মূল কেন্দ্র। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো, যেমন পররাষ্ট্রনীতি, সামষ্টিক অর্থনীতি বা জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিষয়ে সর্বদলীয় ঐকমত্য তৈরির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সংসদকে ব্যবহার করতে হবে। যেকোনো রাজনৈতিক সংকট বা মতভেদের সমাধান যখন সংসদের ফ্লোরে বিতর্ক এবং ভোটের মাধ্যমে হবে, তখন রাজপথে অরাজকতার সুযোগ কমে যাবে।

ত্রয়োদশ সংসদ যদি সকল রাজনৈতিক দলের ও গোষ্ঠীর আস্থার স্থলে পরিণত হতে পারে, তবেই এটি একটি সত্যিকারের সার্বভৌম প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে।

রাজনীতির সকল বিবাদ মীমাংসার কেন্দ্র হিসেবে সংসদকে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত হবে। নাগরিক সমাজ এখন অনেক বেশি সচেতন। তারা চায় তাদের প্রতিনিধিরা সংসদে গিয়ে ব্যক্তিগত বা দলীয় আখের না গুছিয়ে জনগণের কথা বলুক। সংসদ সদস্যদের জন্য একটি কঠোর ‘আচরণবিধি’ নির্ধারণ করা এবং লবিং সংস্কৃতির পরিবর্তে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংসদীয় কার্যক্রমের লাইভ ব্রডকাস্টিংয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জনগণের সরাসরি মতামত বা ফিডব্যাক নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সংসদ সদস্যরা এলাকায় কী কাজ করছেন এবং সংসদে কী ভূমিকা রাখছেন, তা যেন সাধারণ ভোটাররা সহজেই মূল্যায়ন করতে পারেন—এমন প্রযুক্তিগত সংস্কার আনা প্রয়োজন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই পারে জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে। জুলাই সনদের অন্যতম স্পন্দন ছিল ভয়ের সংস্কৃতি থেকে মুক্তি। সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টসহ (সাবেক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) মতপ্রকাশের স্বাধীনতাবিরোধী সকল ‘কালাকানুন’ পুরোপুরি বাতিল করা। গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে নতুন আইনি সুরক্ষা বলয় তৈরি করাও এই সংসদের অন্যতম কাজ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি নতুন আইনসভা নয়, এটি একটি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা। ২০২৪-এর বিপ্লবোত্তর এই সংসদকে ইতিহাসের এক ‘স্মারক সংসদ’ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে হবে।

অতীতের ভুল, একক দলের আধিপত্য এবং সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি টেকসই ও স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করাই হবে এই সংসদের প্রধান সার্থকতা। জাতি আশা করে, এই সংসদ একটি নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করবে, যেখানে ক্ষমতা হবে সেবার মাধ্যম এবং সংসদ হবে সাধারণ মানুষের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, বৈষম্যহীন ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার শপথ নিয়েই পরিচালিত হোক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ।

লেখক: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পর্কিত