জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গণতান্ত্রিক ৩৬ দিন

প্রকাশ : ০৪ আগস্ট ২০২৬, ২০: ১৫
স্ট্রিম গ্রাফিক

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হচ্ছে। আসলে অভ্যুত্থান বা গণআন্দোলনের বর্ষপূর্তির তো কোনো নির্দিষ্ট দিন থাকে না। একটা সময়কাল থাকে। ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের মুখে দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেই হিসেবে দিনটিকে গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতির দিন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে তার পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল আরও কয়েক দিন আগেই। শোনা যায়, পরিবারের অনেক সদস্যকেই তিনি আগে থেকে দেশ ছাড়তে বলেছিলেন। সম্ভবত তিনি নিজেও পতনের ঘণ্টাধ্বনি শুনতে পেয়েছিলেন।

যাই হোক, জুলাই অভ্যুত্থানকে একটা দিন কিংবা জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের মধ্যেও সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর বীজ বপন করেছিলেন শেখ হাসিনা, তার দল এবং তার সরকারই। সেটা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা ভোটের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০১৮-এর মধ্যরাতের ভোট ডাকাতি এবং ২০২৪-এর ডামি নির্বাচন গণবিস্ফোরণকে অনিবার্য করে তুলেছিল। আর অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে গিয়ে গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং বিরোধী মতের ওপর সীমাহীন নির্যাতন পুরো দেশকে যে ভয়ের চাদরে ঢেকে রেখেছিল; যে দম বন্ধ করা মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছিল– গণঅভ্যুত্থানই ছিল সেখান থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।

লেখাটা শুরু করার সময় ভেবেছিলাম, ওই ৩৬ দিনের জীবন্ত স্মৃতি নিয়ে একটা কিছু লিখব। তবে কয়েক লাইন লেখার পর মনে হলো, ওই সময়টার একটা ভার্সন আমার কাছে আছে – হয় নিজের যাপিত স্মৃতিতে, না হয় পরবর্তী সময়ে অন্য অনেকের কাছে তাদের গল্প শুনে। কিন্তু এমন অনেক গল্প আছে যা আমি দেখিনি, পরেও জানতে পারিনি। তাই ওই সময় নিয়ে লিখতে গেলে এমন অনেক কিছু বাদ পড়ে যাবে, যা ছাড়া হয়তো জুলাই পূর্ণতা পায় না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা না জানানোর এই ধৃষ্টতা দেখানোর সাহস আমার নেই। তার চেয়ে বরং সেই সময়টার দর্শনগত দিকের সঙ্গে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি মেলানোর চেষ্টা করি।

বাংলাদেশের জনগণ মূলত স্বাধীন ছিল ৯ মাস। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এর আগেও তার স্বাধীনতা ছিল না, পরেও না। ১৬ ডিসেম্বরের পর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও জনগণের স্বাধীনতা ও মুক্তি আজও অর্জিত হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৯ মাসে এ দেশের জনগণ স্বাধীনভাবে অন্তত মরতে পেরেছে। তেমনি জুলাই অভ্যুত্থানের ৩৬ দিনে এ দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝে নিয়েছিল। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিয়েছে এবং সেই মালিকানা বুঝে নিতে জীবন দিতে বুলেটের সামনে দাঁড়িয়েছে। তাকে আটকানোর ক্ষমতা কারও ছিল না। কিন্তু ৫ আগস্টের পর আবারও তাকে ফিরতে হয়েছে শাসনের বৃত্তে।

সময়টাকে যখন ফিরে দেখি, তখন কেমন জানি বিশ্বাস হতে চায় না। আসলে ওই ৩৬ দিনে এ দেশের মানুষ একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। কল্পনা করা যায়, নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও একজন এগিয়ে যাচ্ছে বুলেটের দিকে! পাশের মানুষটা গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ার পর তাকে তুলে নিয়ে আবারও সামনের দিকে এগোচ্ছে! শত শত তরুণ নিহত হওয়ার পরও বাবা-মা সন্তানকে ঘর থেকে বের হতে বাধা দিচ্ছে না। কেউ কেউ তার সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই রাস্তায় নেমে আসছে এটা জেনেও যে, ফেরার সময় তাকে সন্তানের মৃতদেহ বয়ে আনতে হতে পারে। কী এক নেশায় বুঁদ হয়েছিল এ দেশের মানুষ! গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার নেশা; রাষ্ট্রের মালিকানা ছিনিয়ে নেওয়ার নেশা। ৫৩ বছরের না পাওয়া স্বাধীনতা আর মুক্তির নেশা!

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মানুষ কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য জীবন দিতে যায়নি। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, কাঠামোগত সংস্কার। যাতে ভবিষ্যতে আবারও কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে। এই জায়গাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সম্ভবত পদ্ধতিটা ভুল ছিল।

জুলাইয়ের ৩৬ দিনের পরই অবশ্য সেই পুরোনো বৃত্তে ফিরল দেশ। আবারও সেই দুর্নীতি আর ক্ষমতার অপব্যবহার। সঙ্গে যুক্ত হল মব আর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে যে তরুণরা স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিলো, ক্ষমতার পালাবদলে তাদেরই কেউ কেউ হয়ে উঠলেন রাষ্ট্রের মালিক। কাউকে কাউকে শূন্য থেকে কোটিপতি হয়ে উঠতে দেখলো মানুষ। যাদের আহবানে সাড়া দিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল তারা, বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল বুলেটের সামনে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা যেভাবে আওয়ামী লীগ দাবি করত, ঠিক সেভাবে ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর শুরু হলো এর মাস্টারমাইন্ড অনুসন্ধান। ’৭১-এর জনযুদ্ধ যেভাবে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে, এক দলের সংগ্রামের গল্পে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে; একইভাবে ’২৪-এ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অভ্যুত্থানকে ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। জনগণ পেয়ে গেল অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের নতুন মালিকের সন্ধান। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. ইউনূস দেশবাসীকে চিনিয়ে দিলেন তার নিয়োগকর্তাদের। সেই নিয়োগে তথা রাষ্ট্রের মালিকানায় আর জনগণের হিস্যা থাকল না।

রাজনৈতিক শক্তিগুলোও বসে থাকল না। চাঁদাবাজ বদলে গেল, চাঁদাবাজি থামলো না। লুটপাট, দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলোতে নতুন কিছু চেহারা বসে গেল। বুঝে নিতে অবশ্য কয়েকটা দিন সময় লেগেছিল মানুষের। শাসনের কেন্দ্রে গণঅভ্যুত্থানের মালিকরা আর সারা দেশে রাজনৈতিক শক্তিগুলো দাপট দেখাতে শুরু করল। ৩৬ দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ফিরে গেল তার পরিচিত চেহারায়। এর মধ্যে বাড়তে শুরু করল নতুন মাল্টিমিলিয়নিয়ারের সংখ্যা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই যে সংখ্যাটা বেড়েছে ৭ হাজারের বেশি। যাদের অধিকাংশেরই নাকি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মানুষ কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের জন্য জীবন দিতে যায়নি। তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, কাঠামোগত সংস্কার। যাতে ভবিষ্যতে আবারও কেউ স্বৈরাচার হয়ে উঠতে না পারে। এই জায়গাতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সম্ভবত পদ্ধতিটা ভুল ছিল। রাজনীতির জটিল ধাঁধা তারা পড়তে পারেননি। পারলেও হয়তো এড়িয়ে গেছেন সচেতনভাবেই। শেষ সময়টাতে মনে হয়েছে, তারা শুধু দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চাইছেন। জুলাই সনদ, সনদ বাস্তবায়ন আদেশ, গণভোট অধ্যাদেশ – সব কেমন এলোমেলোভাবে দ্রুত সামনে আসতে থাকলো। সুতায় কোথায় যেন টান পড়তে দেখা গেল। কোথাও কোথাও সুতা কেটেও গেল। পরিণতিতে নির্বাচিত সরকার এসে জনগণের কাছে করা অনেক প্রতিশ্রুতি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যুক্তি খুঁজে পেল।

গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করল। শুরু হল নতুন অধ্যায়। এটাকে বলা যেতে পারে ‘ফেজ অব ডিনায়াল’। সরকার ও ক্ষমতাসীন দল সম্ভবত ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। নির্বাচিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা স্বৈরাচারবিরোধী সাড়ে ১৫ বছরের লড়াইয়ের সময়ে জনগণের কাছে করা অঙ্গীকার, এমনকি ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগের অবস্থানও ভুলে গেল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানালো সরকার পক্ষ। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের স্বপ্ন শুরুতেই ধাক্কা খেল। এরপর সামনে এলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩ অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করার প্রশ্ন। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্নে জারি করা সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় ও বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল হল। অথচ সরকারি দলের রাজনৈতিক ইশতেহার ৩১ দফায় যার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার, তথ্য অধিকারের মতো অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করার ব্যাপারটাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ল। সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি অবশ্য আলোচনায় আসবে। রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার কোন পথে অগ্রসর হয়, সেটি সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই পরিষ্কার হবে জনগণের সামনে।

দেড় হাজারের বেশি মানুষের জীবনদান এবং বিশ হাজারের বেশি মানুষ চোখ হারিয়ে, পঙ্গুত্ব বরণ করে রাষ্ট্রের মালিকানা বুঝে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু ৫৩ বছরের সেই অধরা স্বপ্ন ভেঙে যেতে ৩৬ দিনের বেশি লাগেনি। তবে জনগণ ভয় কাটিয়ে লড়াই করতে শিখেছে। ভয় যেমন সংক্রামক, সাহসও তেমনি। জুলাইয়ের ৩৬ দিনে যে সাহস করোনা ভাইরাসের চেয়েও তীব্রভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল জনগণের মধ্যে। গণভবনের নিশ্ছিদ্র দেয়াল ভেদ করে যা আক্রান্ত করেছিল সাড়ে ১৫ বছরের প্রতাপশালী স্বৈরশাসক শেখ হাসিনাকে। আবারও নিশ্চয়ই জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে নেবে ৩৬ দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রেরণায়।

লেখক: রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত