বাকি বিল্লাহ নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি। তিনি স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন শাহবাগ আন্দোলন, সেই আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষ এবং এর শাপলা-কেন্দ্রিক ঘটনা নিয়ে। এই ভিডিও সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লেখাটি তৈরি হয়েছে।
লেখা:

গণজাগরণ মঞ্চ নামটা মূলত আন্দোলনের পরের দিকে এসেছে। শাহবাগের এই আন্দোলনের পেছনে একটি দীর্ঘ পটভূমি রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ একে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে রিলেট করেন। তবে ২০১৩-এর সেই জেনারেশনের প্রস্তুতির পটভূমিটি নতুন করে শুরু হয়েছিল মূলত ২০০১ সালে।
২০০১ সালে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে এবং জামায়াতের দুইজন নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। সেটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। যারা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে এবং কখনো এই প্রশ্নে কোনো মীমাংসায় আসেনি, সেই দলের নেতারা যখন গাড়িতে জাতীয় পতাকা নিয়ে ঘোরেন, তখন থেকেই বয়ানের আরেকটি পর্ব শুরু হয়। আগের প্রজন্মের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এক নতুন জেনারেশন যুক্ত হতে থাকে। এই একই সময়ে ২০০৫-০৬ সালের দিকে ইন্টারনেট-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটিগুলো গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘সামহয়ার ইন ব্লগের’মাধ্যমে ইয়াঙ্গার জেনারেশন এই বিচারের দাবিটি নতুন করে তুলতে শুরু করে।
এই আন্দোলনের পেছনে বেশ কয়েকটি পক্ষ এবং কয়েক বছরের চর্চা ছিল। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যে সময়টাকে আমরা ‘ব্লগ যুগ’বলি। তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুটি কয়েক বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এই দাবিটি জোরালোভাবে ওঠে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে আমরা অনলাইনে যে ন্যারেটিভের লড়াই দেখি, তার শুরুটা হয়েছিল তখনই। মতামত প্রকাশের এই জায়গায় যারা এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে তারাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—এই বোধটি তখন কেবল তৈরি হচ্ছিল।
সে সময় অমি রহমান পিয়ালসহ আওয়ামী লীগের কিছু গ্রুপ ব্লগে তাদের দলের পক্ষে লড়াই করছিল। আবার আমরা যারা বামপন্থী, আমাদের নিজস্ব কিছু ইস্যু, লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। একই সাথে জামায়াত-শিবির ও ইসলামিস্টদেরও অনলাইনে একটি সংগঠিত উপস্থিতি ছিল। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন করতাম, কিন্তু আওয়ামী লীগ যেভাবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দিতে চাইত, আমরা তার বাইরে থাকতে চেয়েছি।
তৎকালীন তরুণ প্রজন্ম ব্লগ এবং অনলাইনের মতপ্রকাশের জায়গায় পুরোপুরি যুক্ত ছিল। এর ফলে রাজনীতি তখন এই ন্যারেটিভ কেন্দ্রিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই ঘুরছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরণের বাইরে সাধারণ মানুষের এই বাস্তব ক্ষোভকে ধারণ করা। একদিকে ছিল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, অন্যদিকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের যে রাজনীতি এবং এটি নিয়ে অনন্ত এক ‘বাইনারি’ টিকিয়ে রাখা—তার একটি নিষ্পত্তি করা। আমাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমেই এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান হবে।
২০১১-১২ সালের দিকে এই এনগেজমেন্টগুলি ব্লগে নানা পোলারাইজেশন তৈরি করে। সেখান থেকে ‘সামহয়ার ইন ব্লগ’ভাগ হয়ে আওয়ামীপন্থী ব্লগাররা ‘আমার ব্লগ’এবং ‘সচলায়তন’নামে আরও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল মুভমেন্ট এবং এনগেজমেন্টের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। আমরাও সমান্তরালভাবে আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাকে আমি ১০০ ভাগ স্বতঃস্ফূর্ত বলব। কেউ যদি পরবর্তী ঘটনাবলি মিলিয়ে একে আওয়ামী লীগের পাতানো পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চান, আমি তাঁর সাথে একমত নই। যেহেতু আমি নিজে সেখানে যুক্ত ছিলাম, আমি জানি এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। একে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে আরও পরে।
এই আন্দোলন হাতছাড়া হওয়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন। বলেন, আন্দোলন কি আপনাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল? বিষয়টি বেশ জটিল। এই জটিলতা আমরা ২০১০-১২ সাল থেকেই মোকাবিলা করছিলাম। মূলত লড়াইটি ছিল আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়ে। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ছিলাম, কিন্তু আমাদের সমান্তরালে আরেকটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল যারা সবকিছু ‘আওয়ামী ফিল্টারে’দেখতে চাইত। তাদের লক্ষ্য ছিল বিএনপি-সহ সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ন্যারেটিভের মধ্যে ঠেলে দেওয়া। আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী ছিলাম।
২০১৩ সালের ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই আন্দোলনের ভেতরে এসব বিষয় নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যেমন—দাবি বা স্লোগান হিসেবে ‘ফাঁসি’শব্দটি থাকবে কি না, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিতর্ক হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রয়াত ব্লগার রাসেল পারভেজের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। তিনি জোরালো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ফাঁসির দাবি শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের স্পিরিট এবং আকাঙ্ক্ষাকে কলঙ্কিত করবে।
সে সময় আন্দোলনের ভেতরে বহুমুখী দৃশ্যপট ছিল। সরকারের হয়ে কাজ করা একদল লোক যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বাধীন এক অংশ। এর বাইরে ব্লগারদের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ছিল, যেটির সাথে আমি, পারভেজ আলম, আসিফ মহিউদ্দিন ও শরদ চৌধুরী যুক্ত ছিলাম। ৫ ফেব্রুয়ারির আগে ব্লগারদের সংগঠন হিসেবে এটিই প্রমিনেন্ট ছিল।
বাইরে থেকে যারা দেখেছেন, তারা মনে করেন আন্দোলনটি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই ব্যাখ্যার কারণ হলো—আমরা শাহবাগের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আমাদের ন্যারেটিভ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বাস্তব সত্য হলো, সংগঠিত শক্তি বা সংখ্যাগত দিক থেকে আওয়ামী লীগ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি গোছানো ছিল। শাহবাগের জমায়েত এবং তার আশপাশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশাল উপস্থিতি ছিল এবং প্রচারণায় তাদের কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালেই ‘আমার ব্লগ’আমাদেরকে ‘জামায়াতের টাকা খাওয়া’ব্লগার হিসেবে ফ্রেমিং করার চেষ্টা হয়েছিল। ফলে ৫ ফেব্রুয়ারির পরে যখন ইমরান এইচ সরকারকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব গড়ে উঠল, আমরা বুঝতে পারছিলাম এটি সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি তখন সরাসরি পাল্টা নেতৃত্বের দাবি তুলতাম, তবে আমাদের ওপর আন্দোলনের বিভক্তির দায় চাপানো হতো। বলা হতো যে, আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চাইছি। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা করে গেছি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে রাজনৈতিক নিষ্পত্তি আমরা চেয়েছিলাম, তার সাথে আমরা বেইমানি করতে চাইনি। আমাদের সাধ্যমতো আমরা ওই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছি।
শাপলা ও শাহবাগের মধ্যে যে ‘বাইনারি’ বা বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো—এটি পুরোপুরি ভুয়া তথ্য এবং ভুয়া বয়ানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছিল। শাহবাগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়তো একভাবে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রচার করা হলো যে শাহবাগের আয়োজক ব্লগাররা সেখানে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ কথাবার্তা বলছে। শুধু তাই নয়, সেখানে প্রচুর কনডম পাওয়া যাচ্ছে কিংবা বেলেল্লাপানা হচ্ছে—এমন সব নোংরা তথ্য ছড়ানো হলো। শাহবাগে তখন পরিবার-পরিজন ও শিশুসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বিশাল জমায়েত ছিল। ফলে যারা এই মিথ্যা তথ্যগুলো ছড়াচ্ছিল, তারা নিজেরাও জানত যে এগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট।
তখন ‘আমার দেশ’ পত্রিকা তথাকথিত নাস্তিক্যবাদীদের কিছু কন্টেন্ট প্রকাশ করল। সেগুলো ছিল মূলত ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের দিকের ব্লগের কন্টেন্ট। তখন ব্লগ ছিল একটি নিজস্ব জগত, বাইরের মানুষ ওভাবে খবর রাখত না। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে ওই পুরনো কন্টেন্টগুলোর সাথে শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা তখনকার রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে সেগুলো সামনে আনা হলো। ফলে শাহবাগকে ‘নাস্তিকদের আখড়া’ হিসেবে চিত্রায়িত করা এবং নাস্তিকের ফাঁসির দাবি তোলা ছিল পুরোপুরি ভিত্তিহীন। শাহবাগের আয়োজকদের মধ্যে যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতাম না বা প্রতিপক্ষ মনে করতাম, আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম যে তারাও নাস্তিক নয়। আমি এখানে ফ্যাক্ট বোঝানোর জন্য এই কথাগুলো বলছি।
একটি জনপ্রিয় বয়ান আছে যে—শাহবাগ দিয়েই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, আমরা যারা শাহবাগের আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম, তারা শাহবাগকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি-কে ‘জঙ্গিবাদী’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেছি। হয়তো কারো কারো স্লোগানে সেই ট্যাগিং ছিল, কিন্তু আমরা তাতে সায় দিইনি। আমি বিশ্বাস করি, যদি শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওই ঘটনাটি না ঘটত, তবে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ওরকম একটি একতরফা নির্বাচন করতে পারত না। শুধু শাহবাগের ম্যান্ডেট দিয়ে সেটি সম্ভব হতো না। কারণ শাহবাগের যে বুদ্ধিভিত্তিক অংশ ছিল—যেমন পারভেজ আলম, রাসেল পারভেজ, কৌশিক বা আমি—আমরা কেউই ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে একতরফা নির্বাচন’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা চলে আসবে’—আওয়ামী লীগের এই বয়ান গ্রহণ করিনি।
কিন্তু শাপলা চত্বরে যেভাবে বলপ্রয়োগ করা হলো, সেটি ছিল রাষ্ট্রশক্তির এক ভয়াবহ ও সফল এক্সপেরিমেন্ট। এন্থনি লোনস্টাইন যেমন তাঁর ‘প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংকে কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ও নজরদারির এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়; একইভাবে শাপলা চত্বরের ওই বিশাল সমাবেশ দমন করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং পুলিশ-র্যাব একটি মহড়া বা এক্সারসাইজ সম্পন্ন করল। তারা পরখ করে দেখল যে, দীর্ঘ সময় বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব কি না। হেফাজতের আন্দোলন দমনের পর বেনজীরের মতো চরিত্ররা ‘সুপার কনফিডেন্ট’ হয়ে উঠেছিল।
শাপলা চত্বরের ঘটনায় আরেকটি দিক ছিল। হেফাজত কেন এত বড় সমাবেশ করছে এবং তাদের দাবি কী—সেটি শহরের প্রভাবশালী মহলের কাছে পরিষ্কার ছিল না। ‘নাস্তিকের কল্লা চাই’, ‘নাস্তিক পেলে ছেড়ো না’—এ ধরনের স্লোগান ও রাজনীতি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল। এই ধরনের উগ্র রাজনীতি জয়ী হলে রাষ্ট্র কোন পরিণতির দিকে যাবে, সেই আশঙ্কায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর একটি বড় অংশ তখন আওয়ামী লীগের বলপ্রয়োগকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে বসেছিল। শাপলা-শাহবাগ বাইনারির এই জায়গাটিতে আমরা সাধারণত খুব কম আলোকপাত করি।
শাপলা চত্বরের পরিস্থিতি সেই সময়ের সরকার যেভাবে সামাল দিয়েছিল, তা নিয়ে আমি ভিন্নমত পোষণ করি। আমার মনে আছে, আমাদের একসময়ের বন্ধু এবং বর্তমানে প্রভাবশালী পিনাকী ভট্টাচার্য তখন বিষয়টি নিয়ে অনেক হাসাহাসি ও ব্যঙ্গ করে পোস্ট লিখেছিলেন—বিশেষ করে সেই ‘কান ধরার’ বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলনে আমরা যারা যুক্ত ছিলাম এবং যারা রাজনীতির জটিলতাগুলো খেয়াল করছিলাম, তাদের জন্য এটি দেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিষয়টিকে কাউন্টার করতে না পারা ছিল আমাদের জন্য বড় এক গ্লানি। সেখানে মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর যে ভীতি ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হলো, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাটি সমাজে ‘লেজিটিমেট’ বা বৈধতা পেল কীভাবে? ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ছিল একটি নির্বাচিত ও মোটামুটি বৈধ সরকার। অন্যদিকে বিএনপি তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। ফলে বিএনপিও এক ধরনের সংকটময় অবস্থানে পড়ে গিয়েছিল যে, তারা হেফাজতকে পুরোপুরি সমর্থন করবে কি না। কারণ, হেফাজতের ওই আন্দোলনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতার পতন ঘটত, তবে সেই ক্ষমতা কোন দিকে যেত? সেটি কি কোনো গণতান্ত্রিক ধারায় এগোত, নাকি অন্য কোনো পথে—তা নিয়ে সংশয় ছিল।
আমরা ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেখেছি যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শক্তি ও নারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুক্ত ছিলেন। এরপরেও কিছু গোষ্ঠী একে ‘ইসলামিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে আন্দোলনের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০১৩ সালে হেফাজত যেভাবে জমায়েতটি করেছিল, তাদের আসলে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ ছিল না। তাদের প্রধান দাবি ছিল ‘নাস্তিকদের ফাঁসি’—যার ভিত্তি ছিল শাহবাগে নাস্তিকতা ও বেলেল্লাপনা হচ্ছে এমন কিছু ভুয়া তথ্য। এই দাবির গ্রাউন্ড যৌক্তিকভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের বাইরে সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
এখন ২০২৪-এর পরে এসে আমরা যখন পেছনের ইতিহাস দেখি, তখন ভিন্ন এক চিত্র সামনে আসে। আমি সোহেল আহমেদ মুন্নার ‘ইতিহাস ও বয়ান’ বইটি পড়ছিলাম। ইতিহাস তো কেবল তথ্য নয়, এটি একটি আখ্যান। ২০২৪-এর পরে বিশেষ করে হাদির মৃত্যু এবং আরও অনেক ঘটনা সামনে আসার পর আওয়ামী লীগ-ভারত-হেফাজত মিলিয়ে যে আখ্যানগুলো তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে আংশিক সত্য আছে। কিন্তু পুরো আখ্যানটি যেভাবে হাজির করা হয়, সেটি অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে বেশি ‘বয়ানি’ হয়ে ওঠে। ইতিহাস বুঝতে হলে কখনো আখ্যানের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, আবার কখনো আখ্যানের বাড়তি মেদ সরিয়ে স্রেফ ‘ফ্যাক্ট’ বা বাস্তব তথ্য দিয়ে তা বিচার করতে হয়।
গণজাগরণ মঞ্চ ও শাপলা চত্বরের এই ঘটনাগুলো ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে তেমন প্রভাব ফেলেছে, আমি আসলে বিষয়টিকে এভাবে দেখি না। যদি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি, তবে আমার একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জার্নি আছে। নব্বই দশকের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতি করেছি। এরপর একসময় রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্লগের নতুন ও আকর্ষণীয় জগতে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি। সেই ব্লগ-পলিটিক্সই আমাকে আবার রাজনীতির মাঠে ফিরিয়ে আনে। এটি একটি রূপান্তর বা বিবর্তনের প্রক্রিয়া। মানুষ কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ২০০৭ সালে আমার যে চিন্তাধারা ছিল, ২০১৩ বা ২০১৮ সালে তা এক ছিল না—সময়ের সাথে সাথে নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।
আমি ২০১৮ সালের কথা আলাদাভাবে বলছি কারণ সে সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে মোমেন্টাম তৈরি হয়েছিল, অনেক ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবী তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল এটি অত্যন্ত ন্যায্য আন্দোলন এবং আমি এর পক্ষে সক্রিয় ছিলাম, এমনকি গ্রেফতারও হয়েছি। আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো—২০২৪-এ এসে যদি আমরা কেবল ‘শাপলা পক্ষ’ বনাম ‘শাহবাগ পক্ষ’ খোঁজার চেষ্টা করি, তবে সেটি ভুল হবে। কারণ এর মধ্যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে এবং সবারই চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে।
২০২৪-এ আমরা যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়িয়েছি, আমরা যদি এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধটি ২০১৩-১৪ সালেই ধারণ করতে পারতাম, তবে তখনই একসাথে দাঁড়াতে আমাদের কোনো সমস্যা হতো না। যদি আমরা স্বীকার করি যে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং আমরা একে অপরকে ‘ডেমোক্রেটিক স্পেস’ দেবো, তবে অনেক সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল।
২০১৩ সালের মূল সংকটটি ছিল দ্বিমুখী এবং অগণতান্ত্রিক। একদিকে আওয়ামী লীগ শাহবাগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিএনপি-র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল এবং তাদের ওপর ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ তকমা সেঁটে দিয়েছিল। এটি যেমন অগণতান্ত্রিক ছিল, তেমনি শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে ‘নাস্তিকের ফাঁসি’ বা ‘কল্লা চাই’—এই ধরনের ভাষা এবং ব্লগারদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য প্রচারের যে রাজনীতি ছিল, সেটিও ছিল চরম অগণতান্ত্রিক।
শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হয়েছে যে—গণতন্ত্র কেন জরুরি। অন্যের জন্য গণতান্ত্রিক জায়গা বা স্পেস রাখা কেন প্রয়োজন, তা আমরা এখন বুঝতে পারছি। কারণ যদি অন্যের জন্য স্পেস না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত নিজের জন্যও কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। এটাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তবে শাপলা এবং শাহবাগ—এই ধরনের বর্গকরণের একটি বড় মুশকিল আছে। যেমন বর্তমানে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কোনো মেয়ে যদি স্লিভলেস পোশাক পরে হাঁটে তবে সে নিশ্চিতভাবে ‘শাহবাগী’। আবার কারো কপালে টিপ থাকলে কিংবা কেউ ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে গেলে তাকেও ‘শাহবাগী’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। এই যে একটি বর্গকরণ সমাজে গেড়ে বসেছে, সেটি নিয়ে আলাপ করতে গেলে আমি নিজেও সেই বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাই। তাই এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
ইদানীং ‘উগ্রবাদ’ মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে আমরা বিষয়টিকে কীভাবে বিচার করছি। যে ব্যক্তি বাংলাদেশকে স্বীকার করবে এবং গণতন্ত্রকে মেনে চলবে, সে যদি ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক বা তথাকথিত ‘মৌলবাদী’ও হয়, তবে তাতে কোনো সংকট নেই। একটি স্বাধীন দেশে যে কেউ তার নিজস্ব বিশ্বাস পালন করতে পারে এবং এটি নিয়ে অন্য কারো মাথা ঘামানোর কিছু নেই। এ কারণেই আমি ‘মৌলবাদ’ শব্দটি পারতপক্ষে ব্যবহার করি না, কারণ নিজের বিশ্বাসের মূলে থাকা কোনো অন্যায় কিছু নয়। সমস্যাটি তৈরি হয় যখন কেউ দাবি করে—‘গণতন্ত্র হারাম’। তখন বুঝতে হবে যে, এই ব্যক্তির সাথে গণতান্ত্রিক স্পেস শেয়ার করার আর কোনো সুযোগ নেই।
কেউ যদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, তবে সেটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার শামিল। কারণ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। বর্তমানে অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এবং দাবি করেন যে এটি ভারত করে দিয়েছে। একইভাবে একদল লোক ২০২৪-এর অভ্যুত্থানকেও আমেরিকার ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন। দুই ক্ষেত্রেই একটি বড় সত্য আড়াল করা হয়—তা হলো সাধারণ মানুষের অসীম ত্যাগ ও সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা ছিল এবং ২০২৪-এর পটভূমিতে আমেরিকার হয়তো কোনো আগ্রহ ছিল; কিন্তু এর জন্য যে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামল এবং লড়াই করল, সেই গণসংগ্রাম কি কোনো ষড়যন্ত্রের চেয়ে ছোট?
মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগ সয়েছে এবং সশস্ত্র লড়াই করেছে। ঠিক তেমনি ২০২৪-এর অভ্যুত্থানেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আসল লড়াইটি হলো—গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা ডেমোক্রেটিক ভ্যালুজ রক্ষা করা। বাংলাদেশকে স্বীকার করা, গণতন্ত্রকে স্বীকার করা এবং অপরের জন্য সহনশীল হওয়া—এটাই বড় কথা। এই মূল্যবোধগুলো যদি আমাদের মধ্যে থাকে, তবে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও আমি কোনো বড় সংকট দেখি না। এই সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করেই আমরা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

বাকি বিল্লাহ নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সদস্য। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সভাপতি। তিনি স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন শাহবাগ আন্দোলন, সেই আন্দোলনের বিভিন্ন পক্ষ এবং এর শাপলা-কেন্দ্রিক ঘটনা নিয়ে। এই ভিডিও সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লেখাটি তৈরি হয়েছে।
গণজাগরণ মঞ্চ নামটা মূলত আন্দোলনের পরের দিকে এসেছে। শাহবাগের এই আন্দোলনের পেছনে একটি দীর্ঘ পটভূমি রয়েছে। অধিকাংশ মানুষ একে ১৯৯২ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে রিলেট করেন। তবে ২০১৩-এর সেই জেনারেশনের প্রস্তুতির পটভূমিটি নতুন করে শুরু হয়েছিল মূলত ২০০১ সালে।
২০০১ সালে যখন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার গঠন করে এবং জামায়াতের দুইজন নেতা মন্ত্রিসভায় স্থান পান। সেটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এক ধরনের তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। যারা একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে এবং কখনো এই প্রশ্নে কোনো মীমাংসায় আসেনি, সেই দলের নেতারা যখন গাড়িতে জাতীয় পতাকা নিয়ে ঘোরেন, তখন থেকেই বয়ানের আরেকটি পর্ব শুরু হয়। আগের প্রজন্মের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে এক নতুন জেনারেশন যুক্ত হতে থাকে। এই একই সময়ে ২০০৫-০৬ সালের দিকে ইন্টারনেট-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম ও কমিউনিটিগুলো গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘সামহয়ার ইন ব্লগের’মাধ্যমে ইয়াঙ্গার জেনারেশন এই বিচারের দাবিটি নতুন করে তুলতে শুরু করে।
এই আন্দোলনের পেছনে বেশ কয়েকটি পক্ষ এবং কয়েক বছরের চর্চা ছিল। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত যে সময়টাকে আমরা ‘ব্লগ যুগ’বলি। তখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইস্যুটি কয়েক বছর ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই এই দাবিটি জোরালোভাবে ওঠে। দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে আমরা অনলাইনে যে ন্যারেটিভের লড়াই দেখি, তার শুরুটা হয়েছিল তখনই। মতামত প্রকাশের এই জায়গায় যারা এগিয়ে থাকবে, ভবিষ্যতে তারাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে—এই বোধটি তখন কেবল তৈরি হচ্ছিল।
সে সময় অমি রহমান পিয়ালসহ আওয়ামী লীগের কিছু গ্রুপ ব্লগে তাদের দলের পক্ষে লড়াই করছিল। আবার আমরা যারা বামপন্থী, আমাদের নিজস্ব কিছু ইস্যু, লড়াই এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। একই সাথে জামায়াত-শিবির ও ইসলামিস্টদেরও অনলাইনে একটি সংগঠিত উপস্থিতি ছিল। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে পূর্ণ সমর্থন করতাম, কিন্তু আওয়ামী লীগ যেভাবে বিষয়টিকে রাজনৈতিক রূপ দিতে চাইত, আমরা তার বাইরে থাকতে চেয়েছি।
তৎকালীন তরুণ প্রজন্ম ব্লগ এবং অনলাইনের মতপ্রকাশের জায়গায় পুরোপুরি যুক্ত ছিল। এর ফলে রাজনীতি তখন এই ন্যারেটিভ কেন্দ্রিক আলোচনার ওপর ভিত্তি করেই ঘুরছিল। আমাদের লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরণের বাইরে সাধারণ মানুষের এই বাস্তব ক্ষোভকে ধারণ করা। একদিকে ছিল ন্যায়বিচারের প্রশ্ন, অন্যদিকে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের স্মৃতি ও উত্তরাধিকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষের যে রাজনীতি এবং এটি নিয়ে অনন্ত এক ‘বাইনারি’ টিকিয়ে রাখা—তার একটি নিষ্পত্তি করা। আমাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল যে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মাধ্যমেই এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান হবে।
২০১১-১২ সালের দিকে এই এনগেজমেন্টগুলি ব্লগে নানা পোলারাইজেশন তৈরি করে। সেখান থেকে ‘সামহয়ার ইন ব্লগ’ভাগ হয়ে আওয়ামীপন্থী ব্লগাররা ‘আমার ব্লগ’এবং ‘সচলায়তন’নামে আরও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। উদ্দেশ্য ছিল মুভমেন্ট এবং এনগেজমেন্টের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখা। আমরাও সমান্তরালভাবে আমাদের মতো চেষ্টা করেছি। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি শাহবাগে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাকে আমি ১০০ ভাগ স্বতঃস্ফূর্ত বলব। কেউ যদি পরবর্তী ঘটনাবলি মিলিয়ে একে আওয়ামী লীগের পাতানো পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চান, আমি তাঁর সাথে একমত নই। যেহেতু আমি নিজে সেখানে যুক্ত ছিলাম, আমি জানি এই পুরো প্রক্রিয়াটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল। একে রাজনৈতিক রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছে আরও পরে।
এই আন্দোলন হাতছাড়া হওয়া নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন করেন। বলেন, আন্দোলন কি আপনাদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল? বিষয়টি বেশ জটিল। এই জটিলতা আমরা ২০১০-১২ সাল থেকেই মোকাবিলা করছিলাম। মূলত লড়াইটি ছিল আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়ে। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে ছিলাম, কিন্তু আমাদের সমান্তরালে আরেকটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল যারা সবকিছু ‘আওয়ামী ফিল্টারে’দেখতে চাইত। তাদের লক্ষ্য ছিল বিএনপি-সহ সকল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ন্যারেটিভের মধ্যে ঠেলে দেওয়া। আমরা এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী ছিলাম।
২০১৩ সালের ৫, ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই আন্দোলনের ভেতরে এসব বিষয় নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যেমন—দাবি বা স্লোগান হিসেবে ‘ফাঁসি’শব্দটি থাকবে কি না, তা নিয়ে আমাদের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিতর্ক হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমাদের প্রয়াত ব্লগার রাসেল পারভেজের কথা বিশেষভাবে বলতে হয়। তিনি জোরালো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ফাঁসির দাবি শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের স্পিরিট এবং আকাঙ্ক্ষাকে কলঙ্কিত করবে।
সে সময় আন্দোলনের ভেতরে বহুমুখী দৃশ্যপট ছিল। সরকারের হয়ে কাজ করা একদল লোক যেমন ছিল, তেমনি ছিল ইমরান এইচ সরকারের নেতৃত্বাধীন এক অংশ। এর বাইরে ব্লগারদের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম ছিল, যেটির সাথে আমি, পারভেজ আলম, আসিফ মহিউদ্দিন ও শরদ চৌধুরী যুক্ত ছিলাম। ৫ ফেব্রুয়ারির আগে ব্লগারদের সংগঠন হিসেবে এটিই প্রমিনেন্ট ছিল।
বাইরে থেকে যারা দেখেছেন, তারা মনে করেন আন্দোলনটি আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই ব্যাখ্যার কারণ হলো—আমরা শাহবাগের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি আমাদের ন্যারেটিভ অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। বাস্তব সত্য হলো, সংগঠিত শক্তি বা সংখ্যাগত দিক থেকে আওয়ামী লীগ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি গোছানো ছিল। শাহবাগের জমায়েত এবং তার আশপাশে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিশাল উপস্থিতি ছিল এবং প্রচারণায় তাদের কড়া নিয়ন্ত্রণ ছিল।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১২ সালেই ‘আমার ব্লগ’আমাদেরকে ‘জামায়াতের টাকা খাওয়া’ব্লগার হিসেবে ফ্রেমিং করার চেষ্টা হয়েছিল। ফলে ৫ ফেব্রুয়ারির পরে যখন ইমরান এইচ সরকারকে কেন্দ্র করে নেতৃত্ব গড়ে উঠল, আমরা বুঝতে পারছিলাম এটি সমস্যাজনক হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আমরা যদি তখন সরাসরি পাল্টা নেতৃত্বের দাবি তুলতাম, তবে আমাদের ওপর আন্দোলনের বিভক্তির দায় চাপানো হতো। বলা হতো যে, আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চাইছি। এই কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আমরা আমাদের মতো করে চেষ্টা করে গেছি। কারণ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে রাজনৈতিক নিষ্পত্তি আমরা চেয়েছিলাম, তার সাথে আমরা বেইমানি করতে চাইনি। আমাদের সাধ্যমতো আমরা ওই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছি।
শাপলা ও শাহবাগের মধ্যে যে ‘বাইনারি’ বা বিভাজন তৈরি করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ হলো—এটি পুরোপুরি ভুয়া তথ্য এবং ভুয়া বয়ানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা হয়েছিল। শাহবাগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট হয়তো একভাবে তৈরি হয়েছিল, কিন্তু প্রচার করা হলো যে শাহবাগের আয়োজক ব্লগাররা সেখানে ‘ধর্মবিদ্বেষী’ কথাবার্তা বলছে। শুধু তাই নয়, সেখানে প্রচুর কনডম পাওয়া যাচ্ছে কিংবা বেলেল্লাপানা হচ্ছে—এমন সব নোংরা তথ্য ছড়ানো হলো। শাহবাগে তখন পরিবার-পরিজন ও শিশুসহ সব শ্রেণী-পেশার মানুষের বিশাল জমায়েত ছিল। ফলে যারা এই মিথ্যা তথ্যগুলো ছড়াচ্ছিল, তারা নিজেরাও জানত যে এগুলো সম্পূর্ণ বানোয়াট।
তখন ‘আমার দেশ’ পত্রিকা তথাকথিত নাস্তিক্যবাদীদের কিছু কন্টেন্ট প্রকাশ করল। সেগুলো ছিল মূলত ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের দিকের ব্লগের কন্টেন্ট। তখন ব্লগ ছিল একটি নিজস্ব জগত, বাইরের মানুষ ওভাবে খবর রাখত না। কিন্তু ২০১৩ সালে এসে ওই পুরনো কন্টেন্টগুলোর সাথে শাহবাগের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বা তখনকার রাজনীতির কোনো সম্পর্ক ছিল না। সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে সেগুলো সামনে আনা হলো। ফলে শাহবাগকে ‘নাস্তিকদের আখড়া’ হিসেবে চিত্রায়িত করা এবং নাস্তিকের ফাঁসির দাবি তোলা ছিল পুরোপুরি ভিত্তিহীন। শাহবাগের আয়োজকদের মধ্যে যাদের আমি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করতাম না বা প্রতিপক্ষ মনে করতাম, আমি নিশ্চিতভাবে জানতাম যে তারাও নাস্তিক নয়। আমি এখানে ফ্যাক্ট বোঝানোর জন্য এই কথাগুলো বলছি।
একটি জনপ্রিয় বয়ান আছে যে—শাহবাগ দিয়েই আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বীজ বপন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারি যে, আমরা যারা শাহবাগের আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলাম, তারা শাহবাগকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি-কে ‘জঙ্গিবাদী’ বা ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ট্যাগ দেওয়ার রাজনীতির তীব্র বিরোধিতা করেছি। হয়তো কারো কারো স্লোগানে সেই ট্যাগিং ছিল, কিন্তু আমরা তাতে সায় দিইনি। আমি বিশ্বাস করি, যদি শাপলা চত্বরে হেফাজতের ওই ঘটনাটি না ঘটত, তবে আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে ওরকম একটি একতরফা নির্বাচন করতে পারত না। শুধু শাহবাগের ম্যান্ডেট দিয়ে সেটি সম্ভব হতো না। কারণ শাহবাগের যে বুদ্ধিভিত্তিক অংশ ছিল—যেমন পারভেজ আলম, রাসেল পারভেজ, কৌশিক বা আমি—আমরা কেউই ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে একতরফা নির্বাচন’ এবং ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা চলে আসবে’—আওয়ামী লীগের এই বয়ান গ্রহণ করিনি।
কিন্তু শাপলা চত্বরে যেভাবে বলপ্রয়োগ করা হলো, সেটি ছিল রাষ্ট্রশক্তির এক ভয়াবহ ও সফল এক্সপেরিমেন্ট। এন্থনি লোনস্টাইন যেমন তাঁর ‘প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বইয়ে দেখিয়েছেন যে, গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংকে কীভাবে নতুন প্রযুক্তি ও নজরদারির এক্সপেরিমেন্ট চালানো হয়; একইভাবে শাপলা চত্বরের ওই বিশাল সমাবেশ দমন করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং পুলিশ-র্যাব একটি মহড়া বা এক্সারসাইজ সম্পন্ন করল। তারা পরখ করে দেখল যে, দীর্ঘ সময় বলপ্রয়োগ করে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব কি না। হেফাজতের আন্দোলন দমনের পর বেনজীরের মতো চরিত্ররা ‘সুপার কনফিডেন্ট’ হয়ে উঠেছিল।
শাপলা চত্বরের ঘটনায় আরেকটি দিক ছিল। হেফাজত কেন এত বড় সমাবেশ করছে এবং তাদের দাবি কী—সেটি শহরের প্রভাবশালী মহলের কাছে পরিষ্কার ছিল না। ‘নাস্তিকের কল্লা চাই’, ‘নাস্তিক পেলে ছেড়ো না’—এ ধরনের স্লোগান ও রাজনীতি রাষ্ট্র ও সমাজের সামনে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছিল। এই ধরনের উগ্র রাজনীতি জয়ী হলে রাষ্ট্র কোন পরিণতির দিকে যাবে, সেই আশঙ্কায় প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর একটি বড় অংশ তখন আওয়ামী লীগের বলপ্রয়োগকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে বসেছিল। শাপলা-শাহবাগ বাইনারির এই জায়গাটিতে আমরা সাধারণত খুব কম আলোকপাত করি।
শাপলা চত্বরের পরিস্থিতি সেই সময়ের সরকার যেভাবে সামাল দিয়েছিল, তা নিয়ে আমি ভিন্নমত পোষণ করি। আমার মনে আছে, আমাদের একসময়ের বন্ধু এবং বর্তমানে প্রভাবশালী পিনাকী ভট্টাচার্য তখন বিষয়টি নিয়ে অনেক হাসাহাসি ও ব্যঙ্গ করে পোস্ট লিখেছিলেন—বিশেষ করে সেই ‘কান ধরার’ বিষয়টি নিয়ে। কিন্তু শাহবাগের আন্দোলনে আমরা যারা যুক্ত ছিলাম এবং যারা রাজনীতির জটিলতাগুলো খেয়াল করছিলাম, তাদের জন্য এটি দেখা ছিল অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিষয়টিকে কাউন্টার করতে না পারা ছিল আমাদের জন্য বড় এক গ্লানি। সেখানে মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর যে ভীতি ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হলো, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তবে প্রশ্ন হলো, এই ঘটনাটি সমাজে ‘লেজিটিমেট’ বা বৈধতা পেল কীভাবে? ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ছিল একটি নির্বাচিত ও মোটামুটি বৈধ সরকার। অন্যদিকে বিএনপি তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন করছে। ফলে বিএনপিও এক ধরনের সংকটময় অবস্থানে পড়ে গিয়েছিল যে, তারা হেফাজতকে পুরোপুরি সমর্থন করবে কি না। কারণ, হেফাজতের ওই আন্দোলনের মাধ্যমে যদি ক্ষমতার পতন ঘটত, তবে সেই ক্ষমতা কোন দিকে যেত? সেটি কি কোনো গণতান্ত্রিক ধারায় এগোত, নাকি অন্য কোনো পথে—তা নিয়ে সংশয় ছিল।
আমরা ২০২৪-এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে দেখেছি যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শক্তি ও নারীরা ঐক্যবদ্ধভাবে যুক্ত ছিলেন। এরপরেও কিছু গোষ্ঠী একে ‘ইসলামিক অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে আন্দোলনের ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০১৩ সালে হেফাজত যেভাবে জমায়েতটি করেছিল, তাদের আসলে সুনির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনা বা ‘এক্সিট প্ল্যান’ ছিল না। তাদের প্রধান দাবি ছিল ‘নাস্তিকদের ফাঁসি’—যার ভিত্তি ছিল শাহবাগে নাস্তিকতা ও বেলেল্লাপনা হচ্ছে এমন কিছু ভুয়া তথ্য। এই দাবির গ্রাউন্ড যৌক্তিকভাবে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষের বাইরে সর্বসাধারণের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।
এখন ২০২৪-এর পরে এসে আমরা যখন পেছনের ইতিহাস দেখি, তখন ভিন্ন এক চিত্র সামনে আসে। আমি সোহেল আহমেদ মুন্নার ‘ইতিহাস ও বয়ান’ বইটি পড়ছিলাম। ইতিহাস তো কেবল তথ্য নয়, এটি একটি আখ্যান। ২০২৪-এর পরে বিশেষ করে হাদির মৃত্যু এবং আরও অনেক ঘটনা সামনে আসার পর আওয়ামী লীগ-ভারত-হেফাজত মিলিয়ে যে আখ্যানগুলো তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে আংশিক সত্য আছে। কিন্তু পুরো আখ্যানটি যেভাবে হাজির করা হয়, সেটি অনেক সময় ইতিহাসের চেয়ে বেশি ‘বয়ানি’ হয়ে ওঠে। ইতিহাস বুঝতে হলে কখনো আখ্যানের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, আবার কখনো আখ্যানের বাড়তি মেদ সরিয়ে স্রেফ ‘ফ্যাক্ট’ বা বাস্তব তথ্য দিয়ে তা বিচার করতে হয়।
গণজাগরণ মঞ্চ ও শাপলা চত্বরের এই ঘটনাগুলো ২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানে তেমন প্রভাব ফেলেছে, আমি আসলে বিষয়টিকে এভাবে দেখি না। যদি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি, তবে আমার একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক জার্নি আছে। নব্বই দশকের শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতি করেছি। এরপর একসময় রাজনীতি থেকে ইস্তফা দিয়ে ব্লগের নতুন ও আকর্ষণীয় জগতে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে পড়ি। সেই ব্লগ-পলিটিক্সই আমাকে আবার রাজনীতির মাঠে ফিরিয়ে আনে। এটি একটি রূপান্তর বা বিবর্তনের প্রক্রিয়া। মানুষ কখনো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। ২০০৭ সালে আমার যে চিন্তাধারা ছিল, ২০১৩ বা ২০১৮ সালে তা এক ছিল না—সময়ের সাথে সাথে নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে।
আমি ২০১৮ সালের কথা আলাদাভাবে বলছি কারণ সে সময় কোটা সংস্কার আন্দোলনের যে মোমেন্টাম তৈরি হয়েছিল, অনেক ‘প্রগতিশীল’ বুদ্ধিজীবী তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছিল এটি অত্যন্ত ন্যায্য আন্দোলন এবং আমি এর পক্ষে সক্রিয় ছিলাম, এমনকি গ্রেফতারও হয়েছি। আমি যেটা বোঝাতে চাচ্ছি তা হলো—২০২৪-এ এসে যদি আমরা কেবল ‘শাপলা পক্ষ’ বনাম ‘শাহবাগ পক্ষ’ খোঁজার চেষ্টা করি, তবে সেটি ভুল হবে। কারণ এর মধ্যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে এবং সবারই চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে।
২০২৪-এ আমরা যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একসাথে দাঁড়িয়েছি, আমরা যদি এই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধটি ২০১৩-১৪ সালেই ধারণ করতে পারতাম, তবে তখনই একসাথে দাঁড়াতে আমাদের কোনো সমস্যা হতো না। যদি আমরা স্বীকার করি যে বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং আমরা একে অপরকে ‘ডেমোক্রেটিক স্পেস’ দেবো, তবে অনেক সংকট এড়ানো সম্ভব ছিল।
২০১৩ সালের মূল সংকটটি ছিল দ্বিমুখী এবং অগণতান্ত্রিক। একদিকে আওয়ামী লীগ শাহবাগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে বিএনপি-র তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চেয়েছিল এবং তাদের ওপর ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ তকমা সেঁটে দিয়েছিল। এটি যেমন অগণতান্ত্রিক ছিল, তেমনি শাপলা চত্বরকে কেন্দ্র করে ‘নাস্তিকের ফাঁসি’ বা ‘কল্লা চাই’—এই ধরনের ভাষা এবং ব্লগারদের বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য প্রচারের যে রাজনীতি ছিল, সেটিও ছিল চরম অগণতান্ত্রিক।
শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদের এক তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের এই সত্যটি উপলব্ধি করতে হয়েছে যে—গণতন্ত্র কেন জরুরি। অন্যের জন্য গণতান্ত্রিক জায়গা বা স্পেস রাখা কেন প্রয়োজন, তা আমরা এখন বুঝতে পারছি। কারণ যদি অন্যের জন্য স্পেস না থাকে, তবে শেষ পর্যন্ত নিজের জন্যও কোনো জায়গা অবশিষ্ট থাকে না। এটাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থানের আগে আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তবে শাপলা এবং শাহবাগ—এই ধরনের বর্গকরণের একটি বড় মুশকিল আছে। যেমন বর্তমানে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, কোনো মেয়ে যদি স্লিভলেস পোশাক পরে হাঁটে তবে সে নিশ্চিতভাবে ‘শাহবাগী’। আবার কারো কপালে টিপ থাকলে কিংবা কেউ ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে গেলে তাকেও ‘শাহবাগী’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। এই যে একটি বর্গকরণ সমাজে গেড়ে বসেছে, সেটি নিয়ে আলাপ করতে গেলে আমি নিজেও সেই বৃত্তের মধ্যে পড়ে যাই। তাই এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা জরুরি।
ইদানীং ‘উগ্রবাদ’ মাথাচাড়া দেওয়া নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেখতে হবে আমরা বিষয়টিকে কীভাবে বিচার করছি। যে ব্যক্তি বাংলাদেশকে স্বীকার করবে এবং গণতন্ত্রকে মেনে চলবে, সে যদি ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক বা তথাকথিত ‘মৌলবাদী’ও হয়, তবে তাতে কোনো সংকট নেই। একটি স্বাধীন দেশে যে কেউ তার নিজস্ব বিশ্বাস পালন করতে পারে এবং এটি নিয়ে অন্য কারো মাথা ঘামানোর কিছু নেই। এ কারণেই আমি ‘মৌলবাদ’ শব্দটি পারতপক্ষে ব্যবহার করি না, কারণ নিজের বিশ্বাসের মূলে থাকা কোনো অন্যায় কিছু নয়। সমস্যাটি তৈরি হয় যখন কেউ দাবি করে—‘গণতন্ত্র হারাম’। তখন বুঝতে হবে যে, এই ব্যক্তির সাথে গণতান্ত্রিক স্পেস শেয়ার করার আর কোনো সুযোগ নেই।
কেউ যদি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, তবে সেটি রাষ্ট্রের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করার শামিল। কারণ বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির জন্মই হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। বর্তমানে অনেকে মুক্তিযুদ্ধকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেন এবং দাবি করেন যে এটি ভারত করে দিয়েছে। একইভাবে একদল লোক ২০২৪-এর অভ্যুত্থানকেও আমেরিকার ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন। দুই ক্ষেত্রেই একটি বড় সত্য আড়াল করা হয়—তা হলো সাধারণ মানুষের অসীম ত্যাগ ও সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতা ছিল এবং ২০২৪-এর পটভূমিতে আমেরিকার হয়তো কোনো আগ্রহ ছিল; কিন্তু এর জন্য যে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নামল এবং লড়াই করল, সেই গণসংগ্রাম কি কোনো ষড়যন্ত্রের চেয়ে ছোট?
মুক্তিযুদ্ধের সময় কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্ভোগ সয়েছে এবং সশস্ত্র লড়াই করেছে। ঠিক তেমনি ২০২৪-এর অভ্যুত্থানেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। আসল লড়াইটি হলো—গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বা ডেমোক্রেটিক ভ্যালুজ রক্ষা করা। বাংলাদেশকে স্বীকার করা, গণতন্ত্রকে স্বীকার করা এবং অপরের জন্য সহনশীল হওয়া—এটাই বড় কথা। এই মূল্যবোধগুলো যদি আমাদের মধ্যে থাকে, তবে রাজনৈতিক বিভাজন থাকলেও আমি কোনো বড় সংকট দেখি না। এই সহনশীলতার ওপর ভিত্তি করেই আমরা একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে পারব।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ৫ মে ২০২৩ দিগন্ত টেলিভিশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। টেলিভিশনটি ওই দিন ঘটনার লাইভ সম্প্রচার করছিল। সেই রাতেই দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সে রাতে তিনি অফিসেই ছিলেন। কী ঘটেছিল সেদিন, টেলিভিশন দুটি কীভাবে বন্ধ করা হয়েছিল, আজও কেন চালু
৩ ঘণ্টা আগে
এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের যে ফলাফল সামনে এলো, তা রাজ্য রাজনীতির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পালাবদলের ইঙ্গিত। এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— বাংলার মহিলারা কি এবার একজোট হয়ে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান করলেন? ভোটের অঙ্ক অন্তত সেই বাস্তবতাই তুলে ধরছে।
৯ ঘণ্টা আগে
লেখকদের দুই পয়সা দাম দেয় না যে সমাজ, যে সমাজের মানুষ হরদম হাসাহাসি করে লেখকদের নিয়ে এবং বলে—‘কী হয় লিখে?’ তাদের জন্য এক ‘চপেটাঘাতের মতো উদাহরণ’ হয়ে আছেন কার্ল মার্ক্স। মার্ক্সই সম্ভবত সেই এক এবং অদ্বিতীয় লেখক ও চিন্তক, যাঁর লেখালেখি ও চিন্তা ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস নির্বিশেষে সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করেছে।
১০ ঘণ্টা আগে
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে গতকাল (সোমবার) হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এই চুক্তিটি নিয়ে আগে থেকেই নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও আলোচনা চলছিল।
১১ ঘণ্টা আগে