জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর

জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে অনেক ফারাক রয়ে গেছে

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান

জুলাই আন্দোলন মূলত বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার লক্ষ্যে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার এই ন্যায়সঙ্গত দাবির প্রতি চরম দমনপীড়ন চালালে, এটি অতি দ্রুত একটি সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। ২০১৪ সালের পর থেকে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে, জনগণকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক ক্ষমতায় বসে থাকা একটি সরকারকে হটানোর প্রক্রিয়ায় আন্দোলনের পরিসরও ব্যাপকতা লাভ করে।

তখন কেবল বৈষম্য দূরীকরণই মূল বিষয় ছিল না; বরং রাষ্ট্রব্যবস্থায় কুক্ষিগত ক্ষমতার অবসান, প্রশাসনকে জনমুখী করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহির আওতায় আনার মতো বৃহত্তর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় প্রত্যাশাগুলো এর সাথে যুক্ত হয়। ফলশ্রুতিতে, যা প্রাথমিকভাবে কেবল ছাত্রদের আন্দোলন ছিল, তা পরিণত হয় আপামর ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানে এবং মানুষের প্রত্যাশাও বহুগুণে বেড়ে যায়।

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে—প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, রাজনীতি, সংসদ পরিচালনা এবং সংবিধানে পরিবর্তনের যে গভীর আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার একটি শক্ত ভিত্তি ইতোমধ্যে রচিত হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে ও স্বাক্ষরে যে 'জুলাই সনদ' বা সংস্কার রূপরেখা প্রণীত হয়েছে, তা গণভোটে বিপুল ব্যবধানে জনগণের সমর্থন লাভ করেছে। অর্থাৎ, পরিবর্তনের পক্ষে একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কাগজে-কলমে থাকা এই পরিবর্তনগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?

এই মুহূর্তে যারা নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছেন, তাদের সদিচ্ছার ওপর এই সংস্কারের ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভরশীল। জনগণ যে প্রত্যাশা নিয়ে গণভোটে রায় দিয়েছে, ক্ষমতাসীনদের দলীয় স্বার্থের বা মতাদর্শের সাথে তার পুরোপুরি মিল না-ও থাকতে পারে। কিন্তু জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করার ক্ষেত্রে তারা কতটা উদারতা দেখাবেন এবং জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতা অনুভব করবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে সংস্কারগুলোর আইনি ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি। কাগজে-কলমে স্বীকৃতি পাওয়ার পর শুরু হবে বাস্তবায়নের আসল লড়াই। তাই এটি কোনো শর্টকাট বা সহজ গন্তব্য নয়। এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথে জুলাই অভ্যুত্থানের সাথে যুক্ত ছাত্র-জনতা সবাইকে নিরন্তর সজাগ থাকতে হবে।

কোনো রাজনৈতিক দল যদি মনে করে তারা নিজেদের সুবিধামতো সনদের কেবল সেই অংশটুকুই মানবে যাতে তাদের সায় আছে, আর বাকিটা গণভোটে পাস হলেও এড়িয়ে যাবে, তবে ওই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবেই হোঁচট খেতে হবে।

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হলো, তা ১০০ নম্বরের মধ্যে কোনো নির্দিষ্ট নম্বর দিয়ে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে পরিবর্তনের একটি মজবুত ভিত্তি যেহেতু তৈরি হয়েছে এবং জনগণ নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করতে শুরু করেছে, তাই এই পথ থেকে পিছিয়ে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। কোনো রাজনৈতিক দল যদি মনে করে তারা নিজেদের সুবিধামতো সনদের কেবল সেই অংশটুকুই মানবে যাতে তাদের সায় আছে, আর বাকিটা গণভোটে পাস হলেও এড়িয়ে যাবে, তবে ওই রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে নিশ্চিতভাবেই হোঁচট খেতে হবে।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের একটি বড় স্লোগান ও অনুপ্রেরণা ছিল 'সিস্টেম ভাঙা' বা একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। এই লক্ষ্য রাতারাতি বা পুরোপুরি অর্জিত না হলেও, ইতিবাচক পরিবর্তন শুরু হয়েছে। রাজনীতিবিমুখ তরুণেরা এখন রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনা নিয়ে গভীরভাবে ভাবছে। সরকার বা কর্তৃপক্ষ কোনো ভুল বা জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নিলে জনগণ তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করছে এবং কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হচ্ছে। যেমন, সম্প্রতি বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের একটি বিতর্কিত নির্দেশনার পর জনমতের চাপে বিদ্যুৎ বিভাগ পিছু হটতে বাধ্য হয়। এগুলো ছোট হলেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন। তবে রাজনীতিতে সত্যিকারের গুণগত পরিবর্তন কতটা এলো, তা বুঝতে আমাদের অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় মেয়াদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আমার চূড়ান্ত প্রত্যাশা হলো—কৃত্রিমভাবে কেবল ব্যক্তি বা দলের পরিবর্তন না ঘটিয়ে, যেন পুরো সিস্টেম বা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন করা হয়। আমাদের বিদ্যমান আইন, প্রতিষ্ঠান এবং সংবিধানের বেশ কিছু অনুচ্ছেদ একটি গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক ও নারীবান্ধব সমাজ গড়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল এক সরকার গিয়ে আরেক সরকার এলে বা এক দলের বদলে অন্য দল ক্ষমতায় আসলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।

রাজনৈতিক দলগুলোকে অনুধাবন করতে হবে যে জনগণ ঠিক কী চায়। জনআকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে রাজনৈতিক দলগুলো যখন এই সিস্টেম বদলানোর দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করবে, কেবল তখনই আমরা কাঙ্ক্ষিত সেই 'নতুন বাংলাদেশ' পাব।

  • সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: আইনজীবী ও পরিবেশবিদ; সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত