মার্কিন বিনিয়োগের বার্তা: সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রস্তুত তো বাংলাদেশ?

আবু আহমেদ
আবু আহমেদ

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২১: ০৮
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

যুক্তরাষ্ট্র বরাবরই বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক অংশীদার। আমাদের গ্যাস সেক্টরে শেভরন এবং বিমা খাতে মেটলাইফের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো দীর্ঘকাল ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করছে। তারা এদেশে এসে যেমন মুনাফা করছে, তেমনি আমাদের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে। বর্তমান সংকটজনক অর্থনৈতিক অবস্থায় মার্কিন ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি দলের আগমন একটি বড় ইতিবাচক বার্তা দেয়।

বিনিয়োগের একটি অলিখিত নিয়ম হলো— একটি বড় দেশের বিনিয়োগ অন্য দেশগুলোকেও উৎসাহিত করে। অর্থাৎ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি বাংলাদেশে বড় পরিসরে বিনিয়োগে যুক্ত হয়, তবে চীন, তুরস্ক, কোরিয়া বা অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীরাও এখানে আসতে ভরসা পাবেন। কিন্তু বিদেশিরা এসে আমাদের দেশের উন্নয়ন করে দিয়ে যাবে— এমন অলীক কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের নিজেদের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দ্রুত মেরামত করতে হবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে দুর্বল অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজ না পাওয়া বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ দেখে শুরুতেই তিনি হতাশ হন। বিমানবন্দর হলো একটি দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার। অথচ আমরা এখনও আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছি। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে একটি জাহাজ খালাস করতে যেখানে ১২ দিন সময় লাগে, সেখানে বিদেশের অন্যান্য বন্দরে লাগে মাত্র তিন থেকে চার দিন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অবস্থাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অনুকূল নয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দেশীয় ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে বসে থাকার সময় আর নেই। চট্টগ্রাম বন্দর বা নতুন কোনো মেগা প্রজেক্টের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে দীর্ঘমেয়াদে লিজ দেওয়া যেতে পারে। এতে যেমন কাজের গতি বাড়বে, তেমনি আন্তর্জাতিক মানও নিশ্চিত হবে। এছাড়া, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিদেশি বা বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে টোলভিত্তিক এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা জরুরি। মানুষ উন্নত সেবা পেলে অর্থ খরচ করতে দ্বিধা করে না।

বিনিয়োগের আরেকটি প্রধান শর্ত হলো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। বর্তমানে দেশে জ্বালানি সংকট প্রকট। দেশীয়ভাবে এর তাৎক্ষণিক কোনো সমাধান নেই। তাই সাময়িকভাবে বেশি খরচ হলেও বিদেশ থেকে পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি করে শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, বিদ্যুৎ-গ্যাস ছাড়া কোনো বিনিয়োগই আলোর মুখ দেখবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি এনার্জি সেক্টরে তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে আসতে চায়, তবে তা লুফে নেওয়া উচিত।

অর্থায়নের ক্ষেত্রে আমাদের চিরাচরিত বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-নির্ভরতা কমাতে হবে। এর বিকল্প হিসেবে 'অ্যাসেট সিকিউরিটাইজেশন'-এর পথে হাঁটা যেতে পারে। পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু বা মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলোকে কোম্পানি মডেলে এনে বন্ড বা সুকুক ইস্যু করে জনগণের কাছে শেয়ার বিক্রি করা যেতে পারে। প্রকল্পগুলোর টোল বা আয়ের অংশ মুনাফা হিসেবে জনগণ পাবে, আর সরকার একসঙ্গে বিশাল অংকের মূলধন হাতে পাবে, যা নতুন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা যাবে।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে আমাদের প্রধান অন্তরায় হচ্ছে দুর্বল অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতা। একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী যখন ঢাকা বিমানবন্দরে নামেন, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগেজ না পাওয়া বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ দেখে শুরুতেই তিনি হতাশ হন।

বিনিয়োগের পথে অন্যতম বড় বাধা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পদে পদে হয়রানি এবং আইনি দীর্ঘসূত্রিতা। কোনো বিরোধ বা 'ডিসপিউট' তৈরি হলে তা নিষ্পত্তি করতে বছরের পর বছর লেগে যায়। এর সমাধানে হাইকোর্টে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা বেঞ্চ গঠন করা প্রয়োজন, যাতে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে রায় পাওয়া যায়। পাশাপাশি, কর ব্যবস্থা সহজীকরণ এবং দ্রুততম সময়ে বিভিন্ন সেবার ছাড়পত্র প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।

মার্কিন ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের জন্য বাংলাদেশে একাধিক সম্ভাবনাময় খাতের দুয়ার উন্মুক্ত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। এর বাইরেও জ্বালানি বা এনার্জি সেক্টরে মার্কিন কোম্পানিগুলোর দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে; শেভরন যার অন্যতম বড় উদাহরণ। ফলে জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ খাতে তারা নতুন করে বড় বিনিয়োগ করতে পারে। তারা চাইলে চামড়া শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর খাতেও অনায়াসে বিনিয়োগ করতে পারে।

এছাড়া রপ্তানিমুখী যেকোনো পণ্য উৎপাদনে তারা যদি তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা নিয়ে যুক্ত হয়, তবে সরকারের উচিত হবে নির্দিষ্ট জায়গা চিহ্নিত করে তাদের দ্রুততম সময়ে প্রয়োজনীয় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে সর্বাত্মক সহায়তা করা। এই সম্ভাব্য খাতগুলোতে মার্কিন মূলধন ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো গেলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে।

বিশ্ববাজারে টিকতে হলে শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে থাকলে চলবে না। ওষুধ, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বেসিক স্টিল ইঞ্জিনিয়ারিং, আইটি এবং যানবাহন সংযোজনের মতো খাতে বিনিয়োগের দুয়ার উন্মুক্ত করতে হবে। ভিয়েতনাম গত ১৫-২০ বছরে কয়েক ডজন দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি িএফটিএ) করেছে, অথচ আমরা এখনও অনেক অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের উচিত দ্রুত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি করা এবং সার্কের ব্যর্থতার এই যুগে আসিয়ানের সদস্য বা অন্তত সহযোগী সদস্য হওয়ার চেষ্টা করা।

আমাদের মনে রাখতে হবে, অর্থনীতি কখনোই শক্তিশালী হয় না যদি না একটি দেশের সামগ্রিক নীতি ও পররাষ্ট্র সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ হয়। আমাদের কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক বা ভারত— যারা আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রতি সম্মান রেখে, নিয়ম মেনে প্রযুক্তি ও মূলধন নিয়ে আসবে, তাদের সবার জন্যই আমাদের দরজা খোলা রাখতে হবে। সরকার শুধু 'ফ্যাসিলিটেটর' বা সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করবে।

দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারলে, মার্কিন প্রতিনিধি দলের এই সফর আমাদের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা হয়ে আসতে পারে। বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাদের এই আগ্রহ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার এই যাত্রায় আমাদের নিজেদের প্রস্তুতি কতটুকু, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

  • অধ্যাপক আবু আহমেদ: অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ এবং পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ; চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত