জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

পাক-আফগান সংঘাতের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার ঝুঁকি কতটা

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫৫
পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ। সংগৃহীত ছবি

দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং পারস্পরিক অভিযোগের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত এখন সরাসরি সামরিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের ‘অপারেশন গজব লিল হক’ বা ‘ন্যায়ের হামলা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে ভাঙন ধরেছে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। ডুরান্ড লাইন বরাবর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ কেবল দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ককেই তলানিতে নিয়ে যায়নি, বরং অঞ্চলজুড়ে চরমপন্থা ও অস্থিতিশীলতার নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে।

পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের এই আগ্রাসী মনোভাব এবং তালেবান শাসনের পাল্টা হামলার ঘোষণা আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। টিটিপি ইস্যু ও সীমান্ত বিবাদকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত যদি দ্রুত প্রশমিত না হয়, তবে এর ভয়াবহ ফলাফল পুরো উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।

ডুরান্ড লাইন থেকে রণক্ষেত্র: সংঘাতের মূল কারণ

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার ২ হাজার ৬১১ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখা, যা ‘ডুরান্ড লাইন’ নামে পরিচিত, তা নিয়ে ঐতিহাসিক বিবাদ রয়েছে। কাবুল কখনোই ব্রিটিশ আমলে নির্ধারিত এই সীমান্তকে আনুষ্ঠানিকভাবে মেনে নেয়নি, যার ফলে সীমান্ত এলাকা সবসময়ই অস্থিতিশীল থেকেছে। তবে বর্তমান সরাসরি সামরিক সংঘাতের মূল অনুঘটক হলো নিষিদ্ধ গোষ্ঠী তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের (টিটিপি) ভয়াবহ তৎপরতা। পাকিস্তানের স্পষ্ট অভিযোগ, আফগান তালেবান সরকার তাদের মাটিতে টিটিপি-কে নিরাপদ আশ্রয় ও রসদ সরবরাহ করছে, যেখান থেকে তারা পাকিস্তানি ভূখণ্ডে নিয়মিত আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে। বিপরীতে তালেবান সরকার এই অভিযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে টিটিপি-র আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক লেফটেন্যান্ট কর্নেলসহ বহু সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এই ভয়াবহ হামলার প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান সরাসরি আফগান ভূখণ্ডে ‘অপারেশন গজব লিল হক’ বা ‘ন্যায়ের হামলা’ শুরু করেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে এখন ‘প্রকাশ্য যুদ্ধ’ চলছে। এই সংঘাত কেবল সীমান্ত নিরাপত্তা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিরতার আশঙ্কা

পাকিস্তান-আফগান সংঘাত কেবল দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর ভয়াবহ প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সীমান্ত সংঘাতকে কেন্দ্র করে অঞ্চলজুড়ে চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থান এবং ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ পুরো উপমহাদেশের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরির আশঙ্কাও প্রবল হচ্ছে।

চরমপন্থার নতুন ঢেউ

সীমান্ত এলাকার এই চরম অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে টিটিপি ছাড়াও অন্যান্য উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো নতুন করে সংগঠিত হওয়ার এবং তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করার সুযোগ পাবে।

পাকিস্তান-আফগানিস্তানের এই যুদ্ধ পরিস্থিতি আল-কায়েদা বা আইসিসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পুনরায় শক্তিশালী হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দিতে পারে। এরফলে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় চরমপন্থার একটি নতুন ও ভয়াবহ ঢেউ আছড়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ

এই সংঘাতকে কেন্দ্র করে চীন মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিলেও অঞ্চলটির নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ভারত ও আমেরিকার স্বার্থও গভীরভাবে জড়িত রয়েছে। পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে চীন ও আফগানিস্তানের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের কৌশলগত অবস্থান এই সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলছে। ফলে পুরো অঞ্চলটি পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার রণক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যে। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পশ্চিমা শক্তিগুলোও তাদের নিজস্ব কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে তৎপর হতে পারে, যা অঞ্চলটিকে আরও অস্থিতিশীল করবে।

শরণার্থী ও মানবিক সংকট

সংঘাত তীব্র হলে ডুরান্ড লাইন পেরিয়ে ব্যাপক শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে, যা পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করবে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ সামরিক অভিযানের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবে, যার ফলে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলো এই বিপুল সংখ্যক শরণার্থীর ত্রাণ ও পুনর্বাসন নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। শরণার্থী শিবিরগুলো স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সম্পদ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশের ওপর প্রভাব: একটি বিশ্লেষণ

ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে পাকিস্তান-আফগান সংঘাতের সরাসরি বা সামরিক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবুও, দক্ষিণ এশিয়ার এই গুরুতর অস্থিতিশীলতা বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু পরোক্ষ ঝুঁকির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে তার ঢেউ পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও চরমপন্থা বিরোধী লড়াইয়ে প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক চাপও সৃষ্টি করতে পারে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা ঝুঁকি

দক্ষিণ এশিয়ায় চরমপন্থা বা উগ্রবাদ বেড়ে গেলে তা পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করতে পারে। অস্থিতিশীল আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে উগ্রবাদী আদর্শ বা নেটওয়ার্ক সীমান্ত পেরিয়ে সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে, যা বাংলাদেশের মতো শান্তিপূর্ণ দেশের জন্যও উদ্বেগজনক।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হলে তা বিচ্ছিন্নতাবাদী বা চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে উৎসাহ প্রদান করতে পারে। এজন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে এবং উগ্রবাদ দমনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অতিরিক্ত সতর্ক ও তৎপর থাকতে হবে। সীমান্ত ও সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।

অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব

যদিও পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের ফলে সরাসরি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা কম, তবুও আঞ্চলিক অস্থিরতা পণ্য সাপ্লাই চেইন ব্যাহত করতে পারে এবং আকাশ বা জলপথে পণ্য পরিবহনে ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে সীমিত হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তা সম্প্রসারণের একটি বিশেষ প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশ মূলত ওষুধ, তৈরি পোশাক ও পাটজাত পণ্য আফগানিস্তানে রপ্তানি করে এবং শুকনো ফল ও তুলা আমদানি করে থাকে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ খুব বেশি না হলেও, একটি অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই সংঘাতের ফলে ফার্মাসিউটিক্যালস খাতে যৌথ বিনিয়োগ এবং সরাসরি কার্গো ফ্লাইট চালুর উদ্যোগগুলো ধীরগতির বা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

কূটনৈতিক সমীকরণ

মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ওআইসি এবং জাতিসংঘে এই সংঘাত নিয়ে কূটনৈতিক চাপের মুখোমুখি হতে পারে। দুই দেশই মুসলিম বিশ্বের অংশ হওয়ায়, জোটনিরপেক্ষ নীতি অনুসরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ একটি নাজুক কূটনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সবসময়ই শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং এই ক্ষেত্রেও ঢাকার অবস্থান হবে সংঘাত নিরসনের পক্ষে। তবে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থ জড়িয়ে থাকায় নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা চালানো বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার এই ভয়াবহ সংঘাত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনি সংকেত, যা অত্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোকে ভঙ্গুর করে তুলছে। যুদ্ধের মাধ্যমে কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, বরং তা কেবল মানবিক বিপর্যয় ও অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি করে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেছেন, বাংলাদেশ প্রকাশ্যে কঠোর অবস্থান না নিলেও বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে উভয় পক্ষকে সংঘাত থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট নিরসনে চীন, ভারত ও রাশিয়ার মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর উচিত হবে অবিলম্বে কার্যকরী মধ্যস্থতার উদ্যোগ নেওয়া। ডুরান্ড লাইনের এই রণক্ষেত্র কেবল দুই প্রতিবেশীর বিষয় নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

সম্পর্কিত