মৃত্যুবার্ষিকী
ফাবিহা বিনতে হক

‘এ-বদ্বীপে দালালি ছাড়া ফুলও ফোটে না, মেঘও নামে না।’
‘পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা।’
হুমায়ুন আজাদের বহুল আলোচিত এই উক্তিগুলো পাওয়া যায় ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ বইয়ে। কিন্তু বইটি কেবল এমন কিছু আপাত-নিরীহ অথচ গভীর সত্য উচ্চারণে ভরা—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। বইয়ের পাঁচ নম্বর প্রবচনেই পাঠক থমকে যেতে পারেন। সেখানে লেখা, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে। শামসুর রাহমান বোঝেন না কার সঙ্গে পর্দায়, আর কার সঙ্গে শয্যায় যেতে হয়।’
আজকের পাঠকের কাছে এমন ভাষা হয়তো আরও বেশি বিস্ময় তৈরি করবে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের লেখার ধরনই ছিল এমন। তিনি প্রচলিত ভদ্রতার নিরাপদ সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কথা বলতেন না। যে বিষয় নিয়ে অন্যরা ঘুরিয়ে কথা বলতেন, সেটিকেই তিনি সরাসরি সামনে এনে দাঁড় করাতেন। ফলে তাঁর কোনো মন্তব্য প্রশংসা কুড়িয়েছে, কোনোটি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে থেকেছে।
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়, আগামী প্রকাশনী থেকে। তবে বই হিসেবে প্রকাশের আগেই এর কিছু প্রবচন প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অরুণিমা সাহিত্য পত্রিকায়, ১৯৮৯ সালে। সেখান থেকেই মূলত শুরু হয় বিতর্ক।
কারণ হুমায়ুন আজাদ সাধারণ প্রবাদ-প্রবচনের মতো শুধু জীবন ও সমাজের সাধারণ সত্য নিয়ে কথা বলেননি। তিনি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। আর তাই তাঁর প্রবচন হয়ে উঠেছিল একই সঙ্গে সাহিত্য, ব্যঙ্গ, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম।
বইটির ভূমিকাতেও তিনি প্রবচনের প্রকৃতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে লিখেছিলেন, ‘প্রবচন এক ধরনের প্রবাদ, তবে প্রবাদে সাধারণ সত্যের পরিমাণ কিছুটা বেশি, কেননা প্রবাদে বিশেষ এক দৃষ্টিতে সত্যকে না দেখে দেখা হয় নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে…অরুণিমায় [মে ১৯৮৯] পঁচিশটি প্রবচন ছাপার পর বুঝতে পারি কতো প্রথাগত কপট এ-বঙ্গীয় সমাজ, বুঝতে পারি কতো সার্থক এ-প্রবচনগুচ্ছ।’
প্রবচনগুচ্ছ-এ হুমায়ুন আজাদ ধর্মব্যবসায়ী ও মৌলবাদীদের নিয়েও তীব্র ভাষায় লিখেছেন। তাঁর একটি বহুল আলোচিত প্রবচন হলো, ‘বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে’।
হুমায়ুন আজাদের ‘তীর্যক’ মন্তব্যগুলোর একটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, সেখানে আজাদ তার শিল্পমূল্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তিনি লিখেছেন, ‘অন্যদের কাহিনীর ক্ষীণ সূত্র নিয়ে হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ লেখা, আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী কেটে কেটে, নষ্ট ক’রে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। অন্যের কাহিনীসূত্র নিয়ে হ্যামলেট লেখা মানবপ্রজাতির একজনের বিস্ময়কর প্রতিভার লক্ষণ, আর বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী ছিঁড়ে সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি চিত্রগ্রহণদক্ষতার পরিচায়ক। আরেকটি উৎকৃষ্টতর হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ, বা মেঘনাদবধ মানুষের ইতিহাসে আর লেখা হবে না; কিন্তু সত্যজিতের পথের পাঁচালীর থেকে উৎকৃষ্ট পথের পাঁচালী হয়তো তৈরি হবে আগামী দশকেই।’
এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও লিখেছেন, ‘সত্যজিত যদি ভারতরত্ন হন, তবে বিভূতিভূষণ বিশ্বরত্ন, সভ্যতারত্ন; কিন্তু অসভ্য প্রচারের যুগে মহৎ বিভূতিভূষণকে পৃথিবী কেনো ভারতও চেনে না, চেনে গৌণ সত্যজিৎকে।’
আরও একটি প্রবচনে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর পাশে সত্যজিতের চলচিত্রটি খুবই শোচনীয় বস্তু, ওটি তৈরি না হ’লেও ক্ষতি ছিলো না; কিন্তু বিভূতিভূষণ যদি পথের পাঁচালী না লিখতেন, তাহলে ক্ষতি হতো সভ্যতার।’
সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্বখ্যাত একজন শিল্পীকে নিয়ে এমন মন্তব্য যে ভাবনার জন্ম দেবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এখানেও হুমায়ুন আজাদের অবস্থান ছিল প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। তিনি সাহিত্যকর্ম এবং তার চলচ্চিত্ররূপের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করতে গিয়ে হয়তো মূল সাহিত্যকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
‘প্রবচনগুচ্ছ’ প্রকাশের পর এর কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিতর্ক আরও বড় আকার নেয় যখন ‘দৈনিক সংবাদ’-এ কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হকের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে সমালোচনা করে একটা কলাম লেখেন, সেখানে মন্তব্য করেন, ‘ড. আজাদ নারী জাতির প্রতি অসম্মান প্রকাশ করেছেন এবং তিনি স্ব-বিরোধী।’
এরপর ‘সাপ্তাহিক তারকালোক’-এ বিষয়টি নিয়ে পাল্টা আলোচনা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার স্ব-নামে প্রকাশিত এক লেখায় সৈয়দ শামসুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করে হুমায়ুন আজাদ বলেন, “বিষয়টি বিস্মিত করেছে অনেককে; ‘খেলারাম খেলে যা’ কিংবা ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’র লেখক এসব কথা বলেছেন। আর স্ব-বিরোধিতা? –একজন তরুণ কবির বরাত দিয়ে লেখা হয় – ‘সৈয়দ শামসুল হক সাম্প্রতিক সরকার বিরোধী আন্দোলনের সারিতে থাকেন, কিন্তু অন্তরালে তিনি এ সরকারের সাথে সংশ্রবও রাখেন। এ সরকারের কয়েকটি প্রচার চিত্রের নির্মাতাও তিনি। পাশাপাশি অপসংস্কৃতির কথাও তার মুখে শোভা পায় না। কারণ অপ-চলচ্চিত্রের সংগেও তিনি জড়িত। কাজেই স্ব-বিরোধিতার অভিযোগ তাঁর মুখে সাজে না।’’
‘সাপ্তাহিক তারকালোক’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সৈয়দ শামসুল হককে ‘একজন রুগ্ন বুর্জোয়া ও লোলুপ লুম্পেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শুধু তাই নয় সৈয়দ শামসুল হককে ‘যৌনগ্রাফার’ উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি তার রচনায় আত্মহত্যা করেছেন।’
এ ছাড়া প্রবচনগুচ্ছ বইয়ের ভূমিকায় হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘যিনি নারীকে যৌনপীড়ন না ক'রে উপন্যাস বা অপন্যাস লিখতে পারেন না, তিনি হাহাকার করেছেন মোল্লার মতো।’
‘প্রবচনগুচ্ছ’-এ কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে তীব্র মন্তব্য থাকার পরও তিনি এই আক্রমণের জবাব ব্যক্তিগত আক্রমণে দেননি। বরং তিনি হুমায়ুন আজাদের লেখার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর যখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘ড. আজাদকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত’, তখন শামসুর রাহমান সেই মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এ প্রবচনগুলো নিয়ে হৈ চৈ করার মতো কিছু নেই। ইতিবাচকভাবে দেখলে এক অর্থ মনে হবে, আর নেতিবাচকভাবে দেখলে ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। প্রবচনগুচ্ছ প্রকাশের কারণে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে যেসব তৎপরতা চালানো হচ্ছে, তা অনভিপ্রেত। এগুলো লেখকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা আপত্তিকর।’
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঊর্ধ্বে গিয়ে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে আসে। কেউ কারও লেখা পছন্দ নাও করতে পারেন, তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনাও করতে পারেন; কিন্তু তার লেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে চিহ্নিত করাকে শামসুর রাহমান সমর্থন করেননি।
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছে সবচেয়ে ‘বিতর্কিত’ অংশ ছিল নারীদের নিয়ে। এর মধ্যে একটি প্রবচন—‘আগে কাননাবালারা আসতো পতিতালয় থেকে, এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’
পরে ‘আততায়ীর সঙ্গে কথোপকথন’ বইয়ে তিনি এই প্রবচনের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই কথার উদ্দেশ্য নারীকে অপমান করা নয়; বরং সমাজে নারীকে মূল্যায়নের পরিবর্তিত কাঠামো এবং শিক্ষিত সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
হুমায়ুন আজাদ এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘কাননবালা শব্দের তাৎপর্য বুঝতে পারেন নি। কাননবালা বাঙলা চলচ্চিত্রের একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় অভিনেত্রী ছিলেন। আগে বাঙলা নাটক, মঞ্চ, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যে মেয়েরা পতিতালয় থেকেই আসতো। কয়েক দশকে আমাদের সমাজে বদল ঘটে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, কলেজ থেকে, বহু মেয়ে অভিনয়ে আসছে; একে খুব গৌরবজনক মনে করছে… এখনকার শিক্ষিত মেয়েরা অঞ্জু ঘোষ হ'তে চায়, তাদের জীবনের লক্ষ্য অঞ্জু ঘোষ হওয়া, শ্রীদেবী হওয়া। কেউ আর বেগম রোকেয়া হতে চায় না। আমাদের সমাজ এদেরই প্রচার বেশি দিয়ে থাকে…আমি শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় অভিনেত্রীর বেশ মূল্য। কিন্তু যে মেয়েটি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে, চমৎকার গবেষণা করেছে, চমৎকার বই লিখেছে, তাকে বিশেষ মূল্য দেয়া হয় না। প্রবচনটিতে এ-দুটো দিকই ধরা পড়েছে।’
কাননবালা প্রসঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের সমালোচনার জবাবে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, ‘সৈয়দ হকের মগজ যে এতো নিষ্ক্রিয় এটা ভাবতে আমার কষ্ট হয়। নারীকে যে সারাক্ষণ প্রশংসা করতে হবে তা নয়; কেউই সারাক্ষণ প্রশংসা পেতে পারে না, নারী হওয়া সহজাতভাবে প্রশংসা পাওয়ার ব্যাপার নয়; সব কিছুই সমালোচনার বস্তু। এ-সমাজে আর সারা পৃথিবীতে রূপসী বলে সাধারণত গণ্য হয় যারা, সে-চিত্রতারকা বা সামাজিক মহিলাদের আন্তরিকতা নেই; তা পণ্যমাত্র।’
হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে মতভেদ থাকবেই। তাঁর অনেক বক্তব্যকে কেউ সাহসী সত্য উচ্চারণ হিসেবে দেখবেন, কেউ দেখবেন অপ্রয়োজনীয় কটাক্ষ হিসেবে। তাঁর ভাষা কখনো এতটাই ধারালো যে মূল বক্তব্যের চেয়ে শব্দের তীব্রতাই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এসব লেখাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
বিশেষ করে হুমায়ুন আজাদের সাহিত্য পড়ে যে তাঁর সঙ্গে একমত হতেই হবে তা নয়। বরং তাঁর লেখা পড়লে নিজের বিশ্বাসকেও মনের অজান্তে একবার প্রশ্ন করতে হয়। তাঁর ভাষা কখনো অস্বস্তিকর, কখনো নিষ্ঠুর, আবার কখনো তীব্র ব্যঙ্গাত্মক। কিন্তু সেই অস্বস্তির মধ্যেই ছিল তাঁর লেখার শক্তি।

‘এ-বদ্বীপে দালালি ছাড়া ফুলও ফোটে না, মেঘও নামে না।’
‘পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা।’
হুমায়ুন আজাদের বহুল আলোচিত এই উক্তিগুলো পাওয়া যায় ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ বইয়ে। কিন্তু বইটি কেবল এমন কিছু আপাত-নিরীহ অথচ গভীর সত্য উচ্চারণে ভরা—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। বইয়ের পাঁচ নম্বর প্রবচনেই পাঠক থমকে যেতে পারেন। সেখানে লেখা, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে। শামসুর রাহমান বোঝেন না কার সঙ্গে পর্দায়, আর কার সঙ্গে শয্যায় যেতে হয়।’
আজকের পাঠকের কাছে এমন ভাষা হয়তো আরও বেশি বিস্ময় তৈরি করবে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের লেখার ধরনই ছিল এমন। তিনি প্রচলিত ভদ্রতার নিরাপদ সীমারেখায় দাঁড়িয়ে কথা বলতেন না। যে বিষয় নিয়ে অন্যরা ঘুরিয়ে কথা বলতেন, সেটিকেই তিনি সরাসরি সামনে এনে দাঁড় করাতেন। ফলে তাঁর কোনো মন্তব্য প্রশংসা কুড়িয়েছে, কোনোটি তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, আবার কোনোটি দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের বিষয় হয়ে থেকেছে।
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে অমর একুশে গ্রন্থমেলায়, আগামী প্রকাশনী থেকে। তবে বই হিসেবে প্রকাশের আগেই এর কিছু প্রবচন প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অরুণিমা সাহিত্য পত্রিকায়, ১৯৮৯ সালে। সেখান থেকেই মূলত শুরু হয় বিতর্ক।
কারণ হুমায়ুন আজাদ সাধারণ প্রবাদ-প্রবচনের মতো শুধু জীবন ও সমাজের সাধারণ সত্য নিয়ে কথা বলেননি। তিনি নির্দিষ্ট ব্যক্তি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সমাজব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে সরাসরি আক্রমণ করেছেন। আর তাই তাঁর প্রবচন হয়ে উঠেছিল একই সঙ্গে সাহিত্য, ব্যঙ্গ, সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত অবস্থান প্রকাশের মাধ্যম।
বইটির ভূমিকাতেও তিনি প্রবচনের প্রকৃতি নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে লিখেছিলেন, ‘প্রবচন এক ধরনের প্রবাদ, তবে প্রবাদে সাধারণ সত্যের পরিমাণ কিছুটা বেশি, কেননা প্রবাদে বিশেষ এক দৃষ্টিতে সত্যকে না দেখে দেখা হয় নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে…অরুণিমায় [মে ১৯৮৯] পঁচিশটি প্রবচন ছাপার পর বুঝতে পারি কতো প্রথাগত কপট এ-বঙ্গীয় সমাজ, বুঝতে পারি কতো সার্থক এ-প্রবচনগুচ্ছ।’
প্রবচনগুচ্ছ-এ হুমায়ুন আজাদ ধর্মব্যবসায়ী ও মৌলবাদীদের নিয়েও তীব্র ভাষায় লিখেছেন। তাঁর একটি বহুল আলোচিত প্রবচন হলো, ‘বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিণত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে’।
হুমায়ুন আজাদের ‘তীর্যক’ মন্তব্যগুলোর একটি ছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ নিয়ে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায় নির্মিত চলচ্চিত্রটি যেখানে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত, সেখানে আজাদ তার শিল্পমূল্য নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন।
তিনি লিখেছেন, ‘অন্যদের কাহিনীর ক্ষীণ সূত্র নিয়ে হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ লেখা, আর বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পথের পাঁচালী কেটে কেটে, নষ্ট ক’রে, সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। অন্যের কাহিনীসূত্র নিয়ে হ্যামলেট লেখা মানবপ্রজাতির একজনের বিস্ময়কর প্রতিভার লক্ষণ, আর বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালী ছিঁড়ে সত্যজিতের পথের পাঁচালী তৈরি চিত্রগ্রহণদক্ষতার পরিচায়ক। আরেকটি উৎকৃষ্টতর হ্যামলেট বা ওথেলো বা ম্যাকবেথ, বা মেঘনাদবধ মানুষের ইতিহাসে আর লেখা হবে না; কিন্তু সত্যজিতের পথের পাঁচালীর থেকে উৎকৃষ্ট পথের পাঁচালী হয়তো তৈরি হবে আগামী দশকেই।’
এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও লিখেছেন, ‘সত্যজিত যদি ভারতরত্ন হন, তবে বিভূতিভূষণ বিশ্বরত্ন, সভ্যতারত্ন; কিন্তু অসভ্য প্রচারের যুগে মহৎ বিভূতিভূষণকে পৃথিবী কেনো ভারতও চেনে না, চেনে গৌণ সত্যজিৎকে।’
আরও একটি প্রবচনে তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘বিভূতিভূষণের পথের পাঁচালীর পাশে সত্যজিতের চলচিত্রটি খুবই শোচনীয় বস্তু, ওটি তৈরি না হ’লেও ক্ষতি ছিলো না; কিন্তু বিভূতিভূষণ যদি পথের পাঁচালী না লিখতেন, তাহলে ক্ষতি হতো সভ্যতার।’
সত্যজিৎ রায়ের মতো বিশ্বখ্যাত একজন শিল্পীকে নিয়ে এমন মন্তব্য যে ভাবনার জন্ম দেবে, তা সহজেই অনুমান করা যায়। কিন্তু এখানেও হুমায়ুন আজাদের অবস্থান ছিল প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা। তিনি সাহিত্যকর্ম এবং তার চলচ্চিত্ররূপের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করতে গিয়ে হয়তো মূল সাহিত্যকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
‘প্রবচনগুচ্ছ’ প্রকাশের পর এর কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিতর্ক আরও বড় আকার নেয় যখন ‘দৈনিক সংবাদ’-এ কথাশিল্পী সৈয়দ শামসুল হকের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি প্রবচনগুচ্ছ নিয়ে সমালোচনা করে একটা কলাম লেখেন, সেখানে মন্তব্য করেন, ‘ড. আজাদ নারী জাতির প্রতি অসম্মান প্রকাশ করেছেন এবং তিনি স্ব-বিরোধী।’
এরপর ‘সাপ্তাহিক তারকালোক’-এ বিষয়টি নিয়ে পাল্টা আলোচনা প্রকাশিত হয়। পত্রিকার স্ব-নামে প্রকাশিত এক লেখায় সৈয়দ শামসুল হকের বক্তব্যের সমালোচনা করে হুমায়ুন আজাদ বলেন, “বিষয়টি বিস্মিত করেছে অনেককে; ‘খেলারাম খেলে যা’ কিংবা ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’র লেখক এসব কথা বলেছেন। আর স্ব-বিরোধিতা? –একজন তরুণ কবির বরাত দিয়ে লেখা হয় – ‘সৈয়দ শামসুল হক সাম্প্রতিক সরকার বিরোধী আন্দোলনের সারিতে থাকেন, কিন্তু অন্তরালে তিনি এ সরকারের সাথে সংশ্রবও রাখেন। এ সরকারের কয়েকটি প্রচার চিত্রের নির্মাতাও তিনি। পাশাপাশি অপসংস্কৃতির কথাও তার মুখে শোভা পায় না। কারণ অপ-চলচ্চিত্রের সংগেও তিনি জড়িত। কাজেই স্ব-বিরোধিতার অভিযোগ তাঁর মুখে সাজে না।’’
‘সাপ্তাহিক তারকালোক’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সৈয়দ শামসুল হককে ‘একজন রুগ্ন বুর্জোয়া ও লোলুপ লুম্পেন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। শুধু তাই নয় সৈয়দ শামসুল হককে ‘যৌনগ্রাফার’ উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি তার রচনায় আত্মহত্যা করেছেন।’
এ ছাড়া প্রবচনগুচ্ছ বইয়ের ভূমিকায় হুমায়ুন আজাদ লিখেছেন, ‘যিনি নারীকে যৌনপীড়ন না ক'রে উপন্যাস বা অপন্যাস লিখতে পারেন না, তিনি হাহাকার করেছেন মোল্লার মতো।’
‘প্রবচনগুচ্ছ’-এ কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে তীব্র মন্তব্য থাকার পরও তিনি এই আক্রমণের জবাব ব্যক্তিগত আক্রমণে দেননি। বরং তিনি হুমায়ুন আজাদের লেখার স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ভাইস চ্যান্সেলর যখন মন্তব্য করেছিলেন, ‘ড. আজাদকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করানো উচিত’, তখন শামসুর রাহমান সেই মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘এ প্রবচনগুলো নিয়ে হৈ চৈ করার মতো কিছু নেই। ইতিবাচকভাবে দেখলে এক অর্থ মনে হবে, আর নেতিবাচকভাবে দেখলে ভিন্ন অর্থ দাঁড়াবে। প্রবচনগুচ্ছ প্রকাশের কারণে হুমায়ুন আজাদের বিরুদ্ধে যেসব তৎপরতা চালানো হচ্ছে, তা অনভিপ্রেত। এগুলো লেখকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর এ বিষয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা আপত্তিকর।’
এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানে ব্যক্তিগত আক্রমণের ঊর্ধ্বে গিয়ে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে আসে। কেউ কারও লেখা পছন্দ নাও করতে পারেন, তার বক্তব্যের কঠোর সমালোচনাও করতে পারেন; কিন্তু তার লেখার অধিকার কেড়ে নেওয়া বা তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে চিহ্নিত করাকে শামসুর রাহমান সমর্থন করেননি।
হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছে সবচেয়ে ‘বিতর্কিত’ অংশ ছিল নারীদের নিয়ে। এর মধ্যে একটি প্রবচন—‘আগে কাননাবালারা আসতো পতিতালয় থেকে, এখন আসে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।’
পরে ‘আততায়ীর সঙ্গে কথোপকথন’ বইয়ে তিনি এই প্রবচনের ব্যাখ্যা দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এই কথার উদ্দেশ্য নারীকে অপমান করা নয়; বরং সমাজে নারীকে মূল্যায়নের পরিবর্তিত কাঠামো এবং শিক্ষিত সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তোলা।
হুমায়ুন আজাদ এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘কাননবালা শব্দের তাৎপর্য বুঝতে পারেন নি। কাননবালা বাঙলা চলচ্চিত্রের একজন অত্যন্ত আকর্ষণীয় অভিনেত্রী ছিলেন। আগে বাঙলা নাটক, মঞ্চ, চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্যে মেয়েরা পতিতালয় থেকেই আসতো। কয়েক দশকে আমাদের সমাজে বদল ঘটে গেছে। এখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে, কলেজ থেকে, বহু মেয়ে অভিনয়ে আসছে; একে খুব গৌরবজনক মনে করছে… এখনকার শিক্ষিত মেয়েরা অঞ্জু ঘোষ হ'তে চায়, তাদের জীবনের লক্ষ্য অঞ্জু ঘোষ হওয়া, শ্রীদেবী হওয়া। কেউ আর বেগম রোকেয়া হতে চায় না। আমাদের সমাজ এদেরই প্রচার বেশি দিয়ে থাকে…আমি শুনেছি বিশ্ববিদ্যালয়ের এলাকায় অভিনেত্রীর বেশ মূল্য। কিন্তু যে মেয়েটি প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছে, চমৎকার গবেষণা করেছে, চমৎকার বই লিখেছে, তাকে বিশেষ মূল্য দেয়া হয় না। প্রবচনটিতে এ-দুটো দিকই ধরা পড়েছে।’
কাননবালা প্রসঙ্গে সৈয়দ শামসুল হকের সমালোচনার জবাবে হুমায়ুন আজাদ লিখেছিলেন, ‘সৈয়দ হকের মগজ যে এতো নিষ্ক্রিয় এটা ভাবতে আমার কষ্ট হয়। নারীকে যে সারাক্ষণ প্রশংসা করতে হবে তা নয়; কেউই সারাক্ষণ প্রশংসা পেতে পারে না, নারী হওয়া সহজাতভাবে প্রশংসা পাওয়ার ব্যাপার নয়; সব কিছুই সমালোচনার বস্তু। এ-সমাজে আর সারা পৃথিবীতে রূপসী বলে সাধারণত গণ্য হয় যারা, সে-চিত্রতারকা বা সামাজিক মহিলাদের আন্তরিকতা নেই; তা পণ্যমাত্র।’
হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে মতভেদ থাকবেই। তাঁর অনেক বক্তব্যকে কেউ সাহসী সত্য উচ্চারণ হিসেবে দেখবেন, কেউ দেখবেন অপ্রয়োজনীয় কটাক্ষ হিসেবে। তাঁর ভাষা কখনো এতটাই ধারালো যে মূল বক্তব্যের চেয়ে শব্দের তীব্রতাই বেশি আলোচিত হয়। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এসব লেখাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
বিশেষ করে হুমায়ুন আজাদের সাহিত্য পড়ে যে তাঁর সঙ্গে একমত হতেই হবে তা নয়। বরং তাঁর লেখা পড়লে নিজের বিশ্বাসকেও মনের অজান্তে একবার প্রশ্ন করতে হয়। তাঁর ভাষা কখনো অস্বস্তিকর, কখনো নিষ্ঠুর, আবার কখনো তীব্র ব্যঙ্গাত্মক। কিন্তু সেই অস্বস্তির মধ্যেই ছিল তাঁর লেখার শক্তি।
.png)

২০১৯ সালে প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়, ব্রিটেনে কাজ করার সময় হিচকক শুধু রহস্য বা থ্রিলারের গল্প বলেননি। ক্যামেরার ব্যবহার, দৃশ্য সাজানো ও সম্পাদনার ক্ষেত্রেও নতুন ধরনের ভাষা তৈরি করেছিলেন। এই নতুন ব্যাকরণ ইউরোপীয় চলচ্চিত্রকে আমূল বদলে দেয়।
২ ঘণ্টা আগে
বিড়ালকে পরিবারের সদস্যের মতো করে যাঁরা বড় করেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের ‘ক্যাট মম’ বলতে পছন্দ করেন। কারও জীবনে এই সম্পর্কের শুরু অসুস্থ বিড়ালকে বাঁচানো থেকে, কারও আবার হঠাৎ পাওয়া বিড়ালছানাকে ঘিরে।
৪ ঘণ্টা আগে
এই সাক্ষাৎকারে তারেক মাসুদ তাঁর মাদ্রাসাজীবনের শৈশবের অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশে সুফি মরমিয়া ঐতিহ্যের গুরুত্ব, গণমাধ্যমে রাজনৈতিক সহিংসতার উপস্থাপন, মাটির ময়না নির্মাণের অভিজ্ঞতা, চলচ্চিত্রে সংগীত ও স্থাপত্যের ভূমিকা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
৫ ঘণ্টা আগে
একদা সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রসঙ্গক্রমে তাঁর লেখায় উল্লেখ করেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস নাই।’ প্রশ্ন জাগে, তবে কি সত্যি বাংলার ইতিহাস নাই, নাকি সেটা কথার কথা? একসময় যে-ইতিহাস শুধু রাজরাজড়ার কর্মকাণ্ডের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল, সময়ের পরিক্রমায় সে নিম্নবর্গকে তার ঘরে ঠাঁই দিল।
৭ ঘণ্টা আগে