লেখা:

পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন শুধু ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার ঘটনা নয়। এটি সেই সময় হিসেবে দেখা হবে, যখন দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সীমান্ত সংক্রান্ত একটি বিষয় নতুন করে নির্বাচনী আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ২৯৪টির মধ্যে ২৯৩টি আসনের ফল প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন এবং তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। ফালতা কেন্দ্রের ফলাফল এখনও বাকি রয়েছে, কারণ সেখানে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই বিপুল জয়কে একক কোনো কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃণমূল কংগ্রেসকে একদিকে ক্ষমতাবিরোধী মনোভাবের মুখে পড়তে হয়েছে, অন্যদিকে দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাদের শাসনামলে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার দাবিও সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি, বিজেপির ছিল শক্তিশালী ও সংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামো।
এই সব বিষয়কে একসাথে জোরালো করেছে ‘বাংলাদেশ ইস্যু’। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা নিরাপত্তা ও পরিচয়ের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন এটি একটি দর্পণ, যার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নিজেদের নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যেমন: কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে শরণার্থী, কে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, কে দেশের মানুষ, আর কে দেশের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে।
এটাই ছিল ভারতীয় জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় সাফল্য। তারা বাংলাদেশ প্রসঙ্গকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব, জনসংখ্যা, সরকারি সুবিধা আর দেশের প্রতি আনুগত্য এই বিষয়গুলোকে সহজভাবে মানুষের সামনে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে।
এটি সম্ভব হয়েছিল কেবল ২০২৪ সালের আগস্টে যখন শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, বৈধতার সংকট, সংস্কারের চ্যালেঞ্জ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সংখ্যালঘুদের দোকানপাট, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গণপিটুনি ও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপের কথা উল্লেখ করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলেছে, বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন।
পশ্চিমবঙ্গে যেসব খবর বা তথ্য ছড়িয়েছে, সেগুলো সব সঠিক ছিল কিনা এটা নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এসব তথ্য মানুষের মনে কী ধারণা তৈরি করেছে। এর ফলে অনেক হিন্দু ভোটারের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে পূর্ব দিকের সীমান্ত নিরাপদ নয়।
ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের প্রচারে এই অনিরাপত্তার বিষয়টাকে তিনভাবে দেখায়। প্রথমত, তারা নিজেদের এমন দল হিসেবে তুলে ধরে, যারা বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে আসা হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষা করবে।
এ জন্য তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এর কথা বলে। এই আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীরা সহজে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারে। তবে মুসলিম হলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে সংশোধনী চালু হয়, আর মে মাসে প্রথমবার কিছু মানুষ নাগরিকত্বের সনদ পান।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় জনতা পার্টি অভিযোগ করে যে অবৈধ অভিবাসীদের তৃণমূল কংগ্রেস ভোটের জন্য ব্যবহার করে, এবং এতে মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাত দেখানো হয়।
তৃতীয়ত, বিজেপি বলে এই সমস্যা ঠিকভাবে সামলাতে হলে ক্ষমতায় তাদের থাকা দরকার। তাদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব যাচাই ভালোভাবে করতে হলে কলকাতা (রাজ্য সরকার) ও নয়াদিল্লি (কেন্দ্রীয় সরকার) একই দলের হওয়া জরুরি।
এই কৌশলে যেমন লাভ ছিল, তেমনি ঝুঁকিও ছিল। কারণ এতে দুই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। একদিকে, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু অভিবাসীদের বলা হয়েছে তারা স্বীকৃতি ও অধিকার পাবে। অন্যদিকে, বাঙালি মুসলিমদের নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
মতুয়া বিষয়টি এই পুরো দ্বিমুখী রাজনীতির মধ্যে ছিল। মতুয়ারা মূলত পূর্ববঙ্গ (দেশভাগের আগে এ নাম ছিল) ও বাংলাদেশ থেকে আসা দলিত শরণার্থী মানুষ। তারা শুধু একটি ভোটব্যাংক নয়, বরং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের জটিল ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে।
দীর্ঘদিন ধরে তারা নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে ছিল জাতিগত বৈষম্য, ঘরছাড়া হওয়া, নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, সঠিক নথিপত্রের অভাব, সরকারি সুবিধা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি কম পাওয়া।
নির্বাচনী প্রচারের সময় তৃণমূল কংগ্রেস মতুয়া সম্প্রদায়কে টানতে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ও তাদের সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের আরও বড় একটি প্রতিশ্রুতি দেয় নাগরিকত্ব দেওয়ার। তারা এটিকে অতীতের ভুল সংশোধন হিসেবে তুলে ধরে।
এই কারণেই ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি শুধু নাম সংশোধন করার বিষয় ছিল না। বিজেপি প্রশ্ন উপস্থাপন করে এই এলাকার ‘আসল নাগরিক’ কারা?
প্রায় ২৭ লাখ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। সমালোচকদের মতে, এই তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের বেশি লক্ষ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি এটিকে ‘গণতান্ত্রিকভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া’ হিসেবে তুলে ধরে।
এভাবে ‘বাংলাদেশ ইস্যু’ শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাস্তবে ভোটের ব্যবস্থার মধ্যেও ঢুকে পড়ে। সীমান্তের প্রসঙ্গ যেন ভোটকেন্দ্র ও ভোটার তালিকায় আবার ফিরে আসে। ফলে অনেক মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজপত্র নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। এইভাবে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারাটাই ভারতীয় জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষা করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। সীমান্ত পাহারা দেয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, যারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে।
তাঁর মতে, যদি সীমান্ত পেরিয়ে কেউ বেআইনিভাবে ঢুকে থাকে, তার দায় রাজ্য সরকারের নয়, বরং কেন্দ্রের। এছাড়া তিনি বিজেপির এই অভিযোগকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করেছেন, অর্থাৎ তিনি মনে করেন এই বক্তব্য ধর্মভিত্তিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।
তবে এই যুক্তিগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক। এগুলি অভিযোগের জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু মানুষের ভয় দূর করতে পারেনি।
গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস এমন রাজনীতি করেছে যেখানে সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা এবং বাংলার রাজনৈতিক পরিচয়ের ধারণা একসাথে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, বাংলা উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব থেকে আলাদা থাকতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে এই ধারণা আগের মতো আর শক্তিশালী নেই। ভারতীয় জনতা পার্টি এখন বাংলার রাজনীতিতে আরও বেশি হিন্দুত্ববাদী ভাষা ও ইস্যু ব্যবহার করতে শিখেছে।
‘বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’ এবার বিজেপির পথ সহজ করে দেয়। তারা স্থানীয় সমস্যা যেমন: চাকরি, অপরাধ, দুর্নীতি বা সরকারি সুবিধা বণ্টনের সমস্যাকে বড় জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে হিন্দু সমাজের একত্রিত হওয়াকে তারা আক্রমণ নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে দেখায়।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। একদিকে তাদের সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের পাশে থাকতে হয়, অন্যদিকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন’ করার অভিযোগ এড়াতে হয়। আবার বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী সম্প্রদায়কেও রাজনৈতিকভাবে সামলাতে হয়। ফলে তাদের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান রাখা আরও কঠিন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ইসলামপন্থীদের সক্রিয়তা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্যকে কল্পিত বলে যেমন উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি এসবকে ব্যবহার করে ভারতীয় মুসলমানদের কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোও ঠিক নয়।
বাংলাদেশ সবসময়ই বাংলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশভাগ, ভাষা, অভিবাসন, নদী, শ্রম, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দুঃখ-স্মৃতির তার মূল কারণ। কিন্তু এই প্রচারণায় যা পরিবর্তন হয়েছে, তা হলো এর রাজনৈতিক ব্যবহার। সীমান্তকে নির্বাচনের অস্ত্র বানানো হয়েছে। বিজেপি জিতেছে, কারণ তারা জানে ইতিহাস কখনো পুরনো হয় না, ভোটের সময় মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য সেই ইতিহাসকে আবার সামনে আনা যায়।
(স্ক্রল ডট ইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

পশ্চিমবঙ্গ ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন শুধু ১৫ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ক্ষমতায় আসার ঘটনা নয়। এটি সেই সময় হিসেবে দেখা হবে, যখন দীর্ঘদিন বাংলাদেশ সীমান্ত সংক্রান্ত একটি বিষয় নতুন করে নির্বাচনী আলোচনায় কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে ওঠে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, ২৯৪টির মধ্যে ২৯৩টি আসনের ফল প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বিজেপি পেয়েছে ২০৭টি আসন এবং তৃণমূল পেয়েছে ৮০টি আসন। ফালতা কেন্দ্রের ফলাফল এখনও বাকি রয়েছে, কারণ সেখানে পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই বিপুল জয়কে একক কোনো কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। তৃণমূল কংগ্রেসকে একদিকে ক্ষমতাবিরোধী মনোভাবের মুখে পড়তে হয়েছে, অন্যদিকে দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এবং তাদের শাসনামলে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার দাবিও সামনে এসেছে। এর পাশাপাশি, বিজেপির ছিল শক্তিশালী ও সংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামো।
এই সব বিষয়কে একসাথে জোরালো করেছে ‘বাংলাদেশ ইস্যু’। এর ফলে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ শুধু অভিযোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা নিরাপত্তা ও পরিচয়ের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যেন এটি একটি দর্পণ, যার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ নিজেদের নতুন করে ভাবতে শুরু করে। যেমন: কে হিন্দু, কে মুসলিম, কে শরণার্থী, কে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, কে দেশের মানুষ, আর কে দেশের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসে।
এটাই ছিল ভারতীয় জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় সাফল্য। তারা বাংলাদেশ প্রসঙ্গকে এমনভাবে ব্যবহার করেছে, যার মাধ্যমে নাগরিকত্ব, জনসংখ্যা, সরকারি সুবিধা আর দেশের প্রতি আনুগত্য এই বিষয়গুলোকে সহজভাবে মানুষের সামনে ব্যাখ্যা করতে পেরেছে।
এটি সম্ভব হয়েছিল কেবল ২০২৪ সালের আগস্টে যখন শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, বৈধতার সংকট, সংস্কারের চ্যালেঞ্জ এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, গণবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সংখ্যালঘুদের দোকানপাট, বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। চলতি বছরেও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গণপিটুনি ও কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলোর চাপের কথা উল্লেখ করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার বলেছে, বাংলাদেশে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় তারা উদ্বিগ্ন।
পশ্চিমবঙ্গে যেসব খবর বা তথ্য ছড়িয়েছে, সেগুলো সব সঠিক ছিল কিনা এটা নির্বাচনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। বরং বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এসব তথ্য মানুষের মনে কী ধারণা তৈরি করেছে। এর ফলে অনেক হিন্দু ভোটারের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে পূর্ব দিকের সীমান্ত নিরাপদ নয়।
ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের প্রচারে এই অনিরাপত্তার বিষয়টাকে তিনভাবে দেখায়। প্রথমত, তারা নিজেদের এমন দল হিসেবে তুলে ধরে, যারা বাংলাদেশ থেকে নির্যাতিত হয়ে আসা হিন্দু শরণার্থীদের রক্ষা করবে।
