যুক্তরাষ্ট্র-ইরানকে টেবিলে বসাতে পাকিস্তানের নতুন ‘দাওয়া’

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্থবির হয়ে পড়া সরাসরি শান্তি আলোচ'না পুনরায় শুরু করার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। কূটনৈতিক প্রয়াসের অংশ হিসেবে জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তাদের অবিলম্বে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে দেশটির সরকার।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) রাতে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতিতে জানায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইশাক দার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। দার সুবিধাজনক সময়ে আরাঘচিকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আয়াজ সাদিক ইরানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার ও প্রধান কৌশলবিদ মোহাম্মদ বাঘের গালিবফকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তবে ইরানি প্রতিনিধিরা কবে পাকিস্তান সফর করবেন তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

এই কূটনৈতিক তৎপরতা এমন সময়ে হলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের নেতাদের সমালোচনা করে তাঁদের ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘তারা (ইরান) মিটিংয়ের অনুরোধ জানায় এবং এরপর আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় ভবিষ্যতে আরও বৈঠকের তারিখ ঠিক হয়। অথচ ইরান প্রকাশ্যে ও গর্বের সঙ্গে বলে বেড়ায় যে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না।’

পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে এটি ইরানের জন্য ‘শেষ সুযোগ’। তাদের সামনে একটাই পথ—‘চুক্তি অথবা পূর্ণ আত্মসমর্পণ’।

ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা চলছে না। তিনি জানান, ইরান কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে কারিগরি আলোচনা চালাচ্ছে।

বাঘাই আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় পাকিস্তানই ‘প্রধান মধ্যস্থতাকারী’ এবং কাতার ‘প্রয়োজন অনুযায়ী’ সহযোগিতা করছে।

ইসলামাবাদ সমঝোতা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকিস্তানের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে। তারা ক্রমাগত সংযম, সংলাপ এবং কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়ে আসছে।

গত এপ্রিলে বহু দশকের মধ্যে প্রথম যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সরাসরি আলোচনার আয়োজন করেছিল পাকিস্তান। সেই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ জুন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় স্মারক বা ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ীভাবে যুদ্ধবন্ধসহ সকল বিরোধের স্থায়ী সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।

তবে সমঝোতা স্মারক এক মাসের বেশি স্থায়ী হয়নি; দুই পক্ষ আবারও সামরিক হামলায় জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় ইরানের ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে।

এত কিছুর পরও জুলাইজুড়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বারবার বলে আসছেন যে ‘ইসলামাবাদ স্মারকই’ শান্তির একমাত্র পথ।

সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, এই সমঝোতা স্মারকই ইরানের ভবিষ্যৎ বৈদেশিক সম্পর্কের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘শত্রুকে আমরা যে চুক্তিতে সই করিয়েছি, সেটিতে অবিচল রাখতে বাধ্য করতে হবে। এর মাধ্যমেই দেশ এবং আমাদের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’

ইরানে নিযুক্ত পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত আসিফ দুররানি আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই স্মারক মৃত দলিল নয়, বরং ‘ভিত্তিপ্রস্তর’ হিসেবে কাজ করছে।’

বিশ্লেষকেরা কী বলছেন

বারবার শান্তির উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়া প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বিশ্বাসহীনতাকেই প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করছেন।

জার্মান মার্শাল ফান্ডের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা গ্রেস ওয়েরমেনবোল বলেন, ‘বারবার সংঘাতের ফলে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্বাসটুকুও নষ্ট হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি ঢাকতেই ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সামরিক হুমকি দিচ্ছে, অন্যদিকে কূটনীতির পথও খোলা রাখছে।

কাতারের জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মেহরান কামরাভা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কোনো এক্সিট স্ট্র্যাটেজি বা বের হয়ে যাওয়ার পথ জানা নেই। তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই এবং এই যুদ্ধের শেষ কোথায় তা নিয়ে তাদের স্পষ্ট ধারণাই নেই। ফলে তারা বারবার নিজেদের শর্ত পরিবর্তন করছে।’

ট্রাম্পের বিভিন্ন এলোমেলো মন্তব্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রাম্প তাঁর অনিশ্চিত আচরণকে ক্ষমতার উৎস মনে করেন। হোয়াইট হাউসের কোনো সুসংগত কৌশল না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিচ্ছে।’

তেহরানের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক সৈয়দ মুজতবা জালালজাদেহ মনে করেন, বারবার ব্যর্থতায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা কিছুটা সংকুচিত হয়ে কেবল ‘সহযোগিতাকারী’ দেশে পরিণত হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘পাকিস্তান যদি নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি দেয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সমঝোতা চেষ্টাকে ‘কূটনৈতিক শ্রম বিভাজন’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

জালালজাদেহ এবং মেহরান কামরাভা জানান, ওমান ও ইরান উপকূলীয় দেশ হওয়ায় তারা হরমুজ প্রণালির জলপথ, মাইন অপসারণ ও সার্ভিস চার্জের মতো কারিগরি বিষয়গুলো পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান ও কাতার রাজনৈতিক-কৌশলগত বিষয়গুলো যেমন—যুদ্ধবিরতি, হামলা কমানো, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, পারমাণবিক ফাইল এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি নিয়ে কাজ করছে।

তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা ও আনাদোলু

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত