আমীন আল রশীদ

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিএনপি সরকারের ১০ম দিন। বেলা পৌনে ১১টা। সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন থেকে ৫ নম্বর ফটক দিয়ে বের হয়ে পরিবহন পুল ভবনের সামনে দিয়ে ওসমানী মিলনায়তনে হেঁটে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্দেশ্য, একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে যোগদান। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ের মূল ফটক দিয়ে আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ফিরে আসেন তিনি।
সচিবালয় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন মূলত হাঁটাপথই। বরং এটুকু পথ গাড়িতে গেলে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহর ও আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা বলয়ের কারণে বেশ কিছু সময়ের জন্য রাস্তা স্থবির হয়ে যায়। একসময় যে দৃশ্য ছিল খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী রাস্তার সেই স্থবিরতা এবং ভিআইপি মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য যে সচিবালয়ে নিজের কার্যালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গেলেন। ঘটনা হিসেবে এটি খুব বড় না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ক্ষমতাবানদের আচরণের ধারায় এটি একটি বড় ধরনের ধাক্কা।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ঘর পোড়া গরু। তাই আশঙ্কা জাগে, এটা কি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক পদক্ষেপ নাকি আইওয়াশ বা লোকদেখানো ব্যাপার? প্রধানমন্ত্রী কি তাঁর পুরো মেয়াদকালে এই সংস্কৃতি ও অভ্যাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন? নাকি প্রথম দিকে মানুষকে চমকে দিয়ে ধীরে ধীরে পুরোনো সিস্টেমেই ফিরে যাবেন?
সরকার গঠনের অষ্টম দিন ২৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। সচিবালয়ের কর্মচারী খন্দকার শামীমের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে অপহরণের ঘটনায় তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশনার এক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে ওই স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলের অপহরণের খবর পেয়ে খন্দকার শামীম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বিষয়টি জানান। প্রধানমন্ত্রী ঘটনাটি শুনেই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত উদ্ধারের নির্দেশ দেন।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই অভিযান শুরু হয়। পরে খিলগাঁওয়ের জোড়পুকুর এলাকার ওই নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে শিক্ষার্থীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায়ও প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হয়েছেন। সচিবালয়ের একজন সাধারণ কর্মচারীর সমস্যা সমাধানে তিনি যেভাবে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটি বিরল ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবার ক্ষেত্রে কি এটা ঘটবে বা ঘটে? সব অপহৃতকে উদ্ধারে পুলিশ কি এরকম তৎপরতা ও আন্তরিকতা দেখায়? যাদের পক্ষে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ তো দূরে থাক, একজন পুলিশ কমিশনারের নাগাল পাওয়াও কঠিন, সেসব মানুষের কী হবে? তারা এরকম ঘটনায় শুরুতেই যাবেন সংশ্লিষ্ট থানায়। থানার ওসির সঙ্গেও তাঁর সরাসরি দেখা করা কঠিন। ডিউটি অফিসার তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করেন এবং অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশ কতটা তড়িৎ ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়—সেই অভিজ্ঞতা দেশবাসীর আছে। টাকা ছাড়া পুলিশ কোনো কাজ করে কিনা—সেই প্রশ্ন সবার মনেই আছে। সুতরাং, যে ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হলেন, সেই ঘটনাগুলো যাতে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের বেলাতেই ঘটে; অর্থাৎ কেউ অপহৃত হলে পুলিশ যাতে ডিসি মাসুদের মতো তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেয়, এরকম একটি ব্যবস্থা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। অর্থাৎ দুয়েকটি ঘটনা দিয়ে চমকে দেওয়া নয়, বরং নাগরিকের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি পুলিশ তার দৈনন্দিন কাজের অংশ বানিয়ে ফেলবে এবং কোনো ধরনের ঘুষ বা ক্ষমতাবানের ফোন ছাড়াই পুলিশ আন্তরিকভাবে নাগরিকদের সেবা দেবে—এরকম একটি পুলিশ বাহিনীই মানুষের প্রত্যাশা।
তারেক রহমানের আরেকটি চমক শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিএনপির এমপিদের গাড়ি এবং সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এটিকেও চমক বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা, এমপি হয়ে প্রথমেই অধিকাংশের লক্ষ্য থাকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি। কিন্তু সেই প্রবণতায় রাশ টানলেন তারেক রহমান।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অফিসে আসছেন সকাল ৯টায়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরাও সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, তাও তদারকি করছেন। বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর এত সকালে অফিসে আসার ঘটনা মন্ত্রী, সচিবসহ অন্যদের জন্য কিছুটা বিড়ম্বনারও কারণ হচ্ছে। বিশেষ করে যারা দেরিতে অফিসে এসে অভ্যস্ত। কিন্তু যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই অফিসে ঢুকে যাচ্ছেন সকাল ৯টায় আর সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন, তখন মন্ত্রী ও সচিবদের না এসে উপায় কী!
প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে আসার পর থেকে যে ব্যক্তিগত সাদা গাড়িটি ব্যবহার করছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও সেই গাড়িতেই চড়ছেন। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত এই গাড়ির চালকও তার ব্যক্তিগত এবং গাড়ির জ্বালানি খরচও দিচ্ছেন তিনি নিজেই। ঘোষণা দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সাধারণ চলাচলে গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন না। চলাচলের সময় সড়কের দুপাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান এবং পুরো রাস্তায় নিরাপত্তার যে বাড়াবাড়ি এতদিন ছিল, সেটিও ভেঙে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রীর বহরে থাকা গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে মাত্র চারটিতে নামিয়ে এনেছেন। তার রাস্তায় চলাচলের সময় অন্য যানবাহন চলাচল যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই নির্দেশনাও দিয়েছেন। এমনকি তার গাড়ি মেনে চলবে ট্রাফিক সিগন্যাল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এগুলো বেশ নতুন এবং চমকপ্রদ। কেননা এই ধরনের সংস্কৃতি মানুষ ইউরোপের মতো উন্নত দেশে দেখে অভ্যস্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তো বটেই, মন্ত্রী এমনকি এমপি ও সচিবদের চলাচলেও যে বিলাসিতা আর অতিমাত্রায় নিরাপত্তার ডামাডোল এতদিন ধরে চলে আসছিল, সেই ধারণা ও অভ্যস্ততায় একটা বড় ধরনের ধাক্কা দিলেন তারেক রহমান।
এর পেছনে নিশ্চয়ই ভূমিকা রেখেছে তাঁর দীর্ঘদিনের লন্ডনবাসের অভিজ্ঞতা। তিনি প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবনযাপন করেছেন লন্ডনে। একটি উন্নত সংস্কৃতির দেশে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে তার জীবন-যাপন ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এই যে পরিবর্তন বা একাট উন্নত সংস্কৃতির দিকে যাত্রা, এর পেছনে রয়েছে তাঁর দেড় যুগের জীবনযাপন। যে কারণে তিনি এরকম চমক দেখাচ্ছেন বা দেখাতে পারছেন। বস্তুত এগুলোকে তাঁর চমক না বলে জীবনচর্চা বলাই ভালো। কেননা তিনি এরইমধ্যে এই ধরনের চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। অনভ্যস্ততার কারণে অনেকের কাছে এগুলো চমক বলে বলে মনে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুরোনো ধারার রাজনীতি চলবে না। সরকারি অফিসগুলোয়, বিশেষ করে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নাগরিকদের সেবার বদলে টাকা কামানোর যে ধান্দা ও অভ্যাস, সেখানেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে না পারলে মানুষ দ্রুতই এই সরকারের ওপরেও আস্থা হারাবে—সেই উপলব্ধিও নিশ্চয়ই তারেক রহমানের হয়েছে।
তবে এগুলো যে নিছকই লোকদেখানো ব্যাপার নয়, সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের। প্রধানমন্ত্রীর অনুসরণ করে যদি সকল মন্ত্রী ও সচিবও সকাল সকাল অফিসে যান; যদি রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ভিআইপিগিরি না দেখান; মন্ত্রী সাহেব যাবেন বলে আগে থেকেই রাস্তা ফাঁকা করে দেয়া না হয় ও ভিআইপির গাড়ি বলে যদি তারা সিগন্যাল অমান্য না করে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে না যায়; যদি সাধারণ মানুষের মতোই তারাও রাস্তায় জ্যামে বসে থাকেন—তাহলেই বোঝা যাবে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। কিন্তু এই চর্চা যদি এক দুই মাস পরেই মুখথুবড়ে পড়ে বা কিছুদিন পরে যদি আবারও সবকিছু পুরোনো অবস্থাই চলতে শুরু করে, তখন মানুষ ধরে নেবে যে এগুলো ছিলো লোকদেখানো ব্যাপার। মানুষকে চমকে দেয়ার কারসাজি।
নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষ দেড় বছর যেরকম একটা অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। সেই অনশ্চয়তার এক ধরণের অবসান হয়েছে মূলত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এই সরকার যে পরিবর্তনের ইঙ্গিতগুলো দিচ্ছে, সেগুলো যেন সত্যিই পরিবর্তন আনতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। বিএনপি সরকারের ১০ম দিন। বেলা পৌনে ১১টা। সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবন থেকে ৫ নম্বর ফটক দিয়ে বের হয়ে পরিবহন পুল ভবনের সামনে দিয়ে ওসমানী মিলনায়তনে হেঁটে যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্দেশ্য, একুশে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে যোগদান। অনুষ্ঠান শেষে দুপুর ১২টার দিকে সচিবালয়ের মূল ফটক দিয়ে আবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে ফিরে আসেন তিনি।
সচিবালয় থেকে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন মূলত হাঁটাপথই। বরং এটুকু পথ গাড়িতে গেলে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির বহর ও আনুষঙ্গিক নিরাপত্তা বলয়ের কারণে বেশ কিছু সময়ের জন্য রাস্তা স্থবির হয়ে যায়। একসময় যে দৃশ্য ছিল খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী রাস্তার সেই স্থবিরতা এবং ভিআইপি মানসিকতা পরিবর্তনের জন্য যে সচিবালয়ে নিজের কার্যালয় থেকে হেঁটে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে গেলেন। ঘটনা হিসেবে এটি খুব বড় না। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে চলে আসা ক্ষমতাবানদের আচরণের ধারায় এটি একটি বড় ধরনের ধাক্কা।
কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ঘর পোড়া গরু। তাই আশঙ্কা জাগে, এটা কি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক পদক্ষেপ নাকি আইওয়াশ বা লোকদেখানো ব্যাপার? প্রধানমন্ত্রী কি তাঁর পুরো মেয়াদকালে এই সংস্কৃতি ও অভ্যাসের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন? নাকি প্রথম দিকে মানুষকে চমকে দিয়ে ধীরে ধীরে পুরোনো সিস্টেমেই ফিরে যাবেন?
সরকার গঠনের অষ্টম দিন ২৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। সচিবালয়ের কর্মচারী খন্দকার শামীমের নবম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছেলে অপহরণের ঘটনায় তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর নির্দেশনার এক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর খিলগাঁও এলাকা থেকে ওই স্কুলছাত্রকে উদ্ধার করে পুলিশ। ছেলের অপহরণের খবর পেয়ে খন্দকার শামীম প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে বিষয়টি জানান। প্রধানমন্ত্রী ঘটনাটি শুনেই সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত উদ্ধারের নির্দেশ দেন।
পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পাওয়ার পরপরই অভিযান শুরু হয়। পরে খিলগাঁওয়ের জোড়পুকুর এলাকার ওই নির্মাণাধীন ভবনে অভিযান চালিয়ে শিক্ষার্থীকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
এই ঘটনায়ও প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হয়েছেন। সচিবালয়ের একজন সাধারণ কর্মচারীর সমস্যা সমাধানে তিনি যেভাবে তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়েছেন, সেটি বিরল ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবার ক্ষেত্রে কি এটা ঘটবে বা ঘটে? সব অপহৃতকে উদ্ধারে পুলিশ কি এরকম তৎপরতা ও আন্তরিকতা দেখায়? যাদের পক্ষে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ তো দূরে থাক, একজন পুলিশ কমিশনারের নাগাল পাওয়াও কঠিন, সেসব মানুষের কী হবে? তারা এরকম ঘটনায় শুরুতেই যাবেন সংশ্লিষ্ট থানায়। থানার ওসির সঙ্গেও তাঁর সরাসরি দেখা করা কঠিন। ডিউটি অফিসার তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করেন এবং অপহৃতদের উদ্ধারে পুলিশ কতটা তড়িৎ ও আন্তরিক পদক্ষেপ নেয়—সেই অভিজ্ঞতা দেশবাসীর আছে। টাকা ছাড়া পুলিশ কোনো কাজ করে কিনা—সেই প্রশ্ন সবার মনেই আছে। সুতরাং, যে ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী প্রশংসিত হলেন, সেই ঘটনাগুলো যাতে রাষ্ট্রের সব নাগরিকের বেলাতেই ঘটে; অর্থাৎ কেউ অপহৃত হলে পুলিশ যাতে ডিসি মাসুদের মতো তাৎক্ষণিক অ্যাকশন নেয়, এরকম একটি ব্যবস্থা চালু করাই সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত। অর্থাৎ দুয়েকটি ঘটনা দিয়ে চমকে দেওয়া নয়, বরং নাগরিকের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি পুলিশ তার দৈনন্দিন কাজের অংশ বানিয়ে ফেলবে এবং কোনো ধরনের ঘুষ বা ক্ষমতাবানের ফোন ছাড়াই পুলিশ আন্তরিকভাবে নাগরিকদের সেবা দেবে—এরকম একটি পুলিশ বাহিনীই মানুষের প্রত্যাশা।
তারেক রহমানের আরেকটি চমক শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিএনপির এমপিদের গাড়ি এবং সরকারি প্লট না নেওয়ার সিদ্ধান্ত। এটিকেও চমক বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা, এমপি হয়ে প্রথমেই অধিকাংশের লক্ষ্য থাকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি। কিন্তু সেই প্রবণতায় রাশ টানলেন তারেক রহমান।
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অফিসে আসছেন সকাল ৯টায়। মন্ত্রিসভার সদস্য ও সচিবরাও সময়মতো অফিসে আসছেন কি না, তাও তদারকি করছেন। বস্তুত প্রধানমন্ত্রীর এত সকালে অফিসে আসার ঘটনা মন্ত্রী, সচিবসহ অন্যদের জন্য কিছুটা বিড়ম্বনারও কারণ হচ্ছে। বিশেষ করে যারা দেরিতে অফিসে এসে অভ্যস্ত। কিন্তু যখন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীই অফিসে ঢুকে যাচ্ছেন সকাল ৯টায় আর সরকারি ছুটির দিনেও অফিস করছেন, তখন মন্ত্রী ও সচিবদের না এসে উপায় কী!
প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত সরকারি গাড়ি ব্যবহার করছেন না তারেক রহমান। নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে আসার পর থেকে যে ব্যক্তিগত সাদা গাড়িটি ব্যবহার করছেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও সেই গাড়িতেই চড়ছেন। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত এই গাড়ির চালকও তার ব্যক্তিগত এবং গাড়ির জ্বালানি খরচও দিচ্ছেন তিনি নিজেই। ঘোষণা দিয়েছেন, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ছাড়া সাধারণ চলাচলে গাড়িতে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করবেন না। চলাচলের সময় সড়কের দুপাশে পুলিশের সারিবদ্ধ অবস্থান এবং পুরো রাস্তায় নিরাপত্তার যে বাড়াবাড়ি এতদিন ছিল, সেটিও ভেঙে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উপরন্তু প্রধানমন্ত্রীর বহরে থাকা গাড়ির সংখ্যা কমিয়ে মাত্র চারটিতে নামিয়ে এনেছেন। তার রাস্তায় চলাচলের সময় অন্য যানবাহন চলাচল যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেই নির্দেশনাও দিয়েছেন। এমনকি তার গাড়ি মেনে চলবে ট্রাফিক সিগন্যাল। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এগুলো বেশ নতুন এবং চমকপ্রদ। কেননা এই ধরনের সংস্কৃতি মানুষ ইউরোপের মতো উন্নত দেশে দেখে অভ্যস্ত। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তো বটেই, মন্ত্রী এমনকি এমপি ও সচিবদের চলাচলেও যে বিলাসিতা আর অতিমাত্রায় নিরাপত্তার ডামাডোল এতদিন ধরে চলে আসছিল, সেই ধারণা ও অভ্যস্ততায় একটা বড় ধরনের ধাক্কা দিলেন তারেক রহমান।
এর পেছনে নিশ্চয়ই ভূমিকা রেখেছে তাঁর দীর্ঘদিনের লন্ডনবাসের অভিজ্ঞতা। তিনি প্রায় দেড় যুগ নির্বাসিত জীবনযাপন করেছেন লন্ডনে। একটি উন্নত সংস্কৃতির দেশে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে তার জীবন-যাপন ও আচরণে পরিবর্তন এসেছে। এই যে পরিবর্তন বা একাট উন্নত সংস্কৃতির দিকে যাত্রা, এর পেছনে রয়েছে তাঁর দেড় যুগের জীবনযাপন। যে কারণে তিনি এরকম চমক দেখাচ্ছেন বা দেখাতে পারছেন। বস্তুত এগুলোকে তাঁর চমক না বলে জীবনচর্চা বলাই ভালো। কেননা তিনি এরইমধ্যে এই ধরনের চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। অনভ্যস্ততার কারণে অনেকের কাছে এগুলো চমক বলে বলে মনে হচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে পুরোনো ধারার রাজনীতি চলবে না। সরকারি অফিসগুলোয়, বিশেষ করে সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নাগরিকদের সেবার বদলে টাকা কামানোর যে ধান্দা ও অভ্যাস, সেখানেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে না পারলে মানুষ দ্রুতই এই সরকারের ওপরেও আস্থা হারাবে—সেই উপলব্ধিও নিশ্চয়ই তারেক রহমানের হয়েছে।
তবে এগুলো যে নিছকই লোকদেখানো ব্যাপার নয়, সেটি প্রমাণ করার দায়িত্ব তাঁর এবং তাঁর মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের। প্রধানমন্ত্রীর অনুসরণ করে যদি সকল মন্ত্রী ও সচিবও সকাল সকাল অফিসে যান; যদি রাস্তায় চলাচলের ক্ষেত্রে ভিআইপিগিরি না দেখান; মন্ত্রী সাহেব যাবেন বলে আগে থেকেই রাস্তা ফাঁকা করে দেয়া না হয় ও ভিআইপির গাড়ি বলে যদি তারা সিগন্যাল অমান্য না করে রাস্তার উল্টো দিক দিয়ে না যায়; যদি সাধারণ মানুষের মতোই তারাও রাস্তায় জ্যামে বসে থাকেন—তাহলেই বোঝা যাবে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। কিন্তু এই চর্চা যদি এক দুই মাস পরেই মুখথুবড়ে পড়ে বা কিছুদিন পরে যদি আবারও সবকিছু পুরোনো অবস্থাই চলতে শুরু করে, তখন মানুষ ধরে নেবে যে এগুলো ছিলো লোকদেখানো ব্যাপার। মানুষকে চমকে দেয়ার কারসাজি।
নতুন সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। বিশেষ করে অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের মানুষ দেড় বছর যেরকম একটা অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতার ভেতর দিয়ে গেছে। সেই অনশ্চয়তার এক ধরণের অবসান হয়েছে মূলত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে। এই সরকার যে পরিবর্তনের ইঙ্গিতগুলো দিচ্ছে, সেগুলো যেন সত্যিই পরিবর্তন আনতে পারে, সেটি নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

দীর্ঘদিনের বৈরিতা এবং পারস্পরিক অভিযোগের পর পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত সংঘাত এখন সরাসরি সামরিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের ‘অপারেশন গজব লিল হক’ বা ‘ন্যায়ের হামলা’ ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে যে ভাঙন ধরেছে, তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকিস্বরূপ।
১ ঘণ্টা আগে
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ঘড়িতে যখন তেহরান সময় রাত ৩টা ১৫ মিনিট, ঠিক তখনই পারস্য উপসাগরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গর্জে ওঠে ইসরায়েলি স্টিলথ ফাইটার জেটের ইঞ্জিন।
৬ ঘণ্টা আগে
সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফাঁদে পড়বে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে এবং তেলের দাম বেড়ে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অর্থনীতি যে বড় ধরনের সংকটে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
১৬ ঘণ্টা আগে
গত সপ্তাহে জেনেভায় মার্কিন ও ইরানি কূটনীতিকরা ওমানের মধ্যস্থতায় আরও এক দফা আলোচনায় বসেছিলেন। কিন্তু এর ফলাফল ঠিক পরিষ্কার ছিল না। ইরান যখন আলোচনায় ‘ভালো অগ্রগতি’র দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র তখন বলছে অগ্রগতি হয়েছে ‘সামান্যই’।
১ দিন আগে