জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

হরমুজ প্রণালী বন্ধে জ্বালানি সংকটে পড়বে বাংলাদেশ

লেখা:
লেখা:
শাফকাত রাব্বি

স্ট্রিম গ্রাফিক

হরমুজ প্রণালী হলো পারস্য উপসাগর আর আরব সাগরের মধ্যকার সংযোগকারী সরু জলপথ। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্যমতে, প্রতিদিন বিশ্বের সামুদ্রিক তেল পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। এছাড়া বিশ্ববাজারে লেনদেন হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে যায়। যার প্রধান উৎস কাতার আর সংযুক্ত আরব আমিরাত।

এ কারণেই হরমুজকে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট বা সরুপথ বলা হয়। এমনকি এই পথে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার সামান্য হুমকিও তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। সরবরাহের ভয় আর বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।

ইরানের তেল-গ্যাস রপ্তানি

২০২৩ সালে ইরান ছিল ওপেকের চতুর্থ বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল উৎপাদনকারী। আর ২০২২ সালে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী ছিল। দেশটির হাতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাসের মজুদ রয়েছে। ২০২৩ সালের হিসাবে তেলের মজুদে তারা বিশ্বে তৃতীয় এবং গ্যাসের মজুদে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল।

২০২৩ সালের শেষে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের মজুদের প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল ইরানের হাতে। আর বৈশ্বিক মজুদের প্রায় ১২ শতাংশ। এত সম্পদ থাকার পরেও ইরানের উৎপাদন ক্ষমতা সীমিত। এর কারণ বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগের অভাব এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞার কারণে তারা গ্যাস তরল করে বিশ্ববাজারে পাঠাতে পারে না। এর বদলে তারা পাইপলাইনের মাধ্যমে তুরস্ক, আর্মেনিয়া আর আজারবাইজানের মতো প্রতিবেশী দেশে গ্যাস রপ্তানি করে।

তুরস্ক দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ইরানের পাইপলাইন গ্যাসের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তবে বিশ্ব এলএনজি বাজারে ইরানের অংশীদারত্ব কম হলেও হরমুজ প্রণালীর ঝুঁকি কমে না। আসল বিপদটা হলো উপসাগরীয় এলএনজি রপ্তানিকারকদের নিয়ে। কাতারের মতো দেশগুলোর গ্যাসের চালান এই প্রণালী দিয়েই যেতে হয়।

বিশ্ববাজার থেকে উপসাগরীয় সরবরাহ বন্ধ হলে কী হবে

ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা ইরানি পাইপলাইন গ্যাস বন্ধ হলে বিশ্ব এলএনজি বাজারে খুব বড় প্রভাব পড়বে না। কিন্তু হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে কাতারের রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে। কাতার হলো বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক।

২০২৪ সালে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া এলএনজির প্রায় ৮৩ শতাংশই ছিল পারস্য উপসাগর থেকে এশিয়ায় যাওয়া চালান। এর সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীন, ভারত আর দক্ষিণ কোরিয়া। ওই বছর প্রণালী দিয়ে যাওয়া মোট এলএনজির ৫২ শতাংশই কিনেছে এই তিন দেশ।

বিশ্ব এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় ১৯ শতাংশ আসে কাতার থেকে। কিছু তেল রপ্তানিকারকের বিকল্প পথ থাকলেও কাতারের হাতে হরমুজ ছাড়া আর কোনো সামুদ্রিক পথ নেই। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হলে এশিয়া আর ইউরোপের ক্রেতারা বিকল্প উৎসের জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে।

এর ফলাফল হবে তাৎক্ষণিক। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম হু হু করে বাড়বে। ইউরোপ আর এশিয়া সীমিত এলএনজি কার্গো বা চালানের জন্য প্রতিযোগিতায় নামবে। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো লেনদেনের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্ট সংকটে পড়বে।

রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা করেছিল তখন বিশ্ববাজারে স্পট এলএনজির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। হরমুজ বন্ধ হলে আবারও একই অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে যদি এর সঙ্গে তেলের দামও চড়া থাকে।

হরমুজ যদি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকে তবে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বর্তমান ৭২ ডলার থেকে বেড়ে ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেলের দাম বাড়লে গ্যাসের বাজারেও প্রভাব পড়ে। এশিয়ার অনেক এলএনজি চুক্তি তেলের দামের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ফলে তেলের দাম বাড়লে এলএনজির দামও বাড়ে। জাহাজ ভাড়া আর বিমা খরচ বাড়লে সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ বাড়ে।

জ্বালানি বাজার একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। চোকপয়েন্ট সংকট কোনো একটি পণ্যকে আলাদা করে রাখে না। বরং পুরো ব্যবস্থায় দামের চাপ বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের এলএনজি ঝুঁকি

বাংলাদেশ ইরান থেকে সরাসরি গ্যাস আমদানি করে না। তবুও দেশটি উপসাগরীয় এলএনজি প্রবাহের ওপর কাঠামোগতভাবে নির্ভরশীল। এই এলএনজি হরমুজ হয়েই আসে। অর্থাৎ সমস্যাটা দ্বিপক্ষীয় নয়; সমস্যাটা পদ্ধতিগত।

এলএনজি আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ার পেছনে কিছু কারণ আছে। কারণগুলো হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়া এবং নবায়নযোগ্য শক্তির প্রসারে ধীরগতি। সরকারের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২২ অর্থবছরে মোট গ্যাসের চাহিদার ২২ শতাংশ পূরণ হয়েছে এলএনজি আমদানি দিয়ে।

বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। ২০২৩ সালে আমদানির পরিমাণ দাঁড়ায় ৫২ লাখ মেট্রিক টনে। যা আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি আর দেশীয় উৎপাদন কমার কারণে ভবিষ্যতে এলএনজির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে।

২০২৩ সালে এলএনজি আমদানিতে বাংলাদেশ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বা ৫০ কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ করেছে। এর বড় অংশই বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আমদানির অর্ধেকের বেশি আসে কাতার ও ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি চুক্তির মাধ্যমে। বাকিটা কেনা হয় স্পট মার্কেট থেকে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হলেও সরবরাহের অভাবে অনেক কেন্দ্র সক্ষমতা অনুযায়ী চলতে পারছে না।

হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন ঘটলে বাংলাদেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাতারের সঙ্গে চুক্তিকৃত এলএনজি সরবরাহ দেরি হতে পারে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। স্পট মার্কেটে দাম বেড়ে গেলে বিকল্প কার্গো কেনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমদানি ব্যয় বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়বে। এলএনজি সংগ্রহ কমে গেলে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হবে।

বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, ইরানে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে লিটারপ্রতি জ্বালানির দাম ৫ থেকে ১০ টাকা বাড়তে পারে। হরমুজ অবরোধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চললে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে।

কৌশলগত শিক্ষা

বাংলাদেশের জন্য হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়াটা তেহরানের সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক সংকট নয়, বরং বাজার সংকট। বাংলাদেশের ঝুঁকির মূল কারণ হলো বৈশ্বিক এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। এর বিপরীতে কোনো বৈচিত্র্য নেই, কৌশলগত মজুদ নেই এবং শক্তিশালী কোনো দেশীয় বিকল্পও নেই।

এই ঘটনা তিনটি কৌশলগত প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রথমত, উপসাগরের বাইরে এলএনজি সরবরাহকারীর খোঁজ করা। উত্তর আমেরিকার এলএনজি এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির আলোকে এটি ভাবা যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, মজুদ ক্ষমতা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি হেজিং মেকানিজম বা ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা করা। তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা এবং দেশীয় জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানো। প্রয়োজনে কয়লার দিকে নতুন করে নজর দেওয়া।

জ্বালানি চোকপয়েন্টগুলো এখন আর কেবল আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয় নয়। এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির ফাটলরেখা বা ফল্ট লাইন। আর বাংলাদেশ সেই কম্পনের ঠিক মাঝখানেই বসে আছে।


কাউন্টারপয়েন্টে প্রকাশিত বাংলাদেশি-আমেরিকান ভূ-রাজনৈতিক কলামিস্ট শাফকাত রাব্বির নিবন্ধ থেকে অনূদিত।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত