রাতে বিদ্যুতের চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে লোডশেডিং

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ২৩: ৪৩
বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় না ফেরায় ফের তীব্র লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা রয়ে গেছে। স্ট্রিম গ্রাফিক

দেশে চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে গ্যাসভিত্তিক বেশ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে এবং চালু থাকা কেন্দ্রগুলোও চলছে আংশিক সক্ষমতায়।

প্রায় সারাদিনই দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট করে লোডশেডিং করতে হচ্ছে। রাতে বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য আরও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে মধ্যরাতে লোডশেডিং সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎচালিত যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং সেগুলো প্রধানত রাতের বেলায় চার্জ দেওয়ার কারণে এই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ও লোডশেডিং দুটোই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে বাস্তব উৎপাদন নির্ভর করে জ্বালানি সরবরাহ, কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও চাহিদার তারতম্যের ওপর। চলতি বছরের মে মাসে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড হয়েছে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একমাত্র প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। রাষ্ট্রীয় এ সংস্থাটির তথ্য বলছে, সোমবার (৩ আগস্ট) বেলা ১২টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৭৩১ মেগাওয়াট। সরবরাহ করা হয়েছে ১৩ হাজার ১৫ মেগাওয়াট। এ সময় ২ হাজার ৭১৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। দুপুর ১টায় লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। রোববারও (২ আগস্ট) দিনের বেলা এভাবে দুই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল।

রাত বাড়লে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ আরও বাড়ছে। রোববার (২ আগস্ট) দিবাগত রাত ১টায় ৩ হাজার ৫১২ মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হয়েছে। ওই সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৪৪ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১২ হাজার ৫৩২ মেগাওয়াট।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের (এমএমসিএফডি) কিছু বেশি। বর্তমানে সরবরাহ বন্ধ থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি সচল থাকার সময় সরবরাহের পরিমাণ ছিল ১ হাজার এমএমসিএফডি।

গ্যাসের সরবরাহ সংকটে বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য উৎপাদনে থাকা বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে সরকারি খাতের ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার চট্টগ্রাম তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির (এনডব্লিউপিজিসিএল) ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের (এপিএসসিএল) ৪৫০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র (দক্ষিণ) ও ৪২০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র (পূর্ব) এবং বেসরকারি খাতের আশুগঞ্জ ১৯৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র।

একই কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে রুরাল পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিসিএল) ২১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র, পিডিবির টঙ্গী ৮০ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিরাজগঞ্জ ২২৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্র (ইউনিট-৩) এবং পিডিবির বাঘাবাড়ী ৭১ মেগাওয়াট গ্যাস টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র।

সচল থাকা কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে এনডব্লিউপিজিসিএলের সিরাজগঞ্জ ৪০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-৪ গ্যাস সংকটের কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না। ৪১৪ মেগাওয়াট কার্যকর সক্ষমতার এই কেন্দ্রটি থেকে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। একই সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বেসরকারি খাতের সামিট মেঘনাঘাট ৩৩৫ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎকেন্দ্রে, যেখান থেকে ৩৩৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে মাত্র ১৩৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। গ্যাস সংকটের আগে এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আরও বেশি পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছিল।

পিডিবি বলছে, গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। আবার চাইলেই ফার্নেস অয়েল বা তরল জ্বালানি দিয়ে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না। কারণ এটি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। ফলে চাহিদার পুরোটা তরল জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদন করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণেই লোডশেডিং বেড়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে আমরা অন্যান্য উৎস থেকে কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন করছি। বলা যায়, গ্যাসভিত্তিক ব্যতীত যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে, সেগুলো পুরোদমে চালানো হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগে দেখা যেত মাঝরাতে বিদ্যুতের চাহিদা কম। কিন্তু ইদানীং অটোরিকশার সংখ্যা বেড়ে গেছে। রাতে একসঙ্গে এগুলোয় চার্জ দেওয়া হয়। রাতে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার এটি একটি বড় কারণ।’

দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট নতুন নয়। দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে আসায় ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু করে সরকার। কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত দুটি ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে এলএনজি রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছিল। দৈনিক গ্যাস সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এলএনজি থেকে। তবে গত ২১ জুলাই মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দেয়। এখন পর্যন্ত টার্মিনালটি সচল হয়নি। ফলে সারা দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দেয়। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে পরিবহন ও শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সেই ধাক্কা লেগেছে।

রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (আরপিজিসিএল) উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন স্ট্রিমকে বলেন, ‘দিন দুয়েকের মধ্যে আংশিকভাবে টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করা যাবে। আগামী সপ্তাহে টার্মিনাল থেকে পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ করা যাবে বলে আশা করছি।’

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত