লেখা:

ইতিহাসবিদদের একধরনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা থাকে। তাই তারা জানেন, প্রতিটি ইতিহাসেরই আবার নিজস্ব ইতিহাস আছে। ফলে তারা সহজে বিস্মিত হন না। এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল ব্যাপকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে গেছে। এই ফলাফল হয়তো অনেক ইতিহাসবিদদের সাময়িকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু দ্রুতই তারা আবার নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় হয়েছেন। আবারও নতুন করে প্রমাণিত হলো তাদের কাছে পশ্চিবঙ্গ সবসময়ই এক রহস্য।
ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়েছিল পশ্চিবঙ্গকে কেন্দ্র করেই। এর আগে মোগলরাও এই প্রদেশটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। শুরুতে এখানকার জলাভূমিনির্ভর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা শাসন প্রতিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে বৃষ্টিনির্ভর এক সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে তারা বিশাল এক স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়; আর এই বাহিনী দ্বারাই তারা সমসাময়িক অন্যান্য ভারতীয় শাসকদের চাপে রাখত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শতবর্ষব্যাপী শাসনামলে (১৭৫৭-১৮৫৭) দুটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু সামাজিক সংস্কারের জন্যও এই প্রদেশকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল—প্রথমত সতীদাহ প্রথা বিলোপ, দ্বিতীয়ত বিধবা বিবাহের বৈধতা প্রদান। এই সংস্কারগুলো যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, তা হিন্দু রক্ষণশীলদের ক্ষুব্ধ করেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমাজব্যবস্থায় তারা প্রভাবশালী ছিল। এই বিষয়টি ব্রিটিশদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। তারা বুঝেছিল, তাদের প্রধান কাজ যেহেতু বাণিজ্য, তাই হিন্দু সামাজিক প্রথায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর যখন ব্রিটিশ ক্রাউন কোম্পানির শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের শাসননীতির মূল কথা হয়ে দাঁড়ায়—হিন্দু সামাজিক রীতিনীতি যতই পশ্চাৎপদ হোক, তাতে হাত না দেওয়া। তারা এই নীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তারা হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বীজ বপন করে; কয়েক দশকের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ফলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না যে, বিশ শতকের গোড়ায় স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন মুসলিম সমাজ ও রাজনীতির পুনর্জাগরণে উদ্যোগী হন, তখন তিনি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পশ্চিমবঙ্গ ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম ক্ষেত্র। এমনকি হিন্দুত্বের ধারণাটিরও উৎপত্তি এখানে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ১৯৪৯ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর ‘হিন্দুত্ববাদ: হু ইজ এ হিন্দু’ বইয়ে এই ধারণাটি প্রবর্তন করেন। কিন্তু বাস্তবে এর ধারণাগত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন এক বাঙালি—চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১৯)। তিনি ১৮৯২ সালে বাংলা ভাষায় ‘হিন্দুত্ব: হিন্দুর প্রকৃত ইতিহাস’ নামে একটি বই লেখেন। তারও আগে, ১৮৫৮ সালে আরেক বাঙালি তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায় ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নামে একটি বই রচনা করেন, যা ছিল স্পষ্টতই উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ।
১৮৬৭ সাল থেকে ‘হিন্দু মেলা’ নামে একটি বার্ষিক আয়োজন বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যেখানে বিপুলসংখ্যক বাঙালি ভদ্রলোক অংশগ্রহণ করতেন। ‘ভদ্রলোক’ ধারণাটি জটিল হলেও সংক্ষেপে বলা যায়—এটি উচ্চবর্ণের বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব করে; বিশেষ করে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ সম্প্রদায়কে, যারা মূলত বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি। (মজার ছলে একে ‘কাবাব’ হিসেবেও মনে রাখা যায়—কা = কায়স্থ, বা = বামুন/ব্রাহ্মণ, ব = বৈদ্য)। নবগোপাল মিত্র এই আয়োজনের সূচনা করেন এবং এর প্রাথমিক অর্থায়ন করেছিল ঠাকুর পরিবার।
এবার আসা যাক বাঙালি বাম রাজনীতিতে। বিদ্রূপাত্মকভাবে, যে বাংলা হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্মভূমি, সেই বাংলাই আবার ভারতের বাম রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রশক্তির পক্ষে যোগ দেওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এখানে বামপন্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এই আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করে। একই বছরে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ) তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই বামপন্থী বার্তা মধ্যবিত্ত বাঙালিদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এছাড়াও, দেশভাগের পর শরণার্থীদের ব্যাপক আগমন, বিশেষ করে কলকাতায়, বাম রাজনীতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কংগ্রেস ও বামপন্থীরা উভয়েই বাংলায় একই রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল। এর অন্তত একটি ইতিবাচক ফল ছিল—দেশভাগের ভয়াবহতা সত্ত্বেও বাংলায় বড় ধরনের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি, যদিও ১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ ঘটেছিল, যা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর প্রত্যক্ষ ফল। দেশভাগের আগের অর্ধশতাব্দীজুড়ে বাংলায় নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ষাটের শেষ এবং সত্তরের শুরুর দশকে নকশালবাদের উত্থান, যা তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের (১৯৭২-৭৭) আমলে কঠোরভাবে দমন করা হয়। তিনিই ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। এরপর বামফ্রন্ট সরকার সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকে। পরে তাদের স্থান নেয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এখন প্রশ্ন আসে। তা হলো—বাংলায় যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়েছিল উনিশ শতকে, তা কি আবার ফিরে আসছে? বাঙালি ভদ্রলোক কি আবার সেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা প্রদর্শন করছে? যদি তা-ই হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন অনিবার্য—তারা কি সর্বভারতীয় হিন্দুত্ব রাজনীতির নেতৃত্ব দেবে, নাকি গুজরাটি, মারাঠি বা হিন্দিভাষী উত্তর ভারতের নেতৃত্ব মেনে নেবে? ভারতীয় রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং আগামী দশ বছর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নব্বইয়ের দশকের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের ধাঁচে বিজেপি যদি বাংলায় উত্তর ভারতের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি অনুসরণ করে, তবে এর পরিণতি কী হবে? কেননা পশ্চিমবঙ্গ—যেখানে প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলার বিজেপি সতর্কভাবেই এগোবে; কারণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিক থেকে স্বস্তির বিষয় যে, অতীতের মতো এবার ভারত বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে কোনো কূটনীতিক নয়, বরং একজন রাজনীতিবিদ—দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা ভালোভাবে বোঝেন। তিনি গুজরাটি হলেও বাংলার মানুষ এবং বাংলা ভাষায় সাবলীল—যা তাঁকে একটি বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা দেবে।
(দ্য ওয়ার-এ প্রকাশিত নিবন্ধ, অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

ইতিহাসবিদদের একধরনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা থাকে। তাই তারা জানেন, প্রতিটি ইতিহাসেরই আবার নিজস্ব ইতিহাস আছে। ফলে তারা সহজে বিস্মিত হন না। এবারের পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল ব্যাপকভাবে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষে গেছে। এই ফলাফল হয়তো অনেক ইতিহাসবিদদের সাময়িকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, কিন্তু দ্রুতই তারা আবার নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় হয়েছেন। আবারও নতুন করে প্রমাণিত হলো তাদের কাছে পশ্চিবঙ্গ সবসময়ই এক রহস্য।
ভারতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়েছিল পশ্চিবঙ্গকে কেন্দ্র করেই। এর আগে মোগলরাও এই প্রদেশটিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছে। শুরুতে এখানকার জলাভূমিনির্ভর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তারা শাসন প্রতিষ্ঠায় কিছুটা অসুবিধার সম্মুখীন হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা এই পরিস্থিতিকেই কাজে লাগিয়ে বৃষ্টিনির্ভর এক সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতি গড়ে তোলে, যার মাধ্যমে তারা বিশাল এক স্থায়ী সেনাবাহিনী গঠন করতে সক্ষম হয়; আর এই বাহিনী দ্বারাই তারা সমসাময়িক অন্যান্য ভারতীয় শাসকদের চাপে রাখত।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শতবর্ষব্যাপী শাসনামলে (১৭৫৭-১৮৫৭) দুটি গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু সামাজিক সংস্কারের জন্যও এই প্রদেশকেই বেছে নেওয়া হয়েছিল—প্রথমত সতীদাহ প্রথা বিলোপ, দ্বিতীয়ত বিধবা বিবাহের বৈধতা প্রদান। এই সংস্কারগুলো যতই প্রগতিশীল হোক না কেন, তা হিন্দু রক্ষণশীলদের ক্ষুব্ধ করেছিল। ঐতিহ্যগতভাবে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু সমাজব্যবস্থায় তারা প্রভাবশালী ছিল। এই বিষয়টি ব্রিটিশদের চোখ এড়িয়ে যায়নি। তারা বুঝেছিল, তাদের প্রধান কাজ যেহেতু বাণিজ্য, তাই হিন্দু সামাজিক প্রথায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর যখন ব্রিটিশ ক্রাউন কোম্পানির শাসনভার গ্রহণ করে, তখন তাদের শাসননীতির মূল কথা হয়ে দাঁড়ায়—হিন্দু সামাজিক রীতিনীতি যতই পশ্চাৎপদ হোক, তাতে হাত না দেওয়া। তারা এই নীতিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে তারা হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বীজ বপন করে; কয়েক দশকের মধ্যেই তা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। ফলে অবাক হওয়ার কিছু ছিল না যে, বিশ শতকের গোড়ায় স্যার সৈয়দ আহমদ খান যখন মুসলিম সমাজ ও রাজনীতির পুনর্জাগরণে উদ্যোগী হন, তখন তিনি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
এটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, পশ্চিমবঙ্গ ছিল হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রথম ক্ষেত্র। এমনকি হিন্দুত্বের ধারণাটিরও উৎপত্তি এখানে। সাধারণভাবে মনে করা হয়, ১৯৪৯ সালে বিনায়ক দামোদর সাভারকর তাঁর ‘হিন্দুত্ববাদ: হু ইজ এ হিন্দু’ বইয়ে এই ধারণাটি প্রবর্তন করেন। কিন্তু বাস্তবে এর ধারণাগত ভিত্তি তৈরি করেছিলেন এক বাঙালি—চন্দ্রনাথ বসু (১৮৪৪-১৯১৯)। তিনি ১৮৯২ সালে বাংলা ভাষায় ‘হিন্দুত্ব: হিন্দুর প্রকৃত ইতিহাস’ নামে একটি বই লেখেন। তারও আগে, ১৮৫৮ সালে আরেক বাঙালি তারিণীচরণ চট্টোপাধ্যায় ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ নামে একটি বই রচনা করেন, যা ছিল স্পষ্টতই উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে তীব্র বিদ্বেষপূর্ণ।
১৮৬৭ সাল থেকে ‘হিন্দু মেলা’ নামে একটি বার্ষিক আয়োজন বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, যেখানে বিপুলসংখ্যক বাঙালি ভদ্রলোক অংশগ্রহণ করতেন। ‘ভদ্রলোক’ ধারণাটি জটিল হলেও সংক্ষেপে বলা যায়—এটি উচ্চবর্ণের বাঙালিদের প্রতিনিধিত্ব করে; বিশেষ করে ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থ সম্প্রদায়কে, যারা মূলত বাংলার শিক্ষিত শ্রেণি। (মজার ছলে একে ‘কাবাব’ হিসেবেও মনে রাখা যায়—কা = কায়স্থ, বা = বামুন/ব্রাহ্মণ, ব = বৈদ্য)। নবগোপাল মিত্র এই আয়োজনের সূচনা করেন এবং এর প্রাথমিক অর্থায়ন করেছিল ঠাকুর পরিবার।
এবার আসা যাক বাঙালি বাম রাজনীতিতে। বিদ্রূপাত্মকভাবে, যে বাংলা হিন্দু জাতীয়তাবাদের জন্মভূমি, সেই বাংলাই আবার ভারতের বাম রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে। বিশ্বযুদ্ধের সময়, বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রশক্তির পক্ষে যোগ দেওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এখানে বামপন্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ এই আন্দোলনকে আরও ত্বরান্বিত করে। একই বছরে প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েশন (আইপিটিএ) তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এই বামপন্থী বার্তা মধ্যবিত্ত বাঙালিদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। এছাড়াও, দেশভাগের পর শরণার্থীদের ব্যাপক আগমন, বিশেষ করে কলকাতায়, বাম রাজনীতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কংগ্রেস ও বামপন্থীরা উভয়েই বাংলায় একই রাজনৈতিক পরিসরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল। এর অন্তত একটি ইতিবাচক ফল ছিল—দেশভাগের ভয়াবহতা সত্ত্বেও বাংলায় বড় ধরনের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি, যদিও ১৯৪৬ সালে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’ ঘটেছিল, যা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-এর প্রত্যক্ষ ফল। দেশভাগের আগের অর্ধশতাব্দীজুড়ে বাংলায় নিয়মিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ঘটনা।
পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ষাটের শেষ এবং সত্তরের শুরুর দশকে নকশালবাদের উত্থান, যা তৎকালীন কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের (১৯৭২-৭৭) আমলে কঠোরভাবে দমন করা হয়। তিনিই ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীকে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। এরপর বামফ্রন্ট সরকার সিপিআই (এম)-এর নেতৃত্বে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকে। পরে তাদের স্থান নেয় তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এখন প্রশ্ন আসে। তা হলো—বাংলায় যে হিন্দু জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়েছিল উনিশ শতকে, তা কি আবার ফিরে আসছে? বাঙালি ভদ্রলোক কি আবার সেই হিন্দু জাতীয়তাবাদী উদ্দীপনা প্রদর্শন করছে? যদি তা-ই হয়, তবে আরেকটি প্রশ্ন অনিবার্য—তারা কি সর্বভারতীয় হিন্দুত্ব রাজনীতির নেতৃত্ব দেবে, নাকি গুজরাটি, মারাঠি বা হিন্দিভাষী উত্তর ভারতের নেতৃত্ব মেনে নেবে? ভারতীয় রাজনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে এবং আগামী দশ বছর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—নব্বইয়ের দশকের রাম জন্মভূমি আন্দোলনের ধাঁচে বিজেপি যদি বাংলায় উত্তর ভারতের মতো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি অনুসরণ করে, তবে এর পরিণতি কী হবে? কেননা পশ্চিমবঙ্গ—যেখানে প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠী রয়েছে, অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ৮ শতাংশ হিন্দু।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলার বিজেপি সতর্কভাবেই এগোবে; কারণ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিক থেকে স্বস্তির বিষয় যে, অতীতের মতো এবার ভারত বাংলাদেশে হাইকমিশনার হিসেবে কোনো কূটনীতিক নয়, বরং একজন রাজনীতিবিদ—দীনেশ ত্রিবেদীকে নিয়োগ দিয়েছে, যিনি সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতা ভালোভাবে বোঝেন। তিনি গুজরাটি হলেও বাংলার মানুষ এবং বাংলা ভাষায় সাবলীল—যা তাঁকে একটি বাড়তি রাজনৈতিক সুবিধা দেবে।
(দ্য ওয়ার-এ প্রকাশিত নিবন্ধ, অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ হলো তার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আর এই বাহিনীর মধ্যে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে পুলিশ। সমকালীন বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে নানামুখী সংস্কার, আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে পুলিশ বাহিনীতে। সময়ের প্রয়োজনে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব
৭ ঘণ্টা আগে
একজন নারী কখন সবচেয়ে নিঃশব্দে কাঁদেন? যখন প্রতারণাটা বোঝার ভাষা থাকে না, অভিযোগ করার জায়গা থাকে না, আর সংসারটা টিকিয়ে রাখার দায় থেকেও মুক্তি নেই। যখন তিনি জানতে পারেন যাঁকে একমাত্র ভেবে এসেছেন এত বছর, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো উৎসর্গ করেছেন, তিনি আসলে গোপনে আরেকটি সংসার পেতে রেখেছেন।
৮ ঘণ্টা আগে
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপের চলমান আর্থিক সংকট ও সাড়ে ২৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের উদ্যোগ দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান দশা কেবল তাদের নিজস্ব সংকট নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অর্থনীতির একটি ‘টেস্ট কেস’।
৯ ঘণ্টা আগে
গত ১৩ জুন দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও এবং কয়েকটি ছবি অনেকেই শেয়ার করেন। সেখানে দেখা যাচ্ছে, নদী খননের মাটিতে ঢাকা পড়েছে একটি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেশ কিছু ঘর। ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু কাদামাটির স্তূপ তৈরি হয়েছে।
১২ ঘণ্টা আগে