এ জন্য তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) এর কথা বলে। এই আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিম শরণার্থীরা সহজে ভারতীয় নাগরিকত্ব পেতে পারে। তবে মুসলিম হলে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মার্চে সংশোধনী চালু হয়, আর মে মাসে প্রথমবার কিছু মানুষ নাগরিকত্বের সনদ পান।
দ্বিতীয়ত, ভারতীয় জনতা পার্টি অভিযোগ করে যে অবৈধ অভিবাসীদের তৃণমূল কংগ্রেস ভোটের জন্য ব্যবহার করে, এবং এতে মুসলিমদের প্রতি পক্ষপাত দেখানো হয়।
তৃতীয়ত, বিজেপি বলে এই সমস্যা ঠিকভাবে সামলাতে হলে ক্ষমতায় তাদের থাকা দরকার। তাদের মতে, সীমান্ত নিরাপত্তা ও নাগরিকত্ব যাচাই ভালোভাবে করতে হলে কলকাতা (রাজ্য সরকার) ও নয়াদিল্লি (কেন্দ্রীয় সরকার) একই দলের হওয়া জরুরি।
এই কৌশলে যেমন লাভ ছিল, তেমনি ঝুঁকিও ছিল। কারণ এতে দুই ধরনের বার্তা দেওয়া হয়েছে। একদিকে, বাংলাদেশ থেকে আসা হিন্দু অভিবাসীদের বলা হয়েছে তারা স্বীকৃতি ও অধিকার পাবে। অন্যদিকে, বাঙালি মুসলিমদের নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
মতুয়া বিষয়টি এই পুরো দ্বিমুখী রাজনীতির মধ্যে ছিল। মতুয়ারা মূলত পূর্ববঙ্গ (দেশভাগের আগে এ নাম ছিল) ও বাংলাদেশ থেকে আসা দলিত শরণার্থী মানুষ। তারা শুধু একটি ভোটব্যাংক নয়, বরং ১৯৪৭ সালের দেশভাগের জটিল ইতিহাসের প্রতিনিধিত্ব করে।
দীর্ঘদিন ধরে তারা নানা সমস্যার মধ্যে ছিল। এর মধ্যে ছিল জাতিগত বৈষম্য, ঘরছাড়া হওয়া, নাগরিকত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা, সঠিক নথিপত্রের অভাব, সরকারি সুবিধা ও রাজনৈতিক স্বীকৃতি কম পাওয়া।
নির্বাচনী প্রচারের সময় তৃণমূল কংগ্রেস মতুয়া সম্প্রদায়কে টানতে বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ও তাদের সংস্কৃতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি তাদের আরও বড় একটি প্রতিশ্রুতি দেয় নাগরিকত্ব দেওয়ার। তারা এটিকে অতীতের ভুল সংশোধন হিসেবে তুলে ধরে।
এই কারণেই ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি শুধু নাম সংশোধন করার বিষয় ছিল না। বিজেপি প্রশ্ন উপস্থাপন করে এই এলাকার ‘আসল নাগরিক’ কারা?
প্রায় ২৭ লাখ মানুষ ভোটার তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। সমালোচকদের মতে, এই তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটারদের বেশি লক্ষ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টি এটিকে ‘গণতান্ত্রিকভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া’ হিসেবে তুলে ধরে।
এভাবে ‘বাংলাদেশ ইস্যু’ শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বাস্তবে ভোটের ব্যবস্থার মধ্যেও ঢুকে পড়ে। সীমান্তের প্রসঙ্গ যেন ভোটকেন্দ্র ও ভোটার তালিকায় আবার ফিরে আসে। ফলে অনেক মানুষ নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজপত্র নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, আর তারা নিজেদের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগে। এইভাবে মানুষের চিন্তাভাবনা বদলে দিতে পারাটাই ভারতীয় জনতা পার্টির সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ভারতের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রক্ষা করার দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। সীমান্ত পাহারা দেয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী, যারা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে।
তাঁর মতে, যদি সীমান্ত পেরিয়ে কেউ বেআইনিভাবে ঢুকে থাকে, তার দায় রাজ্য সরকারের নয়, বরং কেন্দ্রের। এছাড়া তিনি বিজেপির এই অভিযোগকে সাম্প্রদায়িক বলে সমালোচনা করেছেন, অর্থাৎ তিনি মনে করেন এই বক্তব্য ধর্মভিত্তিক বিভাজন তৈরি করতে পারে।
তবে এই যুক্তিগুলো ছিল প্রতিরক্ষামূলক। এগুলি অভিযোগের জবাব দিয়েছে বটে, কিন্তু মানুষের ভয় দূর করতে পারেনি।
গত ১৫ বছর ধরে তৃণমূল কংগ্রেস এমন রাজনীতি করেছে যেখানে সাধারণ মানুষের কল্যাণের কথা এবং বাংলার রাজনৈতিক পরিচয়ের ধারণা একসাথে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, বাংলা উত্তর ভারতের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রভাব থেকে আলাদা থাকতে পারে।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফলাফল ইঙ্গিত দেয় যে এই ধারণা আগের মতো আর শক্তিশালী নেই। ভারতীয় জনতা পার্টি এখন বাংলার রাজনীতিতে আরও বেশি হিন্দুত্ববাদী ভাষা ও ইস্যু ব্যবহার করতে শিখেছে।
‘বাংলাদেশ প্রসঙ্গ’ এবার বিজেপির পথ সহজ করে দেয়। তারা স্থানীয় সমস্যা যেমন: চাকরি, অপরাধ, দুর্নীতি বা সরকারি সুবিধা বণ্টনের সমস্যাকে বড় জাতীয় নিরাপত্তা ও পরিচয়ের প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরে। এর ফলে হিন্দু সমাজের একত্রিত হওয়াকে তারা আক্রমণ নয়, বরং নিজেদের নিরাপত্তার প্রয়োজন হিসেবে দেখায়।
এই পরিস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেস এক ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। একদিকে তাদের সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের পাশে থাকতে হয়, অন্যদিকে ‘অনুপ্রবেশকারীদের সমর্থন’ করার অভিযোগ এড়াতে হয়। আবার বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থী সম্প্রদায়কেও রাজনৈতিকভাবে সামলাতে হয়। ফলে তাদের জন্য রাজনৈতিক অবস্থান রাখা আরও কঠিন হয়ে যায়।
বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, ইসলামপন্থীদের সক্রিয়তা এবং ভারতবিরোধী বক্তব্যকে কল্পিত বলে যেমন উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তেমনি এসবকে ব্যবহার করে ভারতীয় মুসলমানদের কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে দেখানোও ঠিক নয়।
বাংলাদেশ সবসময়ই বাংলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশভাগ, ভাষা, অভিবাসন, নদী, শ্রম, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দুঃখ-স্মৃতির তার মূল কারণ। কিন্তু এই প্রচারণায় যা পরিবর্তন হয়েছে, তা হলো এর রাজনৈতিক ব্যবহার। সীমান্তকে নির্বাচনের অস্ত্র বানানো হয়েছে। বিজেপি জিতেছে, কারণ তারা জানে ইতিহাস কখনো পুরনো হয় না, ভোটের সময় মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার জন্য সেই ইতিহাসকে আবার সামনে আনা যায়।
(স্ক্রল ডট ইন থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)

প্রতি বছর জুনের আগেই একটা প্রত্যাশার মৌসুম তৈরি হয়। পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের পর্দায় জাতীয় বাজেট নিয়ে আলোচনা জমে ওঠে। বাজেট ঘোষণার পর সেই আলোচনা কয়েক দিন চলে, তারপর স্তিমিত হয়ে যায়। পরের বছর আবার একই চক্র।
৩ ঘণ্টা আগে
সরকার জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিটে ১.২০–১.৫০ টাকা (প্রায় ১৭–২১%) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যার সঙ্গে খুচরা দামে আনুপাতিক সমন্বয় হতে পারে।
১ দিন আগে
বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি এক অভূতপূর্ব ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, যেখানে ইসরায়েল-আমেরিকা বনাম ইরান ও তার প্রক্সি শক্তিগুলোর মধ্যকার সরাসরি সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। এই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইরানের কৌশলী পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি, যার সাম্প্রতি
১ দিন আগে
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের উত্থান এবং ২০১১ সালে তৃণমূলের ক্ষমতা দখলের পর এই ফলাফল বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তৃতীয় বড় বাঁক।
১ দিন আগে