ad

মেরিলিন মনরোর মৃত্যুবার্ষিকী

‘ডাম্ব ব্লন্ড’ নন, তিনি হতে চেয়েছিলেন অভিনেত্রী

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ০৫
‘ডাম্ব ব্লন্ড’ নন, মেরিলিন মনরো হতে চেয়েছিলেন অভিনেত্রী। স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৫৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। রাত তখন প্রায় একটা। শুটিং দেখতে নিউইয়র্কের লেক্সিংটন অ্যাভিনিউ স্ট্রিটে ভিড় জমেছে। শতাধিক আলোকচিত্রী আর কয়েক হাজার দর্শক অপেক্ষা করছেন নায়িকার জন্য।

কিছুক্ষণ পর নায়িকা এসে দাঁড়ালেন। তিনি দাঁড়িয়েছিলেন পাতাল রেলের বাতাস বের হওয়ার গ্রিলের ওপর। ঠিক তখনই নিচ দিয়ে একটি ট্রেন চলে গেল। মুহূর্তেই নিচ থেকে তীব্র বাতাস উঠে তাঁর সাদা পোশাক উড়িয়ে দিল। অনেক চেষ্টা করেও পোশাকটি ধরে রাখা যাচ্ছে না। এর মাঝেই চারপাশে ক্যামেরার ফ্লাশ ঝলসে উঠল। দর্শকদের উচ্ছ্বাস আর হাততালিতে মুখর হয়ে উঠল পুরো এলাকা।

সেই অভিনেত্রীর নাম মেরিলিন মনরো। আমার মতো আরও অনেকেরই হয়তো তাঁর সঙ্গে পরিচয় সেই আইকনিক ছবিটির মাধ্যমে। তবে মজার বিষয় হলো, ছবিটি ইতিহাস হয়ে গেলেও সেই দৃশ্যটি শেষ পর্যন্ত সিনেমায় রাখা হয়নি। পরে স্টুডিওতে একই দৃশ্য নতুন করে ধারণ করা হয় এবং সেটিই ছবিতে রাখা হয়। শুধু তাই নয়, এই একটি দৃশ্যের কারণে পরে আরও অনেক ঘটনারও জন্ম হয়েছিল।

বাতাসে স্কার্ট ওড়ার সেই দৃশ্য, যা মনরোর দাম্পত্যে ফাটল ধরিয়েছিল

বিলি ওয়াইল্ডারের দ্য সেভেন ইয়ার ইচ ছবির ‘ফ্লাইং স্কার্ট’ দৃশ্যটি সিনেমার ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত মুহূর্তগুলোর একটি।

দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছিল নিউইয়র্কের লেক্সিংটন অ্যাভিনিউয়ে। রাত প্রায় একটার পর শুটিং শুরু হলেও সেখানে জড়ো হয় কয়েক হাজার দর্শক ও শতাধিক আলোকচিত্রী। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে ১৪ বার দৃশ্যটি ধারণ করা হয়। পাতাল রেলের বাতাসে যখনই মেরিলিন মনরোর সাদা পোশাক উড়ে যাচ্ছিল, দর্শকদের উল্লাসে শুটিং বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল।

‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডিস’ সিনেমায় মনরো। সংগৃহীত ছবি
‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডিস’ সিনেমায় মনরো। সংগৃহীত ছবি

এই শব্দের কারণেই নিউইয়র্কে ধারণ করা দৃশ্যটি ছবিতে ব্যবহার করা হয়নি। পরে ক্যালিফোর্নিয়ার ফক্স স্টুডিওতে একই দৃশ্য আবার ধারণ করা হয়। তবে নিউইয়র্কে তোলা ছবিগুলোই প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়। সেখান থেকেই দৃশ্যটি বিশ্বজুড়ে আইকনিক হয়ে ওঠে।

শুটিংয়ের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মেরিলিনের দ্বিতীয় স্বামী, বেসবল তারকা জো ডিম্যাজিও। হাজারো মানুষের সামনে স্ত্রীকে এভাবে দেখানো তিনি মেনে নিতে পারেননি। আলোকচিত্রী জর্জ এস. জিমবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ ডিম্যাজিও শুটিং সেট ছেড়ে চলে যান।

এর কিছুদিন পরই মেরিলিন মনরো মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন। তাঁদের সংসার টিকেছিল এক বছরেরও কম। বিচ্ছেদের পেছনে আরও নানা কারণ থাকলেও, এই বিখ্যাত দৃশ্যটিকেও তাঁদের সম্পর্ক ভাঙার অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয়।

নর্মা জিন থেকে মেরিলিন মনরো

রুপালি পর্দায় আসার আগে মেরিলিন মনরোর নাম ছিল নর্মা জিন বেকার। ১৯২৬ সালের ১ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম তাঁর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কাজ করতেন প্রতিরক্ষা কারখানায়। সেসময়ই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। কারখানার কর্মীদের ছবি তুলতে আসা একজন আলোকচিত্রী ক্যামেরার সামনে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি ও সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন। তাঁর পরামর্শেই মডেলিং শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন জনপ্রিয় সাময়িকীর প্রচ্ছদে জায়গা করে নেন তিনি। ধীরে ধীরে বড় পর্দার জনপ্রিয় মুখ হয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন মেরিলিন মনরো।

নর্মা জিন থেকে হওয়ার মেরিলিন মনরো হওয়ার পথে বিতর্ক আর জনপ্রিয়তা যেন হাত ধরাধরি করে হেঁটেছে। ১৯৪৬ সালে তাঁর জীবনে আসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। টোয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের নির্বাহী বেন লিয়নের নজরে পড়ে তিনি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। সিনেমাগুলোতে তাঁকে প্রায়ই দেখা যেত আবেদনময়ী চরিত্রে দেখা যেত বলে তাঁর নাম দেওয়া হয় ‘ব্লন্ড বম্বশেল’।

আইকনিক মেরিলিন মনরো। সংগৃহীত ছবি
আইকনিক মেরিলিন মনরো। সংগৃহীত ছবি

নতুন পরিচয়ের সঙ্গে নিজেকেও নতুন করে গড়ে তুলতে শুরু করেন তিনি। অভিনয়ের পাশাপাশি নাচ ও গান শেখেন। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করেও খুব বেশি সাফল্য পাননি। ফক্সের সঙ্গে করা সাপ্তাহিক ১২৫ ডলারের চুক্তি শেষ হয়ে গেলে জীবিকার জন্য আবার মডেলিংয়ে ফিরে যেতে হয় তাঁকে।

১৯৪৯ সালে মাত্র ৫০ ডলারের বিনিময়ে একটি নগ্ন ফটোশুটে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। চার বছর পর হিউ হেফনার ৫০০ ডলারে সেই ছবিগুলোর স্বত্ব কিনে নতুন ম্যাগাজিন প্লেবয়-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশ করেন। এতে তিনি হন ম্যাগাজিনটির প্রথম ‘প্লেমেট অব দ্য মান্থ’। বিষয়টি তখন বিতর্ক তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত তাঁর জনপ্রিয়তাই আরও বাড়িয়ে দেয়।

১৯৫০ সালে ‘দ্য অ্যাসফল্ট জাঙ্গল’ এবং ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে মনরো দর্শক ও সমালোচকদের নজর কাড়েন। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৯৫৩ সালে ‘নায়াগ্রা’ মুক্তির পর তিনি হলিউডের প্রথম সারির তারকায় পরিণত হন। একই বছর ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’ ও ‘হাউ টু ম্যারি আ মিলিয়নেয়ার’, আর ১৯৫৪ সালে ‘দেয়ার্স নো বিজনেস লাইক শো বিজনেস’ তাঁর জনপ্রিয়তাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়।

হলিউড মনরোকে বারবার ‘ডাম্ব ব্লন্ড’ নারীর চরিত্রেই আটকে রাখতে চাইছিল

বিপুল জনপ্রিয়তার পরও মেরিলিন মনরো নিজের অভিনয়জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। হলিউড তাঁকে বারবার ‘ডাম্ব ব্লন্ড’—অর্থাৎ শুধু সুন্দরী, সরল ও আবেদনময়ী নারীর চরিত্রেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছিল। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে।

সেই লক্ষ্যেই ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি নিউইয়র্কের অ্যাক্টরস স্টুডিওতে অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নেন। একই সময়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মেরিলিন মনরো প্রোডাকশনস। সে সময় কোনো নারী তারকার নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছিল খুবই বিরল ঘটনা।

শুটিংয়ের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মেরিলিনের দ্বিতীয় স্বামী, বেসবল তারকা জো ডিম্যাজিও। হাজারো মানুষের সামনে স্ত্রীকে এভাবে দেখানো তিনি মেনে নিতে পারেননি। আলোকচিত্রী জর্জ এস. জিমবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ ডিম্যাজিও শুটিং সেট ছেড়ে চলে যান।

১৯৫৬ সালে ‘বাস স্টপ’ ছবিতে অভিনয় করে তিনি সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ান। সেসময় সমালোচকরা লিখেছিলেন, ‘মেরিলিন মনরো অবশেষে প্রমাণ করলেন, তিনি শুধু তারকা নন, একজন অভিনেত্রীও।’

১৯৫৯ সালে ‘সাম লাইক ইট হট’ ছবিতে অভিনয়ের জন্য মেরিলিন মনরো গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার জিতেছিলেন। কিন্তু পেশাগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ক্রমেই ভেঙে পড়ছিলেন। একই বছর তিনি বিখ্যাত নাট্যকার আর্থার মিলারকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে নিয়ে তখন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। কিন্তু সেই সংসারও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ‘সাম লাইক ইট হট’ ছবির শুটিং চলাকালেই তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, অনেক সময় সাধারণ সংলাপও মনে রাখতে পারতেন না। ছোট সংলাপ ঠিকভাবে বলতে কখনও কখনও ৬০টিরও বেশি টেক দিতে হয়েছিল।

শুটিংয়ে নিয়মিত দেরি করা নিয়েও পরিচালক ও সহ-অভিনেতাদের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ তৈরি হতো। সন্তান নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়া, একাধিক গর্ভপাত এবং মানসিক অবসাদ তাঁকে ধীরে ধীরে ঘুমের ওষুধ ও মদে নির্ভরশীল করে তোলে।

১৯৬১ সালে আর্থার মিলারের সঙ্গে মনরোর বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। একই বছর মুক্তি পাওয়া ‘দ্য মিসফিটস’ ছিল তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র। ১৯৬২ সালে শারীরিক অসুস্থতা ও বিষণ্নতার কারণে ‘সামথিংস গট টু গিভ’ ছবি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়।

এর কিছুদিন পর, ১৯৬২ সালের ৫ আগস্ট, মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লস অ্যাঞ্জেলেসের বাড়িতে মনরোর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্তে অতিরিক্ত বারবিচুরেট সেবনের ফলে সম্ভাব্য আত্মহত্যাকে মৃত্যুর কারণ বলা হয়। পরে তাঁর মৃত্যু নিয়ে জন এফ. কেনেডি, রবার্ট কেনেডি ও মাফিয়াকে ঘিরে নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ালেও সেসবের পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

১৯৯৯ সালে আমেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট মনরোকে সর্বকালের সেরা নারী চলচ্চিত্র তারকাদের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মৃত্যুর ছয় দশকের বেশি সময় পরও মেরিলিন মনরো শুধু হলিউডের নয়, বিশ্ব সংস্কৃতির অন্যতম বড় আইকন হয়ে আছেন।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত