রাহাত মিনহাজ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমোচনীয় অধ্যায়। রক্তের কালিতে লেখা এই অধ্যায় মুছে ফেলার বা অস্বীকার করার খুব একটা সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সাড়া জাগানো ৩৬ দিনের জুলাই মাসের এই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে একটু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তার আগে দু-একটি বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন বোধ হয়।
বাঙালির সহজাত বৈশিষ্ট্যে এই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে কামড়া-কামড়ি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। অভ্যুত্থানে কার কত অবদান তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন পক্ষের নিকৃষ্ট পর্যায়ের আত্মপ্রচার ও বাগাড়ম্বর; যা জুলাইয়ের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে।
আসুন একটা প্রশ্ন নিয়ে শুরু করা যাক। জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল? রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বহু তত্ত্ব হাজির করতে পারেন। আমি শুধু একটি বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। এ রকম একটা অভ্যুত্থান ছাড়া কর্তৃত্বপরায়ণ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটানোর কি কোনো উপায় ছিল? শেখ হাসিনা, শেখ পরিবার, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্রেসি ও ব্যাংক লুটেরারা যে অক্ষশক্তির বলয় তৈরি করেছিল তা ছেদ করতে এই রকম একটা অভ্যুত্থানের কোনো বিকল্প ছিল না। সময়ই নিজ গতিপথে এই অভ্যুত্থানের পথ রচনা করেছে। যে পথে শামিল হয়েছেন ডান-বাম, কট্টরপন্থী-উদারপন্থী-মধ্যপন্থী, শান্তিকামী-উগ্রবাদী এমনকি শেখ হাসিনাপন্থীও। আমার দৃঢ় ধারণা চব্বিশের এই পালাবদল আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থকও কামনা করেছেন। তাঁরাও উদ্ধত, দুর্নীতিগ্রস্ত, মানুষের অমর্যাদাকারী ওই সরকারের পতন চেয়েছিল।
আরেকটি প্রশ্ন? চব্বিশের অভ্যুত্থানের প্রধান ধাক্কাটা কে বা কারা দিয়েছেন? মাস্টারমাইন্ড না হলেও কাদের ভূমিকা ছিল ফলাফল নির্ধারণী? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই। সেটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। একটু খেয়াল করে দেখুন, ৩ আগস্ট সেনাসদরে অনুষ্ঠিত বৈঠকটিই ছিল প্রধান নিয়ামক। খুব সম্ভবত শেখ হাসিনাও সেটা জানতেন। একটু খেয়াল করে দেখুন, অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনার বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের কেউই দেশে ছিলেন না। তাঁরা কবে, কোন প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়লেন? অনেকের ধারণা সেনাসদরে ৩ আগস্টের ওই বৈঠকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন চূড়ান্ত হয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার খ্যাতিমান বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি এক নিবন্ধে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। একটু মনে করিয়ে দেই, ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বার্লিনের রবার্ট বোশ একাডেমির ফেলো। তিনি সারা বিশ্ব বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নীতি-নির্ধারণী নানা বিষয়ে লেখালেখি করেন। তিনি ১৭ আগস্ট ২০২৫ দ্য হিল নামের অনলাইনে ‘কোয়াইট মিলিটারি ক্যু ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক কলাম লেখেন। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শেষ অঙ্কে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারীর ভূমিকায় ছিল।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। হ্যাঁ, অবশ্যই সেই পরিস্থিতি তৈরিতে অনেকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আছে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও ত্যাগের ইতিহাস। এখানে বলাই বাহুল্য, বিদেশী অনেক পক্ষও শেখ হাসিনার বিপক্ষে ছিল।
চোখের সামনে শেখ হাসিনার পরাক্রমশালী সরকার ধসে পড়ল। একটা দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার সদলবলে পালাল। এরপর তো দেশটা ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। কিন্তু বাংলাদেশ কেন ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে? কেন মব সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, উগ্রবাদের আস্ফালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মূল্যস্ফীতি, নয়া মাফিয়াদের উত্থান থামানো গেল না? কেন রাজনৈতিক হানাহানি, ক্ষমতার জন্য কামড়াকামড়ি বন্ধ হলো না? দেশ গড়ার বদলে, শৃঙ্খলার সমাজ প্রতিষ্ঠার বদলে কেন একটি পক্ষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল? কেনই বা দুর্নীতি বন্ধ করা গেল না? ছাত্রলীগ তো নেই, তারপরও কেন শিক্ষাঙ্গনে চলমান ভীতিকর নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না?
শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি মানুষের বীতশ্রদ্ধ হওয়ার অন্যতম বড় একটা কারণ ছিল অহংকারী বাগাড়ম্বর। তিনি বলতেন, দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স চলছে কিন্তু বাস্তবে তাঁর অনুগত সহযোগীরা দিনে-দুপুরে ব্যাংক লুট করত। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, শেখ হাসিনার পতনের পর তো বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি হওয়ার কথা। তা কি হলো? টিআইবির তথ্য বলছে, দুর্নীতি তো কমেইনি বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।
সার্বিক অর্থনৈতিক দশাও করুণ। মূল্যস্ফীতি এখনও ১০ শতাংশের (৯.১৬%) কাছাকাছি। একটু মনে করিয়ে দেই, ২০২২ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭.৪০ শতাংশ। দেশটিতে সেই মূল্যস্ফীতি এখন ৭.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কি বিস্ময়কর উন্নতি। কিন্তু বাংলাদেশ কেন নতুন নতুন অর্থনৈতিক সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে? বিদেশী বিনিয়োগ কমছে জ্যামিতিক হারে।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ সামনে না এগিয়ে কেন পিছিয়ে যাচ্ছে, তার যথাযথ কারণ অনুসন্ধান সহজ নয়। সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদেরা এর যথাযথ উত্তর দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশের একজন অতি সামান্য নাগরিক ও সামাজিক ভাষ্যকার হিসেবে আমার ধারণা, এই পিছিয়ে পড়া, সংকটে ঘুরপাক খাওয়ার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও বৈষম্য। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশে এখনও অন্তত ২০ ভাগ মানুষ দরিদ্র; যার অর্থ দেশে কম করে হলেও তিন-চার কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বাংলাদেশির স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই তালিকা আরও লম্বা। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে এমন শোচনীয় অবস্থা নিয়ে দেশ এগিয়ে নেওয়া যায় না। কারণ বিভিন্ন নিয়ামকের মধ্যে একটি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নিয়ামকই প্রধান যা রাষ্ট্রের মূলধারার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আবেদন কমে আসার আরেকটি কারণ সম্ভবত বিভিন্ন পক্ষের ১৯৭১ বিরোধিতা। শেখ হাসিনা তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ১৯৭১ সালকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একাত্তরের চেতনাকে আঘাত করা, পাকিস্তানিকরণের প্রতি অতি উৎসাহ বাংলাদেশের নাগরিকেরা ভালোভাবে নিয়েছে মনে হয় না। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও অতৃপ্তির পরও ১৯৭১ বাংলাদেশের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন, অমূল্য গৌরবগাথা। কিন্তু কথায় কথায় একাত্তরকে অপমান করা, খাটো করার প্রবণতা বহু মানুষকে প্রতারিতবোধে দগ্ধ করছে।
ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার এই আলোচনা অনেক বড় ও বহুমাত্রিক। স্বল্প পরিসরে এই আলোচনা সম্ভব নয়। তাই আলোচনাটা শেষ করতে চাই, একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ সামনে এনে। একাডেমিক ভাষায়, শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামল ছিল আংশিক ফ্যাসিবাদ; যার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল কর্তৃত্ববাদ ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। সঙ্গে ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন। সেই শাসনামলকে প্রত্যাখ্যান করে সামনে এগোতে হলে উদার গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহির শাসন প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদ কায়েম করে ফ্যাসিবাদকে দমন বা নির্মূল করা যায় না; বরং এটি আরেক ধরনের অভ্যুত্থান বা বিপ্লব বা নৈরাজ্যের পথ প্রশস্ত করে। ২০২৪ সালের সহিংসতা ও রক্তপাতের পর বাংলাদেশ আবার একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ঢুকে পড়ুক, এটা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়। এটা বাংলাদেশ সহ্যও করতে পারবে না।
*মতামত লেখকের নিজস্ব

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অমোচনীয় অধ্যায়। রক্তের কালিতে লেখা এই অধ্যায় মুছে ফেলার বা অস্বীকার করার খুব একটা সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। সাড়া জাগানো ৩৬ দিনের জুলাই মাসের এই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে একটু প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব মেলানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তার আগে দু-একটি বিষয় আলোচনা করা প্রয়োজন বোধ হয়।
বাঙালির সহজাত বৈশিষ্ট্যে এই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব নিয়ে কামড়া-কামড়ি অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে। অভ্যুত্থানে কার কত অবদান তা নিয়ে চলছে বিভিন্ন পক্ষের নিকৃষ্ট পর্যায়ের আত্মপ্রচার ও বাগাড়ম্বর; যা জুলাইয়ের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে।
আসুন একটা প্রশ্ন নিয়ে শুরু করা যাক। জুলাইয়ের এই অভ্যুত্থান কেন হয়েছিল? রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বহু তত্ত্ব হাজির করতে পারেন। আমি শুধু একটি বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই। এ রকম একটা অভ্যুত্থান ছাড়া কর্তৃত্বপরায়ণ শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটানোর কি কোনো উপায় ছিল? শেখ হাসিনা, শেখ পরিবার, সিভিল-মিলিটারি বুরোক্রেসি ও ব্যাংক লুটেরারা যে অক্ষশক্তির বলয় তৈরি করেছিল তা ছেদ করতে এই রকম একটা অভ্যুত্থানের কোনো বিকল্প ছিল না। সময়ই নিজ গতিপথে এই অভ্যুত্থানের পথ রচনা করেছে। যে পথে শামিল হয়েছেন ডান-বাম, কট্টরপন্থী-উদারপন্থী-মধ্যপন্থী, শান্তিকামী-উগ্রবাদী এমনকি শেখ হাসিনাপন্থীও। আমার দৃঢ় ধারণা চব্বিশের এই পালাবদল আওয়ামী লীগের কোটি কোটি সমর্থকও কামনা করেছেন। তাঁরাও উদ্ধত, দুর্নীতিগ্রস্ত, মানুষের অমর্যাদাকারী ওই সরকারের পতন চেয়েছিল।
আরেকটি প্রশ্ন? চব্বিশের অভ্যুত্থানের প্রধান ধাক্কাটা কে বা কারা দিয়েছেন? মাস্টারমাইন্ড না হলেও কাদের ভূমিকা ছিল ফলাফল নির্ধারণী? এই প্রশ্নের উত্তর একটাই। সেটা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। একটু খেয়াল করে দেখুন, ৩ আগস্ট সেনাসদরে অনুষ্ঠিত বৈঠকটিই ছিল প্রধান নিয়ামক। খুব সম্ভবত শেখ হাসিনাও সেটা জানতেন। একটু খেয়াল করে দেখুন, অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর শেখ হাসিনার বিশাল একান্নবর্তী পরিবারের কেউই দেশে ছিলেন না। তাঁরা কবে, কোন প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়লেন? অনেকের ধারণা সেনাসদরে ৩ আগস্টের ওই বৈঠকেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন চূড়ান্ত হয়েছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার খ্যাতিমান বিশ্লেষক ব্রহ্ম চেলানি এক নিবন্ধে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। একটু মনে করিয়ে দেই, ব্রহ্ম চেলানি নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং বার্লিনের রবার্ট বোশ একাডেমির ফেলো। তিনি সারা বিশ্ব বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার নীতি-নির্ধারণী নানা বিষয়ে লেখালেখি করেন। তিনি ১৭ আগস্ট ২০২৫ দ্য হিল নামের অনলাইনে ‘কোয়াইট মিলিটারি ক্যু ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে এক কলাম লেখেন। এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের শেষ অঙ্কে বাংলাদেশে সেনাবাহিনী চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকারীর ভূমিকায় ছিল।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্বিতীয়বারের মতো এমন ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। হ্যাঁ, অবশ্যই সেই পরিস্থিতি তৈরিতে অনেকের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আছে দীর্ঘ দিনের রাজনৈতিক আন্দোলন ও ত্যাগের ইতিহাস। এখানে বলাই বাহুল্য, বিদেশী অনেক পক্ষও শেখ হাসিনার বিপক্ষে ছিল।
চোখের সামনে শেখ হাসিনার পরাক্রমশালী সরকার ধসে পড়ল। একটা দুর্নীতিগ্রস্থ সরকার সদলবলে পালাল। এরপর তো দেশটা ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। কিন্তু বাংলাদেশ কেন ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে? কেন মব সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, উগ্রবাদের আস্ফালন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মূল্যস্ফীতি, নয়া মাফিয়াদের উত্থান থামানো গেল না? কেন রাজনৈতিক হানাহানি, ক্ষমতার জন্য কামড়াকামড়ি বন্ধ হলো না? দেশ গড়ার বদলে, শৃঙ্খলার সমাজ প্রতিষ্ঠার বদলে কেন একটি পক্ষ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠল? কেনই বা দুর্নীতি বন্ধ করা গেল না? ছাত্রলীগ তো নেই, তারপরও কেন শিক্ষাঙ্গনে চলমান ভীতিকর নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস বন্ধ হচ্ছে না?
শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি মানুষের বীতশ্রদ্ধ হওয়ার অন্যতম বড় একটা কারণ ছিল অহংকারী বাগাড়ম্বর। তিনি বলতেন, দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স চলছে কিন্তু বাস্তবে তাঁর অনুগত সহযোগীরা দিনে-দুপুরে ব্যাংক লুট করত। তাই প্রশ্ন থেকে যায়, শেখ হাসিনার পতনের পর তো বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির ইতিবাচক উন্নতি হওয়ার কথা। তা কি হলো? টিআইবির তথ্য বলছে, দুর্নীতি তো কমেইনি বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বেড়েছে।
সার্বিক অর্থনৈতিক দশাও করুণ। মূল্যস্ফীতি এখনও ১০ শতাংশের (৯.১৬%) কাছাকাছি। একটু মনে করিয়ে দেই, ২০২২ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কায় গণঅভ্যুত্থানের সময় মূল্যস্ফীতি ছিল ৬৭.৪০ শতাংশ। দেশটিতে সেই মূল্যস্ফীতি এখন ৭.৩০ শতাংশে নেমে এসেছে। কি বিস্ময়কর উন্নতি। কিন্তু বাংলাদেশ কেন নতুন নতুন অর্থনৈতিক সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে? বিদেশী বিনিয়োগ কমছে জ্যামিতিক হারে।
অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ সামনে না এগিয়ে কেন পিছিয়ে যাচ্ছে, তার যথাযথ কারণ অনুসন্ধান সহজ নয়। সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদেরা এর যথাযথ উত্তর দিতে পারবেন। তবে বাংলাদেশের একজন অতি সামান্য নাগরিক ও সামাজিক ভাষ্যকার হিসেবে আমার ধারণা, এই পিছিয়ে পড়া, সংকটে ঘুরপাক খাওয়ার প্রধান কারণ অর্থনৈতিক দৈন্যদশা ও বৈষম্য। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে বাংলাদেশে এখনও অন্তত ২০ ভাগ মানুষ দরিদ্র; যার অর্থ দেশে কম করে হলেও তিন-চার কোটি মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ বাংলাদেশির স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। অন্যদিকে বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ, যা গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই তালিকা আরও লম্বা। বিভিন্ন অর্থনৈতিক সূচকে এমন শোচনীয় অবস্থা নিয়ে দেশ এগিয়ে নেওয়া যায় না। কারণ বিভিন্ন নিয়ামকের মধ্যে একটি রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নিয়ামকই প্রধান যা রাষ্ট্রের মূলধারার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের আবেদন কমে আসার আরেকটি কারণ সম্ভবত বিভিন্ন পক্ষের ১৯৭১ বিরোধিতা। শেখ হাসিনা তাঁর কর্তৃত্ববাদী শাসনামলে ১৯৭১ সালকে সর্বোচ্চ ব্যবহার করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে একাত্তরের চেতনাকে আঘাত করা, পাকিস্তানিকরণের প্রতি অতি উৎসাহ বাংলাদেশের নাগরিকেরা ভালোভাবে নিয়েছে মনে হয় না। বিভিন্ন ধরনের প্রশ্ন ও অতৃপ্তির পরও ১৯৭১ বাংলাদেশের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন, অমূল্য গৌরবগাথা। কিন্তু কথায় কথায় একাত্তরকে অপমান করা, খাটো করার প্রবণতা বহু মানুষকে প্রতারিতবোধে দগ্ধ করছে।
ব্যর্থতার বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়ার এই আলোচনা অনেক বড় ও বহুমাত্রিক। স্বল্প পরিসরে এই আলোচনা সম্ভব নয়। তাই আলোচনাটা শেষ করতে চাই, একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ সামনে এনে। একাডেমিক ভাষায়, শেখ হাসিনার প্রায় ১৬ বছরের শাসনামল ছিল আংশিক ফ্যাসিবাদ; যার প্রধান অনুষঙ্গ ছিল কর্তৃত্ববাদ ও সর্বগ্রাসী দুর্নীতি। সঙ্গে ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘন। সেই শাসনামলকে প্রত্যাখ্যান করে সামনে এগোতে হলে উদার গণতান্ত্রিক ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহির শাসন প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদ কায়েম করে ফ্যাসিবাদকে দমন বা নির্মূল করা যায় না; বরং এটি আরেক ধরনের অভ্যুত্থান বা বিপ্লব বা নৈরাজ্যের পথ প্রশস্ত করে। ২০২৪ সালের সহিংসতা ও রক্তপাতের পর বাংলাদেশ আবার একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতিতে ঢুকে পড়ুক, এটা নিশ্চয় কারও কাম্য নয়। এটা বাংলাদেশ সহ্যও করতে পারবে না।
*মতামত লেখকের নিজস্ব
.png)

একটি বড় দেশের বিনিয়োগ অন্য দেশগুলোকেও উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগে যুক্ত হয়, তবে চীন, তুরস্ক, কোরিয়া বা অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এখানে আসতে ভরসা পাবেন।
১৫ ঘণ্টা আগে
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। আসলে অভ্যুত্থান বা গণআন্দোলনের বর্ষপূর্তির তো কোনো নির্দিষ্ট দিন থাকে না। একটা সময়কাল থাকে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন।
১৬ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। কিন্তু আরও উদ্বেগের বিষয়, এই প্রাদুর্ভাব আমাদের বহুদিনের উপেক্ষিত এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের চিকিৎসা করতে গিয়ে যখন ৮৯ শতাংশ পরিবার ঋণ নেয়, ৬১ শতাংশ পরিবার সঞ্চয় ভেঙে ফেলে তখন বোঝা যায়, রোগের চেয়ে বড় অসুখ আমাদের স্বাস
১৬ ঘণ্টা আগে
ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্ত ছিল ৫ আগস্টের ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি। এর পেছনের পটভূমি এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের নানা বিষয় নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের মুখোমুখি হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। সাক্ষাৎকার নিয়
১৮ ঘণ্টা আগে