স্ট্রিম ডেস্ক

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ‘মুখ ও মুখোশ’। এই সিনেমার হাত ধরেই এ দেশে নিজেদের সিনেমা তৈরির স্বপ্ন সত্যি হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম সবাক পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা। এই ছবির পেছনের কারিগর ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি অনেক বাধা পেরিয়ে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ দেশে নিজেদের সিনেমা বানানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না। তখন সিনেমা হলগুলোতে শুধু ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, উর্দু আর হলিউডের সিনেমাই দেখানো হতো। এমন অবস্থায় ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় সিনেমা শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সভার আয়োজন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ড. আবদুস সাদেক। সেই সভায় অবাঙালি সিনেমা ব্যবসায়ী ফজলে দোসানী তাচ্ছিল্য করে বলেন, ‘এখানকার আবহাওয়া খারাপ, স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা বেশি। এখানে সিনেমা বানানো সম্ভব নয়।’
এই কথার কড়া প্রতিবাদ করেন আবদুল জব্বার খান। তিনি বলেন, ‘এখানে যদি ভারতীয় সিনেমার শুটিং হতে পারে, তবে পূর্ণাঙ্গ সিনেমা কেন বানানো যাবে না? মিস্টার দোসানী, মনে রাখবেন, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কেউ সিনেমা না বানায়, তবে আমি জব্বার খানই তা বানিয়ে প্রমাণ করব।’
এই জেদ আর চ্যালেঞ্জ থেকেই শুরু হয় আবদুল জব্বার খানের স্বপ্নের পথচলা।
বিখ্যাত লেখক পাওলো কোয়েলহো তাঁর ‘দ্য আলকেমিস্ট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মানুষ যখন মন থেকে কিছু চায়, তখন পুরো পৃথিবী তাকে সেটা পেতে সাহায্য করে।’ সিনেমা বানানোর দুই বছরের ক্লান্তিকর যাত্রায় আবদুল জব্বার খান পদে পদে বাধার মুখে পড়েছেন। শুরুতে তাঁর এই চ্যালেঞ্জকে অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। কিউ এম জামান তো বলেই বসেছিলেন, ‘ভুল করলে হে, সিনেমা তুমি করতে পারবে না।’

জব্বার খান হাল ছাড়েননি। সামর্থ্য কম থাকলেও অদম্য ইচ্ছা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল টাকা। সেই সময়ে প্রায় ৮২ হাজার টাকা খরচ করে সিনেমা বানানোর কথা ভাবাই কঠিন ছিল। ঠিক তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন সংস্কৃতিপ্রেমী কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু মিয়া। তিনি হচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক আলমগীরের বাবা। দুদু মিয়া নির্মাণ খরচের অর্ধেক টাকা দেন। বাকি টাকার ব্যবস্থা করেন আবদুল জব্বার খান ও তাঁর চার বন্ধু। টাকার চিন্তা তো দূর হলো, কিন্তু এবার শুরু হলো অভিনয়শিল্পী খোঁজার পালা। সেখানেও বাধার কোনো শেষ ছিল না।
টাকার সমস্যা মিটলেও শিল্পী খুঁজে বের করা ছিল আরেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমে কলিম শরাফী ও কামেলা শরাফীকে নায়ক-নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাজ করা হয়নি। বাধ্য হয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো—‘এ দেশের প্রথম ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী নেওয়া হবে।’
এই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জহরত আরার। তিনি বাড়ির কাউকে না জানিয়েই গোপনে যোগাযোগ করেন। সঙ্গে নিয়ে যান বান্ধবী পিয়ারী বেগমকে, যিনি ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। অডিশন দেওয়ার দুই দিন পর খবর পেলেন, দুজনেই ‘সিলেক্টেড’!
সিনেমায় নায়িকা কুলসুমের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কলকাতা থেকে আসেন শিল্পী পূর্ণিমা সেনগুপ্ত। আর পিয়ারী বেগম অভিনয় করেন নায়ক আফজালের বোন রাশিদার চরিত্রে।
আবদুল জব্বার খান এর আগে ফরিদপুরের একটি ডাকাতির ঘটনা নিয়ে ‘ডাকাত’ নামের একটি নাটক লিখেছিলেন। প্রথমে এই সিনেমার নামও রাখা হয়েছিল ‘ডাকাত’। তবে পরে নাম বদলে রাখা হয় ‘মুখ ও মুখোশ’।
ডাকাত সরদারের চরিত্রে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ। এ ছাড়া অনেক স্থানীয় অভিনয়শিল্পীকে নেওয়া হয়, যাঁদের আগে অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁরা সবাই বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন। পরিচালক মূল নায়ক (আফজাল) চরিত্রে কলিম শরাফীকে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শরাফী ও তাঁর বন্ধুরা পারিশ্রমিক দাবি করায় সেটি আর সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। আরেকটি চরিত্রের জন্য তিনি নিজের শ্যালককে বেছে নেন। আর তিনি হচ্ছেন দেশের প্রথম কৌতুকাভিনেতা সাইফুদ্দিন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন রফিক, নুরুল আনাম খান, বিলকিস বারী প্রমুখ।
১৯৫৩ সালের নভেম্বরে শিল্পী নির্বাচন শেষ হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক মহরত বা উদ্বোধনের আগেই শুটিং শুরু হয়ে যায়। প্রথম দিকে ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন কলকাতার মুরারী মোহন ঘোষ। কিন্তু শুটিং চলাকালে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হঠাৎ কাজ ছেড়ে দেওয়ায় গল্পের চিত্রনাট্য বদলাতে হয়। এরপর ১৯৫৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কারণে অনেক দিন শুটিং বন্ধ থাকে। মনে হচ্ছিল, সেই অবাঙালি ব্যবসায়ী ফজলে দোসানীর কথাই বুঝি সত্যি হতে চলেছে! প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার বাধা দিলেও, বিরতির পর সিনেমার পুরো টিম আবার পুরোদমে কাজে নেমে পড়ে।
১৯৫৪ সালের ৬ আগস্ট শাহবাগ হোটেলের ছাদে সিনেমার আনুষ্ঠানিক মহরত হয়। সেদিনও প্রবল বৃষ্টিতে শাহবাগ এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে গিয়েছিল। এর মধ্যেই মহরতের উদ্বোধন করেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ইসকান্দার মীর্জা। দুর্যোগ অবশ্য এখানেই থামেনি। ১৯৫৫ সালে শুটিং শেষ হওয়ার ঠিক আগে ইউনিটটি আবার বন্যার কবলে পড়ে। পানি নেমে গেলে আবার কাজ শুরু হয়। সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর টানা শুটিং শেষ হয়।
বাজেট কম থাকায় পুরো সিনেমার শুটিং ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় করা হয়। তেজগাঁও, কালীগঞ্জ, রাজারবাগ, কমলাপুর, লালমাটিয়া, সিদ্ধেশ্বরী, জিঞ্জিরা ও টঙ্গী ছিল প্রধান লোকেশন। এরপর সিনেমা সম্পাদনার (এডিটিং) জন্য পুরো দল লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে যায়। প্রায় তিন মাস ধরে চলে সম্পাদনার কাজ। তবে সবচেয়ে বড় বিপদ দেখা দেয় শব্দ সম্পাদনায় (ডাবিং)। কারণ শুটিংয়ের সময় রেকর্ড করা শব্দের মান খুব খারাপ ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পীদের দিয়ে ডাবিং করানোর চেষ্টা করা হলেও তাদের বাংলা উচ্চারণে সমস্যা থাকায় তা বাতিল করতে হয়। শেষমেশ সম্পাদক চরম ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্য ও সংলাপ ধরে ধরে সম্পাদনার কাজ শেষ করেন।
সব শেষে ৯৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তির জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া নিয়ে। অনেক হল মালিক ও পরিবেশক ভেবেছিলেন, দর্শক এই সিনেমা দেখবে না। কেউ কেউ আবার ভয় পাচ্ছিলেন যে, সিনেমা খারাপ হলে দর্শকরা রেগে গিয়ে হল ভাঙচুর করতে পারে! এ কারণে ঢাকার বেশ কয়েকটি সিনেমা হল এটি চালাতে রাজি হয়নি। পরে ‘পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্ট’ ও ‘পাকিস্তান ফিল্ম সার্ভিস’ ছবিটি পরিবেশনের দায়িত্ব নেয়।
অবশেষে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে সিনেমাটির প্রথম উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। একই দিন বিকেলে পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে দর্শকদের জন্য এটি মুক্তি পায়। ছবিটির বাকি তিনটি প্রিন্ট চট্টগ্রামের নিরালা, নারায়ণগঞ্জের ডায়মন্ড এবং খুলনার উল্লাসিনী সিনেমা হলে একযোগে চালানো হয়।
মুক্তির পর সিনেমা হলের চিত্র পুরোপুরি পালটে যায়। শুধু প্রথম দিকেই সিনেমাটি প্রায় ৪৮ হাজার টাকা আয় করে। পরে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ও টেলিভিশনে দেখানোর পর আয় আরও বাড়ে। নিজেদের দেশের তৈরি সিনেমা দেখার জন্য এ দেশের মানুষদের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল, তা নির্মাতাদের সব ভয় দূর করে দেয়। এ দেশের মানুষ দুহাত ভরে গ্রহণ করে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশকে। এই সিনেমাটি যদি সেদিন সফল না হতো, তবে হয়তো আজ আমরা ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘বেহুলা’ কিংবা ‘আলোর মিছিল’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো পেতাম না।

বাংলাদেশের সিনেমার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে ‘মুখ ও মুখোশ’। এই সিনেমার হাত ধরেই এ দেশে নিজেদের সিনেমা তৈরির স্বপ্ন সত্যি হয়। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তি পাওয়া ছবিটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) প্রথম সবাক পূর্ণাঙ্গ বাংলা সিনেমা। এই ছবির পেছনের কারিগর ছিলেন আবদুল জব্বার খান। তিনি অনেক বাধা পেরিয়ে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এ দেশে নিজেদের সিনেমা বানানোর কোনো উদ্যোগ ছিল না। তখন সিনেমা হলগুলোতে শুধু ভারতীয় বাংলা, হিন্দি, উর্দু আর হলিউডের সিনেমাই দেখানো হতো। এমন অবস্থায় ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় সিনেমা শিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সভার আয়োজন করেন পূর্ববঙ্গ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ড. আবদুস সাদেক। সেই সভায় অবাঙালি সিনেমা ব্যবসায়ী ফজলে দোসানী তাচ্ছিল্য করে বলেন, ‘এখানকার আবহাওয়া খারাপ, স্যাঁতসেঁতে আর্দ্রতা বেশি। এখানে সিনেমা বানানো সম্ভব নয়।’
এই কথার কড়া প্রতিবাদ করেন আবদুল জব্বার খান। তিনি বলেন, ‘এখানে যদি ভারতীয় সিনেমার শুটিং হতে পারে, তবে পূর্ণাঙ্গ সিনেমা কেন বানানো যাবে না? মিস্টার দোসানী, মনে রাখবেন, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কেউ সিনেমা না বানায়, তবে আমি জব্বার খানই তা বানিয়ে প্রমাণ করব।’
এই জেদ আর চ্যালেঞ্জ থেকেই শুরু হয় আবদুল জব্বার খানের স্বপ্নের পথচলা।
বিখ্যাত লেখক পাওলো কোয়েলহো তাঁর ‘দ্য আলকেমিস্ট’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মানুষ যখন মন থেকে কিছু চায়, তখন পুরো পৃথিবী তাকে সেটা পেতে সাহায্য করে।’ সিনেমা বানানোর দুই বছরের ক্লান্তিকর যাত্রায় আবদুল জব্বার খান পদে পদে বাধার মুখে পড়েছেন। শুরুতে তাঁর এই চ্যালেঞ্জকে অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। কিউ এম জামান তো বলেই বসেছিলেন, ‘ভুল করলে হে, সিনেমা তুমি করতে পারবে না।’

জব্বার খান হাল ছাড়েননি। সামর্থ্য কম থাকলেও অদম্য ইচ্ছা আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে তিনি এগিয়ে যান। সবচেয়ে বড় বাধা ছিল টাকা। সেই সময়ে প্রায় ৮২ হাজার টাকা খরচ করে সিনেমা বানানোর কথা ভাবাই কঠিন ছিল। ঠিক তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন সংস্কৃতিপ্রেমী কলিম উদ্দিন আহমেদ দুদু মিয়া। তিনি হচ্ছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক আলমগীরের বাবা। দুদু মিয়া নির্মাণ খরচের অর্ধেক টাকা দেন। বাকি টাকার ব্যবস্থা করেন আবদুল জব্বার খান ও তাঁর চার বন্ধু। টাকার চিন্তা তো দূর হলো, কিন্তু এবার শুরু হলো অভিনয়শিল্পী খোঁজার পালা। সেখানেও বাধার কোনো শেষ ছিল না।
টাকার সমস্যা মিটলেও শিল্পী খুঁজে বের করা ছিল আরেক বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথমে কলিম শরাফী ও কামেলা শরাফীকে নায়ক-নায়িকা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের কাজ করা হয়নি। বাধ্য হয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো—‘এ দেশের প্রথম ছবিতে অভিনয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী নেওয়া হবে।’
এই বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী জহরত আরার। তিনি বাড়ির কাউকে না জানিয়েই গোপনে যোগাযোগ করেন। সঙ্গে নিয়ে যান বান্ধবী পিয়ারী বেগমকে, যিনি ইডেন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। অডিশন দেওয়ার দুই দিন পর খবর পেলেন, দুজনেই ‘সিলেক্টেড’!
সিনেমায় নায়িকা কুলসুমের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কলকাতা থেকে আসেন শিল্পী পূর্ণিমা সেনগুপ্ত। আর পিয়ারী বেগম অভিনয় করেন নায়ক আফজালের বোন রাশিদার চরিত্রে।
আবদুল জব্বার খান এর আগে ফরিদপুরের একটি ডাকাতির ঘটনা নিয়ে ‘ডাকাত’ নামের একটি নাটক লিখেছিলেন। প্রথমে এই সিনেমার নামও রাখা হয়েছিল ‘ডাকাত’। তবে পরে নাম বদলে রাখা হয় ‘মুখ ও মুখোশ’।
ডাকাত সরদারের চরিত্রে অভিনয় করেন ইনাম আহমেদ। এ ছাড়া অনেক স্থানীয় অভিনয়শিল্পীকে নেওয়া হয়, যাঁদের আগে অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। তাঁরা সবাই বিনা পারিশ্রমিকে অভিনয় করেছিলেন। পরিচালক মূল নায়ক (আফজাল) চরিত্রে কলিম শরাফীকে নিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শরাফী ও তাঁর বন্ধুরা পারিশ্রমিক দাবি করায় সেটি আর সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে পরিচালক আবদুল জব্বার খান নিজেই নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেন। আরেকটি চরিত্রের জন্য তিনি নিজের শ্যালককে বেছে নেন। আর তিনি হচ্ছেন দেশের প্রথম কৌতুকাভিনেতা সাইফুদ্দিন। অন্যান্য চরিত্রে ছিলেন রফিক, নুরুল আনাম খান, বিলকিস বারী প্রমুখ।
১৯৫৩ সালের নভেম্বরে শিল্পী নির্বাচন শেষ হয়। এরপর আনুষ্ঠানিক মহরত বা উদ্বোধনের আগেই শুটিং শুরু হয়ে যায়। প্রথম দিকে ক্যামেরার দায়িত্বে ছিলেন কলকাতার মুরারী মোহন ঘোষ। কিন্তু শুটিং চলাকালে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিল্পী হঠাৎ কাজ ছেড়ে দেওয়ায় গল্পের চিত্রনাট্য বদলাতে হয়। এরপর ১৯৫৪ সালের ভয়াবহ বন্যার কারণে অনেক দিন শুটিং বন্ধ থাকে। মনে হচ্ছিল, সেই অবাঙালি ব্যবসায়ী ফজলে দোসানীর কথাই বুঝি সত্যি হতে চলেছে! প্রাকৃতিক দুর্যোগ বারবার বাধা দিলেও, বিরতির পর সিনেমার পুরো টিম আবার পুরোদমে কাজে নেমে পড়ে।
১৯৫৪ সালের ৬ আগস্ট শাহবাগ হোটেলের ছাদে সিনেমার আনুষ্ঠানিক মহরত হয়। সেদিনও প্রবল বৃষ্টিতে শাহবাগ এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে গিয়েছিল। এর মধ্যেই মহরতের উদ্বোধন করেন পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল ইসকান্দার মীর্জা। দুর্যোগ অবশ্য এখানেই থামেনি। ১৯৫৫ সালে শুটিং শেষ হওয়ার ঠিক আগে ইউনিটটি আবার বন্যার কবলে পড়ে। পানি নেমে গেলে আবার কাজ শুরু হয়। সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘মুখ ও মুখোশ’-এর টানা শুটিং শেষ হয়।
বাজেট কম থাকায় পুরো সিনেমার শুটিং ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় করা হয়। তেজগাঁও, কালীগঞ্জ, রাজারবাগ, কমলাপুর, লালমাটিয়া, সিদ্ধেশ্বরী, জিঞ্জিরা ও টঙ্গী ছিল প্রধান লোকেশন। এরপর সিনেমা সম্পাদনার (এডিটিং) জন্য পুরো দল লাহোরের শাহনূর স্টুডিওতে যায়। প্রায় তিন মাস ধরে চলে সম্পাদনার কাজ। তবে সবচেয়ে বড় বিপদ দেখা দেয় শব্দ সম্পাদনায় (ডাবিং)। কারণ শুটিংয়ের সময় রেকর্ড করা শব্দের মান খুব খারাপ ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পীদের দিয়ে ডাবিং করানোর চেষ্টা করা হলেও তাদের বাংলা উচ্চারণে সমস্যা থাকায় তা বাতিল করতে হয়। শেষমেশ সম্পাদক চরম ধৈর্যের সঙ্গে প্রতিটি দৃশ্য ও সংলাপ ধরে ধরে সম্পাদনার কাজ শেষ করেন।
সব শেষে ৯৯ মিনিট দৈর্ঘ্যের সিনেমা ‘মুখ ও মুখোশ’ ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট মুক্তির জন্য প্রস্তুত হয়। কিন্তু বিপত্তি দেখা দেয় সিনেমা হলে মুক্তি দেওয়া নিয়ে। অনেক হল মালিক ও পরিবেশক ভেবেছিলেন, দর্শক এই সিনেমা দেখবে না। কেউ কেউ আবার ভয় পাচ্ছিলেন যে, সিনেমা খারাপ হলে দর্শকরা রেগে গিয়ে হল ভাঙচুর করতে পারে! এ কারণে ঢাকার বেশ কয়েকটি সিনেমা হল এটি চালাতে রাজি হয়নি। পরে ‘পাকিস্তান ফিল্ম ট্রাস্ট’ ও ‘পাকিস্তান ফিল্ম সার্ভিস’ ছবিটি পরিবেশনের দায়িত্ব নেয়।
অবশেষে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে সিনেমাটির প্রথম উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। এটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। একই দিন বিকেলে পুরান ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে দর্শকদের জন্য এটি মুক্তি পায়। ছবিটির বাকি তিনটি প্রিন্ট চট্টগ্রামের নিরালা, নারায়ণগঞ্জের ডায়মন্ড এবং খুলনার উল্লাসিনী সিনেমা হলে একযোগে চালানো হয়।
মুক্তির পর সিনেমা হলের চিত্র পুরোপুরি পালটে যায়। শুধু প্রথম দিকেই সিনেমাটি প্রায় ৪৮ হাজার টাকা আয় করে। পরে বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শনী ও টেলিভিশনে দেখানোর পর আয় আরও বাড়ে। নিজেদের দেশের তৈরি সিনেমা দেখার জন্য এ দেশের মানুষদের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছিল, তা নির্মাতাদের সব ভয় দূর করে দেয়। এ দেশের মানুষ দুহাত ভরে গ্রহণ করে প্রথম সবাক চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশকে। এই সিনেমাটি যদি সেদিন সফল না হতো, তবে হয়তো আজ আমরা ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘বেহুলা’ কিংবা ‘আলোর মিছিল’-এর মতো কালজয়ী সিনেমাগুলো পেতাম না।
.png)

বাজার থেকে টাটকা ফল ও সবজি কিনে আনার পর অনেকেই সেগুলো ফ্রিজে বা রান্নাঘরের এক কোণে রেখে দেন। কিন্তু সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে দেখতে ভালো থাকলেও এ খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার ফ্রিজে ফেলে রাখা সবজি বা ফলে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য ক্ষতিকর জীবাণুও জন্মাতে পারে। সব খাবার যে একই সময়
৯ ঘণ্টা আগে
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যা
১ দিন আগে
ছোটবেলায় মনে হতো বন্ধুদের ছাড়া থাকা একেবারেই অসম্ভব। প্রতিদিন ক্লাসের ফাঁকে লুকিয়ে টিফিন খাওয়া, টিফিনের সময় আড্ডা বা ক্লাসের মধ্যে হাসাহাসি করা দিনগুলো যে একদিন ছেড়ে আসতে হবে, তখন তা ভাবিওনি।
১ দিন আগে
চিত্রশিল্পী তৌহিন হাসান ঘুরে দেখেছেন দেশ-বিদেশের বিখ্যাত সব আর্ট মিউজিয়াম ও আর্ট গ্যালারি ও স্কাল্পচার পার্ক। সেই শিল্পভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন ধারাবাহিক ‘আর্ট মিউজিয়ামে চক্কর’। আজ প্রকাশিত হলো এর তৃতীয় পর্ব। এ পর্বে থাকছে একক কোনো শিল্পীর তৈরি বিশ্বের সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য উদ্যান ভ্রমণ
০২ আগস্ট ২০২৬