leadT1ad

৭০ শতাংশের ম্যান্ডেট: সিসিফাসের পাথর নাকি নেমেসিসের পদধ্বনি

স্ট্রিম গ্রাফিক

সংখ্যা কখনো কখনো দর্পণ হয়ে ওঠে। সেই দর্পণে ভেসে ওঠে আমাদের আকাঙ্ক্ষা ও আতঙ্কের প্রতিফলন। গতকাল সোমবার ইএএসডি (এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট) একটি জনমত জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। সেই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ আগামী নির্বাচনে বিএনপিকে ভোট দিতে চায়। একটি দেশের ৭০ শতাংশ ভোটার যখন একটি রাজনৈতিক দলকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে, তখন সেই সংখ্যাটি কেবল জনমত থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের ‘এক্স-রে রিপোর্ট’।

রিপোর্টটি বলছে, দীর্ঘ দহন আর রুদ্ধশ্বাস সময়ের পর জনতা এখন এক বিশাল প্লাবনের অপেক্ষায় আছে। কিন্তু এই প্লাবন কি উর্বর পলি আনবে, নাকি কেবল পুরোনো ধ্বংসস্তূপের ওপর নতুন ইমারত গড়বে—সেই প্রশ্নটিই এখন সময়ের কাঁটায় ঝুলছে।

আমরা ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ১৯৪৮ সালে মার্কিন নির্বাচনের আগে বেশির ভাগ জনমত জরিপে দেখা গিয়েছিল, রিপাবলিকান টমাস ডিউই বিজয়ী হবেন। কিন্তু বাস্তবে জয়ী হয়েছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। এমনকি এই মাত্র ১০ বছর আগে, ২০১৬ সালের নির্বাচনের আগেও জনমত জরিপগুলো বলছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হতে যাচ্ছেন হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু বাস্তবে ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

২০২৪ সালে ভারতে লোকসভা নির্বাচনের আগে বেশ কয়েকটি জনমত জরিপে বলা হয়েছিল, বিজেপি সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন পাবে। কিন্তু ভোটের পরে দেখা গেল, জরিপের সংখ্যার সঙ্গে আসন সংখ্যা মিলছে না। বিজেপি সরকার গঠন করলেও ব্যাপক ঘাম ঝরাতে হয়েছে। জরিপের ফলাফলে যেমনটা বলা হয়েছিল, বিজেপি বিরাট সংখ্যক আসনের ব্যবধানে জিতবে, বাস্তবে তেমনটা ঘটেনি।

আমরা পাকিস্তানের দিকে তাকালেও দেখতে পাব, সেখানেও বেশির ভাগ রাজনৈতিক জরিপের ফল পরবর্তীতে মেলেনি। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে ইএএসডির জরিপে যে ৭০ শতাংশের ‘ম্যান্ডেট’ দেখা যাচ্ছে, তা কি কেবল কোনো বিশেষ দলের প্রতি প্রেম, নাকি গত দেড় দশকের রুদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসার এক মরিয়া চিৎকার, তা অবশ্য নিশ্চিত হয়ে এখনই বলার উপায় নেই।

ইএএসডির এই জরিপ একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, জনগণ এখন পরিবর্তন চায়। তারা চাচ্ছে এক নতুন সামাজিক চুক্তি। তবে জরিপের বস্তুনিষ্ঠতা আর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। ২০ হাজার মানুষের সশরীরে মতামত কি ১৬ কোটি মানুষের গুমরে মরা দীর্ঘশ্বাসকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে?

গ্রিক পুরাণে দেখা যায়, মর্ত্যবাসী যখন প্রতিশোধ, প্রতিহিংসা ও নৈতিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে, তখন মানুষকে শাস্তি দিতে সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনতে পৃথিবীতে নেমে আসেন ভাগ্যদেবী নেমেসিস। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জনমতের এই একচেটিয়া ঝুঁকে পড়া কি সেই ‘নেমেসিস’-এরই পদধ্বনি?

ইএএসডির জরিপ বলছে, ১৯ শতাংশ মানুষের পছন্দ জামায়াতে ইসলামী। অথচ গত নির্বাচনে বা বিগত দিনগুলোতে তাদের ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ শতাংশের কিছু বেশি। হঠাৎ জামায়াতের ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার এই উল্লম্ফন কীসের ইঙ্গিত দেয়? এটি কি কোনো নীরব সামাজিক রূপান্তর, নাকি ক্ষমতার শূন্যস্থান পূরণে এক নতুন মেরুকরণ?

২০২৩ সালের ‘ওয়ার্কিং ক্লাস ইকোনমিক ইনসিকিউরিটি অ্যান্ড ভোটিং ফর র‌্যাডিক্যাল রাইট অ্যান্ড র‌্যাডিক্যাল লেফট পার্টিস’ শীর্ষক গবেষণা বলছে, যখন মূলধারার রাজনীতি মানুষের সব ক্ষুধা মেটাতে পারে না, তখন মানুষ অধিকতর ডান বা বামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। একে বলা যেতে পারে ‘আশ্রয়ের রাজনীতি’। যখন বড় কোনো বটবৃক্ষ উপড়ে যায়, তখন ছোট ছোট গুল্মগুলোও সূর্যের আলো পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ১৯ শতাংশের এই জনমত সম্ভবত সেই ডারউইনীয় বিবর্তনেরই রাজনৈতিক সংস্করণ।

তবে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্যটি হলো সেই ২৭ শতাংশ, যারা অতীতে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে চেয়েছিলেন বা দিয়েছেন। ইএএসডির জরিপে তারা কি অংশ নিয়েছে নাকি সত্তর শতাংশের ভিড়ে মিশে গেছে? নাকি তারা সেই ‘নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ’ হয়ে ওত পেতে আছে সুদিনের আশায়!

জরিপের আয়োজক সংস্থা ইএএসডি অবশ্য বলছে, বিএনপির প্রতি জনসমর্থন বেড়ে যাওয়ার পেছনে ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদির ‍গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনা বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। এই তরুণ রাজনীতিক নিহত হওয়ার পর তাঁর বেশ কয়েকটি বক্তব্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

সে যাইহোক, বিএনপিকে নিয়ে ৭০ শতাংশ মানুষের সরকার গঠনের প্রত্যাশা আসলে এক বিশাল দায়। সিসিফাস যেমন বিশাল পাথর পাহাড়ের চূড়ায় তোলার অভিশাপ পেয়েছিলেন, সত্তর শতাংশের এই পাহাড়সম সমর্থনও বিএনপির জন্য তেমন এক দায় হতে পারে। জনতা যখন কাউকে অকাতরে উজাড় করে দেয়, তখন তার প্রত্যাশার পারদও থাকে হিমালয়ের সমান। এই গাণিতিক আধিপত্য যদি শেষ পর্যন্ত সুশাসনে রূপান্তরিত না হয়, তবে সেই জনতাই আবার ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মতো তার স্রষ্টাকে তাড়া করবে।

ইএএসডির এই জরিপ একটি বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে। সেটি হচ্ছে, জনগণ এখন পরিবর্তন চায়। তারা চাচ্ছে এক নতুন সামাজিক চুক্তি। তবে জরিপের বস্তুনিষ্ঠতা আর পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়। ২০ হাজার মানুষের সশরীরে মতামত কি ১৬ কোটি মানুষের গুমরে মরা দীর্ঘশ্বাসকে পুরোপুরি ধারণ করতে পারে?

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, ব্যালট পেপার আর জরিপের ফরম এক নয়। জরিপে যা সত্তর, ভোটের বাক্সে তা সত্তর না-ও হতে পারে। তবে এই পরিসংখ্যানটি ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষের জন্য এক সতর্কবার্তা।

সুতরাং, জনতার ৭০ শতাংশ ঢেউ এবার কাকে ভাসাবে, কাকে পোড়াবে, সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে ইঙ্গিত বলছে, ঢেউ উঠেছে, বাতাস গরম, আর আগুনের ঋতু দরজায়। যারা এই আগুনের ভাষা পড়তে ব্যর্থ হবে, তাদের নাম লেখা থাকবে ছাইয়ের দলিলে।

মারুফ ইসলাম: কথাসাহিত্যিক

Ad 300x250

সম্পর্কিত