জন্মদিন
মৃদুল মাহবুব

লক্ষ্মী বউটিকে
আমি আজ আর কোথাও দেখি না,
হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে
কোথাও দেখি না,
কতগুলি রাজহাঁস দেখি
নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি,
কতগুলি মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না
শিশুটিকে কোথাও দেখি না!
তবে কি বউটি রাজহাঁস?
তবে কি শিশুটি আজ
সবুজ মাঠের সূর্য, সবুজ আকাশ?
অনেক রক্ত যুদ্ধ গেল,
অনেক রক্ত গেল,
শিমুল তুলোর মতো
সোনারুপো ছড়াল বাতাস।
ছোট ভাইটিকে আমি
কোথাও দেখি না,
নরম নোলক পরা বোনটিকে
আজ আর কোথাও দেখি না!
কেবল পতাকা দেখি,
কেবল উৎসব দেখি,
স্বাধীনতা দেখি,
তবে কি আমার ভাই আজ
ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?
(উচ্চারণগুলি শোকের/ রাজা যায় রাজা আসে)
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে শোকের এই উচ্চারণগুলি কবি আবুল হাসানের। হারানোর বেদনার বিপরীতে এখানে আশা ফিরে এসেছে নতুন দেশের পতাকা বা স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত সত্তা হয়ে। লক্ষ্মী বউ, শিশু, ভাই, বোন—এই সবই বাস্তব, জ্যান্ত। হঠাৎ মিলিয়ে গেছে। কিন্তু তারা স্বাধীনতা, পতাকা, উৎসবের অদেখা এক সত্তা হয়ে ফিরে এসেছে। ব্যক্তির শোক জাতীয় ইতিহাস হয়ে ফিরে আসে। সাধারণ, অতি সাধারণ অনুষঙ্গ নিয়ে এখানে মানুষের ইতিহাস রচিত। এদের কেউই তেমন বড় কিছু নন। মানুষ মরে গেলে, কবরে চলে গেলে সে কবরের মাটিতে মিশে-গলে শুধু ঘাস-ফুল হয়ে জন্মায় না। সে এমন কিছুতে রূপান্তরিত হয় যা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। সে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে। কবি আবুল হাসানের ক্ষেত্রেও বলা চলে এমনটা হয়েছে। তিনি অকালে চলে গিয়েও বিরাট এক কাল্ট ফিগার হয়ে বাংলা কবিতায় ফিরে এসেছেন।
মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।
(মানুষের মৃত্যু হ’লে/ জীবনানন্দ দাশ)
আবুল হাসান ‘মানুষ’ থেকে ‘মানব’ হয়ে উঠেছেন।
২
মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা
বেশ ভালো কথা। শুরুতে মনে হবে, এখানে বেশ রাজনৈতিক একটা ব্যাপার আছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা প্রসঙ্গ আছে। ইরান, ফিলিস্তিনি মিলিয়ে এই কথা হলো একটা ‘প্রোফাউন্ড ট্রু’ বা গভীর সত্য। গভীর সত্য এমন একটি বিষয়, যার উল্টাটাও সত্য, সোজাটাও সত্য।
যেমন ধরুন, তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’র সূচনা। সকল সুখী পরিবার এক রকম, কিন্তু অসুখী পরিবার ভিন্ন ভিন্ন। এর বিপরীতটাও সত্য। মানে, আমি যদি বলি, অনেক সুখী পরিবারের সুখও ভিন্ন ভিন্ন, তাতেও কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। দুটো কথাই সত্য। কিন্তু আর্টে প্রোফাউন্ড ট্রু ইজ অ্যা বিগ ম্যাটার। এই কবিতাও তেমন এক রাজনৈতিক সত্য নিয়ে হাজির হয়। জাতিসংঘ ইসরায়েলি, আমেরিকান, ইউরোপিয়ানদের মৃত্যু গুরুত্ব সহকারে দেখে। বিবিসি, সিএনএন দেখলে বুঝবেন। ফলে, মৃত্যু জাতিসংঘ যে নেয় না, সেটা সাবার্থে সত্য নয়। ফলে, গভীর এক বিপরীতমুখী উচ্চারণ নিয়ে কবিতাটি শুরু হয়।
আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে
আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,
সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন
কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের
ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর…
বেশ ভালো কথা। মানে দুনিয়া থামছে না কবি যাই বলুক, এটা আবুল হাসান জানতেন। তিনি দর্শকের ভূমিকায় চলে গেলেন
মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম
পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলোনা!
তিনি মাত্র দর্শক হয়ে থাকলেন না। মানুষের চাঁদে যাওয়া একটা দৃশ্য প্রকল্প, স্নায়ু যুদ্ধের নন্দন। নাসার বেশিরভাগ আবিষ্কার মিলিটারি ইনভেনশনে কাজে লাগে। এটা দুনিয়াকে শক্তি সংগত করার জন্য দেখানো হয়েছে। এটাও হাসান জানতেন। শান্তির জন্য মানুষ চাঁদে যায়নি। কিন্তু বছরের পর বছর এটাকে বিজ্ঞানের নামে আমরা পাঠ্য বই থেকে শুরু করে হাজার হাজার বই লিখে, তাদের গেলানো শান্তির বিজ্ঞানের জ্যোতির্ময় আলোতে আলোকিত হলাম।
পৃথিবীতে তবু আমার মতোন কেউ রাত জেগে
নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্রের এত অভিমান দেখলোনা!
আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা
সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম,
সুধীবৃন্দ, তবু জীবনে কয়বার বলুন তো
আমরা আমাদের কাছে বোলতে পেরেছি,
ভালো আছি, খুব ভালো আছি?
(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন /পৃথক পালঙ্ক)
বিপুল এক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হওয়ার পরিবর্তে তিনি শেষে এসে নিজের ভেতর বা তাঁর মতো আত্মগুটানো মানুষে পর্যবসিত হলেন। তিনি এই কবিতাকে অতি উচ্চ স্বরে নিয়ে যেতে পারতেন। তার সব উপাদানই এখানে ছিল। কিন্তু তিনি নিজেকে থামলেন। ভালো আছি, তারপর খুব ভালো আছি। এরপর প্রশ্নের যতি দিয়ে থেমে গেলেন।
হাসানের ভেতর সভ্যতা নিয়ে একটা অভিমান মনে হয় ছিলো। আরও অনেক কবিতায় তার উদাহরণ পাওয়া যায়। এই অভিমান তিনি বর্ণনা করেন মাত্র, কোনো মতামত দেন না, বা চমকিত, রহস্যময়, আধ্যাত্মিক কিছু বলতে চান না পাঠককে। তিনি নিজের সাধারণ জীবন নিয়ে বসে থাকেন।
৩
আমাকে যে অনুতপ্ত হতে বলল, কার জন্যে অনুতপ্ত হবো আমি?
কার জন্য অনুশোচনার জ্বলন্ত অঙ্গারে আমি ছোঁয়াবো আমার ঠোঁট?
দিন দিন আমার অধঃপতন পাহাড় কেবলি উঁচু হচ্ছে,
এত দাহ এত পাপ!
আমার পায়ের নখ থেকে মাথার প্রতিটি চুলে এত অপরাধ!
কেন আমি অপরাধ স্বীকার করব? এত এত অপরাধের পরও আমি অপরাধ স্বীকার করতে নারাজ। কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এটা জেনেই আমরা জীবন কাটাই। কিন্তু পরিশুদ্ধ জীবন বলে কিছু নেই। ফলে, জীবনে একটা দ্বিধা থাকতে পারে, তবে সেই অনুশোচনাকে আমি অস্বীকার করি। সে অপরাধ স্বীকার করতে রাজি, কিন্তু কোনো নৈতিকতায় বশীভূত সে হতে চায় না।
হাঁটু ভেঙ্গে একদিন আমার বুকের মধ্যে এসে পড়বে
কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন।
হাত তুলে আর আমি কাউকে ডাকবো না কোনোদিন!
সেই দুঃসহ দিনের কথা ভেবে অনুতপ্ত হবো আমি?
কিন্তু কেন, কার জন্যে অনুশোচনার জ্বলন্ত অঙ্গারে আমি
ছোঁয়াবো আমার ঠোঁট?
অনুতপ্ত হবো আমি বিশেষ নারীর জন্যে?
সেই আমার প্রত্যাখাত প্রথম পুষ্পের জন্যে ফের অনুতাপ?
বাংলা কবিতার চূড়ান্ত অস্বস্তিকর ঘটনা আছে এরপর। এমন মারাত্মক ঘটনা বাংলা কবিতায় নেই, অল্পবিস্তর যা পড়েছি তাতে এই ঘটনা বিরল।
কিশোর বয়সে একদিন আমার শরীর জুড়ে
গোলমরিচের ঝা ঝা গুড়োর মতোন তীক্ষ্ণ জ্বর নেমেছিল,
মনে আছে সেই জ্বরের রাত্রিতে জেগে জেগে জানিনা কখন
আমি মায়ের পাশেই…?
হঠাৎ নিদ্রা ভেঙ্গে যেতে দেখি মধুর চাকের মতো অন্ধকার!
মনে আছে ভল্লুকের মতো বাবা নুয়ে এসে সে আঁধারে কার
টেনে টেনে ছিঁড়েছিল জটিল যৌবন?
সে রাতে আমার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিল,
মনে আছে অন্তলীন আমার চীৎকার?
একজন কিশোর বাবার সঙ্গম-দৃশ্য উপলব্ধির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনা কী ঘটছে তা জ্বরের ঘোরে কিশোর কিছুটা বুঝেছিল বৈ কি! ‘মনে আছে ভল্লুকের মতো বাবা নুয়ে এসে সে আঁধারে কার টেনে টেনে ছিঁড়েছিল জটিল যৌবন?’ এখানে পরিস্কার নয়, বাবা তার মায়ের প্রতি নুয়ে এসেছিলেন কিনা? নাকি অন্য কারো। তবে কিশোরের যে জ্বর তপ্ত রাত সেখানে সাধারণত বাবা-মাই থাকেন। ফলে, বাবা মায়ের সঙ্গম দৃশ্য কয়জন দেখেছেন জীবনে? কয়জনই তা ব্যক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু যারা দেখেছেন এই দৃশ্য, তাঁরা কোনোদিন কোথাও বলতে বা লিখতে পারেননি। আবুল হাসান সেই ইয়ংয়ের ছায়ার উৎক্ষেপণ করেছেন—ঘটনা অস্পষ্ট, অর্ধ-স্মৃত, ঘোরগ্রস্ত, ভাষা নিজেই মধুর চাকের মতো অন্ধকারে বিলীন। অসুস্থ সন্তানের পাশে বাবা মায়ের সঙ্গম!
শুকনো পাতার মতো আমার চীৎকার থেকে ঝরে পড়া মা’র সেই হাত,
সেই রুগ্ন বিষণ্ণ আঙ্গুল-মার মানসিক অনিন্দ্র দহন!
তারও শেষ বিষণ প্লাবন যদি সময়ের তোড়ে গেল
তবে আর কার জন্যে অনুতপ্ত হবো আমি?
কার কাছে বয়ে নিয়ে যাবো এই কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন?
এর চেয়ে অস্বস্তিকর উচ্চারণ বাংলা কবিতায় খুব কম আছে। কার জন্য অনুতপ্ত হব আমি? কার কাছে বয়ে নিয়ে যাব এই কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন? এর কোনো উত্তর নেই। দরকারও নাই। তবে উত্তরহীন এই কবিতা এমন এক অস্বস্তির মুখোমুখি করে পাঠককে, যা তার ভেতরের একই রকম চাপা পড়া দৃশ্যগুলোকে স্পষ্ট করে, মা-বাবার সঙ্গম দৃশ্য কোনো সুখকর অনুভূতি কারো জন্য না, তবে এর অস্তিত্ব আমরা টের পাই যদিও কোনদিন ভাষায় প্রকাশের মতো নায়কের হৃদয় আমরা অর্জন করে উঠতে পারি না।
বাংলা ভাষায় ‘অনুতাপ’-এর গুরুত্ব কী? মানুষ মুখোশ খুলে ফেলে, এতে কোনো অপরাধ নেই, অনুতাপের কিছু নেই।
সাহিত্য নৈতিকতা তৈরি করতে চায়, এই প্রবণতা তার আছে এবং তা আরোপিত হয় সমাজের ওপর। সারা দুনিয়ার চলচ্চিত্রে যেমন ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ দেখাতে হয়, আমাদের লালনও তাই, রবীন্দ্রনাথ বা পাড়ার মোড়ের বড় ভাই কবির কবিতাও তাই। এই যে শিল্প সাহিত্যে ধারণ করা নৈতিকতার যে আবহমানতা, আবুল হাসান এসবে ধার ধারে না। কীসের কী অনুতাপ! আমি কিছুই স্বীকার করব না। চূড়ান্ত আধুনিক মানুষের প্রতিচ্ছবি। কোনো ভড়ং নাই। বাংলা ভাষায় অনেক আধুনিক কবিতা লেখা হয়েছে। এরা এই আবহমান নৈতিকতার সিলসিলাই বহন করছে। ফলে অনেক আধুনিক ভাষায় লিখিত আধুনিক কবিতা মূলত মোরালিটির প্রশ্নে খুব আলাদা হতে পারেনি। কিন্তু হাসানের ভেতর স্খলিত নৈতিকতার এমন একটা ব্যাপার আছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। সত্য হলো, আধুনিক মানুষের যে প্রবণতা তাও স্খলিত। সেই আধুনিক মানুষের উপস্থিতি হাসান ছাড়া অন্যদের কবিতায় নেই বললেই চলে।
দেখুন কবি কী বলে!
নদীর পারের কিশোরী তার নাভির নীচের নির্জনতা
লুট করে নিক নয়টি কিশোর রাত্রিবেলা
আমার কিছু যায় আসেনা,
খুনীর হাতের মুঠোয় থাকুক কুন্দকুসুম কি আসে যায়?
প্রেমিক করতলে না হয় লুকিয়ে ফেলুক ফুলের ফণা কি আসে যায়?
শিশুর মাথায় সাপের মতো বুদ্ধি খেলুক আমার তাতে কি আসে যায়?
(নির্বিকার মানুষ/ যে তুমি হরণ করো)
আবুল হাসান পড়তে গেলে পাঠক নিজেকে দেখতে পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে নৈতিকতার জার্নি, তার সঙ্গে হাসানের কবিতা-প্রবণতা প্রবলভাবেই যায়। ফলে, মানুষ যখন মুখোশ পড়তে শেখে, যৌবন পার করার পর তখন হাসানকে অস্বীকার করতে শুরু করে। ফলে, কিশোর কবি নিজের পাপকে আবিষ্কার করতে শুরু করে হাসানের কবিতার ভেতর দিয়ে। ব্যক্তি যত পাপ আবিষ্কার করতে পারে, তত সে বড় হয়। আদম-হাওয়া পাপের ভেতর দিয়ে স্বর্গের ধারণা অস্বীকার করে আরও মহৎ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে দুনিয়ায়। সেই মহৎ ধারণার নাম ‘মনুষ্যত্ব’ যা পাপের ভেতর দিয়ে অর্জন হয়েছে আদি পুরুষ ও নারীকে।
ফলে, একজন তরুণ যা যা অনুভব করে তার সবই হাসানে পায়। এরপর সমাজ দমিত মানুষ তৈরি করতে তাকে নৈতিক শিল্পের কলকারখানায় পাঠায়। সেই কিশোর একদিন হাসানকে ভুলে যায়।
৪
টেরি ঈগলটনের একটা যুক্তি ছিল—সাহিত্যে পড়ার যোগ্য, মহৎ হিসাবে যা প্রতিষ্ঠা করা হয় তা খুব নিরপেক্ষ বিষয় নয়। এটা ক্ষমতা কাঠামো, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ন্ত্রকদের প্রয়োজন অনুসারে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে, সমাজ প্রভু ঠিক করে কোনটা মহৎ সাহিত্য আর কোনটা নয়। ফলে, ভালো সাহিত্য নামে আমরা যা পড়ি তা নির্দিষ্ট কিছু ভ্যালু, নৈতিকতা, অভ্যাসের সমষ্টি।
সাধারণত একজন লেখক বা কবিকে প্রতীকায়ন করা হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বামপন্থী রাজনীতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা গেছে সহজে। সুকান্ত বেঁচে থাকলে যে দলছুট হতে পারত না, তা বলা যায় না। অকালপ্রয়াত কবির ক্ষেত্রে কাজটা সহজ। উদাহরণ হিসাবে আল মাহমুদের কথা বলা যায়। তিনি যদি তাঁর প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলো রেখে অকালে চলে যেতে পারতেন, তবে তাঁর ওপর বাম ও তথাকথিত সেক্যুলার তকমা সহজেই এঁটে দেওয়া যেতে। কিন্তু তিনি কবি হিসাবে বেঁচে ছিলেন জন্যই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো সমাধান করা যায়নি। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের তরুণ বিপ্লবী অনেক কবিই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের নামে দালালি করেছেন ক্ষমতার। তাঁদের মহৎ সাহিত্যের জোরে শোষণের পক্ষে সামাজিক সম্মতি উৎপাদন করেছেন। কিন্তু একজন তরুণ কবি মারা গেলে তাঁকে নিজের পক্ষে বা বিপক্ষে ফেলা যায় সহজেই। ফলে, অকালপ্রয়াত কবিরা বেশির ভাগই সাহিত্য-শেয়ালের পাল্লায় পড়েন, যা একত্রে হুক্কা-হয়া, হুক্কা-হুয়া বলে একটা ছাঁচের ভেতর তাঁকে বড় করে তোলেন। ফলে, এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতির পক্ষে, ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে, পাঠ্য বইয়ে স্থান দেওয়ার মতো নৈতিকতার পক্ষে লিখিত কবিতাই মহৎ কবিতা।
ফলে, সাহিত্য, সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কবিতা বোদ্ধা, প্রকাশনা সংস্থা, পুরস্কার কমিটি সেই লেখাকেই প্রমোট করবেন যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে না। উল্টা ঘটনাও সত্য। যারা ক্ষমতার পরিবর্তন চায় তারাও নিজেদের পক্ষের এমন লেখক গড়ে তুলতে চাইবেন, যাকে দিয়ে উক্ত চলমান ব্যবস্থাকে ‘প্রতিস্থাপন’ করা যায়। তারাও পরিবর্তন চান না, প্রতিস্থাপন চান। এসব উদাহরণ খুব দূরবর্তী নয়। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের দিকে তাকান আমাদের সমাজের সুসাহিত্যিকদের যে শ্রেণি ছিল, তা গুণে কর্মে একই রকম একটি গ্রুপ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এটা এই আলোচনার স্থান নয়, তাই এটা নিয়ে এর বেশি না বলি। যারা সমাজে পরিবর্তন চান না বা স্থিত অবস্থায় দেখতে চান বা ক্ষমতার দালাল তারা বেশির ভাগ ‘সাহিত্যের ক্যানন বা মহৎ সাহিত্য’কে প্রমোট করে। আর এর বিরোধী শ্রেণি নিয়ে আসে ‘বিদ্রোহী’। এরা যখন ক্ষমতায় যায় এই বিদ্রোহই হয়ে ওঠে লিটারারি ক্যানন, মহৎ সাহিত্য। এক সময়ের রিবেল কবি নজরুল এখন আমাদের জাতীয় কবি। নজরুলের বিদ্রোহী ভাবকে ততটুকুই কাটা হয়েছে যতটুকু রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে লাগে। ফলে, সেনানিবাসের দেওয়ালে লেখা আছে, ‘উন্নত মম শির’।
ফলে, সমাজ একজন কবিকে এত সহজে ভালোবাসে না। আমরা কোন কবিকে ভালোবাসবো তা আমাদের শেখানো হয়। ফলে, কবিকে করুণ ও মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজগুলো সুবিধা হয়। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম সেই যুগে কলকাতায় ক্রাইসলার ব্র্যান্ডের গাড়ি ছিল। নজরুলের রুটির দোকান বা লেটোগানের দলের গল্প পাঠ্যপুস্তকে দশকের পর দশক লেখা হয়েছে। কিন্তু কোনোদিন নজরুলের সচ্ছলতার, আয়-ইনকামের কথা লেখা হয়নি। কেন? এক, শাসকের পক্ষ থেকে দরিদ্রতাকে মহান করে তোলা হয়েছে। সমাজে দরিদ্র লোক থাকে এই দায় ও ব্যর্থতা সরকারের। গরীব থাকা মোটেও আনন্দের কিছু না। তারপরও জনগণকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভাবে শেখানো হয়েছে দারিদ্রতা এক মহান বিষয়। অন্যদিকে যারা নজরুলকে সাহিত্যের ক্যানন তৈরি করে তুলেছিলেন তারা টাকা পয়সাকে রাজনৈতিকভাবে ঘৃণা করতেন, ব্যক্তিগত ভাবে নয়। ফলে, তারাও চায়নি যে নজরুল বড়লোক হয়েছিল মানুষ তা জানুক। সাহিত্যের সমাজ এভাবেই চলে।
কবিতায় আবুল হাসান অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর। তাঁর অকাল মৃত্যু হলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রকল্পে ক্যানন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। সে এখানে অনফিট। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখক হিসেবে প্রমাণের কিছু লেখাপত্র আছে সরকারি লেখকদের পক্ষ থেকে যা খুবই হাস্যকর। কেননা তাঁর পয়লা কবিতার বইয়ের নাম ‘রাজা যায় রাজা আসে’। তিনি যা বলেছেন এই ক্ষমতার বদল নিয়ে, নতুন বাংলাদেশ নিয়ে সেখানে তাঁর স্থান দেওয়া জোর করে প্রতিষ্ঠার মতো ব্যাপার। দেশপ্রেমের মতো জাতীয়তাবাদী গান তিনি গাইতে পারেন নি, কেননা তিনি প্রকৃত কবি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণদের থেকে অনেক দূরবর্তী কবি তিনি। আবার বিরোধী পক্ষের জায়গা থেকেও তাঁকে খোপে আটানো দুষ্কর।
আবুল হাসানের কবিতা এমন যে, তাঁকে আপনি ফিট করতে পারবেন না। ফলে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে মানুষ যত ক্ষমতা কাঠামোর নিকটবর্তী হবে ততই হাসানকে অকালপ্রয়াত কবির তকমায় আটকে রাখবে।
হাসানের ‘কুরুক্ষেত্রে আলাপ’ মূলত কুরুক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটকে ধার করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কথা—
আমার চোয়ালে রক্ত হে অর্জুন আমি জানতাম, আমি ঠিকই জানতাম
আমি শিশু হত্যা থামাতে পারবো না, যুবতী হত্যাও নয়!
ভ্রূণহত্যা! সেতো আরো সঙ্ঘাতিক, আমি জানতাম হে অর্জুন
মানুষ জন্ম চায় না, মানুষের মৃত্যুই আজ ধ্রুব!
৭১ বিজয়ের পর যখন দিকে দিকে স্বাধীনতার স্তুতি লেখা হচ্ছে, তখন পাণ্ডবদের জয়ের পরও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি। নিদারুণ বিদ্রুপ তার কবিতা ফিরে ফিরে আসে।
আমার নাভিতে রক্ত-আমি জানতাম আমি ঠিকই জানতাম
আমি মানুষের এই রোষ থামাতে পারবো না, উন্মত্ততা থামাতে
পারবো না।
দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রবিপ্লব আমি থামাতে পারবো না
চালের আড়ত থেকে অভিনব চাল চুরি থামাতে পারবো না,
রিলিফের কাপড়ে আমি মানুষের অধঃপতন ঢাকতে পারবো না!
হায় বাংলাদেশ! রিলিফের কাপড়, চাল চুরি, দুর্ভিক্ষ, ত্রাণ-দুর্নীতি সবইতো তাঁর কবিতায় লিখিত হলো। রিলিফের কাপড়ে আমি মানুষের অধঃপতন ঢাকতে পারব না!—বিদ্রুপ। শুধু বিদ্রুপই নয়, কবি এর সবই জানতেন, হে অর্জুন আমি জানতাম। আমাদের এই পতন অনিবার্য। বছরের পর বছর আপনি স্বাধীনতার মহত্ত্বের কথা শুনেছেন। কিন্তু কোনো পাঠ্য বইয়ে এই কবিতা সংযুক্ত করা কি সম্ভব!
আবুল হাসান নিষ্ঠুর। কবিতার মতো পেলব শব্দের শাখায় শবফুল ফোঁটালেন তিনি। দেখুন—
শেফালীর সোমত্ত গ্রীবায় লাগবে লাম্পটের লালা আর বিষ
আমি জানতাম হে অর্জুন অনাহারে অনেকেই যুবতী হয়েও আর
যুবতী হবে না!
ভাই পলায়নে যাবে বোন তার বাসনা হারাবে আমি জানতাম
ফুল ফুটবে না, ফুল ফুটবে না, ফুল আর ফুটবে না, ফুল আর কখনো
ফুটবে না!
ফুল ফুটবে না, বারবার বলছেন। গ্রামে কেউ মারা গেলে রমণীরা যেভাবে বিলাপ করে, সেই করুণ সুর। স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে।
বকুল-বৃক্ষদের এইভাবে খুন করা হবে সব গীতিকার পাখিদের
এইভাবে গলা, ডানা স্বরলিপি শব্দের পালকগুলি
ভেঙে দেয়া হবে আমি জানতাম
তিতির ও ঈগল গোত্রের সব শিশুদের এইভাবে ভিক্ষুক পাগল
আর উন্মাদ বানানো হবে
ভারতীয় যুদ্ধের উৎসবে আজ এই শুধু আমাদের
ধনুক ব্যবসা,
আমি জানতাম, হে অর্জুন,-আমি ঠিকই জানতাম।
(কুরুক্ষেত্রে আলাপ/ যে তুমি হরণ করো)
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ ছিল। এই যুদ্ধ জয়ের পরও অর্জুনের বংশ বিনাশ হয়। হাসান সবই জানতেন, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো। পুরাণের ইতিহাসে ন্যায়যুদ্ধে বিজয়ের পর পতন অনিবার্য, তা তিনি লিখেছেন কবিতায়। লক্ষ্য করুণ—‘ভারতীয় যুদ্ধের উৎসবে আজ এই শুধু আমাদের/ধনুক ব্যবসা’। মহাভারত নাকি ভারত— একটা ভ্রম তৈরি হয়। বাংলাদেশে যারা মহৎ কবি হতে পেরেছেন, তাঁদের কার কবিতায় এই সমস্ত কথা আছে, এতটা সরব ও বিস্তারিত ভাবে।
৫
আবুল হাসানের কবিতা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক লেখালেখি পাওয়া যায়। তার সমসাময়িক কোনো কবি এতটা আলোচিত নন মনে হয়। তবে এই আলোচনা নির্বিষ এক হাসানকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। কবিতা আলোচনায় ক্যাটাগরাইজেশন প্রচলিত একটি বিষয়। এতে খুব সহজে কবিকে আবিষ্কার করা যায়। এর সুবিধা হলো, খুব সহজেই একজন কবিকে কবিতার এক এলাকায় ঠেলে দেওয়া যায়। কবিতা কমন যে যে ক্যাটাগরিতে আলোচিত হয় তার একটা লিস্ট করা যাক:
ফলে, আবুল হাসান নিয়ে বাংলা ভাষায় যত কাজ হয়েছে, তার বেশিরভাগই ক্যাটাগরিক্যাল আলোচনা। এই সব তথ্য উপাত্ত হিসেবে ভালো, কিন্তু আমাদের তেমন কাজে আসে না। আমি আবুল হাসানকে অন্য একটা জায়গা থেকে ‘মার্ক’ করতে চাই। এই প্রবণতা অনেক কবির ভেতর আছে হয়ত। কিন্তু হাসান কেমন এই রাস্তায়? কিন্তু তা আমরা তা অনুধাবন করলেও হয়তো লিখিনি। এই আলোচনায় ঢোকার আগে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপটা বোঝা দরকার।
জাতীয় সাহিত্যকে দুই দিক থেকে দেখতে হবে। প্রথম বিষয়টা খুব সোজাসাপ্টা। বাংলা ভাষা ও এই ভাষা ধারণকারী ভূখণ্ড ও তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও কালপর্বে রচিত সাহিত্যে। খুব সরলভাবে বাংলাভাষায় বাংলাদেশে রচিত সাহিত্যই আমাদের জাতীয় সাহিত্য। এটুকু বললে সব বলা হয় না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো আদর্শিক বা বিধানমূলক। এই আদর্শ কীভাবে গড়ে ওঠে ও কাজ করে সেই কথা আগেই বলেছি। দ্বিতীয়বার আর বলার দরকার নাই। এটা একটা ভারবাহী ব্যাপার। শিল্পের এই আদর্শের ওজন আত্ম-পরিচয় হিসাবে নির্দেশিত হয়। একে ভালোবেসে বোদ্ধারা জাতির স্বতন্ত্র ‘প্রাণ’ বলে ডাকে। জাতি বিষয়টাই কাল্পনিক এক ধারণা। সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সেই কল্পনাকে সম্প্রসারণ ও ধরে রাখা হয়। অগণিত আলাদা আলাদা মানুষকে ‘আমরা’য় রূপান্তরিত করা হয়। ফলে, জাতীয় সাহিত্য সব সময় গণমুখী, ভবিষ্যতগামী, গঠনমুখী, সর্বোপরি পরিত্রাণমূলক— সে নানা দায় নিয়ে আগায়।
বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপ হলো তা ধর্মনির্ভর না হয়ে ভাষা দ্বারা বিশেষায়িত (১৯৫২)। এই ভাষা রক্ষার ভিত্তিতেই তার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কল্পনা। ১৯৭১ এ যে দেশ গঠিত হলো তা কোন অর্থেই ধর্মাশ্রয়ী না। ভারত-পাকিস্তানের বিভাজন ধর্মভিত্তিক। বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিভাজনের সীমারেখা ন্যায্যতার ভিত্তিতে মানুষের মুক্তি, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, সামাজিক আগ্রগতিই এর প্রাণভ্রমরা। ফলে, বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্যানন রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্দীন হয়ে যুদ্ধোত্তর কবিদের নিয়ে গড়া একটি সমষ্টির স্বর হিসেবে সন্মিলিত—কবি সেখানে জনতার কণ্ঠস্বর, ঘোষক। এই জাতীয় এমন সন্মিলিত জাতীয় সাহিত্যের যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি এর ঝুঁকিও প্রবল।
বিধান বা আদর্শ অর্থে যে জাতীয় সাহিত্য তার লক্ষ্যকে আবুল হাসান চুরমার করে দেন। এই ভাঙনটাই তার তাৎপর্য ও গুরুত্ব। তার অনেক কবিতা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রুগ্নতাকেই খুলে মেলে দেখায়। সমষ্টির বিপরীতে তিনি মানুষের একাকিত্ব নিয়ে ফিরে আসেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে মতাদর্শের লড়াইয়ের মাঠে বহু কবি ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে উঠেছেন। যখন নানা রাজনৈতিক দলের হাতিয়ারে পরিণত হতে কবিরা মরিয়া তখন আবুল হাসান ‘আমরা’-কে বিজারিত করে আরও বেশি ‘আমি’ হয়ে উঠছেন। তিনি জেনেছেন, ‘মানুষ একা।’ ১৯৭২ সালেই মাত্র দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ পত্রে তিনি লিখেছেন, ‘উৎসর্গ আমার মা আমার মাতৃভূমির মত অসহায়।’ মা, দেশ মাতা হলো জাতীয় সাহিত্যের মূর্তি। তাই তিনি ভেঙে দিলেন। তিনি জাতির শরীরের ভেতর দাঁড়িয়ে জন্ম নয় একে ধ্বংস করে দিতে চান যেন নতুন কিছুর জন্ম হয়। জাতীয় সাহিত্যের যে লক্ষ্যতত্ত্ব থাকে তার থেকে বেশ দূরবর্তী তিনি। ফলে, লক্ষ্য করলে দেখবেন আবুল হাসান সমগ্রে শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম দুটি বই রাজা যায় রাজা আসে, ‘যে তুমি হরণ করো’ থেকে পৃথক পালঙ্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এর কারণ শামসুর রাহমানদের মতো জাতীয় সাহিত্য তৈরি করা ‘বিগ বয়’দের অবচেতন।
৬
সম্ভবত আহমদ ছফা তার ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘যদি মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বা ভিনগ্রহের সত্তা পৃথিবীতে এসে মানুষের প্রকৃতি বুঝতে চায়, তাহলে গ্যোটের ফাউস্ট তাদের হাতে তুলে দিলেই মানুষের সত্তা, আকাঙ্ক্ষা, জ্ঞানপিপাসা, মহত্ত্ব ও পতনের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া যাবে।’ একই কথা আবুল হাসানের কবিতার ক্ষেত্রেও খাটে। হাসান বেঁচে ছিলেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত। ফলে বাংলাদেশ গঠনের কালপর্ব এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ ১৯৭৫ পর্যন্ত তিনি খুব নিবিড়ভাবে দেখেছেন। ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে সাবজেকটিভ (প্রত্যক্ষ), সিম্বলিক (প্রতীকী) ও সিস্টেমেটিক (পরোক্ষ) ভায়োলেন্স বা সহিংসতা বাংলাদেশের দেখা গেছে তার এমন নিপুণ সাহিত্যিক আত্তীকরণ আবুল হাসান ছাড়া আর কোথায় খুঁজে পাবেন? মানুষ সহিংসতা লুকিয়ে রাখতে চায়। হাসান কোনো কাব্যিক আড়াল রাখেননি। যা দেখেছেন তাই কবিতায় জারণ করে নিয়েছেন।
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে ডাইনীর মতোন কেন কোমর বাঁকানো
একটি চাঁদ উঠবে জ্যোৎস্নায়
উলুকঝুলুক গাছ,
মানুষের খোলা, আকাশের নীচে রেস্তোরাঁয়
এখানে সেখানে,
সবদিকে
কেন এত রক্তপাত হবে? গুপ্তহত্যা হবে?
কেন জীবনের দ্রব্যমূল্য বাড়বে এত শনৈঃ শনৈঃ
কেন ফুরাবে এমন আমাদের পকেটে সিগ্রেট,
খাদ্য, রূপালী আত্মার ঘ্রাণ রমণী ও টাকা?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে কেন পাওয়া যায় না প্রেমিকা?
কেন মোমের আলোর শিখা আজকাল
ধীরে জ্বলে,
ধীরে জ্বলে, মাঝরাতে
মহিলার শাড়ি কেন সভ্যতার শোভার মতন
খুলে যায়।
নেমে যায়, আজকাল
কেন এত সহজেই ভেঙে পড়ে কালো চোখ, কোমল যৌবন?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে কিশোর চেনেনা কেন ঘাস ফুল? ঘাস কেন সবুজের বদলে হলুদ?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে নয়টি অমল হাঁস
থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়?
ভালোবাসা, কেবলি…কেবল একটি
বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা হয়?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে মানুষের দরোজায় টোকা দিলে কেন আজ দরোজা খোলে না?
“বৃষ্টি হলে গা জুড়োবে” কেউ কেন বলেনা এখন?
(একটা কিছু মারাত্মক/ রাজা যায় রাজা আসে)
অনেকগুলো কেন নিয়ে এই কবিতা। লক্ষ্য করুন, ‘রক্তপাত, গুপ্তহত্যা, কেন জীবনের দ্রব্যমূল্য বাড়বে এত শনৈঃ শনৈঃ, নয়টি অমল হাঁস / থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়, বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা’ —একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো যোগ মনেহয় নেই। সমাজে এটা যে মারাত্মক কিছু, প্রত্যক্ষ হিংসার ঘটনা ঘটে রোজ তার একটার সঙ্গে অন্যটার কোনো যোগসূত্র নেই। আসলেই নেই? একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও। অদৃশ্যের এক ব্যবস্থা, যা পুরো বাস্তবতাকে সহিংস করে তুলেছে। বারবার কবি প্রশ্ন করছেন, কেন এমন ঘটছে? উত্তরটা কবিতায় দেননি। এর আভাস থেকে আমাদের খুঁজে পেতে হয়। এই যে এত এত রক্তপাত, গুপ্ত হত্যা-এর কারণ অপরাধটা কাঠামোগত। পুরাতন কাঠামোটাই স্বাধীনতা পরবর্তী মহাজনরা টিকিয়ে রাখল। আমরা মারাত্মক ঘটনাটা দেখতে পাই। কিন্তু এই কেন’র উত্তর পুরো ব্যবস্থাটার ভেতর। ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশেও এই ‘একটা কিছু মারাত্মক’ অনেক জায়গায় ঘটেছে, যা পূর্ববর্তী ব্যবস্থারই এক্সটেনশন। ফলে রাজা যায়, রাজা আসে।
একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক চিত্র—বিজয়ের সরকারি আখ্যানের নিচে চাপা পড়া বাস্তবতা আবুল হাসান তার বাস্তব-সময়েই লিখেছেন। তাঁর কবিতা গ্রন্থগুলোর সময় দেখুন—রাজা যায় রাজা আসে, ডিসেম্বর ১৯৭২ এর বিজয়ের মাসে প্রকাশিত, কবিতাগুলো পড়লে শিউরে উঠবেন। যে তুমি হরণ করো ১৯৭৪, মন্বন্তরের বই। ১৯৭৫ পৃথক পালঙ্ক খুলে ধরে গুম-খুন, নিমখুন। গুমখুন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনা। স্বাধীনতা বাংলাদেশে পাকিস্তানের দমনপীড়ন, ব্যবস্থাপনার কোনো পরিবর্তনই সাধন হয়নি। এক রাজা গিয়ে আরেক রাজা এসেছে। ফলে হাসানের কবিতায় আপনি গুম-খুন খুঁজে পাবেন। আজ অব্ধি ঐতিহাসিকভাবে এটাই আমাদের বাস্তবতা।
হত্যা হয়, হীরা ভস্ম হয়, মেধা ঝরে যায়, তবু
কুমোরের চাকা ঘোরে,
চাকা ঘোরে হাজার বছর।
যুদ্ধের যাত্রায় সাজে মহাকাল,
ওলট-পালট করে কতনা শহর
সভ্যতার বুক থেকে খসে যায়
কতনা নহর, তরু, জলপাই, অভ্র, অবসর।
দেশে দেশে নিমখুন, গুমখুন কত,
ভূতে পাওয়া জ্বঘাতক, পাতক, বদমাশ,
হাঁস ফেলে ঘরে তোলে লাশ!
সে তবু সন্ধ্যায় আজো আলো তোলে
শিশুর সবুজ জন্ম তুলে নেয় কোলে!
সে তবু সত্তায় আজো পুষে পুণ্যবান
পতিত জমির মতো থাকে অপেক্ষায়
কবে যেনো এ কলুষ যায়!
হত্যা হয়, হীরা ভস্ম হয়, মেধা ঝরে যায়, তবু
কুমোরের চাকা ঘোরে
চাকা ঘোরে হাজার বছর!
(চাকা/পৃথক পালঙ্ক)
গুম-খুন, নিমখুন করে কারা ঘরে হাঁসের পরিবর্তে লাশ তুলেছিল? সময়টা বুঝতে এই কবিতার আশ্রয় আমাদের লাগে। সেই অস্থির সময়ে হাসানের অনেক কবিতাই মানুষকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে দমনের যে চিত্র তার কাব্যিক ভাষ্য। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-এর নানা রূপ তাঁর কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে।
আরও অনেক লাইন উদাহরণ হিসেবে আনা যাবে হাসানের কবিতা থেকে। ফলে আবুল হাসান আমাদের জাতীয় সাহিত্যের যে প্রকল্প তাতে তছনছ করেছেন। তাঁর সমকালের নির্মলেন্দু গুণ বা রফিক আজাদের ঘোষণামূলক রাজনৈতিক কবিতা থেকে আলাদা করে। রাষ্ট্রে হাসান থেকে তারাই গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে ওঠেন সময়ের ব্যবধানে। কবিতা সমাজ পরিবর্তন করে না। তবে সে দেখার দৃষ্টি দান করে। মানুষ ইতিহাস জানতে শিল্প বা কবিতার সহায় হন। ফলে, কবিতায় রচিত স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশর ইতিহাস দেখতে হলে আবুল হাসান অনিবার্য। মুদ্রার এপিঠের কবিতা সবাই লিখেছে। ওপিঠ দেখার জন্য আবুল হাসান ছাড়া আর কার কবিতার কাছে আমরা যাবে? দেখার জন্য হাসানের কবিতা আমাদের ইতিহাসকে সঠিকভাবে দেখতে দেয়। যারা হাসানের কবিতা বুঝবেন, কবিতা কীভাবে কাজ করে জানতে পারবেন, তারাই বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে সক্ষম। হাসানের কবিতার নানা রকম পাঠ আছে। সেই পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলো আমাদের মনে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতা মূলধারা মূলত সর্বজনীন, ঘোষণামূলক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নজরুলের বিদ্রোহী-কণ্ঠস্বর থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক কবিতা জনসমাবেশের ভাষা হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা তুমি, বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা, আসাদের শার্ট এগুলোর ভেতর একটা মিল আপনি খুঁজে পাবেন। স্বাধীনতার মহত্ত্ব গাঁথা। হেলাল হাফিজ একই ঘটনা স্লোগান-সক্ষম, মিছিলমুখী, বাইরের দিকে সম্বোধিত। একই পটভূমিতে আবুল হাসান প্রতিস্বর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন— এটা তাঁর বিশেষত্ব। এই পথে তিনি নিঃসঙ্গ, পাশে কেউ নেই।
৭৪ এর দুর্ভিক্ষ রফিক আজাদ লেখেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নাইলে মানচিত্র খাবো।’ খুবই সরাসরি, রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেন, অভিশাপ দেন তিনি। এর ফলাফল হিসাবে তাকে খুব সুখকর অভিজ্ঞাতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। রাষ্ট্র সন্ত্রাসী এর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। একই মন্বন্তর নিয়ে হাসান লিখেছেন, ‘অনাহারে অনেকেই যুবতী হয়েও আর যুবতী হবে না’, ‘আমি জানতাম, পারবো না’। আজাদ রাষ্ট্রকে হুমকি দেয় সরাসরি— হারামজাদা বলে গালি দেয়। অন্য দিকে হাসান তাঁর কবিতায় সাক্ষী রেখে দেন। এই Tribune-বনাম-Witness পার্থক্যেই তাঁর মৌলিক অবদান।
এখন প্রশ্ন হলো হাসান রাজনৈতিকভাবে এই দর্শক হয়ে ওঠায় আমাদের লাভ কী হলো? প্রথমত, হাসান আমাদের নিরপেক্ষভাবে বাস্তবতা দেখার চোখ দেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি কিছুই করতে বলেন না। প্রথমত এই রাজনৈতিক বাস্তবতা যখন সবাই উপলব্ধি করতে চায় না বা সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে চায় তখন হাসান তাঁর কবিতায় সময়ের ঘটনাপুঞ্জের নোট নিচ্ছেন। স্বাধীনতার গৌরবের যে মোহ শামসুর রাহমান ও আরও অনেক কবির তা হয়তো আমাদের কাজে লাগে। এগুলো ছাড়া রাষ্ট্র গঠন হয় না। তবে এর বাইরে থেকেও দেখা জরুরি, যা রাষ্ট্র নির্মাণে লাগে। ফলে, এখানে গঠনের রাজনীতি প্রবল, এখন নির্মাণের জন্য ইতিহাসকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। এই পরিশুদ্ধির জন্য যে রাষ্ট্র-যন্ত্রণা লাগে আবুল হাসানের কাছে গেলে পাবেন। এই জন্য হাসান এখনো এতে জরুরি। ভেতর ভর করেছিল তা থেকে ক্ষণিক বের হওয়াও জরুরি। নতুন ইতিহাস লিখতে গেলে এটি আমাদের খুব জরুরিভাবে লাগবে। সবাই যখন উদ্যাপনে ব্যস্ত তখন তিনি শোক করছেন। আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো, হাসান রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের সীমানা মুছে দিয়েছেন তাঁর কবিতায়। প্রেম-মৃত্যু সবই জীবনের অংশ। মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতার যে অ-বিরোচিত, অ-সান্ত্বনাদায়ী পথ সেটাই হাসান পছন্দ করেছেন। সেই পথ খুব বেশি কবি মাড়ায়নি।
মারী ও বন্যায় যার মৃত্যু হয় হোক। আমি মরি নাই–শোনো
লেবুর কুঞ্জের শস্যে সংগৃহীত লেবুর আত্মার জিভে জিভ রেখে
শিশুর যে আস্বাদ আর নারী যে গভীর স্বাদ
সংগোপন শিহরণে পায়-আমি তাই!
নতুন ধানের ঋতু বদলে পালা শেষে
শস্যিতা রৌদ্রের পাশে কিশোরীরা যে পার্বণে আজো হয়
পবিত্র কুমারী শোনো। আমি তাতে আছি!
আর সব যুদ্ধের মৃত্যুর মুখে হঠাৎ হাসির মতো ফুটে ওঠা পদ্মহাঁস
সে আমার গোপন আরাধ্য অভিলাষ!
বহ্নি রচনার দ্বারা বৃক্ষে হয় ফুল;
ফুলে প্রকাশিকা মধুর মৃন্ময় অবদান শোনা,
ঝর্ণার যে পাহাড়ী বঙ্কিম ছন্দ, কবির শ্লোকের মতো স্বচ্ছ সুধাস্রোত
স্পেনের পর্বত প্রস্তর পথে টগবগে রৌদ্রের যে সুগন্ধি কেশর কাঁপা
কর্ডোভার পথে বেদুঈন!
লোকার বিষণ্ণ জন্ম, মৃত্যু দিয়ে ভরা চাঁদ,
শুধু সবিতার শান্তি-আমি তাই!
হারানো পারের ঘাটে জেলে ডিঙ্গি, জাল ভোলা কুচো মাছে
কাঁচালী সৌরভ–শোনো
সেখানে সংগুপ্ত এক নদীর নির্মল ব্রীজে
বিশুদ্ধির বিরল উত্থানের মধ্যে আমি আছি
এ বাংলায় বার বার হাঁসের নরোম পায়ে খঞ্জনার লোহার ক্ষরায়
বন্যার খুরের ধারে কেটে ফেলা মৃত্তিকার মলিন কাগজ
মাঝে মাঝে গলিত শুয়োর গন্ধ, ইঁদুরের বালখিল্য ভাড়াটে উৎপাত
অসুস্থতা, অসুস্থতা আর ক্ষত সারা দেশ জুড়ে হাহাকার
ধান বুনলে ধান হয় না, বীজ থেকে পুনরায় পল্লবিত হয় না পারুল
তবুও রয়েছি আজো আমি আছি,
শেষ অঙ্কে প্রবাহিত শোনো তবে আমার বিনাশ নেই
যুগে যুগে প্রেমিকের চোখের কস্তুরী দৃষ্টি,
প্রেমিকার নত মুখে মধুর যন্ত্রণা,
আমি করি না, মরি না কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে
আমার আত্মাকে দীর্ণ মারতে পারবে না।
(নচিকেতা/ পৃথক পালঙ্ক)
আবুল হাসান অকালে প্রয়াত হয়েছেন এ কথা সত্য। অগণন লেখক, কবি, শিল্পী আছেন যারা আমাদের প্রত্যাশার পূর্বেই চলে গেছেন। একজন শিল্পী তাঁর কাজের ভেতর মূলত তাঁর সময়কে ধরে রাখেন। বড় শিল্পীরা এমনভাবে এটাকে ধারণ করেন যে সর্বকালও তা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়। নতুন নতুন অর্থ নিয়ে তা আমাদের কাছে ধরা দেয়। এমন শক্তিধর কবিরা মারা গেলেও তাঁদের কবিতার ভেতর এই সারবত্তাগুলো রেখে যান, তাঁর সৃষ্টির ভেতর সময় থেমে যায় না, চলতেই থাকে। আবুল হাসান এমনই একজন যারা জীবন থামলেও তাঁর লেখার রেজোন্যান্স থামেনি। তা কেবলই ‘লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে’। তাঁর অকাল মৃত্যুকে ঘিরে আমাদের যে অতৃপ্তি তা দিয়ে তাঁর কবিতার কীর্তি পরিমাপ করতে গেলে তা আমাদেরই দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের মহৎ কবিদের একজন আবুল হাসান।
আবুল হাসানের যাত্রা ‘আমরা’ থেকে ‘আমি’র দিকে। তিনি জনতার মন ও কান ভরাতে বাংলা কবিতা লিখতে আসেননি। তিনি বাংলা কবিতার যে ট্র্যাডিশনাল ধাঁচ সেই পথেই গিয়েছেন, তবে সমান্তরালে নয়, কিছুটা তির্যক বাঁকানো পথে। জাতির যা কিছু মহীয়ান তাকে চুরমার করতে চেয়েছেন, করেছেনও। পথটা খুব সরল ছিল না। কবিতার ভাষায় তিনি বিরাট বিপ্লব করতে চাননি। ভাষা ও কবিতার কারুকাজের কোন জবরদস্তি নাই। কিন্তু তাঁর কবিতা ব্যক্তিকে বিচূর্ণ করে দেয়। দুনিয়ার আসল স্বরূপ খুব অশ্লীল ও নগ্নভাবে ধরা পড়ে।
একাত্তর-উত্তর এই জনপদের মানুষের রাজনৈতিক আচার বুঝতে হলে আবুল হাসানের তিনটি পাতলা বই তুলে দেওয়াই যথেষ্ট; এই তিনটি বইয়ের ভাঁজে একটি জাতির বিজয়, অর্জন ও বিপর্যয় পাশাপাশি শুয়ে আছে। এ এক বিরাট বিরল ঘটনা।
সেই অর্থে তাঁকে রাজনৈতিক কবি বলা যাবে না। তবে তিনি এমন তিনটি কাব্যগ্রন্থের নিদারুণ উদাহরণ রেখে গিয়েছেন যার আছে একটা জাতির ঐতিহাসিক সময়টা বোঝার জন্য যেতে হয়। এই কাজ বড় লেখক ছাড়া আর কেউ করতে পারেন না।
উৎসবের আলো নন, বরং শোকের নীরবতায় সবচেয়ে স্পষ্ট, উজ্জ্বল কবি আবুল হাসান।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও চিন্তক

লক্ষ্মী বউটিকে
আমি আজ আর কোথাও দেখি না,
হাঁটি হাঁটি শিশুটিকে
কোথাও দেখি না,
কতগুলি রাজহাঁস দেখি
নরম শরীর ভরা রাজহাঁস দেখি,
কতগুলি মুখস্থ মানুষ দেখি, বউটিকে কোথাও দেখি না
শিশুটিকে কোথাও দেখি না!
তবে কি বউটি রাজহাঁস?
তবে কি শিশুটি আজ
সবুজ মাঠের সূর্য, সবুজ আকাশ?
অনেক রক্ত যুদ্ধ গেল,
অনেক রক্ত গেল,
শিমুল তুলোর মতো
সোনারুপো ছড়াল বাতাস।
ছোট ভাইটিকে আমি
কোথাও দেখি না,
নরম নোলক পরা বোনটিকে
আজ আর কোথাও দেখি না!
কেবল পতাকা দেখি,
কেবল উৎসব দেখি,
স্বাধীনতা দেখি,
তবে কি আমার ভাই আজ
ঐ স্বাধীন পতাকা?
তবে কি আমার বোন, তিমিরের বেদিতে উৎসব?
(উচ্চারণগুলি শোকের/ রাজা যায় রাজা আসে)
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ১৯৭২ সালে শোকের এই উচ্চারণগুলি কবি আবুল হাসানের। হারানোর বেদনার বিপরীতে এখানে আশা ফিরে এসেছে নতুন দেশের পতাকা বা স্বাধীনতার মতো বিমূর্ত সত্তা হয়ে। লক্ষ্মী বউ, শিশু, ভাই, বোন—এই সবই বাস্তব, জ্যান্ত। হঠাৎ মিলিয়ে গেছে। কিন্তু তারা স্বাধীনতা, পতাকা, উৎসবের অদেখা এক সত্তা হয়ে ফিরে এসেছে। ব্যক্তির শোক জাতীয় ইতিহাস হয়ে ফিরে আসে। সাধারণ, অতি সাধারণ অনুষঙ্গ নিয়ে এখানে মানুষের ইতিহাস রচিত। এদের কেউই তেমন বড় কিছু নন। মানুষ মরে গেলে, কবরে চলে গেলে সে কবরের মাটিতে মিশে-গলে শুধু ঘাস-ফুল হয়ে জন্মায় না। সে এমন কিছুতে রূপান্তরিত হয় যা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। সে জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে। কবি আবুল হাসানের ক্ষেত্রেও বলা চলে এমনটা হয়েছে। তিনি অকালে চলে গিয়েও বিরাট এক কাল্ট ফিগার হয়ে বাংলা কবিতায় ফিরে এসেছেন।
মানুষের মৃত্যু হ’লে তবুও মানব
থেকে যায়; অতীতের থেকে উঠে আজকের মানুষের কাছে
প্রথমত চেতনার পরিমাপ নিতে আসে।
(মানুষের মৃত্যু হ’লে/ জীবনানন্দ দাশ)
আবুল হাসান ‘মানুষ’ থেকে ‘মানব’ হয়ে উঠেছেন।
২
মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা
বেশ ভালো কথা। শুরুতে মনে হবে, এখানে বেশ রাজনৈতিক একটা ব্যাপার আছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটা প্রসঙ্গ আছে। ইরান, ফিলিস্তিনি মিলিয়ে এই কথা হলো একটা ‘প্রোফাউন্ড ট্রু’ বা গভীর সত্য। গভীর সত্য এমন একটি বিষয়, যার উল্টাটাও সত্য, সোজাটাও সত্য।
যেমন ধরুন, তলস্তয়ের ‘আনা কারেনিনা’র সূচনা। সকল সুখী পরিবার এক রকম, কিন্তু অসুখী পরিবার ভিন্ন ভিন্ন। এর বিপরীতটাও সত্য। মানে, আমি যদি বলি, অনেক সুখী পরিবারের সুখও ভিন্ন ভিন্ন, তাতেও কোনো সমস্যা দেখা দেয় না। দুটো কথাই সত্য। কিন্তু আর্টে প্রোফাউন্ড ট্রু ইজ অ্যা বিগ ম্যাটার। এই কবিতাও তেমন এক রাজনৈতিক সত্য নিয়ে হাজির হয়। জাতিসংঘ ইসরায়েলি, আমেরিকান, ইউরোপিয়ানদের মৃত্যু গুরুত্ব সহকারে দেখে। বিবিসি, সিএনএন দেখলে বুঝবেন। ফলে, মৃত্যু জাতিসংঘ যে নেয় না, সেটা সাবার্থে সত্য নয়। ফলে, গভীর এক বিপরীতমুখী উচ্চারণ নিয়ে কবিতাটি শুরু হয়।
আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে
আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,
সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন
কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের
ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর…
বেশ ভালো কথা। মানে দুনিয়া থামছে না কবি যাই বলুক, এটা আবুল হাসান জানতেন। তিনি দর্শকের ভূমিকায় চলে গেলেন
মানুষ চাঁদে গেল, আমি ভালোবাসা পেলুম
পৃথিবীতে তবু হানাহানি থামলোনা!
তিনি মাত্র দর্শক হয়ে থাকলেন না। মানুষের চাঁদে যাওয়া একটা দৃশ্য প্রকল্প, স্নায়ু যুদ্ধের নন্দন। নাসার বেশিরভাগ আবিষ্কার মিলিটারি ইনভেনশনে কাজে লাগে। এটা দুনিয়াকে শক্তি সংগত করার জন্য দেখানো হয়েছে। এটাও হাসান জানতেন। শান্তির জন্য মানুষ চাঁদে যায়নি। কিন্তু বছরের পর বছর এটাকে বিজ্ঞানের নামে আমরা পাঠ্য বই থেকে শুরু করে হাজার হাজার বই লিখে, তাদের গেলানো শান্তির বিজ্ঞানের জ্যোতির্ময় আলোতে আলোকিত হলাম।
পৃথিবীতে তবু আমার মতোন কেউ রাত জেগে
নুলো ভিখিরীর গান, দারিদ্রের এত অভিমান দেখলোনা!
আমাদের জীবনের অর্ধেক সময় তো আমরা
সঙ্গমে আর সন্তান উৎপাদনে শেষ কোরে দিলাম,
সুধীবৃন্দ, তবু জীবনে কয়বার বলুন তো
আমরা আমাদের কাছে বোলতে পেরেছি,
ভালো আছি, খুব ভালো আছি?
(জন্ম মৃত্যু জীবনযাপন /পৃথক পালঙ্ক)
বিপুল এক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হওয়ার পরিবর্তে তিনি শেষে এসে নিজের ভেতর বা তাঁর মতো আত্মগুটানো মানুষে পর্যবসিত হলেন। তিনি এই কবিতাকে অতি উচ্চ স্বরে নিয়ে যেতে পারতেন। তার সব উপাদানই এখানে ছিল। কিন্তু তিনি নিজেকে থামলেন। ভালো আছি, তারপর খুব ভালো আছি। এরপর প্রশ্নের যতি দিয়ে থেমে গেলেন।
হাসানের ভেতর সভ্যতা নিয়ে একটা অভিমান মনে হয় ছিলো। আরও অনেক কবিতায় তার উদাহরণ পাওয়া যায়। এই অভিমান তিনি বর্ণনা করেন মাত্র, কোনো মতামত দেন না, বা চমকিত, রহস্যময়, আধ্যাত্মিক কিছু বলতে চান না পাঠককে। তিনি নিজের সাধারণ জীবন নিয়ে বসে থাকেন।
৩
আমাকে যে অনুতপ্ত হতে বলল, কার জন্যে অনুতপ্ত হবো আমি?
কার জন্য অনুশোচনার জ্বলন্ত অঙ্গারে আমি ছোঁয়াবো আমার ঠোঁট?
দিন দিন আমার অধঃপতন পাহাড় কেবলি উঁচু হচ্ছে,
এত দাহ এত পাপ!
আমার পায়ের নখ থেকে মাথার প্রতিটি চুলে এত অপরাধ!
কেন আমি অপরাধ স্বীকার করব? এত এত অপরাধের পরও আমি অপরাধ স্বীকার করতে নারাজ। কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক এটা জেনেই আমরা জীবন কাটাই। কিন্তু পরিশুদ্ধ জীবন বলে কিছু নেই। ফলে, জীবনে একটা দ্বিধা থাকতে পারে, তবে সেই অনুশোচনাকে আমি অস্বীকার করি। সে অপরাধ স্বীকার করতে রাজি, কিন্তু কোনো নৈতিকতায় বশীভূত সে হতে চায় না।
হাঁটু ভেঙ্গে একদিন আমার বুকের মধ্যে এসে পড়বে
কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন।
হাত তুলে আর আমি কাউকে ডাকবো না কোনোদিন!
সেই দুঃসহ দিনের কথা ভেবে অনুতপ্ত হবো আমি?
কিন্তু কেন, কার জন্যে অনুশোচনার জ্বলন্ত অঙ্গারে আমি
ছোঁয়াবো আমার ঠোঁট?
অনুতপ্ত হবো আমি বিশেষ নারীর জন্যে?
সেই আমার প্রত্যাখাত প্রথম পুষ্পের জন্যে ফের অনুতাপ?
বাংলা কবিতার চূড়ান্ত অস্বস্তিকর ঘটনা আছে এরপর। এমন মারাত্মক ঘটনা বাংলা কবিতায় নেই, অল্পবিস্তর যা পড়েছি তাতে এই ঘটনা বিরল।
কিশোর বয়সে একদিন আমার শরীর জুড়ে
গোলমরিচের ঝা ঝা গুড়োর মতোন তীক্ষ্ণ জ্বর নেমেছিল,
মনে আছে সেই জ্বরের রাত্রিতে জেগে জেগে জানিনা কখন
আমি মায়ের পাশেই…?
হঠাৎ নিদ্রা ভেঙ্গে যেতে দেখি মধুর চাকের মতো অন্ধকার!
মনে আছে ভল্লুকের মতো বাবা নুয়ে এসে সে আঁধারে কার
টেনে টেনে ছিঁড়েছিল জটিল যৌবন?
সে রাতে আমার ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছিল,
মনে আছে অন্তলীন আমার চীৎকার?
একজন কিশোর বাবার সঙ্গম-দৃশ্য উপলব্ধির ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন। ঘটনা কী ঘটছে তা জ্বরের ঘোরে কিশোর কিছুটা বুঝেছিল বৈ কি! ‘মনে আছে ভল্লুকের মতো বাবা নুয়ে এসে সে আঁধারে কার টেনে টেনে ছিঁড়েছিল জটিল যৌবন?’ এখানে পরিস্কার নয়, বাবা তার মায়ের প্রতি নুয়ে এসেছিলেন কিনা? নাকি অন্য কারো। তবে কিশোরের যে জ্বর তপ্ত রাত সেখানে সাধারণত বাবা-মাই থাকেন। ফলে, বাবা মায়ের সঙ্গম দৃশ্য কয়জন দেখেছেন জীবনে? কয়জনই তা ব্যক্ত করতে পেরেছেন। কিন্তু যারা দেখেছেন এই দৃশ্য, তাঁরা কোনোদিন কোথাও বলতে বা লিখতে পারেননি। আবুল হাসান সেই ইয়ংয়ের ছায়ার উৎক্ষেপণ করেছেন—ঘটনা অস্পষ্ট, অর্ধ-স্মৃত, ঘোরগ্রস্ত, ভাষা নিজেই মধুর চাকের মতো অন্ধকারে বিলীন। অসুস্থ সন্তানের পাশে বাবা মায়ের সঙ্গম!
শুকনো পাতার মতো আমার চীৎকার থেকে ঝরে পড়া মা’র সেই হাত,
সেই রুগ্ন বিষণ্ণ আঙ্গুল-মার মানসিক অনিন্দ্র দহন!
তারও শেষ বিষণ প্লাবন যদি সময়ের তোড়ে গেল
তবে আর কার জন্যে অনুতপ্ত হবো আমি?
কার কাছে বয়ে নিয়ে যাবো এই কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন?
এর চেয়ে অস্বস্তিকর উচ্চারণ বাংলা কবিতায় খুব কম আছে। কার জন্য অনুতপ্ত হব আমি? কার কাছে বয়ে নিয়ে যাব এই কুয়াশা অস্থির শিলা রক্তের আগুন? এর কোনো উত্তর নেই। দরকারও নাই। তবে উত্তরহীন এই কবিতা এমন এক অস্বস্তির মুখোমুখি করে পাঠককে, যা তার ভেতরের একই রকম চাপা পড়া দৃশ্যগুলোকে স্পষ্ট করে, মা-বাবার সঙ্গম দৃশ্য কোনো সুখকর অনুভূতি কারো জন্য না, তবে এর অস্তিত্ব আমরা টের পাই যদিও কোনদিন ভাষায় প্রকাশের মতো নায়কের হৃদয় আমরা অর্জন করে উঠতে পারি না।
বাংলা ভাষায় ‘অনুতাপ’-এর গুরুত্ব কী? মানুষ মুখোশ খুলে ফেলে, এতে কোনো অপরাধ নেই, অনুতাপের কিছু নেই।
সাহিত্য নৈতিকতা তৈরি করতে চায়, এই প্রবণতা তার আছে এবং তা আরোপিত হয় সমাজের ওপর। সারা দুনিয়ার চলচ্চিত্রে যেমন ‘দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন’ দেখাতে হয়, আমাদের লালনও তাই, রবীন্দ্রনাথ বা পাড়ার মোড়ের বড় ভাই কবির কবিতাও তাই। এই যে শিল্প সাহিত্যে ধারণ করা নৈতিকতার যে আবহমানতা, আবুল হাসান এসবে ধার ধারে না। কীসের কী অনুতাপ! আমি কিছুই স্বীকার করব না। চূড়ান্ত আধুনিক মানুষের প্রতিচ্ছবি। কোনো ভড়ং নাই। বাংলা ভাষায় অনেক আধুনিক কবিতা লেখা হয়েছে। এরা এই আবহমান নৈতিকতার সিলসিলাই বহন করছে। ফলে অনেক আধুনিক ভাষায় লিখিত আধুনিক কবিতা মূলত মোরালিটির প্রশ্নে খুব আলাদা হতে পারেনি। কিন্তু হাসানের ভেতর স্খলিত নৈতিকতার এমন একটা ব্যাপার আছে, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল। সত্য হলো, আধুনিক মানুষের যে প্রবণতা তাও স্খলিত। সেই আধুনিক মানুষের উপস্থিতি হাসান ছাড়া অন্যদের কবিতায় নেই বললেই চলে।
দেখুন কবি কী বলে!
নদীর পারের কিশোরী তার নাভির নীচের নির্জনতা
লুট করে নিক নয়টি কিশোর রাত্রিবেলা
আমার কিছু যায় আসেনা,
খুনীর হাতের মুঠোয় থাকুক কুন্দকুসুম কি আসে যায়?
প্রেমিক করতলে না হয় লুকিয়ে ফেলুক ফুলের ফণা কি আসে যায়?
শিশুর মাথায় সাপের মতো বুদ্ধি খেলুক আমার তাতে কি আসে যায়?
(নির্বিকার মানুষ/ যে তুমি হরণ করো)
আবুল হাসান পড়তে গেলে পাঠক নিজেকে দেখতে পায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক মানুষের যে নৈতিকতার জার্নি, তার সঙ্গে হাসানের কবিতা-প্রবণতা প্রবলভাবেই যায়। ফলে, মানুষ যখন মুখোশ পড়তে শেখে, যৌবন পার করার পর তখন হাসানকে অস্বীকার করতে শুরু করে। ফলে, কিশোর কবি নিজের পাপকে আবিষ্কার করতে শুরু করে হাসানের কবিতার ভেতর দিয়ে। ব্যক্তি যত পাপ আবিষ্কার করতে পারে, তত সে বড় হয়। আদম-হাওয়া পাপের ভেতর দিয়ে স্বর্গের ধারণা অস্বীকার করে আরও মহৎ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে দুনিয়ায়। সেই মহৎ ধারণার নাম ‘মনুষ্যত্ব’ যা পাপের ভেতর দিয়ে অর্জন হয়েছে আদি পুরুষ ও নারীকে।
ফলে, একজন তরুণ যা যা অনুভব করে তার সবই হাসানে পায়। এরপর সমাজ দমিত মানুষ তৈরি করতে তাকে নৈতিক শিল্পের কলকারখানায় পাঠায়। সেই কিশোর একদিন হাসানকে ভুলে যায়।
৪
টেরি ঈগলটনের একটা যুক্তি ছিল—সাহিত্যে পড়ার যোগ্য, মহৎ হিসাবে যা প্রতিষ্ঠা করা হয় তা খুব নিরপেক্ষ বিষয় নয়। এটা ক্ষমতা কাঠামো, রাজনীতি ও সমাজ নিয়ন্ত্রকদের প্রয়োজন অনুসারে প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফলে, সমাজ প্রভু ঠিক করে কোনটা মহৎ সাহিত্য আর কোনটা নয়। ফলে, ভালো সাহিত্য নামে আমরা যা পড়ি তা নির্দিষ্ট কিছু ভ্যালু, নৈতিকতা, অভ্যাসের সমষ্টি।
সাধারণত একজন লেখক বা কবিকে প্রতীকায়ন করা হয়। সুকান্ত ভট্টাচার্যকে বামপন্থী রাজনীতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা গেছে সহজে। সুকান্ত বেঁচে থাকলে যে দলছুট হতে পারত না, তা বলা যায় না। অকালপ্রয়াত কবির ক্ষেত্রে কাজটা সহজ। উদাহরণ হিসাবে আল মাহমুদের কথা বলা যায়। তিনি যদি তাঁর প্রথম জীবনের কাব্যগ্রন্থগুলো রেখে অকালে চলে যেতে পারতেন, তবে তাঁর ওপর বাম ও তথাকথিত সেক্যুলার তকমা সহজেই এঁটে দেওয়া যেতে। কিন্তু তিনি কবি হিসাবে বেঁচে ছিলেন জন্যই তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো সমাধান করা যায়নি। সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশের তরুণ বিপ্লবী অনেক কবিই শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের নামে দালালি করেছেন ক্ষমতার। তাঁদের মহৎ সাহিত্যের জোরে শোষণের পক্ষে সামাজিক সম্মতি উৎপাদন করেছেন। কিন্তু একজন তরুণ কবি মারা গেলে তাঁকে নিজের পক্ষে বা বিপক্ষে ফেলা যায় সহজেই। ফলে, অকালপ্রয়াত কবিরা বেশির ভাগই সাহিত্য-শেয়ালের পাল্লায় পড়েন, যা একত্রে হুক্কা-হয়া, হুক্কা-হুয়া বলে একটা ছাঁচের ভেতর তাঁকে বড় করে তোলেন। ফলে, এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতির পক্ষে, ধর্ম নিরপেক্ষতার পক্ষে, পাঠ্য বইয়ে স্থান দেওয়ার মতো নৈতিকতার পক্ষে লিখিত কবিতাই মহৎ কবিতা।
ফলে, সাহিত্য, সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কবিতা বোদ্ধা, প্রকাশনা সংস্থা, পুরস্কার কমিটি সেই লেখাকেই প্রমোট করবেন যা বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে না। উল্টা ঘটনাও সত্য। যারা ক্ষমতার পরিবর্তন চায় তারাও নিজেদের পক্ষের এমন লেখক গড়ে তুলতে চাইবেন, যাকে দিয়ে উক্ত চলমান ব্যবস্থাকে ‘প্রতিস্থাপন’ করা যায়। তারাও পরিবর্তন চান না, প্রতিস্থাপন চান। এসব উদাহরণ খুব দূরবর্তী নয়। ২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানের দিকে তাকান আমাদের সমাজের সুসাহিত্যিকদের যে শ্রেণি ছিল, তা গুণে কর্মে একই রকম একটি গ্রুপ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এটা এই আলোচনার স্থান নয়, তাই এটা নিয়ে এর বেশি না বলি। যারা সমাজে পরিবর্তন চান না বা স্থিত অবস্থায় দেখতে চান বা ক্ষমতার দালাল তারা বেশির ভাগ ‘সাহিত্যের ক্যানন বা মহৎ সাহিত্য’কে প্রমোট করে। আর এর বিরোধী শ্রেণি নিয়ে আসে ‘বিদ্রোহী’। এরা যখন ক্ষমতায় যায় এই বিদ্রোহই হয়ে ওঠে লিটারারি ক্যানন, মহৎ সাহিত্য। এক সময়ের রিবেল কবি নজরুল এখন আমাদের জাতীয় কবি। নজরুলের বিদ্রোহী ভাবকে ততটুকুই কাটা হয়েছে যতটুকু রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে লাগে। ফলে, সেনানিবাসের দেওয়ালে লেখা আছে, ‘উন্নত মম শির’।
ফলে, সমাজ একজন কবিকে এত সহজে ভালোবাসে না। আমরা কোন কবিকে ভালোবাসবো তা আমাদের শেখানো হয়। ফলে, কবিকে করুণ ও মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে সামাজিক ও রাজনৈতিক কাজগুলো সুবিধা হয়। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম সেই যুগে কলকাতায় ক্রাইসলার ব্র্যান্ডের গাড়ি ছিল। নজরুলের রুটির দোকান বা লেটোগানের দলের গল্প পাঠ্যপুস্তকে দশকের পর দশক লেখা হয়েছে। কিন্তু কোনোদিন নজরুলের সচ্ছলতার, আয়-ইনকামের কথা লেখা হয়নি। কেন? এক, শাসকের পক্ষ থেকে দরিদ্রতাকে মহান করে তোলা হয়েছে। সমাজে দরিদ্র লোক থাকে এই দায় ও ব্যর্থতা সরকারের। গরীব থাকা মোটেও আনন্দের কিছু না। তারপরও জনগণকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ভাবে শেখানো হয়েছে দারিদ্রতা এক মহান বিষয়। অন্যদিকে যারা নজরুলকে সাহিত্যের ক্যানন তৈরি করে তুলেছিলেন তারা টাকা পয়সাকে রাজনৈতিকভাবে ঘৃণা করতেন, ব্যক্তিগত ভাবে নয়। ফলে, তারাও চায়নি যে নজরুল বড়লোক হয়েছিল মানুষ তা জানুক। সাহিত্যের সমাজ এভাবেই চলে।
কবিতায় আবুল হাসান অনেক ক্ষেত্রে অস্বস্তিকর। তাঁর অকাল মৃত্যু হলেও রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রকল্পে ক্যানন হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। সে এখানে অনফিট। তারপরও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লেখক হিসেবে প্রমাণের কিছু লেখাপত্র আছে সরকারি লেখকদের পক্ষ থেকে যা খুবই হাস্যকর। কেননা তাঁর পয়লা কবিতার বইয়ের নাম ‘রাজা যায় রাজা আসে’। তিনি যা বলেছেন এই ক্ষমতার বদল নিয়ে, নতুন বাংলাদেশ নিয়ে সেখানে তাঁর স্থান দেওয়া জোর করে প্রতিষ্ঠার মতো ব্যাপার। দেশপ্রেমের মতো জাতীয়তাবাদী গান তিনি গাইতে পারেন নি, কেননা তিনি প্রকৃত কবি। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণদের থেকে অনেক দূরবর্তী কবি তিনি। আবার বিরোধী পক্ষের জায়গা থেকেও তাঁকে খোপে আটানো দুষ্কর।
আবুল হাসানের কবিতা এমন যে, তাঁকে আপনি ফিট করতে পারবেন না। ফলে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার যে মানুষ যত ক্ষমতা কাঠামোর নিকটবর্তী হবে ততই হাসানকে অকালপ্রয়াত কবির তকমায় আটকে রাখবে।
হাসানের ‘কুরুক্ষেত্রে আলাপ’ মূলত কুরুক্ষেত্রের প্রেক্ষাপটকে ধার করে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের কথা—
আমার চোয়ালে রক্ত হে অর্জুন আমি জানতাম, আমি ঠিকই জানতাম
আমি শিশু হত্যা থামাতে পারবো না, যুবতী হত্যাও নয়!
ভ্রূণহত্যা! সেতো আরো সঙ্ঘাতিক, আমি জানতাম হে অর্জুন
মানুষ জন্ম চায় না, মানুষের মৃত্যুই আজ ধ্রুব!
৭১ বিজয়ের পর যখন দিকে দিকে স্বাধীনতার স্তুতি লেখা হচ্ছে, তখন পাণ্ডবদের জয়ের পরও স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি। নিদারুণ বিদ্রুপ তার কবিতা ফিরে ফিরে আসে।
আমার নাভিতে রক্ত-আমি জানতাম আমি ঠিকই জানতাম
আমি মানুষের এই রোষ থামাতে পারবো না, উন্মত্ততা থামাতে
পারবো না।
দুর্ভিক্ষ ও রাষ্ট্রবিপ্লব আমি থামাতে পারবো না
চালের আড়ত থেকে অভিনব চাল চুরি থামাতে পারবো না,
রিলিফের কাপড়ে আমি মানুষের অধঃপতন ঢাকতে পারবো না!
হায় বাংলাদেশ! রিলিফের কাপড়, চাল চুরি, দুর্ভিক্ষ, ত্রাণ-দুর্নীতি সবইতো তাঁর কবিতায় লিখিত হলো। রিলিফের কাপড়ে আমি মানুষের অধঃপতন ঢাকতে পারব না!—বিদ্রুপ। শুধু বিদ্রুপই নয়, কবি এর সবই জানতেন, হে অর্জুন আমি জানতাম। আমাদের এই পতন অনিবার্য। বছরের পর বছর আপনি স্বাধীনতার মহত্ত্বের কথা শুনেছেন। কিন্তু কোনো পাঠ্য বইয়ে এই কবিতা সংযুক্ত করা কি সম্ভব!
আবুল হাসান নিষ্ঠুর। কবিতার মতো পেলব শব্দের শাখায় শবফুল ফোঁটালেন তিনি। দেখুন—
শেফালীর সোমত্ত গ্রীবায় লাগবে লাম্পটের লালা আর বিষ
আমি জানতাম হে অর্জুন অনাহারে অনেকেই যুবতী হয়েও আর
যুবতী হবে না!
ভাই পলায়নে যাবে বোন তার বাসনা হারাবে আমি জানতাম
ফুল ফুটবে না, ফুল ফুটবে না, ফুল আর ফুটবে না, ফুল আর কখনো
ফুটবে না!
ফুল ফুটবে না, বারবার বলছেন। গ্রামে কেউ মারা গেলে রমণীরা যেভাবে বিলাপ করে, সেই করুণ সুর। স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে, স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে।
বকুল-বৃক্ষদের এইভাবে খুন করা হবে সব গীতিকার পাখিদের
এইভাবে গলা, ডানা স্বরলিপি শব্দের পালকগুলি
ভেঙে দেয়া হবে আমি জানতাম
তিতির ও ঈগল গোত্রের সব শিশুদের এইভাবে ভিক্ষুক পাগল
আর উন্মাদ বানানো হবে
ভারতীয় যুদ্ধের উৎসবে আজ এই শুধু আমাদের
ধনুক ব্যবসা,
আমি জানতাম, হে অর্জুন,-আমি ঠিকই জানতাম।
(কুরুক্ষেত্রে আলাপ/ যে তুমি হরণ করো)
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ধর্মযুদ্ধ ছিল। এই যুদ্ধ জয়ের পরও অর্জুনের বংশ বিনাশ হয়। হাসান সবই জানতেন, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টার মতো। পুরাণের ইতিহাসে ন্যায়যুদ্ধে বিজয়ের পর পতন অনিবার্য, তা তিনি লিখেছেন কবিতায়। লক্ষ্য করুণ—‘ভারতীয় যুদ্ধের উৎসবে আজ এই শুধু আমাদের/ধনুক ব্যবসা’। মহাভারত নাকি ভারত— একটা ভ্রম তৈরি হয়। বাংলাদেশে যারা মহৎ কবি হতে পেরেছেন, তাঁদের কার কবিতায় এই সমস্ত কথা আছে, এতটা সরব ও বিস্তারিত ভাবে।
৫
আবুল হাসানের কবিতা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক লেখালেখি পাওয়া যায়। তার সমসাময়িক কোনো কবি এতটা আলোচিত নন মনে হয়। তবে এই আলোচনা নির্বিষ এক হাসানকে আমাদের সামনে উপস্থাপন করে। কবিতা আলোচনায় ক্যাটাগরাইজেশন প্রচলিত একটি বিষয়। এতে খুব সহজে কবিকে আবিষ্কার করা যায়। এর সুবিধা হলো, খুব সহজেই একজন কবিকে কবিতার এক এলাকায় ঠেলে দেওয়া যায়। কবিতা কমন যে যে ক্যাটাগরিতে আলোচিত হয় তার একটা লিস্ট করা যাক:
ফলে, আবুল হাসান নিয়ে বাংলা ভাষায় যত কাজ হয়েছে, তার বেশিরভাগই ক্যাটাগরিক্যাল আলোচনা। এই সব তথ্য উপাত্ত হিসেবে ভালো, কিন্তু আমাদের তেমন কাজে আসে না। আমি আবুল হাসানকে অন্য একটা জায়গা থেকে ‘মার্ক’ করতে চাই। এই প্রবণতা অনেক কবির ভেতর আছে হয়ত। কিন্তু হাসান কেমন এই রাস্তায়? কিন্তু তা আমরা তা অনুধাবন করলেও হয়তো লিখিনি। এই আলোচনায় ঢোকার আগে আমাদের জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপটা বোঝা দরকার।
জাতীয় সাহিত্যকে দুই দিক থেকে দেখতে হবে। প্রথম বিষয়টা খুব সোজাসাপ্টা। বাংলা ভাষা ও এই ভাষা ধারণকারী ভূখণ্ড ও তার ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও কালপর্বে রচিত সাহিত্যে। খুব সরলভাবে বাংলাভাষায় বাংলাদেশে রচিত সাহিত্যই আমাদের জাতীয় সাহিত্য। এটুকু বললে সব বলা হয় না। দ্বিতীয় বিষয়টি হলো আদর্শিক বা বিধানমূলক। এই আদর্শ কীভাবে গড়ে ওঠে ও কাজ করে সেই কথা আগেই বলেছি। দ্বিতীয়বার আর বলার দরকার নাই। এটা একটা ভারবাহী ব্যাপার। শিল্পের এই আদর্শের ওজন আত্ম-পরিচয় হিসাবে নির্দেশিত হয়। একে ভালোবেসে বোদ্ধারা জাতির স্বতন্ত্র ‘প্রাণ’ বলে ডাকে। জাতি বিষয়টাই কাল্পনিক এক ধারণা। সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সেই কল্পনাকে সম্প্রসারণ ও ধরে রাখা হয়। অগণিত আলাদা আলাদা মানুষকে ‘আমরা’য় রূপান্তরিত করা হয়। ফলে, জাতীয় সাহিত্য সব সময় গণমুখী, ভবিষ্যতগামী, গঠনমুখী, সর্বোপরি পরিত্রাণমূলক— সে নানা দায় নিয়ে আগায়।
বাংলাদেশের জাতীয় সাহিত্যের স্বরূপ হলো তা ধর্মনির্ভর না হয়ে ভাষা দ্বারা বিশেষায়িত (১৯৫২)। এই ভাষা রক্ষার ভিত্তিতেই তার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কল্পনা। ১৯৭১ এ যে দেশ গঠিত হলো তা কোন অর্থেই ধর্মাশ্রয়ী না। ভারত-পাকিস্তানের বিভাজন ধর্মভিত্তিক। বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিভাজনের সীমারেখা ন্যায্যতার ভিত্তিতে মানুষের মুক্তি, ধর্ম-নিরপেক্ষতা, সামাজিক আগ্রগতিই এর প্রাণভ্রমরা। ফলে, বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্যানন রবীন্দ্র-নজরুল-জসীমউদ্দীন হয়ে যুদ্ধোত্তর কবিদের নিয়ে গড়া একটি সমষ্টির স্বর হিসেবে সন্মিলিত—কবি সেখানে জনতার কণ্ঠস্বর, ঘোষক। এই জাতীয় এমন সন্মিলিত জাতীয় সাহিত্যের যেমন প্রয়োজন আছে, তেমনি এর ঝুঁকিও প্রবল।
বিধান বা আদর্শ অর্থে যে জাতীয় সাহিত্য তার লক্ষ্যকে আবুল হাসান চুরমার করে দেন। এই ভাঙনটাই তার তাৎপর্য ও গুরুত্ব। তার অনেক কবিতা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রুগ্নতাকেই খুলে মেলে দেখায়। সমষ্টির বিপরীতে তিনি মানুষের একাকিত্ব নিয়ে ফিরে আসেন। স্বাধীনতা পরবর্তীতে মতাদর্শের লড়াইয়ের মাঠে বহু কবি ‘আমি’ থেকে ‘আমরা’ হয়ে উঠেছেন। যখন নানা রাজনৈতিক দলের হাতিয়ারে পরিণত হতে কবিরা মরিয়া তখন আবুল হাসান ‘আমরা’-কে বিজারিত করে আরও বেশি ‘আমি’ হয়ে উঠছেন। তিনি জেনেছেন, ‘মানুষ একা।’ ১৯৭২ সালেই মাত্র দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পর ‘রাজা যায় রাজা আসে’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গ পত্রে তিনি লিখেছেন, ‘উৎসর্গ আমার মা আমার মাতৃভূমির মত অসহায়।’ মা, দেশ মাতা হলো জাতীয় সাহিত্যের মূর্তি। তাই তিনি ভেঙে দিলেন। তিনি জাতির শরীরের ভেতর দাঁড়িয়ে জন্ম নয় একে ধ্বংস করে দিতে চান যেন নতুন কিছুর জন্ম হয়। জাতীয় সাহিত্যের যে লক্ষ্যতত্ত্ব থাকে তার থেকে বেশ দূরবর্তী তিনি। ফলে, লক্ষ্য করলে দেখবেন আবুল হাসান সমগ্রে শামসুর রাহমান তাঁর প্রথম দুটি বই রাজা যায় রাজা আসে, ‘যে তুমি হরণ করো’ থেকে পৃথক পালঙ্ককে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। এর কারণ শামসুর রাহমানদের মতো জাতীয় সাহিত্য তৈরি করা ‘বিগ বয়’দের অবচেতন।
৬
সম্ভবত আহমদ ছফা তার ‘ফাউস্ট’ অনুবাদের ভূমিকায় লিখেছিলেন, ‘যদি মানবসভ্যতা ধ্বংস হয়ে যায় এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো বুদ্ধিমান প্রাণী বা ভিনগ্রহের সত্তা পৃথিবীতে এসে মানুষের প্রকৃতি বুঝতে চায়, তাহলে গ্যোটের ফাউস্ট তাদের হাতে তুলে দিলেই মানুষের সত্তা, আকাঙ্ক্ষা, জ্ঞানপিপাসা, মহত্ত্ব ও পতনের ইতিহাস সম্পর্কে গভীর ধারণা পাওয়া যাবে।’ একই কথা আবুল হাসানের কবিতার ক্ষেত্রেও খাটে। হাসান বেঁচে ছিলেন ১৯৪৭ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত। ফলে বাংলাদেশ গঠনের কালপর্ব এবং স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ ১৯৭৫ পর্যন্ত তিনি খুব নিবিড়ভাবে দেখেছেন। ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যে সাবজেকটিভ (প্রত্যক্ষ), সিম্বলিক (প্রতীকী) ও সিস্টেমেটিক (পরোক্ষ) ভায়োলেন্স বা সহিংসতা বাংলাদেশের দেখা গেছে তার এমন নিপুণ সাহিত্যিক আত্তীকরণ আবুল হাসান ছাড়া আর কোথায় খুঁজে পাবেন? মানুষ সহিংসতা লুকিয়ে রাখতে চায়। হাসান কোনো কাব্যিক আড়াল রাখেননি। যা দেখেছেন তাই কবিতায় জারণ করে নিয়েছেন।
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে ডাইনীর মতোন কেন কোমর বাঁকানো
একটি চাঁদ উঠবে জ্যোৎস্নায়
উলুকঝুলুক গাছ,
মানুষের খোলা, আকাশের নীচে রেস্তোরাঁয়
এখানে সেখানে,
সবদিকে
কেন এত রক্তপাত হবে? গুপ্তহত্যা হবে?
কেন জীবনের দ্রব্যমূল্য বাড়বে এত শনৈঃ শনৈঃ
কেন ফুরাবে এমন আমাদের পকেটে সিগ্রেট,
খাদ্য, রূপালী আত্মার ঘ্রাণ রমণী ও টাকা?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে কেন পাওয়া যায় না প্রেমিকা?
কেন মোমের আলোর শিখা আজকাল
ধীরে জ্বলে,
ধীরে জ্বলে, মাঝরাতে
মহিলার শাড়ি কেন সভ্যতার শোভার মতন
খুলে যায়।
নেমে যায়, আজকাল
কেন এত সহজেই ভেঙে পড়ে কালো চোখ, কোমল যৌবন?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে কিশোর চেনেনা কেন ঘাস ফুল? ঘাস কেন সবুজের বদলে হলুদ?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে নয়টি অমল হাঁস
থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়?
ভালোবাসা, কেবলি…কেবল একটি
বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা হয়?
একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও
নইলে মানুষের দরোজায় টোকা দিলে কেন আজ দরোজা খোলে না?
“বৃষ্টি হলে গা জুড়োবে” কেউ কেন বলেনা এখন?
(একটা কিছু মারাত্মক/ রাজা যায় রাজা আসে)
অনেকগুলো কেন নিয়ে এই কবিতা। লক্ষ্য করুন, ‘রক্তপাত, গুপ্তহত্যা, কেন জীবনের দ্রব্যমূল্য বাড়বে এত শনৈঃ শনৈঃ, নয়টি অমল হাঁস / থেঁতলে যায় ট্রাকের চাকায়, বাজেয়াপ্ত শব্দের তালিকা’ —একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো যোগ মনেহয় নেই। সমাজে এটা যে মারাত্মক কিছু, প্রত্যক্ষ হিংসার ঘটনা ঘটে রোজ তার একটার সঙ্গে অন্যটার কোনো যোগসূত্র নেই। আসলেই নেই? একটা কিছু মারাত্মক ঘটছে কোথাও। অদৃশ্যের এক ব্যবস্থা, যা পুরো বাস্তবতাকে সহিংস করে তুলেছে। বারবার কবি প্রশ্ন করছেন, কেন এমন ঘটছে? উত্তরটা কবিতায় দেননি। এর আভাস থেকে আমাদের খুঁজে পেতে হয়। এই যে এত এত রক্তপাত, গুপ্ত হত্যা-এর কারণ অপরাধটা কাঠামোগত। পুরাতন কাঠামোটাই স্বাধীনতা পরবর্তী মহাজনরা টিকিয়ে রাখল। আমরা মারাত্মক ঘটনাটা দেখতে পাই। কিন্তু এই কেন’র উত্তর পুরো ব্যবস্থাটার ভেতর। ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশেও এই ‘একটা কিছু মারাত্মক’ অনেক জায়গায় ঘটেছে, যা পূর্ববর্তী ব্যবস্থারই এক্সটেনশন। ফলে রাজা যায়, রাজা আসে।
একাত্তর পরবর্তী বাংলাদেশের প্রকৃত রাজনৈতিক চিত্র—বিজয়ের সরকারি আখ্যানের নিচে চাপা পড়া বাস্তবতা আবুল হাসান তার বাস্তব-সময়েই লিখেছেন। তাঁর কবিতা গ্রন্থগুলোর সময় দেখুন—রাজা যায় রাজা আসে, ডিসেম্বর ১৯৭২ এর বিজয়ের মাসে প্রকাশিত, কবিতাগুলো পড়লে শিউরে উঠবেন। যে তুমি হরণ করো ১৯৭৪, মন্বন্তরের বই। ১৯৭৫ পৃথক পালঙ্ক খুলে ধরে গুম-খুন, নিমখুন। গুমখুন বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তাক্ত ঘটনা। স্বাধীনতা বাংলাদেশে পাকিস্তানের দমনপীড়ন, ব্যবস্থাপনার কোনো পরিবর্তনই সাধন হয়নি। এক রাজা গিয়ে আরেক রাজা এসেছে। ফলে হাসানের কবিতায় আপনি গুম-খুন খুঁজে পাবেন। আজ অব্ধি ঐতিহাসিকভাবে এটাই আমাদের বাস্তবতা।
হত্যা হয়, হীরা ভস্ম হয়, মেধা ঝরে যায়, তবু
কুমোরের চাকা ঘোরে,
চাকা ঘোরে হাজার বছর।
যুদ্ধের যাত্রায় সাজে মহাকাল,
ওলট-পালট করে কতনা শহর
সভ্যতার বুক থেকে খসে যায়
কতনা নহর, তরু, জলপাই, অভ্র, অবসর।
দেশে দেশে নিমখুন, গুমখুন কত,
ভূতে পাওয়া জ্বঘাতক, পাতক, বদমাশ,
হাঁস ফেলে ঘরে তোলে লাশ!
সে তবু সন্ধ্যায় আজো আলো তোলে
শিশুর সবুজ জন্ম তুলে নেয় কোলে!
সে তবু সত্তায় আজো পুষে পুণ্যবান
পতিত জমির মতো থাকে অপেক্ষায়
কবে যেনো এ কলুষ যায়!
হত্যা হয়, হীরা ভস্ম হয়, মেধা ঝরে যায়, তবু
কুমোরের চাকা ঘোরে
চাকা ঘোরে হাজার বছর!
(চাকা/পৃথক পালঙ্ক)
গুম-খুন, নিমখুন করে কারা ঘরে হাঁসের পরিবর্তে লাশ তুলেছিল? সময়টা বুঝতে এই কবিতার আশ্রয় আমাদের লাগে। সেই অস্থির সময়ে হাসানের অনেক কবিতাই মানুষকে রাষ্ট্রের তরফ থেকে দমনের যে চিত্র তার কাব্যিক ভাষ্য। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস-এর নানা রূপ তাঁর কবিতায় ঘুরে ফিরে এসেছে।
আরও অনেক লাইন উদাহরণ হিসেবে আনা যাবে হাসানের কবিতা থেকে। ফলে আবুল হাসান আমাদের জাতীয় সাহিত্যের যে প্রকল্প তাতে তছনছ করেছেন। তাঁর সমকালের নির্মলেন্দু গুণ বা রফিক আজাদের ঘোষণামূলক রাজনৈতিক কবিতা থেকে আলাদা করে। রাষ্ট্রে হাসান থেকে তারাই গুরুত্বপূর্ণ কবি হয়ে ওঠেন সময়ের ব্যবধানে। কবিতা সমাজ পরিবর্তন করে না। তবে সে দেখার দৃষ্টি দান করে। মানুষ ইতিহাস জানতে শিল্প বা কবিতার সহায় হন। ফলে, কবিতায় রচিত স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশর ইতিহাস দেখতে হলে আবুল হাসান অনিবার্য। মুদ্রার এপিঠের কবিতা সবাই লিখেছে। ওপিঠ দেখার জন্য আবুল হাসান ছাড়া আর কার কবিতার কাছে আমরা যাবে? দেখার জন্য হাসানের কবিতা আমাদের ইতিহাসকে সঠিকভাবে দেখতে দেয়। যারা হাসানের কবিতা বুঝবেন, কবিতা কীভাবে কাজ করে জানতে পারবেন, তারাই বাংলাদেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন করতে সক্ষম। হাসানের কবিতার নানা রকম পাঠ আছে। সেই পাঠের সঙ্গে সঙ্গে এই বিষয়গুলো আমাদের মনে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতা মূলধারা মূলত সর্বজনীন, ঘোষণামূলক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। নজরুলের বিদ্রোহী-কণ্ঠস্বর থেকে শুরু করে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের বেশিরভাগ রাজনৈতিক কবিতা জনসমাবেশের ভাষা হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা তুমি, বর্ণমালা আমার দুঃখিনী বর্ণমালা, আসাদের শার্ট এগুলোর ভেতর একটা মিল আপনি খুঁজে পাবেন। স্বাধীনতার মহত্ত্ব গাঁথা। হেলাল হাফিজ একই ঘটনা স্লোগান-সক্ষম, মিছিলমুখী, বাইরের দিকে সম্বোধিত। একই পটভূমিতে আবুল হাসান প্রতিস্বর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন— এটা তাঁর বিশেষত্ব। এই পথে তিনি নিঃসঙ্গ, পাশে কেউ নেই।
৭৪ এর দুর্ভিক্ষ রফিক আজাদ লেখেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, নাইলে মানচিত্র খাবো।’ খুবই সরাসরি, রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেন, অভিশাপ দেন তিনি। এর ফলাফল হিসাবে তাকে খুব সুখকর অভিজ্ঞাতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়নি। রাষ্ট্র সন্ত্রাসী এর প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। একই মন্বন্তর নিয়ে হাসান লিখেছেন, ‘অনাহারে অনেকেই যুবতী হয়েও আর যুবতী হবে না’, ‘আমি জানতাম, পারবো না’। আজাদ রাষ্ট্রকে হুমকি দেয় সরাসরি— হারামজাদা বলে গালি দেয়। অন্য দিকে হাসান তাঁর কবিতায় সাক্ষী রেখে দেন। এই Tribune-বনাম-Witness পার্থক্যেই তাঁর মৌলিক অবদান।
এখন প্রশ্ন হলো হাসান রাজনৈতিকভাবে এই দর্শক হয়ে ওঠায় আমাদের লাভ কী হলো? প্রথমত, হাসান আমাদের নিরপেক্ষভাবে বাস্তবতা দেখার চোখ দেন। এর প্রেক্ষিতে তিনি কিছুই করতে বলেন না। প্রথমত এই রাজনৈতিক বাস্তবতা যখন সবাই উপলব্ধি করতে চায় না বা সচেতনভাবে এড়িয়ে যেতে চায় তখন হাসান তাঁর কবিতায় সময়ের ঘটনাপুঞ্জের নোট নিচ্ছেন। স্বাধীনতার গৌরবের যে মোহ শামসুর রাহমান ও আরও অনেক কবির তা হয়তো আমাদের কাজে লাগে। এগুলো ছাড়া রাষ্ট্র গঠন হয় না। তবে এর বাইরে থেকেও দেখা জরুরি, যা রাষ্ট্র নির্মাণে লাগে। ফলে, এখানে গঠনের রাজনীতি প্রবল, এখন নির্মাণের জন্য ইতিহাসকে পরিশুদ্ধ করে নিতে হবে। এই পরিশুদ্ধির জন্য যে রাষ্ট্র-যন্ত্রণা লাগে আবুল হাসানের কাছে গেলে পাবেন। এই জন্য হাসান এখনো এতে জরুরি। ভেতর ভর করেছিল তা থেকে ক্ষণিক বের হওয়াও জরুরি। নতুন ইতিহাস লিখতে গেলে এটি আমাদের খুব জরুরিভাবে লাগবে। সবাই যখন উদ্যাপনে ব্যস্ত তখন তিনি শোক করছেন। আরেকটি গুরুতর বিষয় হলো, হাসান রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের সীমানা মুছে দিয়েছেন তাঁর কবিতায়। প্রেম-মৃত্যু সবই জীবনের অংশ। মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশের রাজনৈতিক কবিতার যে অ-বিরোচিত, অ-সান্ত্বনাদায়ী পথ সেটাই হাসান পছন্দ করেছেন। সেই পথ খুব বেশি কবি মাড়ায়নি।
মারী ও বন্যায় যার মৃত্যু হয় হোক। আমি মরি নাই–শোনো
লেবুর কুঞ্জের শস্যে সংগৃহীত লেবুর আত্মার জিভে জিভ রেখে
শিশুর যে আস্বাদ আর নারী যে গভীর স্বাদ
সংগোপন শিহরণে পায়-আমি তাই!
নতুন ধানের ঋতু বদলে পালা শেষে
শস্যিতা রৌদ্রের পাশে কিশোরীরা যে পার্বণে আজো হয়
পবিত্র কুমারী শোনো। আমি তাতে আছি!
আর সব যুদ্ধের মৃত্যুর মুখে হঠাৎ হাসির মতো ফুটে ওঠা পদ্মহাঁস
সে আমার গোপন আরাধ্য অভিলাষ!
বহ্নি রচনার দ্বারা বৃক্ষে হয় ফুল;
ফুলে প্রকাশিকা মধুর মৃন্ময় অবদান শোনা,
ঝর্ণার যে পাহাড়ী বঙ্কিম ছন্দ, কবির শ্লোকের মতো স্বচ্ছ সুধাস্রোত
স্পেনের পর্বত প্রস্তর পথে টগবগে রৌদ্রের যে সুগন্ধি কেশর কাঁপা
কর্ডোভার পথে বেদুঈন!
লোকার বিষণ্ণ জন্ম, মৃত্যু দিয়ে ভরা চাঁদ,
শুধু সবিতার শান্তি-আমি তাই!
হারানো পারের ঘাটে জেলে ডিঙ্গি, জাল ভোলা কুচো মাছে
কাঁচালী সৌরভ–শোনো
সেখানে সংগুপ্ত এক নদীর নির্মল ব্রীজে
বিশুদ্ধির বিরল উত্থানের মধ্যে আমি আছি
এ বাংলায় বার বার হাঁসের নরোম পায়ে খঞ্জনার লোহার ক্ষরায়
বন্যার খুরের ধারে কেটে ফেলা মৃত্তিকার মলিন কাগজ
মাঝে মাঝে গলিত শুয়োর গন্ধ, ইঁদুরের বালখিল্য ভাড়াটে উৎপাত
অসুস্থতা, অসুস্থতা আর ক্ষত সারা দেশ জুড়ে হাহাকার
ধান বুনলে ধান হয় না, বীজ থেকে পুনরায় পল্লবিত হয় না পারুল
তবুও রয়েছি আজো আমি আছি,
শেষ অঙ্কে প্রবাহিত শোনো তবে আমার বিনাশ নেই
যুগে যুগে প্রেমিকের চোখের কস্তুরী দৃষ্টি,
প্রেমিকার নত মুখে মধুর যন্ত্রণা,
আমি করি না, মরি না কেউ কোনোদিন কোনো অস্ত্রে
আমার আত্মাকে দীর্ণ মারতে পারবে না।
(নচিকেতা/ পৃথক পালঙ্ক)
আবুল হাসান অকালে প্রয়াত হয়েছেন এ কথা সত্য। অগণন লেখক, কবি, শিল্পী আছেন যারা আমাদের প্রত্যাশার পূর্বেই চলে গেছেন। একজন শিল্পী তাঁর কাজের ভেতর মূলত তাঁর সময়কে ধরে রাখেন। বড় শিল্পীরা এমনভাবে এটাকে ধারণ করেন যে সর্বকালও তা থেকে আলো বিচ্ছুরিত হয়। নতুন নতুন অর্থ নিয়ে তা আমাদের কাছে ধরা দেয়। এমন শক্তিধর কবিরা মারা গেলেও তাঁদের কবিতার ভেতর এই সারবত্তাগুলো রেখে যান, তাঁর সৃষ্টির ভেতর সময় থেমে যায় না, চলতেই থাকে। আবুল হাসান এমনই একজন যারা জীবন থামলেও তাঁর লেখার রেজোন্যান্স থামেনি। তা কেবলই ‘লাবণ্য ধরে, উজ্জ্বলতা ধরে’। তাঁর অকাল মৃত্যুকে ঘিরে আমাদের যে অতৃপ্তি তা দিয়ে তাঁর কবিতার কীর্তি পরিমাপ করতে গেলে তা আমাদেরই দুর্বলতা হিসাবে চিহ্নিত হবে। বাংলাদেশের মহৎ কবিদের একজন আবুল হাসান।
আবুল হাসানের যাত্রা ‘আমরা’ থেকে ‘আমি’র দিকে। তিনি জনতার মন ও কান ভরাতে বাংলা কবিতা লিখতে আসেননি। তিনি বাংলা কবিতার যে ট্র্যাডিশনাল ধাঁচ সেই পথেই গিয়েছেন, তবে সমান্তরালে নয়, কিছুটা তির্যক বাঁকানো পথে। জাতির যা কিছু মহীয়ান তাকে চুরমার করতে চেয়েছেন, করেছেনও। পথটা খুব সরল ছিল না। কবিতার ভাষায় তিনি বিরাট বিপ্লব করতে চাননি। ভাষা ও কবিতার কারুকাজের কোন জবরদস্তি নাই। কিন্তু তাঁর কবিতা ব্যক্তিকে বিচূর্ণ করে দেয়। দুনিয়ার আসল স্বরূপ খুব অশ্লীল ও নগ্নভাবে ধরা পড়ে।
একাত্তর-উত্তর এই জনপদের মানুষের রাজনৈতিক আচার বুঝতে হলে আবুল হাসানের তিনটি পাতলা বই তুলে দেওয়াই যথেষ্ট; এই তিনটি বইয়ের ভাঁজে একটি জাতির বিজয়, অর্জন ও বিপর্যয় পাশাপাশি শুয়ে আছে। এ এক বিরাট বিরল ঘটনা।
সেই অর্থে তাঁকে রাজনৈতিক কবি বলা যাবে না। তবে তিনি এমন তিনটি কাব্যগ্রন্থের নিদারুণ উদাহরণ রেখে গিয়েছেন যার আছে একটা জাতির ঐতিহাসিক সময়টা বোঝার জন্য যেতে হয়। এই কাজ বড় লেখক ছাড়া আর কেউ করতে পারেন না।
উৎসবের আলো নন, বরং শোকের নীরবতায় সবচেয়ে স্পষ্ট, উজ্জ্বল কবি আবুল হাসান।
লেখক: কবি, গদ্যকার ও চিন্তক
.png)

শুটিংয়ের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন মেরিলিনের দ্বিতীয় স্বামী, বেসবল তারকা জো ডিম্যাজিও। হাজারো মানুষের সামনে স্ত্রীকে এভাবে দেখানো তিনি মেনে নিতে পারেননি। আলোকচিত্রী জর্জ এস. জিমবেলের বর্ণনা অনুযায়ী, ক্ষুব্ধ ডিম্যাজিও শুটিং সেট ছেড়ে চলে যান।
১৩ মিনিট আগে
‘আশা ছিল ভালোবাসা ছিল’, ‘সেই রাতে রাত ছিল পূর্ণিমা’, ‘মেরে সপ্নো কি রানি’, ‘রূপ তেরা মস্তানা’ কিংবা ‘জিন্দেগি এক সফর হ্যায় সুহানা’—এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গানের কণ্ঠশিল্পী বলিউডের কিংবদন্তি কিশোর কুমার। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু তাঁর গান আজও মানুষের মনে একই রকম জনপ্রিয়। রোমান্টিক গানে যেমন শ্রোত
৫ ঘণ্টা আগে
বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ‘মুখ ও মুখোশ’। এই সিনেমার হাত ধরেই এ দেশে নিজেদের সিনেমা তৈরির স্বপ্ন সত্যি হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম সবাক পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা। এই ছবির পেছনের কারিগর ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি অনেক
০৩ আগস্ট ২০২৬
বাজার থেকে টাটকা ফল ও সবজি কিনে আনার পর অনেকেই সেগুলো ফ্রিজে বা রান্নাঘরের এক কোণে রেখে দেন। কিন্তু সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে দেখতে ভালো থাকলেও এ খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার ফ্রিজে ফেলে রাখা সবজি বা ফলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুও জন্মাতে পারে। সব খাবার যে একই সময়
০৩ আগস্ট ২০২৬