leadT1ad

মাদুরোকে আটক ও সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যাবর্তন

রঞ্জন সোলোমন
রঞ্জন সোলোমন

প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২১: ১৬
স্ট্রিম গ্রাফিক

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে ‘আটক’ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পশ্চিমা বিশ্ব উল্লাসে মেতেছে। তাদের দাবি, অত্যাচারী শাসকের পতন ঘটিয়ে ‘গণতন্ত্র’ উদ্ধার করা হয়েছে।  

একনায়ক সরে যাওয়ায় একটি জাতি ‘স্বাধীন’ হলো এবং ইতিহাসকে সঠিক পথে ফেরানো হলো বলে প্রচার করা হচ্ছে। এই প্রচারণা কেবল বিভ্রান্তিকর নয়, ঔপনিবেশিকও বটে। এর মাধ্যমে লাতিন আমেরিকার শত শত বছরের সাম্রাজ্যবিরোধী লড়াই মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। এর মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে শ্রেণি ও বর্ণভিত্তিক শাসনকে। গভীর রাজনৈতিক সংগ্রাম পরিণত করা হচ্ছে নাটকে । নাটকটি লেখা ওয়াশিংটনে। তাতে তালি বাজছে ইউরোপে।  

ভেনেজুয়েলাকে বুঝতে হলে প্রথমে দেশটিকে নিয়ে বানানো পশ্চিমা গালগল্প মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। ভেনেজুয়েলার ঘটনা শুধু নিকোলাস মাদুরোকে নিয়ে নয়। হুগো চাভেজের শুরু করা ‘বলিভারিয়ান বিপ্লব’ কোনো ব্যক্তিপূজা ছিল না। ছিল ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তন। এই বিপ্লবের জন্ম হয়েছিল শত শত বছরের ধনিক শ্রেণির শাসনের বিপরীতে। এতদিন ধরে ফর্সা চামড়ার অভিজাতরা দেশ চালাচ্ছিল। তারা অধিকাংশ মিশ্র বর্ণের বা আদিবাসীদের শাসনের বাইরে রেখেছিল। অর্থনৈতিক পরাধীনতা ও দমনের মাধ্যমে তারা রাজত্ব করেছে। তাই চাভেজ বা পরে মাদুরো ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের কোনো বিচ্যুতি নন। তাঁরা দীর্ঘদিনের অপেক্ষার ফলাফল।

পশ্চিমা বিশ্লেষকরা বলিভারিয়ান প্রকল্পকে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা বলছেন। তারা এর জন্য দায়ী করেন

একনায়কতন্ত্রের অযোগ্যতাকেই। তবে ভেনেজুয়েলা এমনি এমনি ধসে পড়েনি। দেশটির ওপর আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল তেলের আয়কে লক্ষ্য করে। আর্থিক লেনদেন আটকে দেওয়া হয়েছে। ওষুধ আমদানি ও বৈশ্বিক ঋণ পাওয়ার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। এতে অপুষ্টি বেড়েছে। স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। অবকাঠামো নষ্ট হয়েছে। অভাব দেখা দিলে এর দায় চাপানো হয়েছে সমাজতন্ত্রের ওপর। অথচ অবরোধের বিষয় আড়াল করা হয়েছে।

এগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সবসময় সংকট তৈরি করে। পরে তারা সেই সংকট সমাধানের দাবি করে। ১৯৫৪ সালের গুয়াতেমালা থেকে ১৯৭৩ সালের চিলি পর্যন্ত এমন দেখা গেছে। ১৯৮০-এর নিকারাগুয়া বা ২০০৩-এর ইরাকের ঘটনাও একই। অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়। ভেনেজুয়েলা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের দীর্ঘ ঐতিহ্যের নতুন অধ্যায়। একে মানবিক উদ্বেগের মোড়কে ঢাকা হয়েছে।

বলিভারিয়ান বিপ্লব মূলধারার কিছু মৌলিক বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করেছিল। খারাপ শাসনের চেয়েও ভয়ংকর কিছুকে নাড়া দিয়েছিল সে। শ্রেণি বিভেদ ও বর্ণ ব্যবস্থায় আঘাত করেছিল এই বিপ্লব। তেলের সম্পদ সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়েছে। সাক্ষরতা অভিযান ও স্বাস্থ্যসেবায় জোর দেওয়া হয়েছে। খাদ্য সার্বভৌমত্বের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এভাবে জাতীয় সম্পদে অভিজাতদের একচেটিয়া অধিকার ভাঙা হয়েছে। দরিদ্ররা প্রথমবারের মতো ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে। এই পরিবর্তন হয়তো অগোছালো বা অসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু এর ফলে যে আনুগত্য তৈরি হয়েছে তা প্রেসিডেন্ট সরালেই শেষ হবে না।

তাই মাদুরোর পতন হলেও পশ্চিমা কৌশলবিদরা যা চাইছেন তা পাবেন না। বাইরের শক্তি দিয়ে ক্ষমতা বদল হলেও মানুষের রাজনৈতিক সত্তা মরে না। ২০০২ সালের অভ্যুত্থানে মানুষ চাভেজের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। অন্ধ আনুগত্য থেকে নয় বরং তারা বুঝেছিল অভিজাতরা তাদের স্বার্থ দেখবে না।

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে ‘একনায়কতন্ত্র’ শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে। অথচ পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলো নিজেদের অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। সেখানে বর্জন, বন্দিত্ব ও বর্ণবাদী সহিংসতা রয়েছে। কর্পোরেট আধিপত্য নিয়েও তারা নীরব। ফলাফল নিজেদের স্বার্থের পক্ষে গেলে তারা নির্বাচনকে বৈধ বলে। স্বার্থের বিপক্ষে গেলেই তারা গণতন্ত্রকে অবৈধ ঘোষণা করে। মাদুরোর নির্বাচনী রেকর্ড তন্ন তন্ন করে খোঁজা হচ্ছে। অথচ মানবাধিকার লঙ্ঘনের রেকর্ড থাকা মার্কিন মিত্রদের প্রশংসিত করা হচ্ছে।

ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে তা গণতন্ত্র রক্ষা নয়, বরং ক্রমহ্রাসমান মার্কিন আধিপত্যের যুগে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলের রিজার্ভ দখলই মূল উদ্দেশ্য। বলিভারিয়ানরা সম্পদের ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিল। তারা মার্কিন আধিপত্যের বাইরে আঞ্চলিক সংহতি গড়েছিল। দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার পথে হেঁটেছিল তারা। এগুলো নিওলিবারেল ব্যবস্থার জন্য অসহনীয় চ্যালেঞ্জ।

ভেনেজুয়েলা সরকার ও মিত্ররা ‘ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের রাজনীতির প্রত্যাবর্তন’ শব্দটি ব্যবহার করছে। তারা মার্কিন পদক্ষেপকে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ বলছে। তারা মনে করে এর উদ্দেশ্য তেলের সম্পদ দখল করা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট দাবি করেছিলেন ট্রাম্প তাদের তেল ও খনিজ চুরি করতে চান। এই ঘটনা ১৯ শতকের সাম্রাজ্যবাদী আচরণের কথা মনে করিয়ে দেয়।

সাম্রাজ্যবাদ কেবল সম্পদ শোষণ করে না। এটি বিকল্প চিন্তাকেও ধ্বংস করে। সম্পদ বণ্টন বা জনগণের ক্ষমতার চিন্তা দমন করা হয়। এমন যেকোনো প্রকল্প সফল হোক বা না হোক তাকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। কারণ এই প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে পশ্চিমাদের ব্যবস্থার বাইরেও অন্য ব্যবস্থা সম্ভব। ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় অপরাধ অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা নয়। আদর্শিক বিরোধিতা করা ছিল তাদের অপরাধ।

ভেনেজুয়েলার ট্র্যাজেডি এই নয় যে তারা প্রতিরোধ করেছে। তারা ক্রমাগত আক্রমণের মুখেও টিকে থাকার চেষ্টা করেছে। কোনো বিপ্লবই নিখুঁত পরিস্থিতিতে ঘটে না। বলিভারিয়ান প্রক্রিয়া নির্ভুল ছিল কি না সেটি প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো এর ভাগ্য কে ঠিক করবে? ভেনেজুয়েলার জনগণ নাকি বৈশ্বিক কোনো শক্তি?

মাদুরোকে আটক করার ঘটনাকে সমাপ্তি হিসেবে দেখানো হলেও আদতে সমাপ্তি নয়। এই ঘটনা নতুন করে সাম্রাজ্যবাদী লুটের সুযোগ, নয়তো আরও গভীর কোনো প্রতিরোধের সূচনা। মানুষ তখন আরও নির্মমভাবে বাস্তবতাকে বুঝবে। সামাজিক অর্জন ও হারানো মর্যাদার স্মৃতি সহজে মুছবে না। ইতিহাস এভাবে চলে না।

লাতিন আমেরিকা আগেও এমন ‘নাটক’ দেখেছে। সাম্রাজ্যবাদ যখনই বিজয় ঘোষণা করে তখনই তারা গণসংগ্রামের শক্তিকে ছোট করে দেখে। এখন আসল লড়াই মাদুরোর ভাগ্য নিয়ে নয়। ভেনেজুয়েলার জনগণ তাদের বিপ্লবের উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পারবে কি না সেটাই প্রশ্ন। এই অঞ্চল আবার সাম্রাজ্যবাদী শৃঙ্খলার পরীক্ষাগারে পরিণত হবে কি না তা সময়ই বলবে।

ভেনেজুয়েলা সরাসরি আক্রমণের আগেই কার্যত উপনিবেশে পরিণত হয়েছিল। বছরের বছর অবরোধ দিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় আয় ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনভাবে দেশ চালানো অসম্ভব করে তোলা হয়েছে। পশ্চিমাদের এই প্রক্রিয়া কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল না, ছিল পরিকল্পিত কৌশল।

নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রকে দুর্বল করা হয়েছে। এরপর হস্তক্ষেপকে ‘অনিবার্য’ হিসেবে দেখানো হয়েছে। তারপর এসেছে সরাসরি জবরদস্তি।

লাতিন আমেরিকার প্রতিরোধকে ‘আমেরিকা-বিরোধী’ বলে উড়িয়ে দেওয়া ভুল। এই প্রতিরোধ শুধু আবেগের বিষয় নয়, বরং কাঠামোর বিষয়। গুয়াতেমালা থেকে চিলি পর্যন্ত একই প্যাটার্ন দেখা গেছে। অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করা হয়। তারপর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা উস্কে দেওয়া হয়। এরপর নেতৃত্ব সরিয়ে দেওয়া হয়। শেষে সম্পদ পুনর্বণ্টন করা হয়। ভেনেজুয়েলা এই ঐতিহাসিক ছকের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। পার্থক্য শুধু লজ্জার অনুপস্থিতি। যা একসময় গোপনে হতো এখন তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নিজেকে আড়াল করার প্রয়োজন মনে করছে না। ট্রাম্প কোনো ব্যতিক্রম নন, তিনি কেবল হাতিয়ার।

ভেনেজুয়েলার অপরাধ একনায়কতন্ত্র বা দুর্নীতি নয়। তাদের অপরাধ অবাধ্যতা। তারা মেনে নেয়নি যে তাদের সম্পদ নিয়ে অন্যেরা বাজারে দরকষাকষি  করবে। তাই মাদুরোর ‘অপহরণ’ নৈতিক গল্পের খোলসে আসলে রাজনৈতিক গল্প। সব ঔপনিবেশিক গল্পের মতোই এর শেষ হয় চুরির মাধ্যমে। সেই চুরিকে দেখানো হয় প্রয়োজন হিসেবে। আর দখলদারিত্বকে উপস্থাপন করা হয় শৃঙ্খলা হিসেবে।

মিডিল ইস্ট মনিটর থেকে অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত