সুমন সেনগুপ্ত, ইনস্ক্রিপ্ট

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার একটি ভিডিও নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। ভিডিওটিতে মুসলিম দুই ব্যক্তিকে খুব কাছ থেকে গুলি করতে দেখা গেছে। ভিডিওটি আসাম বিজেপির ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে আপলোড করার পর বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষের তীব্র নিন্দার মুখে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হলেও এর মাধ্যমে যে উসকানিমূলক বার্তা দেওয়ার ছিল, তা ততক্ষণে প্রচার হয়ে যায়। এই ঘটনা ভারতের নির্বাচনী প্রচারণায় মেরুকরণের রাজনীতি কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এর আগেও আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘মিঁয়া মুসলমান’ অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমানদের কষ্ট দেওয়াই যেন তাঁর কাজ।
তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, কোনো মিঁয়া মুসলমান রিকশা চালিয়ে যদি ৫ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেন তাঁকে যেন ৪ টাকা দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল মুসলমানদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। প্রশ্ন ওঠে, গত এক দশকে ভারতের বিচারব্যবস্থা কি এই ধরনের ঘৃণামূলক ভাষণের বিরুদ্ধে কোনো সদর্থক রায় দিয়েছে?
সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকেরা মুখে শুধু বলেছেন এই ধরনের ঘৃণাভাষণ বন্ধ হোক, কিন্তু যখনই অভিযোগ উঠেছে তখনই তাঁরা কানে তুলো এবং মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন। ফল এই ধরনের ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা তাই বলছেন, ইদানীং ভোট আদায়ের জন্য মুসলমানদের দানবীয় করে তোলার বিষয়টি স্বাভাবিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিচার বিভাগ থেকে বিরোধীদের প্রতিকার পাওয়ার আশা না থাকায় বিজেপি আরও উৎসাহ পাচ্ছে।
ভিডিওটি নিয়ে শোরগোল পড়ার পরে আরও বেশকিছু সাক্ষাৎকারে রাখঢাক না রেখেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, হিন্দুরা আগামী ১০ বছরের মধ্যে আসামে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলার সীমান্ত অসুরক্ষিত হওয়ায় সেখান দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটছে। তবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করতে পারেননি যে, যেখানে দেশের নানা প্রান্তে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে তাঁরা কেন ভারতে আসতে চাইবেন? কেন ২০২১ সাল থেকে জনগণনা করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তাঁরা করেননি। ওই গণনা করতে পারলেই কতজন অনুপ্রবেশকারী এই দেশে ২০১১ সাল থেকে এসেছেন তা পরিষ্কার হয়ে যেত। এতে আসামের জনবিন্যাস কতটা বদলেছে সেটাও দেখা যেত।
ভারতের বেশিরভাগ সাংবাদিকের এই প্রশ্ন করার সাহস নেই। আগামী নির্বাচনে মেরুকরণের উদ্দেশ্যেই যে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এই সাম্প্রদায়িক ‘বিষ’ ছড়াচ্ছেন, তা বুঝতে পারলেও দেখানোর কেউ নেই। তবে কিছু রাজনৈতিক দল ও সর্বভারতীয় দৈনিক এ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সম্পাদকীয়তে লিখেছে—ভিডিওটি মুছে ফেলাই সমাধান নয়, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই কাজ সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
বিজেপির নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে যে, ২০২২ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের জন্য যদি মুখাপাত্রকে শাস্তি দেওয়া হয়, তবে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিকে কেন সতর্ক করা হবে না?
সম্পাদকীয়তে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা লিখেছে, নিজের সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী ঘৃণা ও বিদ্বেষের আশ্রয় নিচ্ছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ সাংবিধানিক স্বীকৃতির পরিসরে পড়ে কিনা। তাছাড়া, এটি তাঁর নেওয়া শপথের পরিপন্থী কিংবা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার কোনো ধারায় বিরুদ্ধে যায় কিনা। এমনকি, নির্বাচন কমিশনের আইনও এই বক্তব্য লঙ্ঘন করেছে, সুতরাং মুখ্যমন্ত্রীর আর ওই চেয়ারে থাকার অধিকার আছে কি না, সেই প্রশ্নও কোনো কোনো মহল থেকে উঠছে।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও সিপিআইএম এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। দুই রাজনৈতিক দল ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী নেতারা এই ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অথচ প্রধান বিচারপতির কাছে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিকতম ভিডিও সংক্রান্ত মামলাটির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ‘রাজনৈতিক রেষারেষির বক্তব্য নিয়ে আদালতে যাওয়াটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে’ বলে বিষয়টি সরলীকরণ করেন।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, মিঁয়া মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেবেন না, তাই যতদিন তিনি ক্ষমতায় আছেন তাঁদের জন্য কষ্ট অপেক্ষা করছে। বিচার বিভাগের দুর্বলতার কারণেই এমন আচরণ সম্ভব হচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে এক বৃদ্ধ মুসলমান পোশাক বিক্রেতার ওপর বজরং দলের সদস্যরা চড়াও হলেও পুলিশ উল্টো ওই বৃদ্ধকেই গ্রেপ্তার করেছিল। সরকার প্রশ্রয় দিলে পুলিশও স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় না।
সভ্য সমাজে কোনো রাজনৈতিক দল যদি একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়, তাহলে এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যেন পুনরাবৃত্তিতে দলটি নিরুৎসাহিত হয়। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নানান সময়ে এই ধরনের কথা বলার জন্য সাংবিধানিক কোনো সংস্থার কাছ থেকে কখনো সমালোচিত হননি। এতে বিজেপির অন্য ছোটখাট মন্ত্রী কিংবা কর্মীও উৎসাহিত হন ঘৃণাভাষণ দিতে বা হিংসার আশ্রয় নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হতে।
উত্তরাখণ্ডের মহম্মদ দীপক বা দীপককুমারের উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। স্কুলের বাচ্চাদের পোশাক বিক্রেতা এক মুসলমান বৃদ্ধের ওপর যখন ওই অঞ্চলের বজরং দলের সদস্যরা চড়াও হয়ে বলে, দোকানের নাম পাল্টাতে হবে, কারণ ‘বাবা ড্রেস’ কোনো মুসলমান মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না। উগ্রবাদীদের হাত থেকে ওই বৃদ্ধকে রক্ষা করতে উত্তরাখণ্ড সরকারের পুলিশ গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা রাখলেও বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এভাবেই ঘৃণা-বিদ্বেষ বারবার জিতে যেতে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠন ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময়ে একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ওই সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে, অর্থাৎ মার্চ মাসের ১৬ তারিখ থেকে জুন মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত ঘৃণা-বিদ্বেষযুক্ত ভাষণ প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০২৩ সালে এই ধরনের বক্তব্যের সংখ্যা ছিল ৬৬৮টি। শুধু ২০২৪ সালেই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১১৬৫-তে। তাঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী, নির্বাচনে মেরুকরণের লক্ষ্য নিয়েই এই ধরনের ঘৃণা ভাষণের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। যে সময়ে বিরোধীরা সংবিধান রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে লড়েছেন, সেই সময়ে বিজেপি রামমন্দিরকে সামনে রেখে লড়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তো সরাসরিই বলেছিলেন, যদি বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে তাহলে হিন্দু মহিলাদের মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেবে বা রামমন্দির ভেঙে আবার বাবরি মসজিদ করা হবে। এই সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে বিরোধীরা সরব হলেও নির্বাচন কমিশন না শোনার ভান করে। পরোক্ষভাবে তাঁরা এই বক্তব্যগুলোকেই সমর্থন করে গিয়েছে। অথচ বক্তব্যগুলো দেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনার লঙ্ঘন ছিল। অথচ সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি খুব সহজেই বলতে দিতে পারলেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বক্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক কথা এবং তার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় কড়া নাড়া উচিত নয়।
ভারতীয় রাজনীতিতে শিষ্টতা আশা করা এখন হয়ত বাড়াবাড়ি। কিন্তু ন্যূনতম হিতাহিত বোধ কি আজকের রাজনৈতিক নেতাদের থেকে আশা করা অন্যায়? এমনকি দেশের প্রধান বিচারপতিও এই ধরনের কথার অতিসরলীকরণ করা প্রতিক্রিয়া জানান। দেশের ২০ শতাংশ মানুষের ওপর এর প্রভাব কীভাবে পড়ে —ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষেরা তা টের পান? এটা যদি গণহত্যার উসকানি না হয়, তাহলে কোনটাকে বলা হবে গণহত্যাকে মদত দেওয়া, দেশের প্রধান বিচারপতি কি বিষয়টা ভেবে দেখবেন?

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার একটি ভিডিও নিয়ে সম্প্রতি ব্যাপক শোরগোল শুরু হয়েছে। ভিডিওটিতে মুসলিম দুই ব্যক্তিকে খুব কাছ থেকে গুলি করতে দেখা গেছে। ভিডিওটি আসাম বিজেপির ‘এক্স’ হ্যান্ডেলে আপলোড করার পর বিরোধীদল ও সাধারণ মানুষের তীব্র নিন্দার মুখে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হলেও এর মাধ্যমে যে উসকানিমূলক বার্তা দেওয়ার ছিল, তা ততক্ষণে প্রচার হয়ে যায়। এই ঘটনা ভারতের নির্বাচনী প্রচারণায় মেরুকরণের রাজনীতি কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এর আগেও আসামের মুখ্যমন্ত্রী বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ‘মিঁয়া মুসলমান’ অর্থাৎ বাংলাভাষী মুসলমানদের কষ্ট দেওয়াই যেন তাঁর কাজ।
তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, কোনো মিঁয়া মুসলমান রিকশা চালিয়ে যদি ৫ টাকা পারিশ্রমিক দাবি করেন তাঁকে যেন ৪ টাকা দেওয়া হয়। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম ছিল মুসলমানদের অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা। প্রশ্ন ওঠে, গত এক দশকে ভারতের বিচারব্যবস্থা কি এই ধরনের ঘৃণামূলক ভাষণের বিরুদ্ধে কোনো সদর্থক রায় দিয়েছে?
সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকেরা মুখে শুধু বলেছেন এই ধরনের ঘৃণাভাষণ বন্ধ হোক, কিন্তু যখনই অভিযোগ উঠেছে তখনই তাঁরা কানে তুলো এবং মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছেন। ফল এই ধরনের ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। বিভিন্ন সমাজতাত্ত্বিক থেকে শুরু করে বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা তাই বলছেন, ইদানীং ভোট আদায়ের জন্য মুসলমানদের দানবীয় করে তোলার বিষয়টি স্বাভাবিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিচার বিভাগ থেকে বিরোধীদের প্রতিকার পাওয়ার আশা না থাকায় বিজেপি আরও উৎসাহ পাচ্ছে।
ভিডিওটি নিয়ে শোরগোল পড়ার পরে আরও বেশকিছু সাক্ষাৎকারে রাখঢাক না রেখেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, হিন্দুরা আগামী ১০ বছরের মধ্যে আসামে সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
তিনি অভিযোগ করেন, বাংলার সীমান্ত অসুরক্ষিত হওয়ায় সেখান দিয়ে অনুপ্রবেশ ঘটছে। তবে সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করতে পারেননি যে, যেখানে দেশের নানা প্রান্তে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ থেকে তাঁরা কেন ভারতে আসতে চাইবেন? কেন ২০২১ সাল থেকে জনগণনা করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও তাঁরা করেননি। ওই গণনা করতে পারলেই কতজন অনুপ্রবেশকারী এই দেশে ২০১১ সাল থেকে এসেছেন তা পরিষ্কার হয়ে যেত। এতে আসামের জনবিন্যাস কতটা বদলেছে সেটাও দেখা যেত।
ভারতের বেশিরভাগ সাংবাদিকের এই প্রশ্ন করার সাহস নেই। আগামী নির্বাচনে মেরুকরণের উদ্দেশ্যেই যে আসামের মুখ্যমন্ত্রী এই সাম্প্রদায়িক ‘বিষ’ ছড়াচ্ছেন, তা বুঝতে পারলেও দেখানোর কেউ নেই। তবে কিছু রাজনৈতিক দল ও সর্বভারতীয় দৈনিক এ নিয়ে সোচ্চার হয়েছে। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সম্পাদকীয়তে লিখেছে—ভিডিওটি মুছে ফেলাই সমাধান নয়, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই কাজ সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
বিজেপির নতুন সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উদাহরণ দেওয়া হয়েছে যে, ২০২২ সালে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে বিরূপ মন্তব্যের জন্য যদি মুখাপাত্রকে শাস্তি দেওয়া হয়, তবে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিকে কেন সতর্ক করা হবে না?
সম্পাদকীয়তে ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকা লিখেছে, নিজের সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতেই আসামের মুখ্যমন্ত্রী ঘৃণা ও বিদ্বেষের আশ্রয় নিচ্ছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছে, মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ সাংবিধানিক স্বীকৃতির পরিসরে পড়ে কিনা। তাছাড়া, এটি তাঁর নেওয়া শপথের পরিপন্থী কিংবা ভারতীয় ন্যায় সংহিতার কোনো ধারায় বিরুদ্ধে যায় কিনা। এমনকি, নির্বাচন কমিশনের আইনও এই বক্তব্য লঙ্ঘন করেছে, সুতরাং মুখ্যমন্ত্রীর আর ওই চেয়ারে থাকার অধিকার আছে কি না, সেই প্রশ্নও কোনো কোনো মহল থেকে উঠছে।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও সিপিআইএম এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। দুই রাজনৈতিক দল ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী নেতারা এই ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। অথচ প্রধান বিচারপতির কাছে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সাম্প্রতিকতম ভিডিও সংক্রান্ত মামলাটির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ‘রাজনৈতিক রেষারেষির বক্তব্য নিয়ে আদালতে যাওয়াটা রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে’ বলে বিষয়টি সরলীকরণ করেন।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী এখন প্রকাশ্যেই বলছেন, মিঁয়া মুসলমানরা তাঁকে ভোট দেবেন না, তাই যতদিন তিনি ক্ষমতায় আছেন তাঁদের জন্য কষ্ট অপেক্ষা করছে। বিচার বিভাগের দুর্বলতার কারণেই এমন আচরণ সম্ভব হচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে এক বৃদ্ধ মুসলমান পোশাক বিক্রেতার ওপর বজরং দলের সদস্যরা চড়াও হলেও পুলিশ উল্টো ওই বৃদ্ধকেই গ্রেপ্তার করেছিল। সরকার প্রশ্রয় দিলে পুলিশও স্বপ্রণোদিত হয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় না।
সভ্য সমাজে কোনো রাজনৈতিক দল যদি একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ায়, তাহলে এমন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত যেন পুনরাবৃত্তিতে দলটি নিরুৎসাহিত হয়। অথচ দেশের প্রধানমন্ত্রী কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নানান সময়ে এই ধরনের কথা বলার জন্য সাংবিধানিক কোনো সংস্থার কাছ থেকে কখনো সমালোচিত হননি। এতে বিজেপির অন্য ছোটখাট মন্ত্রী কিংবা কর্মীও উৎসাহিত হন ঘৃণাভাষণ দিতে বা হিংসার আশ্রয় নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হতে।
উত্তরাখণ্ডের মহম্মদ দীপক বা দীপককুমারের উদাহরণ দিলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। স্কুলের বাচ্চাদের পোশাক বিক্রেতা এক মুসলমান বৃদ্ধের ওপর যখন ওই অঞ্চলের বজরং দলের সদস্যরা চড়াও হয়ে বলে, দোকানের নাম পাল্টাতে হবে, কারণ ‘বাবা ড্রেস’ কোনো মুসলমান মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে না। উগ্রবাদীদের হাত থেকে ওই বৃদ্ধকে রক্ষা করতে উত্তরাখণ্ড সরকারের পুলিশ গ্রেপ্তার করার ক্ষমতা রাখলেও বজরং দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এভাবেই ঘৃণা-বিদ্বেষ বারবার জিতে যেতে থাকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠন ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ ২০২৪ সালের নির্বাচনের সময়ে একটি সমীক্ষার ফল প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, ওই সালের লোকসভা নির্বাচনের সময়ে, অর্থাৎ মার্চ মাসের ১৬ তারিখ থেকে জুন মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত ঘৃণা-বিদ্বেষযুক্ত ভাষণ প্রায় ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০২৩ সালে এই ধরনের বক্তব্যের সংখ্যা ছিল ৬৬৮টি। শুধু ২০২৪ সালেই সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১১৬৫-তে। তাঁদের সমীক্ষা অনুযায়ী, নির্বাচনে মেরুকরণের লক্ষ্য নিয়েই এই ধরনের ঘৃণা ভাষণের বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। যে সময়ে বিরোধীরা সংবিধান রক্ষার লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনে লড়েছেন, সেই সময়ে বিজেপি রামমন্দিরকে সামনে রেখে লড়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী তো সরাসরিই বলেছিলেন, যদি বিরোধীরা ক্ষমতায় আসে তাহলে হিন্দু মহিলাদের মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেবে বা রামমন্দির ভেঙে আবার বাবরি মসজিদ করা হবে। এই সমস্ত কিছুর বিরুদ্ধে বিরোধীরা সরব হলেও নির্বাচন কমিশন না শোনার ভান করে। পরোক্ষভাবে তাঁরা এই বক্তব্যগুলোকেই সমর্থন করে গিয়েছে। অথচ বক্তব্যগুলো দেশের সংবিধানের মূল প্রস্তাবনার লঙ্ঘন ছিল। অথচ সর্বোচ্চ আদালতের প্রধান বিচারপতি খুব সহজেই বলতে দিতে পারলেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বক্তব্য সাধারণ রাজনৈতিক কথা এবং তার জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দরজায় কড়া নাড়া উচিত নয়।
ভারতীয় রাজনীতিতে শিষ্টতা আশা করা এখন হয়ত বাড়াবাড়ি। কিন্তু ন্যূনতম হিতাহিত বোধ কি আজকের রাজনৈতিক নেতাদের থেকে আশা করা অন্যায়? এমনকি দেশের প্রধান বিচারপতিও এই ধরনের কথার অতিসরলীকরণ করা প্রতিক্রিয়া জানান। দেশের ২০ শতাংশ মানুষের ওপর এর প্রভাব কীভাবে পড়ে —ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষেরা তা টের পান? এটা যদি গণহত্যার উসকানি না হয়, তাহলে কোনটাকে বলা হবে গণহত্যাকে মদত দেওয়া, দেশের প্রধান বিচারপতি কি বিষয়টা ভেবে দেখবেন?

পরিবর্তনগুলো একদিনে আসবে না। রাজনৈতিক দলের ভেতর থেকেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আসতে হবে। একই সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও চাপ থাকতে হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে বা যেখানে চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন, সেখানে তা সঠিক ভাবে করতে পেরেছে কি না, তা একটি প্রশ্ন।
৩ ঘণ্টা আগে
বহুল প্রতীক্ষিত ও আকাঙ্ক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। দীর্ঘদিন পর ভোটকেন্দ্রে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দের দল ও প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার দৃশ্য—গণতন্ত্রের জন্য নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক বার্তা।
৫ ঘণ্টা আগে
যদিও আওয়ামী লীগ নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অনুপস্থিত ছিল, তবুও বিএনপি ও জামায়াতের তীব্র প্রচারণা নির্বাচনী আবহকে অত্যন্ত উত্তপ্ত করে তোলে। নির্বাচনটি বিএনপির জন্য একপ্রকার ‘স্ট্রেস টেস্ট’ হিসেবে কাজ করেছে, বিশেষত জামায়াত ও তার সংশ্লিষ্টদের অপ্রত্যাশিত ভোট ও আসন বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে।
৭ ঘণ্টা আগে
নির্বাচন কমিশন অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। আমরা ‘নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন’-এর পক্ষ থেকে যেসব গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সহায়ক হতে পারত, তার অনেকগুলোই তারা গ্রহণ করেনি।
২ দিন আগে