ব্রিকস সম্মেলন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং আমাদের জাতীয় স্বার্থ

ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৫৩
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিকসকে অনেকেই ‘চীনের ব্রিকস’ হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। স্ট্রিম গ্রাফিক

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং দ্বিপাক্ষিক টানাপোড়েন নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। বিশেষ করে ভারতের মাটিতে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ এবং একই সময়ে ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবস্থান—এই বিষয়গুলো ভূ-রাজনীতিতে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি চেষ্টা দৃশ্যমান হলেও, পর্দার পেছনের কূটনীতি বেশ জটিল। তবে এসব আবেগ ও উত্তেজনার ঊর্ধ্বে উঠে বাংলাদেশকে তার নিজস্ব ‘জাতীয় স্বার্থের’ দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।

অনেকেই ভারতের মাটিতে ব্রিকস সম্মেলন এবং সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কেবল ‘বাংলাদেশ-ভারত’ দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু দুটি বিষয়কে এক করে ফেলাটা কূটনৈতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত হবে। ব্রিকস কোনো একক দেশের জোট নয়; ভারত হয়তো এবারের আয়োজক, কিন্তু জোটটিতে রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা বা ব্রাজিলের মতো দেশগুলো রয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিকসকে অনেকেই ‘চীনের ব্রিকস’ হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন।

অতীতে বেইজিং সফরে গিয়ে খোদ বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন এত বড় একটি শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ যদি অংশ না নেয়, তবে তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে। ব্রিকসে অংশগ্রহণের অর্থ কেবল আয়োজক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন নয়, বরং বিশ্বের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে একই টেবিলে বসার সুযোগ পাওয়া। কূটনীতিতে ‘সাইডলাইন মিটিং’ বা পার্শ্ব-বৈঠকের গুরুত্ব অনেক। সম্মেলনে গেলে অন্যান্য রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার যে সুযোগ তৈরি হবে, তা থেকে আমরা কেন বঞ্চিত হবো? যাবো কি যাবো না—এই দ্বিধায় সময় নষ্ট করলে অন্যান্য দেশের সাথে পার্শ্ব-বৈঠকের সূচি নির্ধারণের সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যাবে।

অনেকেই ভারতের মাটিতে ব্রিকস সম্মেলন এবং সেখানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কেবল ‘বাংলাদেশ-ভারত’ দ্বিপাক্ষিক বিষয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু দুটি বিষয়কে এক করে ফেলাটা কূটনৈতিকভাবে ভুল সিদ্ধান্ত হবে।

এখানে একটি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও রয়েছে। বাংলাদেশ ব্রিকস সম্মেলনে না গেলে সবচেয়ে বেশি খুশি হবে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, ব্রিকস মূলত মার্কিন বলয়ের বাইরের একটি বিকল্প জোট। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে অন্যের খুশির ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং নিজেদের জাতীয় স্বার্থের কথা মাথায় রেখে।

বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্কে বর্তমানে কিছুটা শীতলতা চলছে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক কেবল রাজনীতির ওপর নির্ভরশীল নয়। ভূগোল পরিবর্তন করা যায় না, প্রতিবেশীও বদলানো সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। বাণিজ্য পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও ভারতে আমাদের রপ্তানি ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—উভয় বাণিজ্যই স্বাভাবিক গতিতে চলছে।

এছাড়া দুই দেশের মানুষের মধ্যকার যোগাযোগ থেমে নেই। চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া কিংবা স্কলারশিপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়তে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা রাজনীতির দিকে তাকিয়ে বসে নেই। রাষ্ট্র চলবে তার নিজস্ব গতিতে। অতীতেও দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কে উত্থান-পতন হয়েছে। তাই কোনো একটি বিষয়ের ওপর পুরো সম্পর্ককে বিচার করা ঠিক হবে না।

অতীতে বেইজিং সফরে গিয়ে খোদ বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই ব্রিকসে যুক্ত হওয়ার প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিল। এখন এত বড় একটি শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ যদি অংশ না নেয়, তবে তা বৈশ্বিক কূটনীতিতে একটি নেতিবাচক বার্তা দেবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ও অন্যান্য অভিযুক্তদের দেশে ফেরত আনার বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। ভারত আসলে এই ইস্যুটি কীভাবে সামলাবে—এমন প্রশ্ন এখন জনমনে। বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো দেশ সাধারণত রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া ব্যক্তিদের সহজে ফেরত পাঠায় না। অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে অনেককে ফেরত চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা দেয়নি। ফলে, ভারতও শেখ হাসিনাকে সহজে ফেরত পাঠাবে, এমন সম্ভাবনা কম।

আসলে কোনো নেতার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা দেশে ফেরা কোনো বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভর করে না। এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ওই দেশের জনগণের ওপর। বাংলাদেশের জনগণ চাইলে তবেই কারও ফেরা সম্ভব। বাইরের কোনো রাষ্ট্র এর কৃতিত্ব নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু দিনশেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা জনগণের হাতেই। জনগণ না চাইলে কোনো কিছুই সম্ভব নয়।

বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে সতর্ক কূটনীতি অনুসরণ করতে হবে। ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য জিইয়ে রেখেই আমাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি, ব্রিকসের মতো আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করে জাতীয় স্বার্থ আদায়ে কৌশল প্রয়োগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কূটনীতিতে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত আমাদের মূল ভিত্তি।


লেখক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের সাবেক পরিচালক

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত