এস এম মিনহাজুর রহমান

১৯৯৫ সালে অ্যামাজন প্রথম যে পণ্যটি বিক্রি করেছিল, সেটি ছিল ডগলাস হফস্ট্যাডারের লেখা বই ‘ফ্লুইড কনসেপ্টস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ’। তিন দশক পর সেই অনলাইন বইয়ের দোকানটির বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসেই প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করেছে ২০০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা।
বাংলাদেশেও একটি প্রতিষ্ঠান বই বিক্রি দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। নাম রকমারি ডট কম।
একসময় ঢাকার বাইরে থেকে নতুন বই কেনা সহজ ছিল না। পরিচিত কাউকে দিয়ে নীলক্ষেত বা বাংলাবাজার থেকে বই আনাতে হতো। ফেব্রুয়ারি এলে বইমেলার অপেক্ষা করতে হতো। আর স্থানীয় দোকানে বইটি কবে আসবে, সেটাও জানা থাকত না। রকমারি এই দূরত্বটাই কমিয়ে দিল। ওয়েবসাইট আর ডেলিভারি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে বই কেনার সুযোগ তৈরি হলো।
প্রশ্ন হলো, বই দিয়ে শুরু করা অ্যামাজন যদি আজ বিশ্বের অন্যতম বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তাহলে একইভাবে বই বিক্রি দিয়ে শুরু করা রকমারিও কি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়ে উঠতে পারত? চলুন, উত্তরটা খোঁজা যাক।
জেফ বেজোস অনলাইনে ব্যবসা শুরু করার জন্য বই বেছে নিয়েছিলেন শুধু বই ভালোবাসতেন বলে নয়। বরং বই ছিল ই-কমার্সের সাসটেইনিবিলিটি পরীক্ষা করার জন্য প্রায় আদর্শ পণ্য।
একটি বইয়ের নির্দিষ্ট নাম, লেখক, প্রকাশক ও সংস্করণ থাকে। তাই বইয়ের অনলাইন তালিকা বানানো সহজ। বই পচে যায় না। আকারও মোটামুটি একই ধরনের। ছবি দেখেও ক্রেতা সহজে বুঝতে পারেন তিনি কী কিনছেন।
সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, একটি দোকানে পৃথিবীর সব বই রাখা সম্ভব না হলেও ওয়েবসাইটে সেসব বইয়ের তালিকা রাখা সম্ভব।
১৯৯৫ সালে অ্যামাজন জানিয়েছিল, তাদের ওয়েবসাইটে দশ লাখের বেশি বই রয়েছে। সে সময় একটি বড় শপিং মলের বইয়ের দোকানে যত বই থাকত, অ্যামাজনের তালিকায় ছিল তার প্রায় ৪০ গুণ। সেই সময়ে অ্যামাজনে থাকা সব বইয়ের একটি ছাপা ক্যাটালগ বানানো হলে সেটি নিউইয়র্ক শহরের সাতটি টেলিফোন ডিরেক্টরির সমান মোটা হতো। ব্যবসা শুরুর প্রথম চার সপ্তাহেই অ্যামাজন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ৪৫টির বেশি দেশে বই পাঠিয়েছিল।
রকমারির ক্ষেত্রেও বই একই সুবিধা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। উদ্যোক্তা ছিলেন পাঁচ তরুণ। রকমারির নিজেদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের প্ল্যাটফর্মে তিন লাখের বেশি বই, প্রায় তিন হাজার বইয়ের ক্যাটাগরি এবং বইয়ের বাইরেও পাঁচ শতাধিক ক্যাটাগরির পণ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ৩০টির বেশি দেশে পৌঁছে দেওয়ার দাবিও করে রকমারি।
অ্যামাজনের শুরুর দিকের অফিসে নতুন অর্ডার এলেই ‘বিপ’ শব্দ হতো। প্রথম দিকে সবাই এই শব্দ উপভোগ করতেন। কিন্তু অর্ডার এত দ্রুত আসতে শুরু করল যে কিছুদিন পর সেই অ্যালার্ম বন্ধ করে দিতে হয়।
অ্যামাজনের প্রথম গ্রাহকের নাম ছিল জন ওয়েনরাইট। পরে তাঁর নামে অ্যামাজনের একটি ভবনের নামও রাখা হয়। আর অ্যামাজনের ১০ লাখতম গ্রাহক ছিলেন জাপানের একজন। ১৯৯৭ সালে জেফ বেজোস নিজেই তাঁর অর্ডার টোকিওতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অর্ডারে ছিল উইন্ডোজ এনটি-এর একটি ম্যানুয়াল এবং প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনী নিয়ে একটি বই।
রকমারির আনুষ্ঠানিক ইতিহাসেও প্রথম অর্ডারের উত্তেজনার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে অর্ডার এলে রকমারির কর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ তৈরি হতো। কারণ প্রতিটি অর্ডারই দেখাচ্ছিল, বই কিনতে মানুষের ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের শুরুর গল্প তাই অনেকটা একই। তারা শুধু বই বিক্রির নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেনি। বই আর পাঠকের দূরত্বও কমিয়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশে ই-কমার্সের প্রথম যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করা সহজ কি না, টাকা দিলে পণ্যটি কি আসবে?
রকমারি ক্যাশ অন ডেলিভারি, পণ্য ফেরত ও বদলে দেওয়ার সুবিধা দিয়ে সেই ভয় কিছুটা কমাতে পেরেছিল। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতায় বই অর্ডার করা তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিষয় ছিল। বই হাতে পাওয়ার পর টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকায় ঝুঁকি আরও কমে যায়। রকমারির বর্তমান ওয়েবসাইটেও দেশজুড়ে ক্যাশ অন ডেলিভারি এবং রিটার্ন-রিপ্লেসমেন্ট সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
বইয়ের ব্যবসার আরেকটি সিক্রেট রেসিপি হলো, ধরুন একজন ক্রেতা প্রথমবার হয়তো ৩০০ টাকা দিয়ে একটি উপন্যাস কিনেছেন। বইটি সময়মতো পৌঁছালে তিনি দ্বিতীয়বার হয়তো কোনো অ্যাকাডেমিক বই কিনেছেন। পরে শিশুদের বই, স্টেশনারি বা ইলেকট্রনিক পণ্য কিনতেও হয়তো একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছেন।
এখানে প্রথম বইটি বিক্রি করে কত টাকা লাভ হলো, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রথমবার ঠিকঠাক পণ্য পৌঁছে দিয়ে ক্রেতার আস্থা তৈরি করা। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় কাস্টমার লয়্যালিটি।
অ্যামাজন বই দিয়ে শুরু করেছিল। পরে গান, ভিডিও, খেলনা, ইলেকট্রনিকসসহ নানা পণ্য বিক্রি শুরু করে। কিন্তু শুধু পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়েই অ্যামাজন আজকের অ্যামাজন হয়নি। বড় পরিবর্তন এসেছিল যখন তারা নিজেদের প্ল্যাটফর্ম অন্যদের জন্যও খুলে দেয়।
২০০০ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন মার্কেটপ্লেস চালু হয়। থার্ড পার্টি সেলাররা নতুন, পুরোনো কিংবা সংগ্রহ করার মতো পণ্য বিক্রি করতে পারতেন। অ্যামাজন তখন শুধু নিজের পণ্য বিক্রি করার জায়গায় থাকলো না, বরং অন্য দোকানদারদের জন্যও একটি গ্লোবাল মার্কেটে পরিণত হলো।
এরপর অ্যামাজন নিয়ে এল ক্লাউড কমপিউটিং। ২০০৬ সালে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস এমন একটি ব্যবস্থা চালু করে, যেখানে কোনো স্টার্টআপকে নিজস্ব সার্ভার কেনার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কমপিউটিং শক্তি ও ডেটা স্টোরেজ ভাড়া দেওয়া যায়। বই বিক্রির জন্য তৈরি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একসময় অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি চালানোর ব্যবসায় পরিণত হলো।
২০০৭ সালে অ্যামাজন নিয়ে আসে কিন্ডল। প্রথম কিন্ডলের দাম ছিল ৩৯৯ ডলার। তখন কিন্ডল স্টোরে ৯০ হাজারের বেশি বই পাওয়া যেত। একই সময় অ্যামাজন লেখকদের নিজেদের বই প্রকাশ করার ব্যবস্থাও চালু করে। ফলে অ্যামাজন শুধু বই বিক্রি করছিল না; বই পড়া, বই কেনা এবং বই প্রকাশের পুরো ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেল।
এখানেই অ্যামাজন ও সাধারণ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মূল পার্থক্য।
একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান শুধু প্রোডাক্ট বিক্রি করে। আর অ্যামাজন নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের প্রোডাক্ট বিক্রি, বিজ্ঞাপন দেওয়া, প্রযুক্তি ব্যবহার, কনটেন্ট প্রকাশ এবং গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সমস্ত সুবিধাও বিক্রি করে।
রকমারিও বইয়ের বাইরে গেছে। এখন তাদের প্ল্যাটফর্মে ইলেকট্রনিকস, গ্যাজেট, স্টেশনারি, রান্নাঘরের পণ্য, ফ্যাশন সামগ্রী, খাবার, শিশুদের পণ্য এবং গাড়ির বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্য পাওয়া যায়। কিন্তু পণ্যের সংখ্যা বাড়ানো আর প্ল্যাটফর্ম বড় করা এক বিষয় নয়।
রকমারি যদি বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল চার্জার বিক্রি করে, সেটি পণ্যের পরিসর বৃদ্ধি। কিন্তু নিজেদের ওয়্যারহাউজ ও ডেলিভারি ব্যবস্থা হাজারো ছোট ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করলে সেটি হলো অবকাঠামো ব্যবসা। প্রকাশকদের জন্য সেল এনালাইসিস, লেখকদের জন্য স্ব-প্রকাশনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় ব্যবস্থা, বিক্রেতাদের জন্য বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্য অনলাইন দোকানের জন্য ফুলফিলমেন্ট সেবা চালু করা হলে সেটি অ্যামাজনের মতো বিরাট প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারত।
রকমারি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়নি শুধু এ কারণে নয় যে তারা বইয়ের মধ্যে আটকে ছিল। বরং অ্যামাজন যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যবসা তৈরি করেছিল, মার্কেটপ্লেস, প্রযুক্তি অবকাঠামো, সদস্যভিত্তিক সেবা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও বিক্রেতা-সেবা, রকমারি সেই মাত্রার সমন্বিত ইকোসিস্টেমে পৌঁছাতে পারে নি।
অ্যামাজন গড়ে উঠেছিল বিশাল মার্কিন বাজারে। তাদের সামনে ছিল আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার, ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক উন্নত কুরিয়ার ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা। প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার সুযোগও ছিল।
অন্যদিকে রকমারিকে কাজ করতে হয়েছে ছোট অর্ডারের পরিমাণ, কম ডেলিভারি চার্জ এবং ক্যাশ অন ডেলিভারির মতো বাস্তবতার মধ্যে। কুরিয়ার ব্যবস্থায় পণ্য হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল। বাংলাদেশের অনলাইন বাজারও ছিল অনেক ছোট।
তাই অ্যামাজনের মতো হতে হলে শুধু একইভাবে বই বিক্রি দিয়ে শুরু করলেই হতো না। দরকার ছিল বছরের পর বছর লোকসান সামলানোর মতো মূলধন, নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করার সক্ষমতা, গুদাম ও পরিবহন ব্যবস্থা এবং নতুন ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও টিকে থাকার ক্ষমতা।
তাই রকমারি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়নি, এটিকে শুধু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং বলা যায় দুটি প্রতিষ্ঠানের বাজার, পুঁজি এবং সময়ের বাস্তবতা এক ছিল না।
রকমারির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু গুদামে থাকা বই নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের হাতে থাকা পাঠকের তথ্য। একজন পাঠক কী খুঁজছেন, কোন লেখকের পর কোন লেখকের বই পড়ছেন, কোন জেলায় কোন ধরনের বই জনপ্রিয়, বছরের কোন সময়ে অ্যাকাডেমিক বা চাকরির পরীক্ষার বইয়ের চাহিদা বাড়ছে, এ ধরনের অ্যানালাইসিস। একটি সাধারণ বইয়ের দোকানের কাছে এ ধরনের অ্যানালাইসিস থাকে না, আর এটিই রকমারির সব থেকে বড় শক্তি।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রকমারি থেকে সংগৃহীত বাংলা বইয়ের একটি ডেটাসেটে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি বই, ৬৩ হাজারের বেশি ব্যবহারকারী, ১৬ হাজারের বেশি লেখক এবং ২ লাখের বেশি রিভিউয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি রকমারির পুরো ডেটাবেস নয়। তবে বাংলা বই ও পাঠকের আচরণ নিয়ে গবেষণার জন্য এটি বেশ বড় একটি ডেটাসেট।
এই তথ্য কাজে লাগিয়ে রকমারি শুধু পাঠককে ভালো বই সাজেস্ট করাই নয়, প্রকাশকদের সম্ভাব্য চাহিদার ধারণাও দিতে পারে। নতুন লেখকদের সম্ভাব্য পাঠক খুঁজে দিতে পারে। কোন ধরনের বইয়ের চাহিদা বাড়ছে, সেটাও বোঝা সম্ভব। এমনকি অঞ্চলভেদে কোন ধরনের বই বেশি প্রয়োজন, সেই তথ্যও প্রকাশকদের কাজে লাগতে পারে।
বই মানেই এখন আর শুধু ছাপার অক্ষরে প্রকাশনা নয়। আধুনিকতার এই সময়ে পাঠক বইকে এখন নানা ভাবে দেখে। তাই রকমারির অ্যামাজন হয়ে ওঠার থেকেও আকর্ষণীয় লক্ষ্য হতে পারে বইকে কেন্দ্র করে আরও বড় বই এর মার্কেট তৈরি করা।
সেখানে থাকতে পারে ই-বুক ও অডিওবুক সাবস্ক্রিপশন, লেখকদের সরাসরি প্রকাশনার সুযোগ, অল্প সংখ্যায় চাহিদামতো বই ছাপানোর ব্যবস্থা, পুরোনো বইয়ের যাচাইকৃত মার্কেটপ্লেস, স্কুল-কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়, অনলাইন কোর্স, গবেষণাসামগ্রী, বাংলা ভাষার রিডিং ডিভাইস এবং বিদেশে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য বৈশ্বিক বিতরণব্যবস্থা।
অ্যামাজন বইকে কখনো পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। বই বিক্রি করতে গিয়ে পাওয়া গ্রাহক, তথ্য, প্রযুক্তি ও ডেলিভারি ব্যবস্থাকে তারা পরে একের পর এক নতুন ব্যবসার কাজে লাগিয়েছে।
রকমারির জন্য শিক্ষাটা সেখানেই। শুধু বই বিক্রি করে অ্যামাজন হওয়া যায় না। কিন্তু বই বিক্রি করতে গিয়ে যে বিশ্বাস, তথ্য, প্রযুক্তি ও ডেলিভারি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, সেগুলো কাজে লাগিয়ে আরও বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব।
রকমারি কি বাংলাদেশের অ্যামাজন হতে পারত?
অ্যামাজনের মতো ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য হয়তো বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, প্রকাশনা অবকাঠামো, শিক্ষা পণ্য বিতরণব্যবস্থা, বইকেন্দ্রিক কনটেন্ট এবং বইকেন্দ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠা? হ্যাঁ, সেই সুযোগ রকমারির ছিল। এখনো আছে।
রকমারির সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু নীলক্ষেত বা বাংলাবাজারের বই ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া নয়। তারা প্রমাণ করেছে, আস্থা তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষ দোকানে না গিয়েও ওয়েবসাইটে বই খুঁজবে, অর্ডার করবে এবং সেই বইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে।
অ্যামাজনের ইতিহাস আমাদের একটা কথা বলে। কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের নতুন একটি অভ্যাস তৈরি করতে পারলে, তার আসল ব্যবসা হয়তো প্রথম বিক্রি করা পণ্যটি নয়। আসল ব্যবসা হলো, সেই নতুন অভ্যাসকে ঘিরে কত বড় একটি পৃথিবী তৈরি করা যায়।

১৯৯৫ সালে অ্যামাজন প্রথম যে পণ্যটি বিক্রি করেছিল, সেটি ছিল ডগলাস হফস্ট্যাডারের লেখা বই ‘ফ্লুইড কনসেপ্টস অ্যান্ড ক্রিয়েটিভ’। তিন দশক পর সেই অনলাইন বইয়ের দোকানটির বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে মাত্র তিন মাসেই প্রতিষ্ঠানটি বিক্রি করেছে ২০০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য ও সেবা।
বাংলাদেশেও একটি প্রতিষ্ঠান বই বিক্রি দিয়েই যাত্রা শুরু করেছিল। নাম রকমারি ডট কম।
একসময় ঢাকার বাইরে থেকে নতুন বই কেনা সহজ ছিল না। পরিচিত কাউকে দিয়ে নীলক্ষেত বা বাংলাবাজার থেকে বই আনাতে হতো। ফেব্রুয়ারি এলে বইমেলার অপেক্ষা করতে হতো। আর স্থানীয় দোকানে বইটি কবে আসবে, সেটাও জানা থাকত না। রকমারি এই দূরত্বটাই কমিয়ে দিল। ওয়েবসাইট আর ডেলিভারি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের যেকোনো জায়গা থেকে বই কেনার সুযোগ তৈরি হলো।
প্রশ্ন হলো, বই দিয়ে শুরু করা অ্যামাজন যদি আজ বিশ্বের অন্যতম বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তাহলে একইভাবে বই বিক্রি দিয়ে শুরু করা রকমারিও কি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়ে উঠতে পারত? চলুন, উত্তরটা খোঁজা যাক।
জেফ বেজোস অনলাইনে ব্যবসা শুরু করার জন্য বই বেছে নিয়েছিলেন শুধু বই ভালোবাসতেন বলে নয়। বরং বই ছিল ই-কমার্সের সাসটেইনিবিলিটি পরীক্ষা করার জন্য প্রায় আদর্শ পণ্য।
একটি বইয়ের নির্দিষ্ট নাম, লেখক, প্রকাশক ও সংস্করণ থাকে। তাই বইয়ের অনলাইন তালিকা বানানো সহজ। বই পচে যায় না। আকারও মোটামুটি একই ধরনের। ছবি দেখেও ক্রেতা সহজে বুঝতে পারেন তিনি কী কিনছেন।
সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল, একটি দোকানে পৃথিবীর সব বই রাখা সম্ভব না হলেও ওয়েবসাইটে সেসব বইয়ের তালিকা রাখা সম্ভব।
১৯৯৫ সালে অ্যামাজন জানিয়েছিল, তাদের ওয়েবসাইটে দশ লাখের বেশি বই রয়েছে। সে সময় একটি বড় শপিং মলের বইয়ের দোকানে যত বই থাকত, অ্যামাজনের তালিকায় ছিল তার প্রায় ৪০ গুণ। সেই সময়ে অ্যামাজনে থাকা সব বইয়ের একটি ছাপা ক্যাটালগ বানানো হলে সেটি নিউইয়র্ক শহরের সাতটি টেলিফোন ডিরেক্টরির সমান মোটা হতো। ব্যবসা শুরুর প্রথম চার সপ্তাহেই অ্যামাজন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য এবং ৪৫টির বেশি দেশে বই পাঠিয়েছিল।
রকমারির ক্ষেত্রেও বই একই সুবিধা তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১২ সালে। উদ্যোক্তা ছিলেন পাঁচ তরুণ। রকমারির নিজেদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের প্ল্যাটফর্মে তিন লাখের বেশি বই, প্রায় তিন হাজার বইয়ের ক্যাটাগরি এবং বইয়ের বাইরেও পাঁচ শতাধিক ক্যাটাগরির পণ্য রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ৩০টির বেশি দেশে পৌঁছে দেওয়ার দাবিও করে রকমারি।
অ্যামাজনের শুরুর দিকের অফিসে নতুন অর্ডার এলেই ‘বিপ’ শব্দ হতো। প্রথম দিকে সবাই এই শব্দ উপভোগ করতেন। কিন্তু অর্ডার এত দ্রুত আসতে শুরু করল যে কিছুদিন পর সেই অ্যালার্ম বন্ধ করে দিতে হয়।
অ্যামাজনের প্রথম গ্রাহকের নাম ছিল জন ওয়েনরাইট। পরে তাঁর নামে অ্যামাজনের একটি ভবনের নামও রাখা হয়। আর অ্যামাজনের ১০ লাখতম গ্রাহক ছিলেন জাপানের একজন। ১৯৯৭ সালে জেফ বেজোস নিজেই তাঁর অর্ডার টোকিওতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। অর্ডারে ছিল উইন্ডোজ এনটি-এর একটি ম্যানুয়াল এবং প্রিন্সেস ডায়ানার জীবনী নিয়ে একটি বই।
রকমারির আনুষ্ঠানিক ইতিহাসেও প্রথম অর্ডারের উত্তেজনার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে থেকে অর্ডার এলে রকমারির কর্মীদের মধ্যে বাড়তি উৎসাহ তৈরি হতো। কারণ প্রতিটি অর্ডারই দেখাচ্ছিল, বই কিনতে মানুষের ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের শুরুর গল্প তাই অনেকটা একই। তারা শুধু বই বিক্রির নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেনি। বই আর পাঠকের দূরত্বও কমিয়ে দিয়েছিল।
বাংলাদেশে ই-কমার্সের প্রথম যুগে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, ওয়েবসাইটটি ব্যবহার করা সহজ কি না, টাকা দিলে পণ্যটি কি আসবে?
রকমারি ক্যাশ অন ডেলিভারি, পণ্য ফেরত ও বদলে দেওয়ার সুবিধা দিয়ে সেই ভয় কিছুটা কমাতে পেরেছিল। যদিও বাংলাদেশের বাস্তবতায় বই অর্ডার করা তুলনামূলক কম ঝুঁকির বিষয় ছিল। বই হাতে পাওয়ার পর টাকা দেওয়ার সুযোগ থাকায় ঝুঁকি আরও কমে যায়। রকমারির বর্তমান ওয়েবসাইটেও দেশজুড়ে ক্যাশ অন ডেলিভারি এবং রিটার্ন-রিপ্লেসমেন্ট সুবিধার কথা বলা হয়েছে।
বইয়ের ব্যবসার আরেকটি সিক্রেট রেসিপি হলো, ধরুন একজন ক্রেতা প্রথমবার হয়তো ৩০০ টাকা দিয়ে একটি উপন্যাস কিনেছেন। বইটি সময়মতো পৌঁছালে তিনি দ্বিতীয়বার হয়তো কোনো অ্যাকাডেমিক বই কিনেছেন। পরে শিশুদের বই, স্টেশনারি বা ইলেকট্রনিক পণ্য কিনতেও হয়তো একই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছেন।
এখানে প্রথম বইটি বিক্রি করে কত টাকা লাভ হলো, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়। বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রথমবার ঠিকঠাক পণ্য পৌঁছে দিয়ে ক্রেতার আস্থা তৈরি করা। আর সেখান থেকেই তৈরি হয় কাস্টমার লয়্যালিটি।
অ্যামাজন বই দিয়ে শুরু করেছিল। পরে গান, ভিডিও, খেলনা, ইলেকট্রনিকসসহ নানা পণ্য বিক্রি শুরু করে। কিন্তু শুধু পণ্যের সংখ্যা বাড়িয়েই অ্যামাজন আজকের অ্যামাজন হয়নি। বড় পরিবর্তন এসেছিল যখন তারা নিজেদের প্ল্যাটফর্ম অন্যদের জন্যও খুলে দেয়।
২০০০ সালের নভেম্বরে অ্যামাজন মার্কেটপ্লেস চালু হয়। থার্ড পার্টি সেলাররা নতুন, পুরোনো কিংবা সংগ্রহ করার মতো পণ্য বিক্রি করতে পারতেন। অ্যামাজন তখন শুধু নিজের পণ্য বিক্রি করার জায়গায় থাকলো না, বরং অন্য দোকানদারদের জন্যও একটি গ্লোবাল মার্কেটে পরিণত হলো।
এরপর অ্যামাজন নিয়ে এল ক্লাউড কমপিউটিং। ২০০৬ সালে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস এমন একটি ব্যবস্থা চালু করে, যেখানে কোনো স্টার্টআপকে নিজস্ব সার্ভার কেনার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী কমপিউটিং শক্তি ও ডেটা স্টোরেজ ভাড়া দেওয়া যায়। বই বিক্রির জন্য তৈরি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা একসময় অন্য প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি চালানোর ব্যবসায় পরিণত হলো।
২০০৭ সালে অ্যামাজন নিয়ে আসে কিন্ডল। প্রথম কিন্ডলের দাম ছিল ৩৯৯ ডলার। তখন কিন্ডল স্টোরে ৯০ হাজারের বেশি বই পাওয়া যেত। একই সময় অ্যামাজন লেখকদের নিজেদের বই প্রকাশ করার ব্যবস্থাও চালু করে। ফলে অ্যামাজন শুধু বই বিক্রি করছিল না; বই পড়া, বই কেনা এবং বই প্রকাশের পুরো ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেল।
এখানেই অ্যামাজন ও সাধারণ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মূল পার্থক্য।
একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান শুধু প্রোডাক্ট বিক্রি করে। আর অ্যামাজন নিজেদের পাশাপাশি অন্যদের প্রোডাক্ট বিক্রি, বিজ্ঞাপন দেওয়া, প্রযুক্তি ব্যবহার, কনটেন্ট প্রকাশ এবং গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর সমস্ত সুবিধাও বিক্রি করে।
রকমারিও বইয়ের বাইরে গেছে। এখন তাদের প্ল্যাটফর্মে ইলেকট্রনিকস, গ্যাজেট, স্টেশনারি, রান্নাঘরের পণ্য, ফ্যাশন সামগ্রী, খাবার, শিশুদের পণ্য এবং গাড়ির বিভিন্ন আনুষঙ্গিক পণ্য পাওয়া যায়। কিন্তু পণ্যের সংখ্যা বাড়ানো আর প্ল্যাটফর্ম বড় করা এক বিষয় নয়।
রকমারি যদি বইয়ের পাশাপাশি মোবাইল চার্জার বিক্রি করে, সেটি পণ্যের পরিসর বৃদ্ধি। কিন্তু নিজেদের ওয়্যারহাউজ ও ডেলিভারি ব্যবস্থা হাজারো ছোট ব্যবসার জন্য উন্মুক্ত করলে সেটি হলো অবকাঠামো ব্যবসা। প্রকাশকদের জন্য সেল এনালাইসিস, লেখকদের জন্য স্ব-প্রকাশনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় ব্যবস্থা, বিক্রেতাদের জন্য বিজ্ঞাপন প্ল্যাটফর্ম কিংবা অন্য অনলাইন দোকানের জন্য ফুলফিলমেন্ট সেবা চালু করা হলে সেটি অ্যামাজনের মতো বিরাট প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারত।
রকমারি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়নি শুধু এ কারণে নয় যে তারা বইয়ের মধ্যে আটকে ছিল। বরং অ্যামাজন যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় ব্যবসা তৈরি করেছিল, মার্কেটপ্লেস, প্রযুক্তি অবকাঠামো, সদস্যভিত্তিক সেবা, ডিজিটাল কনটেন্ট ও বিক্রেতা-সেবা, রকমারি সেই মাত্রার সমন্বিত ইকোসিস্টেমে পৌঁছাতে পারে নি।
অ্যামাজন গড়ে উঠেছিল বিশাল মার্কিন বাজারে। তাদের সামনে ছিল আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার, ক্রেডিট কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং তুলনামূলক উন্নত কুরিয়ার ও লজিস্টিকস ব্যবস্থা। প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করার সুযোগও ছিল।
অন্যদিকে রকমারিকে কাজ করতে হয়েছে ছোট অর্ডারের পরিমাণ, কম ডেলিভারি চার্জ এবং ক্যাশ অন ডেলিভারির মতো বাস্তবতার মধ্যে। কুরিয়ার ব্যবস্থায় পণ্য হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও ছিল। বাংলাদেশের অনলাইন বাজারও ছিল অনেক ছোট।
তাই অ্যামাজনের মতো হতে হলে শুধু একইভাবে বই বিক্রি দিয়ে শুরু করলেই হতো না। দরকার ছিল বছরের পর বছর লোকসান সামলানোর মতো মূলধন, নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করার সক্ষমতা, গুদাম ও পরিবহন ব্যবস্থা এবং নতুন ব্যবসায় বারবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেও টিকে থাকার ক্ষমতা।
তাই রকমারি বাংলাদেশের অ্যামাজন হয়নি, এটিকে শুধু ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং বলা যায় দুটি প্রতিষ্ঠানের বাজার, পুঁজি এবং সময়ের বাস্তবতা এক ছিল না।
রকমারির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ শুধু গুদামে থাকা বই নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের হাতে থাকা পাঠকের তথ্য। একজন পাঠক কী খুঁজছেন, কোন লেখকের পর কোন লেখকের বই পড়ছেন, কোন জেলায় কোন ধরনের বই জনপ্রিয়, বছরের কোন সময়ে অ্যাকাডেমিক বা চাকরির পরীক্ষার বইয়ের চাহিদা বাড়ছে, এ ধরনের অ্যানালাইসিস। একটি সাধারণ বইয়ের দোকানের কাছে এ ধরনের অ্যানালাইসিস থাকে না, আর এটিই রকমারির সব থেকে বড় শক্তি।
২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় রকমারি থেকে সংগৃহীত বাংলা বইয়ের একটি ডেটাসেটে ১ লাখ ২৭ হাজারের বেশি বই, ৬৩ হাজারের বেশি ব্যবহারকারী, ১৬ হাজারের বেশি লেখক এবং ২ লাখের বেশি রিভিউয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি রকমারির পুরো ডেটাবেস নয়। তবে বাংলা বই ও পাঠকের আচরণ নিয়ে গবেষণার জন্য এটি বেশ বড় একটি ডেটাসেট।
এই তথ্য কাজে লাগিয়ে রকমারি শুধু পাঠককে ভালো বই সাজেস্ট করাই নয়, প্রকাশকদের সম্ভাব্য চাহিদার ধারণাও দিতে পারে। নতুন লেখকদের সম্ভাব্য পাঠক খুঁজে দিতে পারে। কোন ধরনের বইয়ের চাহিদা বাড়ছে, সেটাও বোঝা সম্ভব। এমনকি অঞ্চলভেদে কোন ধরনের বই বেশি প্রয়োজন, সেই তথ্যও প্রকাশকদের কাজে লাগতে পারে।
বই মানেই এখন আর শুধু ছাপার অক্ষরে প্রকাশনা নয়। আধুনিকতার এই সময়ে পাঠক বইকে এখন নানা ভাবে দেখে। তাই রকমারির অ্যামাজন হয়ে ওঠার থেকেও আকর্ষণীয় লক্ষ্য হতে পারে বইকে কেন্দ্র করে আরও বড় বই এর মার্কেট তৈরি করা।
সেখানে থাকতে পারে ই-বুক ও অডিওবুক সাবস্ক্রিপশন, লেখকদের সরাসরি প্রকাশনার সুযোগ, অল্প সংখ্যায় চাহিদামতো বই ছাপানোর ব্যবস্থা, পুরোনো বইয়ের যাচাইকৃত মার্কেটপ্লেস, স্কুল-কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয়, অনলাইন কোর্স, গবেষণাসামগ্রী, বাংলা ভাষার রিডিং ডিভাইস এবং বিদেশে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের জন্য বৈশ্বিক বিতরণব্যবস্থা।
অ্যামাজন বইকে কখনো পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি। বই বিক্রি করতে গিয়ে পাওয়া গ্রাহক, তথ্য, প্রযুক্তি ও ডেলিভারি ব্যবস্থাকে তারা পরে একের পর এক নতুন ব্যবসার কাজে লাগিয়েছে।
রকমারির জন্য শিক্ষাটা সেখানেই। শুধু বই বিক্রি করে অ্যামাজন হওয়া যায় না। কিন্তু বই বিক্রি করতে গিয়ে যে বিশ্বাস, তথ্য, প্রযুক্তি ও ডেলিভারি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়, সেগুলো কাজে লাগিয়ে আরও বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা সম্ভব।
রকমারি কি বাংলাদেশের অ্যামাজন হতে পারত?
অ্যামাজনের মতো ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক প্রযুক্তি সাম্রাজ্য হয়তো বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ডিজিটাল মার্কেটপ্লেস, প্রকাশনা অবকাঠামো, শিক্ষা পণ্য বিতরণব্যবস্থা, বইকেন্দ্রিক কনটেন্ট এবং বইকেন্দ্রিক অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠা? হ্যাঁ, সেই সুযোগ রকমারির ছিল। এখনো আছে।
রকমারির সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু নীলক্ষেত বা বাংলাবাজারের বই ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া নয়। তারা প্রমাণ করেছে, আস্থা তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশের মানুষ দোকানে না গিয়েও ওয়েবসাইটে বই খুঁজবে, অর্ডার করবে এবং সেই বইয়ের জন্য অপেক্ষা করবে।
অ্যামাজনের ইতিহাস আমাদের একটা কথা বলে। কোনো প্রতিষ্ঠান মানুষের নতুন একটি অভ্যাস তৈরি করতে পারলে, তার আসল ব্যবসা হয়তো প্রথম বিক্রি করা পণ্যটি নয়। আসল ব্যবসা হলো, সেই নতুন অভ্যাসকে ঘিরে কত বড় একটি পৃথিবী তৈরি করা যায়।
.png)

হুমায়ুন আজাদের বহুল আলোচিত এই উক্তিগুলো পাওয়া যায় ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ’ বইয়ে। কিন্তু বইটি কেবল এমন কিছু আপাত-নিরীহ অথচ গভীর সত্য উচ্চারণে ভরা—এমনটা ভাবলে ভুল হবে। বইয়ের পাঁচ নম্বর প্রবচনেই পাঠক থমকে যেতে পারেন। সেখানে লেখা, ‘শামসুর রাহমানকে একটি অভিনেত্রীর সাথে টিভিতে দেখা গেছে।
৪ ঘণ্টা আগে
হোমারের লেখা মহাকাব্য ‘ওডিসি’র প্রধান চরিত্র ওডিসিউস বাড়ি ফেরার পর তার বিশ্বস্ত কুকুর আর্গোস তাকে চিনতে পারে। তাদের পুনর্মিলনের এই আবেগঘন দৃশ্যটি বর্ণনা করতে হোমার ব্যবহার করেছেন মাত্র প্রায় ৪০টি লাইন। অথচ এটি পুরো মহাকাব্যের অন্যতম আবেগঘন ঘটনা। মহাকাব্যের এই দৃশ্যটি পর্দায় নতুন করে তুলে ধরেছেন
১১ আগস্ট ২০২৬
পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বন্য প্রাণীগুলোর একটি সিংহ। ছোটবেলা থেকেই গল্প, সিনেমা আর ছবিতে আমরা তাকে দেখে এসেছি বনের রাজা হিসেবে। তার গর্জন, কেশর আর রাজকীয় উপস্থিতি যেন আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। ‘বনের রাজা’কে বিশ্ব সিংহ দিবসের পরের দিন একটু অন্যভাবে চেনা যাক।
১১ আগস্ট ২০২৬
শিল্পপ্রেমীদের কাছে ‘চিত্রার লাল মিয়া’ নামে পরিচিত বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মদিন আজ (১০ আগস্ট)। তাঁর তুলিতে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম ও জীবনগাথা উঠে এসেছিল এক অনন্য উচ্চতায়। সেই শিল্পকর্মগুলো কোথায়, কেমন আছে এখন?
১০ আগস্ট ২০২৬