লেখা:

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের রাজ্য নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মিত্ররা জয়লাভ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ভারতের এমন পাঁচটি রাজ্যেই এখন বিজেপির শাসন কায়েম হয়েছে। সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে, এতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তাদের ‘বাংলাদেশ নীতি’ বাস্তবায়ন করা খুব সহজ হবে। কারণ, রাজ্য সরকারগুলোর পক্ষ থেকে এখন আর কোনো বাধা আসার ভয় নেই।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে খুব দ্রুত ভালো কোনো পরিবর্তন আসতে চলেছে। বরং, ভারত যদি না বুঝে খুব কঠোর ও একগুঁয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করে, তবে ঢাকা আরও দূরে সরে যেতে পারে। এতে করে সম্পর্ক উন্নয়নের বর্তমান যে সম্ভাবনাটুকু আছে, সেটাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকায় এখন ক্ষমতায় রয়েছে নতুন সরকার, যার নেতৃত্বে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসায়, তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে বিএনপি সরকার। বিএনপি মনে করে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বড় বাধা ছিলেন। তাই নতুন বিজেপি সরকার আসায় তারা এই চুক্তির বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী।
তবে এর পাশাপাশি ঢাকার একটি বড় চিন্তার জায়গাও রয়েছে। ভারত যাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে দাবি করে, তাদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা বাড়াতে পারে। এ বিষয়ে ঢাকা বেশ চিন্তিত। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই ধরনের পুশ-ইন ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুরোপুরি সতর্ক আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আরও কড়া ভাষায় বলেছেন, ভারত এমন কিছু করলে ঢাকা এর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
কথিত অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়া বিজেপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জোর করে তাদের ফেরত পাঠানোর এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গে ভোটে বেশ সুবিধাও পেয়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, নতুন রাজ্য সরকার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মেনে এই নীতি বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কোনো মিল বা সমঝোতা নেই। তাই ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ঢাকা যে তা মেনে নেবে না, সেটা খুব সহজেই বোঝা যায়।
গত এপ্রিলে ভারত একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরিচিত নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সাধারণত পেশাদার কূটনীতিকদেরই এই পদে বসানো হয়, কোনো রাজনীতিককে নয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। তবে ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত না দেওয়ার কারণে ঢাকায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা সামলাতে একজন রাজনীতিকই হয়তো বেশি কাজে আসবেন।
কিন্তু এখানেও একটি বড় বাধা আছে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে প্রায়ই এমন একটি দেশ হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলে। তাছাড়া দলটির অনেক নেতা বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উঁইপোকা’ বলে ডাকেন এবং তাদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে প্রচার করেন। যতদিন ভারতের এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য চলতে থাকবে, ততদিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর কাজ করার সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর সহিংসতার দায়ে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন বিএনপি সরকারের একটি বড় লক্ষ্য। তবে কেবল এই একটি কারণে তারা ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করার পর্যায়ে যাবে না।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলের শুরুতে ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ নিয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ইস্যু যেমন ছিল, তেমনি ছিল বেশি পরিমাণে ডিজেল ও সার সরবরাহ করার আবেদন। পাশাপাশি, বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতীয় ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে লম্বা সময় দেরি হচ্ছে, তা দ্রুত সমাধানেরও অনুরোধ করেন তিনি।
বাংলাদেশের এই অনুরোধগুলোর ব্যাপারে ভারত ইতিবাচক সাড়া দিলেও তাদের মধ্যে যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে সংকটে আছে। এমন বিপদের সময়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে যে ধরনের সাহায্য আশা করা যায়, ভারতের আচরণ তেমন ছিল না। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী খলিলুর রহমানকে জানিয়ে দেন যে, আগে ভারতের নিজেদের চাহিদা মেটানো হবে, তারপর সম্ভব হলে বাংলাদেশকে তা সরবরাহ করা হবে। আসামে ভারতের একটি শোধনাগার রয়েছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের চুক্তিও আছে। কিন্তু বর্তমানে ভারত চুক্তির চেয়ে বেশ কম পরিমাণে জ্বালানি দিচ্ছে।
নয়াদিল্লির চিন্তাভাবনা সম্ভবত এমন যে, ভারতের মতো একটি বড় প্রতিবেশীর কোনো বিকল্প ঢাকার কাছে নেই। জ্বালানি, পানি, কাঁচামাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা চিকিৎসার মতো দরকারি বিষয়গুলোর জন্য ঢাকাকে ভারতের ওপর নির্ভর করতেই হবে। দুই দেশের মধ্যে এই বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা চলে আসছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ভারত এই নির্ভরশীলতাকেই একটি অস্ত্র বা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
তবে এই তিক্ত অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ একা নয়। ভারতের আশেপাশের প্রায় সব দেশের অবস্থাই এমন। বন্ধু হওয়ার চেয়ে তারা ভারতকে নিয়ে বেশি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। ভারত মুখে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা অনেক প্রচার করে। কিন্তু বাস্তবে ভারত তার প্রতিবেশীদের প্রয়োজনের সময় উদাসীন থাকে এবং ‘বড় ভাই’-এর মতো খবরদারি করে। এই আচরণ তখনই বদলায়, যখন প্রতিবেশীরা বাধ্য হয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধানে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক দেখলেই এই কথার সত্যতা প্রমাণ পাওয়া যায়।
এখন বিএনপি সরকারের অধীনে ঢাকাও সেই একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৫ মে তিন দিনের সরকারি সফরে চীনে গিয়েছেন। এই সফরের ঠিক আগেই তিনি ভারতের প্রতি বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়েছেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের অহেতুক দেরির কারণে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর ভারতের জন্য বসে থাকবে না। বরং তারা চীনের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ এগিয়ে নেবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চীন সফরে খলিলুর রহমান বাণিজ্য বাড়ানো, সহজ শর্তে ঋণ, ঋণ শোধ করার সময় বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করবেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছর ধরে বেইজিং বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি দেখিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা নতুন করে ঢাকায় তাদের কাজের ছক সাজাচ্ছে। চীনের এই দ্রুত সক্রিয়তা হয়তো নয়াদিল্লিকে তাদের দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু ভারত যখন নড়েচড়ে বসবে, ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। পরিস্থিতিটা তখন এমন দাঁড়াবে যে—প্রতিযোগী অনেক আগেই দৌড় শুরু করে দিয়েছে, আর ভারত সবেমাত্র মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেখক: মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (এমআইএসএস) এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি; সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট এবং ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, নেভাল ওয়ার কলেজ, গোয়া, ভারত।
(লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের রাজ্য নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তাদের মিত্ররা জয়লাভ করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ভারতের এমন পাঁচটি রাজ্যেই এখন বিজেপির শাসন কায়েম হয়েছে। সাধারণ হিসেবে মনে হতে পারে, এতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তাদের ‘বাংলাদেশ নীতি’ বাস্তবায়ন করা খুব সহজ হবে। কারণ, রাজ্য সরকারগুলোর পক্ষ থেকে এখন আর কোনো বাধা আসার ভয় নেই।
কিন্তু এর মানে এই নয় যে, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে খুব দ্রুত ভালো কোনো পরিবর্তন আসতে চলেছে। বরং, ভারত যদি না বুঝে খুব কঠোর ও একগুঁয়ে কোনো নীতি গ্রহণ করে, তবে ঢাকা আরও দূরে সরে যেতে পারে। এতে করে সম্পর্ক উন্নয়নের বর্তমান যে সম্ভাবনাটুকু আছে, সেটাও পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ঢাকায় এখন ক্ষমতায় রয়েছে নতুন সরকার, যার নেতৃত্বে আছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় আসায়, তাদের অভিনন্দন জানিয়েছে বিএনপি সরকার। বিএনপি মনে করে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির ক্ষেত্রে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বড় বাধা ছিলেন। তাই নতুন বিজেপি সরকার আসায় তারা এই চুক্তির বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী।
তবে এর পাশাপাশি ঢাকার একটি বড় চিন্তার জায়গাও রয়েছে। ভারত যাদের ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসী’ বলে দাবি করে, তাদের জোর করে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা বাড়াতে পারে। এ বিষয়ে ঢাকা বেশ চিন্তিত। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, এই ধরনের পুশ-ইন ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পুরোপুরি সতর্ক আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান আরও কড়া ভাষায় বলেছেন, ভারত এমন কিছু করলে ঢাকা এর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে।
কথিত অবৈধ মুসলিম অভিবাসীদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়া বিজেপির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। জোর করে তাদের ফেরত পাঠানোর এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা পশ্চিমবঙ্গে ভোটে বেশ সুবিধাও পেয়েছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, নতুন রাজ্য সরকার ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ মেনে এই নীতি বাস্তবায়নের জোর চেষ্টা করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই বিষয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কোনো মিল বা সমঝোতা নেই। তাই ভারত এমন কোনো পদক্ষেপ নিলে ঢাকা যে তা মেনে নেবে না, সেটা খুব সহজেই বোঝা যায়।
গত এপ্রিলে ভারত একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির পরিচিত নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। সাধারণত পেশাদার কূটনীতিকদেরই এই পদে বসানো হয়, কোনো রাজনীতিককে নয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই পরিবর্তনের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। তবে ধারণা করা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত ফেরত না দেওয়ার কারণে ঢাকায় যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, তা সামলাতে একজন রাজনীতিকই হয়তো বেশি কাজে আসবেন।
কিন্তু এখানেও একটি বড় বাধা আছে। বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাংলাদেশকে প্রায়ই এমন একটি দেশ হিসেবে দেখানো হয়, যেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর নির্যাতন চলে। তাছাড়া দলটির অনেক নেতা বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উঁইপোকা’ বলে ডাকেন এবং তাদের ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে প্রচার করেন। যতদিন ভারতের এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য চলতে থাকবে, ততদিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দীনেশ ত্রিবেদীর কাজ করার সুযোগ খুবই সীমিত থাকবে।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক বিশাল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন। এরপর সহিংসতার দায়ে তার অনুপস্থিতিতেই তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা এখন বিএনপি সরকারের একটি বড় লক্ষ্য। তবে কেবল এই একটি কারণে তারা ভারতের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করার পর্যায়ে যাবে না।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এপ্রিলের শুরুতে ভারতে গিয়েছিলেন। তিনি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ নিয়ে গিয়েছিলেন। এর মধ্যে শেখ হাসিনা ইস্যু যেমন ছিল, তেমনি ছিল বেশি পরিমাণে ডিজেল ও সার সরবরাহ করার আবেদন। পাশাপাশি, বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতীয় ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে লম্বা সময় দেরি হচ্ছে, তা দ্রুত সমাধানেরও অনুরোধ করেন তিনি।
বাংলাদেশের এই অনুরোধগুলোর ব্যাপারে ভারত ইতিবাচক সাড়া দিলেও তাদের মধ্যে যথেষ্ট আন্তরিকতার অভাব ছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে সংকটে আছে। এমন বিপদের সময়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে যে ধরনের সাহায্য আশা করা যায়, ভারতের আচরণ তেমন ছিল না। ভারতের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী খলিলুর রহমানকে জানিয়ে দেন যে, আগে ভারতের নিজেদের চাহিদা মেটানো হবে, তারপর সম্ভব হলে বাংলাদেশকে তা সরবরাহ করা হবে। আসামে ভারতের একটি শোধনাগার রয়েছে এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহের চুক্তিও আছে। কিন্তু বর্তমানে ভারত চুক্তির চেয়ে বেশ কম পরিমাণে জ্বালানি দিচ্ছে।
নয়াদিল্লির চিন্তাভাবনা সম্ভবত এমন যে, ভারতের মতো একটি বড় প্রতিবেশীর কোনো বিকল্প ঢাকার কাছে নেই। জ্বালানি, পানি, কাঁচামাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বা চিকিৎসার মতো দরকারি বিষয়গুলোর জন্য ঢাকাকে ভারতের ওপর নির্ভর করতেই হবে। দুই দেশের মধ্যে এই বিষয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা চলে আসছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, ভারত এই নির্ভরশীলতাকেই একটি অস্ত্র বা চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে।
তবে এই তিক্ত অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশ একা নয়। ভারতের আশেপাশের প্রায় সব দেশের অবস্থাই এমন। বন্ধু হওয়ার চেয়ে তারা ভারতকে নিয়ে বেশি চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। ভারত মুখে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা অনেক প্রচার করে। কিন্তু বাস্তবে ভারত তার প্রতিবেশীদের প্রয়োজনের সময় উদাসীন থাকে এবং ‘বড় ভাই’-এর মতো খবরদারি করে। এই আচরণ তখনই বদলায়, যখন প্রতিবেশীরা বাধ্য হয়ে নিজেদের সমস্যা সমাধানে চীনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। নেপাল, শ্রীলঙ্কা এবং মালদ্বীপের সঙ্গে ভারতের অতীত সম্পর্ক দেখলেই এই কথার সত্যতা প্রমাণ পাওয়া যায়।
এখন বিএনপি সরকারের অধীনে ঢাকাও সেই একই পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ৫ মে তিন দিনের সরকারি সফরে চীনে গিয়েছেন। এই সফরের ঠিক আগেই তিনি ভারতের প্রতি বেশ কিছু কড়া কথা শুনিয়েছেন। তিস্তা চুক্তি নিয়ে ভারতের অহেতুক দেরির কারণে হতাশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ আর ভারতের জন্য বসে থাকবে না। বরং তারা চীনের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে কাজ এগিয়ে নেবে। ধারণা করা হচ্ছে, এই চীন সফরে খলিলুর রহমান বাণিজ্য বাড়ানো, সহজ শর্তে ঋণ, ঋণ শোধ করার সময় বাড়ানো এবং নতুন বিনিয়োগ নিয়ে চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিশদ আলোচনা করবেন।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছর ধরে বেইজিং বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি দেখিয়েছিল। কিন্তু এখন তারা নতুন করে ঢাকায় তাদের কাজের ছক সাজাচ্ছে। চীনের এই দ্রুত সক্রিয়তা হয়তো নয়াদিল্লিকে তাদের দীর্ঘ ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কিন্তু ভারত যখন নড়েচড়ে বসবে, ততক্ষণে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে। পরিস্থিতিটা তখন এমন দাঁড়াবে যে—প্রতিযোগী অনেক আগেই দৌড় শুরু করে দিয়েছে, আর ভারত সবেমাত্র মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লেখক: মন্ত্রায়া ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (এমআইএসএস) এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি; সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট এবং ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, নেভাল ওয়ার কলেজ, গোয়া, ভারত।
(লেখাটি দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
৯ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৪ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কৃষি। দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতা কৃষির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। গত কয়েক দশকে আমাদের কৃষিতে অভাবনীয় সাফল্য এসেছে। উন্নত জাতের ফসল, সেচ, সার ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই দমন ও প্রযুক্তির ব্যবহার এই সাফল্যের পেছনের মূল কারণ।
১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক তৎপরতা এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। শুধু সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ নয়, বাংলাদেশ সরকারের প্রধান হিসেবে আলাদা দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণও পেয়েছেন তিনি।
১২ আগস্ট ২০২৬