কেরালার মুসলীম লীগের প্রথম নারী বিধায়ক কে এই ফাতিমা তাহলিয়া

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

ফাতিমা তাহলিয়া। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের রাজনীতিতে নারী প্রতিনিধিত্ব এখনও সীমিত। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক দলগুলোতে এই প্রবণতা আরও বেশি। সেই প্রেক্ষাপটে কেরালার ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল) থেকে প্রথম নারী বিধায়ক হয়েছেন ফাতিমা তাহলিয়া।

গত ৯ এপ্রিল কেরালার বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর গত ৪ মে (সোমবার) নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়। দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৪ বছর বয়সী তাহলিয়া ৬৩ হাজার ৯৯৯ ভোট পেয়ে, প্রায় ৪ হাজার ৭০০ ভোটের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন।

দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতাসীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এলডিএফ) শক্তিশালী প্রার্থী টি পি রামকৃষ্ণানকে পরাজিত করেছেন তরুণ নেত্রী ফাতিমা। তাঁর এই জয় শুধু নির্বাচনী সাফল্যই নয়, কেরালার রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই জয় নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

কে এই ফাতিমা তাহলিয়া

কেরালার মধ্যবিত্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ফাতিমা তাহলিয়া। তাঁর বাবা আব্দুল রহিম কে ছিলেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের সক্রিয় সদস্য। বাবার আদর্শই ফাতিমাকে রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে অনুপ্রাণিত করে। শৈশবে বাবার হাত ধরে গ্রামের বিভিন্ন জনসভায় তিনি যেতেন, যা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা গঠনে ভূমিকা রেখেছে।

ছোটবেলা থেকেই তিনি পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ছিলেন। পাশাপাশি সমাজের নানা বৈষম্য বিশেষ করে নারী শিক্ষা অধিকার ও সচেতনতা নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠলেও তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন আত্মবিশ্বাসী ও প্রগতিশীল চিন্তার একজন মানুষ হিসেবে।

ফাতিমা কেরালার কালিকট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি প্রকাশ পেতে থাকে।

রাজনীতিতে যেভাবে আসা

রাজনীতিতে ফাতিমার প্রবেশ হঠাৎ করে হয়নি, বরং দীর্ঘ ১৪ বছরের পরিশ্রম, স্থানীয় জনগণের আস্থা, উন্নয়নমূলক কাজ ও অভিজ্ঞতা তাঁকে রাজনীতিতে আসতে বাধ্য করেছে। ২০১২ সালে ছাত্ররাজনীতির মধ্যে দিয়ে তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় হন। সে সময় তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের সংগঠন ‘হরিথার’ মহিলা শাখার সভাপতি ছিলেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় নারী সংগঠন ও শিক্ষা উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। গ্রামীণ নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্বনির্ভরতা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নানা বাঁধার সম্মুখীন হন। এসময় তিনি বুঝতে পারেন নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে না গেলে পরিবর্তন আনা কঠিন। পরবর্তী সময়ে তিনিও ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। দলটি শুরু থেকে পুরুষ নেতৃত্বাধীন হলেও ফাতিমা সেখানে নিজের জায়গা তৈরি করেন ধৈর্য, দক্ষতা এবং সাংগঠনিক ক্ষমতার মাধ্যমে।

তিনি প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এমএসএফ) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সংগঠনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যৌন হয়রানি বিষয়ে মুখ খুলে বির্তকে জড়িয়ে পরেন এবং তাঁকে ক্ষমতাচ্যূত করা হয়। এরপর একে একে ওয়ার্ড, পঞ্চায়েত এবং জেলা পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। স্থানীয় ওয়ার্ড, পঞ্চায়েতে কাউন্সিলর ছিলেন। এরপর কেরালার বিধানসভা নির্বাচনের প্রার্থী হন। বর্তমানে তিনি কেরালা রাজ্যের বিধায়ক। তাঁর কাজের মূল লক্ষ্য ছিল নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তা।

নির্বাচনে সাফল্য

কেরালার রাজনীতিতে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। দ্য হিন্দু পত্রিকায় উঠে এসেছে, ১৯৯৬ সালে প্রথম একজন নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল। সে বছর নারী প্রার্থী পরাজিত হওয়ায় দীর্ঘ ২৫ বছর আর মুসলিম লীগে কোনো নারী প্রার্থী দেওয়া হয়নি।

নির্বাচনী জনসংযোগের সময়ে ফাতিমা তাহলিয়া। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
নির্বাচনী জনসংযোগের সময়ে ফাতিমা তাহলিয়া। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

২০২১ সালে আবারও একজন নারী প্রার্থী দেওয়া হয় এবং পরাজয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ২০২৬ ছিল ইন্ডিয়ান মুসলিম লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এবছর দুইজন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। সেই প্রেক্ষাপটে ফাতিমাকে প্রার্থী করা ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত। কারণ তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা ছিল ভিন্নধর্মী। তিনি শুধু দলীয় ভোটব্যাংকের ওপর নির্ভর করেননি, বরং তরুণ ভোটার, নারী এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের কাছে নিজের ভাবমূর্তি তুলে ধরেন। উন্নয়ন, শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়ন ছিল তার প্রচারের মূল বিষয়।

ফলাফল প্রত্যাশিতভাবেই তিনি জয়ী হন এবং ইতিহাস গড়েন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগের প্রথম নারী বিধায়ক হিসেবে।

কেন এই জয় গুরুত্বপূর্ণ

ফাতিমার জয়কে কয়েকটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলা যায়। প্রথমত, কেরালার মতো শিক্ষিত রাজ্যেও রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম। ফাতিমা জয় সেই ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেছে। দ্বিতীয়ত, ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ ঐতিহ্যগতভাবে রক্ষণশীল ভাবমূর্তির দল হিসেবে পরিচিত। সেখানে একজন নারী বিধায়কের উত্থান দলটির দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তৃতীয়ত, ফাতিমা তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনীতিতে নতুন ধারা নিয়ে এসেছেন, যেখানে উন্নয়ন ও সংস্কার বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সামনে যত চ্যালেঞ্জ

দলীয় রাজনীতিতে নারীদের জায়গা করে নেওয়া এখনও কঠিন। রাজনীতির এই পথ মোটেও সহজ ছিল না ফাতিমার। অনেক সময় তাঁকে প্রমাণ করতে হয়েছে যে তিনি শুধুমাত্র প্রতীকী প্রার্থী নন, বরং একজন কার্যকর নেত্রী। সমালোচকরাও প্রশ্ন তুলেছেন এই ধরনের সাফল্য কি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে, নাকি এটি শুধুই রাজনৈতিক কৌশল? তবে ফাতিমা তাঁর কাজের মাধ্যমে এসব প্রশ্নের জবাব দিতে শুরু করেছেন। তিনি নারীর অধিকার, মর্যাদা, দলীয় সংস্কার ও লিঙ্গ সমতায় নিয়ে কাজ করেছেন।

ফাতিমা যদি তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী উন্নয়ন ও সামাজিক পরিবর্তন আনতে পারেন, তাহলে তিনি শুধু নিজের দলের মধ্যেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। তাঁর সাফল্য অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত