ড. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী

জুলাই আন্দোলনে আমি যখন রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আসলে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, যখন দেখেছি সারা দেশে আমার শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন শুরু হয়েছে, তাদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে—সেই অবস্থায় একজন শিক্ষকের পক্ষে নীরব থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই আমি আমার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছি। এরপর একটি গণঅভ্যুত্থান হলো এবং এর মধ্য দিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটল। এটিকে আমি সবচেয়ে বড় সফলতা বলে মনে করি।
তবে এই অর্জনের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা আকাঙ্ক্ষাগুলো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া তো কোনো গণঅভ্যুত্থান সফল হয় না। যারা এই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন বা সমর্থন জুগিয়েছিলেন, সেই আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সব ধরনের বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি। বস্তুত, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার সঙ্গে চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছে, নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ একটি বাংলাদেশ চেয়েছে। গত ফ্যাসিস্ট আমলে গুম-খুনের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখেছি, তা থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। তাই আমি বলব, এই অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সফলতা কেবল ওই রেজিমের পতন পর্যন্তই।
এরপর আমাদের যে প্রত্যাশাগুলো ছিল, গত দুই বছরে তা খুব একটা অর্জিত হয়নি। এর একটি বড় কারণ হলো, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছিল, আমার ব্যক্তিগত অভিমত—তারা সম্ভবত গণঅভ্যুত্থানের চেতনাটি বুঝতেই পারেনি। এত দিন পর এ কথা বলতেই হয় যে, তাদের হয়ত নিজস্ব কিছু এজেন্ডা ছিল। আমরা দেখেছি, তাদের ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা ছিল। ফলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে একধরনের অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এটি স্বীকার করতেই হবে।
আমি যখন গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম, তখন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চেয়েছিলাম; গুম, খুন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সেই নিরাপদ বাংলাদেশ পেলাম না। ড. ইউনূসের শাসনামলে এ দেশের অসংখ্য মানুষ মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তির সঙ্গে একাত্তরের চেতনার কোনো বিরোধ ছিল না। অথচ আমরা দেখলাম, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই শক্তির ভেতর থেকেই একটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মুক্তিযুদ্ধের মহান অর্জনগুলোকে ছোট করার চেষ্টা হলো। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলা হলো। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে কার্যত মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো।
এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা বিনষ্ট করা হয়। পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের মূল জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটে। এরপর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, যার বয়স মাত্র ছয় মাস। এই সরকারকে নিয়ে সমালোচনা করার সময় এখনো আসেনি বলেই আমি মনে করি। তবে আমরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেই বাস্তবতায়, মানুষের নিরাপত্তা বিধানে এই সরকারের দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ছে না। জনজীবনে এখনো স্বস্তি বা নিরাপত্তাবোধের অভাব আছে। আমি আশা করব, সরকার এ বিষয়ে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সফল হলেও, মানুষের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের বড় প্রত্যাশা আমাদের ছিল। পুরোনো দলগুলো সে পথে হাঁটেনি। অবশ্য পুরোনো দলগুলো রাতারাতি বদলে যাবে তেমনটা আশাবাদী আমি ছিলাম না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত ছাত্রদের যে নতুন রাজনৈতিক দল, তাদের বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাঝেও তো আমরা নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তারাও সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃত্তেই আটকে আছে। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রশ্নে আমি খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না।
তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শেষ হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি না। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ের যে পথ উন্মোচিত হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। আর সামনের দিনের লড়াইটি অবশ্যই হতে হবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। যারা এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি চালিয়ে নিতে পারবে, তারাই হয়তো আগামী দিনে মুক্তির লড়াইয়ে নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হবে। চব্বিশের নেতৃত্ব হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের মুক্তির এই লড়াই চলতেই থাকবে।

জুলাই আন্দোলনে আমি যখন রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম, তখন আসলে একজন শিক্ষক হিসেবে আমার সামনে আর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, যখন দেখেছি সারা দেশে আমার শিক্ষার্থীদের ওপর ভয়াবহ নিপীড়ন শুরু হয়েছে, তাদের গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে, ঢালাওভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে—সেই অবস্থায় একজন শিক্ষকের পক্ষে নীরব থাকার কোনো সুযোগ ছিল না। তাই আমি আমার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছি। এরপর একটি গণঅভ্যুত্থান হলো এবং এর মধ্য দিয়ে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটল। এটিকে আমি সবচেয়ে বড় সফলতা বলে মনে করি।
তবে এই অর্জনের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা আকাঙ্ক্ষাগুলো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। সর্বস্তরের শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া তো কোনো গণঅভ্যুত্থান সফল হয় না। যারা এই অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলেন বা সমর্থন জুগিয়েছিলেন, সেই আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সব ধরনের বৈষম্য ও নিপীড়ন থেকে মুক্তি। বস্তুত, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার সঙ্গে চব্বিশের আকাঙ্ক্ষার কোনো পার্থক্য নেই। মানুষ অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছে, নিপীড়নমুক্ত নিরাপদ একটি বাংলাদেশ চেয়েছে। গত ফ্যাসিস্ট আমলে গুম-খুনের যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখেছি, তা থেকে মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। তাই আমি বলব, এই অভ্যুত্থানের প্রাথমিক সফলতা কেবল ওই রেজিমের পতন পর্যন্তই।
এরপর আমাদের যে প্রত্যাশাগুলো ছিল, গত দুই বছরে তা খুব একটা অর্জিত হয়নি। এর একটি বড় কারণ হলো, গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসেছিল, আমার ব্যক্তিগত অভিমত—তারা সম্ভবত গণঅভ্যুত্থানের চেতনাটি বুঝতেই পারেনি। এত দিন পর এ কথা বলতেই হয় যে, তাদের হয়ত নিজস্ব কিছু এজেন্ডা ছিল। আমরা দেখেছি, তাদের ব্যক্তিগত ও আন্তর্জাতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা ছিল। ফলে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে একধরনের অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এটি স্বীকার করতেই হবে।
আমি যখন গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম, তখন একটি নিরাপদ বাংলাদেশ চেয়েছিলাম; গুম, খুন ও গণহত্যার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সেই নিরাপদ বাংলাদেশ পেলাম না। ড. ইউনূসের শাসনামলে এ দেশের অসংখ্য মানুষ মব সন্ত্রাস বা গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তির সঙ্গে একাত্তরের চেতনার কোনো বিরোধ ছিল না। অথচ আমরা দেখলাম, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই শক্তির ভেতর থেকেই একটি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। মুক্তিযুদ্ধের মহান অর্জনগুলোকে ছোট করার চেষ্টা হলো। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্যগুলো ভেঙে ফেলা হলো। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে কার্যত মুক্তিযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হলো।
এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা বিনষ্ট করা হয়। পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানের মূল জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটে। এরপর দেশে একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে, যার বয়স মাত্র ছয় মাস। এই সরকারকে নিয়ে সমালোচনা করার সময় এখনো আসেনি বলেই আমি মনে করি। তবে আমরা যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম, সেই বাস্তবতায়, মানুষের নিরাপত্তা বিধানে এই সরকারের দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ এখনো চোখে পড়ছে না। জনজীবনে এখনো স্বস্তি বা নিরাপত্তাবোধের অভাব আছে। আমি আশা করব, সরকার এ বিষয়ে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান সফল হলেও, মানুষের চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি গুণগত পরিবর্তনের বড় প্রত্যাশা আমাদের ছিল। পুরোনো দলগুলো সে পথে হাঁটেনি। অবশ্য পুরোনো দলগুলো রাতারাতি বদলে যাবে তেমনটা আশাবাদী আমি ছিলাম না। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত ছাত্রদের যে নতুন রাজনৈতিক দল, তাদের বর্তমান রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মাঝেও তো আমরা নতুন কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তারাও সেই পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃত্তেই আটকে আছে। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রশ্নে আমি খুব বেশি আশাবাদী হতে পারছি না।
তবে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শেষ হয়ে গেছে বলে আমি মনে করি না। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াইয়ের যে পথ উন্মোচিত হয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে। আর সামনের দিনের লড়াইটি অবশ্যই হতে হবে একটি বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। যারা এই বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইটি চালিয়ে নিতে পারবে, তারাই হয়তো আগামী দিনে মুক্তির লড়াইয়ে নতুন নেতৃত্ব হিসেবে আবির্ভূত হবে। চব্বিশের নেতৃত্ব হয়তো হারিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের মুক্তির এই লড়াই চলতেই থাকবে।
.png)

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হলো, তা ১০০ নম্বরের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের একটি মজবুত ভিত্তি যেহেতু তৈরি হয়েছে এবং জনগণ নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করতে শুরু করেছে, তাই এই পথ থেকে পিছিয়ে আসার আর কোনো সুযোগ নেই।
৩ ঘণ্টা আগে
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমোচনীয় অধ্যায়। রক্তের কালিতে লেখা এই অধ্যায় মুছে ফেলার বা অস্বীকার করার খুব একটা সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সাড়া জাগানো ৩৬ দিনের জুলাই মাসের এই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে একটু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
৪ ঘণ্টা আগে
একটি বড় দেশের বিনিয়োগ অন্য দেশগুলোকেও উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগে যুক্ত হয়, তবে চীন, তুরস্ক, কোরিয়া বা অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এখানে আসতে ভরসা পাবেন।
১৮ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। আসলে অভ্যুত্থান বা গণআন্দোলনের বর্ষপূর্তির তো কোনো নির্দিষ্ট দিন থাকে না। একটা সময়কাল থাকে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৯ ঘণ্টা আগে