একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে নিঃশব্দে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, কোটি ডলারের ট্যাংক বা অত্যাধুনিক ফাইটার প্লেন এখন কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনের কাছে অসহায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ড্রোন সোয়ার্ম বা একঝাঁক ড্রোনের সমন্বিত আক্রমণ প্রযুক্তির আবির্ভাব যুদ্ধের প্রথাগত ব্যাকরণকে নতুন করে লিখতে বাধ্য করছে। গতানুগতিক সম্মুখ সমরের ধারণা পাল্টে দিয়ে ড্রোন এখন হয়ে উঠেছে যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণকারী প্রধান হাতিয়ার। বিশেষ করে অসম যুদ্ধে অল্প খরচে বড় জয়ের কৌশল সামরিক শক্তিধর দেশগুলোকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। আধুনিক সমরবিদদের মতে, এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব ট্যাংক ও ফাইটার প্লেনের একক আধিপত্যের অবসান ঘটাচ্ছে। আগামীর আকাশ প্রতিরক্ষায় ড্রোন এবং এআইয়ের সমন্বয়ই হবে টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি।
ড্রোন সোয়ার্ম: একক আক্রমণের দিন শেষ
ড্রোন সোয়ার্ম হলো এআই-চালিত এমন এক সমন্বিত নেটওয়ার্ক, যা শত শত ড্রোনের মাধ্যমে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’-এর চাপে ফেলে মুহূর্তেই অকেজো করে দেয়। এই প্রযুক্তিতে ড্রোনগুলো নিজেদের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—কে রাডারকে বিভ্রান্ত করবে আর কে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানবে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলো প্রমাণ করেছে যে, একক আক্রমণের চেয়ে যৌথ ড্রোন আক্রমণই সমর কৌশলের ভবিষ্যৎ।
গণ-আক্রমণ
আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অকেজো করতে বর্তমানে ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’ একটি অমোঘ কৌশল হিসেবে স্বীকৃত। একটি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এক সঙ্গে ৫টি বা ১০টি মিসাইল রুখতে পারে, কিন্তু যখন এক সঙ্গে ৫০০টি ড্রোন ধেয়ে আসে, তখন সিস্টেমটি ‘ওভারলোড’ হয়ে নতুন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ইরান বনাম ইসরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধে দেখা গেছে বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও মিসাইল ব্যবহার করে প্রতিরক্ষা ব্যূহকে ব্যস্ত রাখা হয়েছিল যাতে মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সহজ হয়। এই কৌশলে দামী ইন্টারসেপ্টর মিসাইলগুলো সস্তা ড্রোনের পেছনে খরচ হয়ে যাওয়ায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত অরক্ষিত হয়ে পড়ে। এভাবে সংখ্যার আধিক্য দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বকে রুখে দেওয়াই এই কৌশলের মূল উদ্দেশ্য।
স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়
এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ফলে ড্রোন সোয়ার্ম এখন মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। এই প্রযুক্তিতে ড্রোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাগ হয়ে যায়—কেউ শত্রুর রাডারকে বিভ্রান্ত করতে ‘ডিকয়’ হিসেবে কাজ করে, আবার কেউ মূল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। ইরান বনাম ইসরায়েল-আমেরিকা উত্তেজনায় আমরা এর প্রাথমিক মহড়া দেখেছি। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে দেখা গেছে যে ড্রোনগুলো বিভিন্ন দিক ও উচ্চতা থেকে সমন্বিতভাবে আক্রমণ চালিয়ে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নিখুঁত নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে। এই স্বয়ংক্রিয় সক্ষমতা যুদ্ধের ময়দানে প্রতিক্রিয়ার সময়কে অনেক কমিয়ে দেয় এবং শত্রুকে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে দেয়। অ্যালগরিদমের মাধ্যমে পরিচালিত এই যৌথ বুদ্ধিমত্তাই ড্রোনকে একক সমরাস্ত্র থেকে একটি কৌশলী বাহিনীতে পরিণত করেছে।
ট্যাংকের ভবিষ্যৎ: সাঁজোয়া যান কি তবে বোঝা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে স্থলযুদ্ধের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ট্যাংক এখন সস্তা ড্রোনের ‘টপ-অ্যাটাক’ ও চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের মুখে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। মাত্র কয়েকশ ডলারের ড্রোন দিয়ে মিলিয়ন ডলারের ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার বাস্তবতা সমরবিদদের রণকৌশল নতুন করে ভাবাচ্ছে। ভবিষ্যতে ট্যাংকগুলো পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও অস্তিত্ব রক্ষার্থে এগুলোতে অ্যান্টি-ড্রোন জ্যামার ও লেজার ডিফেন্স সিস্টেমের মতো আমূল বিবর্তন আসা এখন সময়ের দাবি।
টপ-অ্যাটাক ভীতি
রণক্ষেত্রে ট্যাংকের সম্মুখভাগ অত্যন্ত শক্তিশালী বর্মে আবৃত থাকলেও এর ওপরের অংশ বা ছাদ তুলনামূলকভাবে বেশ পাতলা ও অরক্ষিত। আধুনিক যুদ্ধে সস্তা এফপিভি ড্রোন বা আত্মঘাতী ড্রোনগুলো এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সরাসরি ট্যাংকের ওপর আছড়ে পড়ে মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের অত্যাধুনিক টি-৯০ ট্যাংকগুলো সামান্য কয়েকশ ডলারের ড্রোনের নিখুঁত ‘টপ-অ্যাটাক’ হামলায় মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই নতুন ভীতি দূর করতে অনেক দেশ এখন ট্যাংকের ওপর লোহার খাঁচা বা ‘কোপ কেজ’ ব্যবহার করছে, যা ড্রোনের অগ্রযাত্রা রুখতে খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না। ফলে প্রথাগত সাঁজোয়া শক্তির দাপট এখন ড্রোনের কামিকাজে কৌশলের কাছে চরম হুমকির মুখে।
খরচের বৈষম্য
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ট্যাংক ও ড্রোনের মূল্যের আকাশচুম্বী ব্যবধান সামরিক অর্থনীতির সমীকরণকে আমূল বদলে দিচ্ছে। একটি উন্নত প্রযুক্তির ট্যাংকের উৎপাদন খরচ প্রায় ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ডলার হলেও এটি ধ্বংস করতে ব্যবহৃত একটি ড্রোনের দাম মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ ডলার। ইউক্রেনীয় বাহিনী কয়েক হাজার ডলারের সস্তা কামিকাজে ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার বিশালাকার ও দামী সাঁজোয়া বহরকে অচল করে দিচ্ছে। এই চরম বৈষম্য প্রমাণ করে যে, দামী অস্ত্র মোতায়েন করাই এখন আর জয়ের নিশ্চয়তা নয়। ফলে সামরিক কমান্ডাররা এখন বিপুল অর্থের ট্যাংক কেনার চেয়ে ক্ষুদ্র ও সুলভ ড্রোনের পেছনে বিনিয়োগ করাকে বেশি লাভজনক ও কৌশলী মনে করছেন।
বিবর্তন
অস্তিত্ব রক্ষার্থে প্রথাগত ট্যাংকের নকশা ও সুরক্ষায় এখন আমূল পরিবর্তন আনা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। ভবিষ্যৎ ট্যাংকগুলো কেবল ভারী বর্মের ওপর নির্ভর না করে নিজস্ব ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম, অ্যান্টি-ড্রোন জ্যামার এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার ডিফেন্স সিস্টেম দ্বারা সজ্জিত হবে। ইসরায়েলের ‘ট্রফি’ অ্যাক্টিভ প্রোটেকশন সিস্টেমের আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি হচ্ছে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধেয়ে আসা ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করতে সক্ষম। আসলে ট্যাংক পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে না, বরং এটি একটি ভ্রাম্যমাণ কমান্ড সেন্টারে পরিণত হবে যা ড্রোন প্রতিরক্ষায় হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই প্রযুক্তিগত বিবর্তনই আধুনিক রণক্ষেত্রে ট্যাংকের টিকে থাকার একমাত্র উপায়।
যুদ্ধবিমানের ভবিষ্যৎ: পাইলটবিহীন আকাশের দিকে
পঞ্চম ও ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান (যেমন এফ-৩৫ বা সু-৫৭) অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং এসব বিমানের জন্য একজন দক্ষ পাইলট তৈরি করতে বছরের পর বছর সময় লাগে। অত্যধিক নির্মাণ ব্যয় এবং দক্ষ পাইলট তৈরির দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রথাগত যুদ্ধবিমানের একক আধিপত্য এখন হুমকির মুখে, যার বিকল্প হিসেবে উদয় হচ্ছে এআই-চালিত পাইলটবিহীন আকাশযান। ‘আনম্যানড উইংম্যান’ ধারণার মাধ্যমে এখন মানববাহী বিমানের সুরক্ষায় একঝাঁক ড্রোন বিপজ্জনক মিশনে অংশ নিচ্ছে, যা মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমিয়ে যুদ্ধের কার্যকারিতা বাড়ায়। মানুষের শারীরিক সীমাবদ্ধতা বা ‘জি-ফোর্স’ সহ্য করার ক্ষমতার চেয়ে এআই ড্রোনের ক্ষিপ্রতা ও নির্ভুলতা অনেক বেশি হওয়ায় আকাশ যুদ্ধের ভবিষ্যৎ এখন অবধারিতভাবেই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের দখলে চলে যাচ্ছে।
আনম্যানড উইংম্যান
ভবিষ্যতের আকাশ যুদ্ধে মানববাহী যুদ্ধবিমানের সুরক্ষায় এবং আক্রমণের ধার বাড়াতে ‘আনম্যানড উইংম্যান’ বা সহায়ক ড্রোন প্রযুক্তি এক বৈপ্লবিক সংযোজন। এই ব্যবস্থায় একজন পাইলট মূল বিমান থেকে নির্দেশ দেবেন এবং তার সঙ্গে থাকা চার-পাঁচটি ড্রোন শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক এলাকায় ঢুকে সরাসরি হামলা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘বোয়িং এমকিউ-২৮ ঘোস্ট ব্যাট’ এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি উড়ে তথ্য সংগ্রহ ও আত্মঘাতী হামলা চালাতে সক্ষম। এটি পাইলটের জীবনের ঝুঁকি কমায় এবং একই সাথে আকাশ যুদ্ধের সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। মানুষের মেধা ও ড্রোনের নির্ভুল সমন্বয়ই হবে আগামীর আকাশ যুদ্ধের প্রধান কৌশল।
ডগফাইট
আকাশ যুদ্ধে চালকের শারীরিক সীমাবদ্ধতা দূর করে এআই-চালিত ড্রোন এখন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। একজন মানুষ পাইলটের পক্ষে ৯ বা ১০-এর বেশি ‘জি-ফোর্স’ সহ্য করা অসম্ভব হলেও ড্রোনগুলো এর চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী মাধ্যাকর্ষণ চাপ সহ্য করে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় বাঁক নিতে পারে। আমেরিকার ‘এক্সকিউ-৫৮এ ভালকিরি’র মতো এআই ড্রোনগুলো সিমুলেশনে দক্ষ পাইলটদের হারিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে। মানুষের ক্লান্তি বা মানসিক চাপের ভয় না থাকায় এই ড্রোনগুলো যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিখুঁত আক্রমণ চালাতে পারে। ফলে আকাশ যুদ্ধের শ্রেষ্ঠত্ব যে অদূর ভবিষ্যতে রক্ত-মাংসের মানুষের হাত থেকে অ্যালগরিদমের হাতে চলে যাবে, তা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
আকাশ প্রতিরক্ষায় এআই ও ড্রোন
আগামীর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেবল গতানুগতিক মিসাইলের ওপর নির্ভর না করে এআই এবং ইন্টারসেপ্টর ড্রোনের এক সমন্বিত ব্যূহতে পরিণত হবে। এআই সেন্সরগুলো চোখের পলকে শত্রুর ড্রোনের ঝাঁক শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজার বা মাইক্রোওয়েভ গান ফায়ারের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে সক্ষম হবে। ড্রোনের বিরুদ্ধে ড্রোনের লড়াই এবং স্বল্প খরচের লেজার প্রযুক্তির এই ব্যবহার আকাশ প্রতিরক্ষাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও দুর্ভেদ্য করে তুলবে।
ড্রোন বনাম ড্রোন
শত্রুর আক্রমণাত্মক ড্রোন রুখতে এখন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ‘ইন্টারসেপ্টর ড্রোন’ বা ড্রোনের বিরুদ্ধে ড্রোনের লড়াই এক কার্যকর সমাধান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রথাগত মিসাইল দিয়ে ছোট ড্রোন ধ্বংস করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কঠিন, তাই গতিশীল ইন্টারসেপ্টর ড্রোনগুলো আকাশেই শত্রুর ড্রোনকে ধাওয়া করে ধাক্কা দিয়ে বা জাল ছুড়ে অকেজো করে দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে তারা বিশেষ ধরনের ‘এফপিভি ইন্টারসেপ্টর’ ব্যবহার করে রাশিয়ার নজরদারি ড্রোনগুলোকে মাঝআকাশে ভূপাতিত করছে। এটি কেবল সাশ্রয়ীই নয়, বরং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জানমালের ক্ষতি না করে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংসে অত্যন্ত নিখুঁত। ফলে ভবিষ্যতের আকাশ যুদ্ধে ড্রোনই হবে ড্রোনের প্রধান শিকারি।
এআই সেন্সর
আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এআই সেন্সর এখন মানুষের চেয়েও দ্রুত গতির সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হিসেবে কাজ করছে। মানুষের চোখের পলক পড়ার আগেই এই সিস্টেমগুলো শত শত ড্রোনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লেজার গান বা হাই-পাওয়ার মাইক্রোওয়েভ গান ফায়ার করতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ ব্রিটেনের ‘ড্রাগনফায়ার’ লেজার সিস্টেমের কথা বলা যায়, যা দিয়ে অত্যন্ত নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা যায় এবং যার প্রতিটি শটের খরচ মাত্র ১০-১২ ডলার। যেখানে একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল ছুড়তে লক্ষ লক্ষ ডলার ব্যয় হয়, সেখানে লেজার প্রযুক্তির এই স্বল্প ব্যয় আকাশ প্রতিরক্ষায় এক নতুন বিপ্লব নিয়ে এসেছে। এটি কেবল সাশ্রয়ীই নয়, বরং ড্রোনের ঝাঁককে মুহূর্তের মধ্যে পুড়িয়ে দিয়ে প্রতিরক্ষাকে করে তোলে দুর্ভেদ্য। মূলত এআই-এর মস্তিষ্ক আর লেজারের গতিই হবে আগামীর অজেয় ঢাল।
নৈতিক ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জ
ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার যুদ্ধের ময়দানে যেমন শ্রেষ্ঠত্ব দিচ্ছে, তেমনি ‘কিলার রোবট’-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে তৈরি করছে গভীর নৈতিক সংকট। যেহেতু এই ব্যবস্থাগুলো সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল, তাই হ্যাকিং এবং সিগন্যাল জ্যামিংয়ের মতো সাইবার ঝুঁকি এখন যুদ্ধের প্রধান কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যন্ত্রের হাতে মানুষের জীবন-মরণের ভার ছেড়ে দেওয়ার এই প্রবণতা আগামীর বিশ্বকে এক অনিশ্চিত এবং জটিল নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সিদ্ধান্ত গ্রহণ
যুদ্ধের ময়দানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার স্বায়ত্তশাসন এক ভয়াবহ নৈতিক সংকটের জন্ম দিচ্ছে, যেখানে একটি যন্ত্র নিজেই স্থির করতে পারে তার লক্ষ্যবস্তু কে হবে। এই ‘লিথাল অটোনোমাস ওয়েপনস’ বা কিলার রোবটগুলো যদি মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রাণঘাতী হামলা চালায়, তবে যুদ্ধের দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার প্রশ্নবিদ্ধ হবে। লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে ‘কারগু-২’ নামক ড্রোন ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল, যা কোনো মানুষের কমান্ড ছাড়াই লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণ করতে সক্ষম ছিল। প্রযুক্তিগত ভুলের কারণে যদি কোনো রোবট সাধারণ বেসামরিক নাগরিক এবং শত্রুপক্ষকে আলাদা করতে না পারে, তবে তা বড় ধরনের যুদ্ধাপরাধের ঝুঁকি তৈরি করে। যন্ত্রের হাতে জীবন-মৃত্যুর অধিকার ছেড়ে দেওয়ার এই প্রবণতা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
সাইবার যুদ্ধ
যেহেতু আধুনিক সামরিক ড্রোনগুলো এআই এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল, তাই আগামীর যুদ্ধে সশরীরে লড়াইয়ের চেয়ে হ্যাকিং বা সিগন্যাল জ্যামিং হবে সবচেয়ে বড় কৌশল। সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নেওয়া বা ইলেকট্রনিক জ্যামিংয়ের মাধ্যমে সেগুলোকে মাঝ আকাশেই অকেজো করে দেওয়া এখন যুদ্ধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০১১ সালে ইরান আমেরিকার একটি অত্যাধুনিক ‘আরকিউ-১৭০’ ড্রোনকে জিপিএস স্পুফিং প্রযুক্তির মাধ্যমে হ্যাক করে অক্ষত অবস্থায় নিজেদের ভূমিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও দেখা যাচ্ছে যে, শক্তিশালী ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম ব্যবহার করে প্রতিদিন শত শত ড্রোনকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করা হচ্ছে। মূলত ডেটা লিংকে ফাটল ধরাতে পারলে একটি শক্তিশালী ড্রোন বাহিনীও মুহূর্তের মধ্যে অর্থহীন হয়ে পড়তে পারে।
একবিংশ শতাব্দীর রণক্ষেত্রে ড্রোন সোয়ার্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান কেবল একটি প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ নয়, বরং এটি প্রথাগত সমরবিদ্যার এক আমূল রূপান্তর। হাজার কোটি ডলারের ট্যাংক বা যুদ্ধবিমানের একক দাপট এখন অতীত; পরিবর্তে যুদ্ধজয়ের চাবিকাঠি চলে গেছে সস্তা অথচ নিখুঁত অ্যালগরিদমের নিয়ন্ত্রণে।
আগামীর যুদ্ধে বিজয়ী হবে সেই পক্ষ, যারা প্রযুক্তির এই ‘অসম’ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে আকাশ ও স্থলভাগে অভেদ্য ডিজিটাল ব্যূহ তৈরি করতে পারবে। তবে এই অগ্রযাত্রার সমান্তরালে সাইবার ঝুঁকি এবং কিলার রোবটের নৈতিক সংকটকে উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা হিসেবে দেশগুলোকে কেবল প্রচলিত সমরাস্ত্র বৃদ্ধিতে নয়, বরং সাইবার নিরাপত্তা, লেজার ডিফেন্স এবং এআই-চালিত ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমে ব্যাপক বিনিয়োগ করতে হবে। যন্ত্রের স্বায়ত্তশাসন এবং মানুষের নৈতিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে আগামীর বিশ্ব নিরাপত্তার প্রধান চ্যালেঞ্জ।
২০২৬ সালের এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এটা স্পষ্ট যে, সমরশক্তির সংজ্ঞায় এখন পেশিশক্তির চেয়ে প্রজ্ঞার গুরুত্ব বেশি। যারা এই ডিজিটাল বিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারবে না, ইতিহাসের পাতায় তারা কেবল ব্যয়বহুল সামরিক ধ্বংসাবশেষের সাক্ষী হয়েই থাকবে। মূলত আগামীর যুদ্ধ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের এক চরম লড়াই।
- সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক