শর্ত পাল্টে প্রতিমন্ত্রীর বোনকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিয়োগ

বোরহান উদ্দিন
বোরহান উদ্দিন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলেও, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা অস্বীকার করেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

নিয়োগবিধি বদলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ পাওয়া কর্মকর্তাকে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (চতুর্থ গ্রেড) নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৮ জুলাই সিন্ডিকেট সভায় সুরাইয়া ইয়াসমিনের নিয়োগ অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনি বিএনপি সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের আজাদের আপন বোন।

এই নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠলেও, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তা অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে নয়, বরং প্রশাসনিক প্রয়োজনেই বিধি সংশোধন করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষাজীবনে তৃতীয় বিভাগ থাকায় পূর্বের নিয়োগবিধি অনুযায়ী সুরাইয়া ইয়াসমিন পদটিতে আবেদনের যোগ্য ছিলেন না। কিন্তু, নিয়োগবিধি সংশোধন করে তাঁকে আবেদনের সুযোগ করে দেয় প্রশাসন।

২০২০ সালে সিন্ডিকেট অনুমোদিত নিয়োগবিধি অনুযায়ী, ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে আবেদনকারীর স্নাতকোত্তরে ন্যূনতম দ্বিতীয় বিভাগ (জিপিএ-৫ স্কেলে ৩.৫০ এবং সিজিপিএ-৪ স্কেলে ৩.০০) থাকতে হবে। শিক্ষাজীবনের কোনো পর্যায়েই তৃতীয় বিভাগ গ্রহণযোগ্য হবে না।

রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, সুরাইয়া ইয়াসমিনের উচ্চমাধ্যমিকে তৃতীয় বিভাগ রয়েছে। ফলে এই বিধিতে তিনি আবেদনের অযোগ্য ছিলেন।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। পরে ১৭ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা শপথ নেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি সিন্ডিকেট সভায় নিয়োগবিধিতে ‘অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রে যেকোনো একটি শর্ত শিথিলযোগ্য’ বিধান যুক্ত করা হয়। ১৪ জুলাই ওই শর্ত যুক্ত করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।

দুই বোনের সঙ্গে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
দুই বোনের সঙ্গে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

কর্মকর্তাদের অভিযোগ, এই পরিবর্তনের কারণেই আগে আবেদনের জন্য অযোগ্য বিবেচিত ওই কর্মকর্তা আবেদনের সুযোগ পান।

এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদ বলেন, দীর্ঘদিন কর্মরত অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের সুযোগ করে দিতেই এই বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এটি আগেও ছিল। শর্ত শিথিল করা মানেই নিয়োগ নিশ্চিত নয়; সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশ ও সিন্ডিকেটের অনুমোদনের ভিত্তিতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখার দায়িত্ব

সুরাইয়া ইয়াসমিন ২০০৪ সালে ঢাবিতে উচ্চমান সহকারী হিসেবে যোগ দেন। সম্প্রতি তিনি রেজিস্ট্রার দপ্তরের প্রশাসন-১ শাখায় সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২৫ মার্চ প্রশাসন-৫ (কাউন্সিল) শাখার তৎকালীন ডেপুটি রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেন অবসর-পূর্ব ছুটিতে (এলপিআর) গেলে সুরাইয়া ইয়াসমিনকে ওই শাখার অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়।

ডেপুটি রেজিস্ট্রার এলপিআরে যাওয়ায় অভিজ্ঞতার কারণে আমাকে প্রশাসন-৫ শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সুরাইয়া ইয়াসমিন, নিয়োগ পাওয়া ডেপুটি রেজিস্ট্রার

প্রশাসন-৫ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গোপনীয় শাখা। এখান থেকেই সিন্ডিকেট সভার এজেন্ডা প্রণয়নসহ বিভিন্ন নীতিগত কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সাধারণত অভিজ্ঞ ডেপুটি রেজিস্ট্রারদের এই দায়িত্ব দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কর্মরত থাকা সত্ত্বেও একজন সহকারী রেজিস্ট্রারকে এই শাখার দায়িত্ব দেওয়ায় তখন থেকেই প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এই শাখার দায়িত্ব পেতেও প্রভাব খাটিয়েছিলেন তিনি। ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে নিয়োগ পাওয়ার পরও তিনি একই শাখার দায়িত্ব পালন করছেন।

নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী ডেপুটি রেজিস্ট্রার নিয়োগের সিলেকশন বোর্ডে রেজিস্ট্রার সদস্য হিসেবে থাকার কথা। তবে প্রশাসনিক ভবন সূত্র জানায়, ওই বোর্ডে রেজিস্ট্রার উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়া সরাসরি নিয়োগে লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান থাকলেও, লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই শুধু মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়।

প্রতিযোগী প্রার্থীদের দাবি, মৌখিক পরীক্ষা ছিল কেবল আনুষ্ঠানিকতা। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার তুলনায় রাজনৈতিক প্রভাব বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। ডেপুটি রেজিস্ট্রার পদে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ ১২ জন এবং বাইরের কয়েকজন আবেদন করেন, যাদের মধ্যে অন্তত তিনজন ছিলেন পিএইচডিধারী। তাদের টপকে সুরাইয়া ইয়াসমিনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, ডেপুটি রেজিস্ট্রারের পাঁচ-সাতটি পদ শূন্য থাকলেও, বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র একটি পদের।

দীর্ঘদিন রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) শাখায় কাজ করায় সুরাইয়া সুরাইয়া ইয়াসমিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি। অন্য প্রার্থীরা ভিন্ন শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা তিনি কার আত্মীয়, এসব সিলেকশন বোর্ডের বিবেচ্য ছিল না। বিএম ওবায়দুল ইসলাম, উপাচার্য

অভিযোগের বিষয়ে সুরাইয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘ডেপুটি রেজিস্ট্রার এলপিআরে যাওয়ায় অভিজ্ঞতার কারণে আমাকে প্রশাসন-৫ শাখায় অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।’ তবে নিয়োগবিধি শিথিলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সুরাইয়া ইয়াসমিন ফেসবুকে আছেন কবিতা ডিইউ নামে। এই আইডিতে ফরহাদ হোসেন আজাদের বিষয়ে পোস্ট রয়েছে। এমনকি প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে পরিবারের সদস্য হিসেবে একাধিক ছবিতে আছেন ফরহাদ হোসেন আজাদ।

জানতে চাইলে উপাচার্য বিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত চলমান থাকায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে তাঁকে বোর্ডে রাখা হয়নি। তবে একজন সদস্য অনুপস্থিত থাকলেও কোরামের কোনো সমস্যা হয়নি।’

নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন রেজিস্ট্রার (প্রশাসন) শাখায় কাজ করায় সুরাইয়া সুরাইয়া ইয়াসমিনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বেশি। অন্য প্রার্থীরা ভিন্ন শাখায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচয় বা তিনি কার আত্মীয়, এসব সিলেকশন বোর্ডের বিবেচ্য ছিল না।’

উপাচার্য আরও বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই শিথিলযোগ্য বিধান অনুমোদিত হয়েছিল। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যমান নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ফলে এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ ছিল না।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত