leadT1ad

‘যুদ্ধবিরতি’ আসলে গাজাকে দৃষ্টির আড়ালে ঠেলে দেওয়ার হাতিয়ার

ইমান আবু জায়েদ
ইমান আবু জায়েদ

প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৩৪
স্ট্রিম গ্রাফিক

গাজার কেন্দ্রীয় অঞ্চল আল-বুরাইজ ক্যাম্পেবাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি সালাহ আল-মাবহু তাঁর ছোট ছেলে আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে আগুনের পাশে বসে আছেন। তাঁবুর পাশে জবুথবু হয়ে বসে একটু উষ্ণতার খোঁজ করছেন তাঁরা। এই দৃশ্য এখন গাজার প্রতিটি কোণেই দেখা যায়।

অক্টোবরের দিকে যখন গাজায় যুদ্ধবিরতির গুঞ্জন বাতাসে ভাসতে শুরু করেছিল, তখন আমাদের কাছে তা মনে হচ্ছিল বহু দূরের কোনো স্বপ্ন। মনে অবিশ্বাস ও ভয় নিয়েই আমরা আশার ক্ষীণ সুত্রকে আঁকড়ে ধরতে চাইছিলাম। গত দুই বছরে আমরা এমন অনেক ‘যুদ্ধবিরতি’র কথা শুনেছি, যা কখনোই স্থায়ী হয়নি। প্রতিবার আশাহত হতে হতে আমাদের মন যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল।

অবশেষে গত অক্টোবরে যখন যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এল, গাজার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রাস্তাগুলো উল্লাসধ্বনি আর আনন্দোচ্ছ্বাসে কেঁপে উঠল। মানুষ সাময়িকভাবে হলেও মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল। কিন্তু সেই আনন্দের ভিড়েও আমার বুকে অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধছিল। মনে হচ্ছিল, এই আপাত শান্তি বা নীরবতা হয়তো আরও বড় কোনো ঝড় আসার পূর্বলক্ষণ; হয়তো আরেকটি নৃশংস হত্যাযজ্ঞের প্রস্তুতির বিরতি মাত্র।

দুর্ভাগ্যবশত, আমার সেই আশঙ্কাই সত্য হলো। যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার পরেও ইসরায়েলের মরণঘাতী হামলা থামেনি। এখন পর্যন্ত তাদের সেনাবাহিনীর হাতে আরও চার শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। এছাড়া গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনী যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার পরোক্ষ প্রভাবে মৃত্যু হয়েছে আরও অসংখ্য মানুষের।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই অব্যাহত মৃত্যুর মিছিলের মধ্যেও বিশ্ববাসীর মনোযোগ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। নভেম্বর মাসে আমি লক্ষ্য করলাম, গাজা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া বা কোনো সংবাদমাধ্যমে লিখছি, মানুষের তাতে আগ্রহ বা প্রতিক্রিয়া আগের মতো আর নেই। শুধু আমি নই, অন্যান্য ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ও লেখকরাও একই পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়েছেন। পৃথিবীর মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েছে, কারণ গ্লোবাল মিডিয়া ও কূটনৈতিক চাতুর্যে বিশ্ববাসীকে খুব সহজেই বোঝানো হয়েছে যে—যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।

নভেম্বরের ২০ তারিখ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পে আমার পরিচিত আবু শাওয়িশ পরিবারের বাড়িতে হামলা চালায়। আমার বন্ধু বাতুল আবু শাওয়িশ তার চোখের সামনে পুরো পরিবারকে হারিয়েছে। তার ছোট বোন ১১ বছর বয়সী হাবিবা, ১৬ বছর বয়সী টিমা; দুই ভাই ১৪ বছরের ইউসুফ ও ১৮ বছরের মোহাম্মদ; এবং তার মা ৪৩ বছর বয়সী সাহার ও বাবা ৫০ বছরের রামি—সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

তখনই আমার কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গেল, এই তথাকথিত যুদ্ধবিরতির আসল উদ্দেশ্য সহিংসতা বা মৃত্যু থামানো ছিল না। এর উদ্দেশ্য কোনোভাবেই সাধারণ মানুষকে রক্ষা করা, রক্তপাত বন্ধ করা বা গণহত্যা রোধ করা ছিল না। এর একমাত্র ও প্রধান লক্ষ্য ছিল গাজা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলা আলোচনা থামিয়ে দেওয়া। গাঁজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানুষের দৈনন্দিন অবর্ণনীয় দুর্ভোগ যেন আর আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে ঝড় না তোলে, তা নিশ্চিত করাই ছিল এই যুদ্ধবিরতির নীলকশা।

ফলাফল হিসেবে, গাজা এখন কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে। বিশ্ব গণমাধ্যমের স্পটলাইট এখন সরে গেছে অন্য কোনো নতুন খবর বা বিশ্বের অন্য কোনো ‘হট স্পট’-এর দিকে। আর আড়ালে আবডালে, নিরবে গাজায় চলছে নিরবচ্ছিন্ন মৃত্যুযজ্ঞ।

তথাকথিত শান্তির আড়ালে রক্তের দাগ

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র দুই সপ্তাহ বা তার কিছু বেশি সময় পেরোনোর পর, ২৮ অক্টোবর, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ভয়াবহ বোমাবর্ষণ শুরু করে। সেই এক হামলাতেই ১০৪ জন মানুষ প্রাণ হারান।

নভেম্বরের ২০ তারিখ ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মধ্য গাজার নুসেইরাত শরণার্থী ক্যাম্পে আমার পরিচিত আবু শাওয়িশ পরিবারের বাড়িতে হামলা চালায়। আমার বন্ধু বাতুল আবু শাওয়িশ তার চোখের সামনে পুরো পরিবারকে হারিয়েছে। তার ছোট বোন ১১ বছর বয়সী হাবিবা, ১৬ বছর বয়সী টিমা; দুই ভাই ১৪ বছরের ইউসুফ ও ১৮ বছরের মোহাম্মদ; এবং তার মা ৪৩ বছর বয়সী সাহার ও বাবা ৫০ বছরের রামি—সবাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই পরিবারের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল না। তারা সবাই ছিলেন নিতান্তই সাধারণ বেসামরিক নাগরিক। কিন্তু তাদের রেহাই দেওয়া হয়নি। বাতুলকে এখন একা, সম্পূর্ণ একা এই গণহত্যার বিভীষিকা মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

শীত ও প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই: ইসরায়েলের নতুন অস্ত্র

ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত রয়েছে ঠিকই, কিন্তু এর পাশাপাশি চলছে ভিন্ন উপায়ে নীরব গণহত্যা। ধসে পড়া দালান, অবিস্ফোরিত বোমা, আকস্মিক বন্যা, হাইপোথার্মিয়া (তীব্র ঠান্ডা), অনাহার ও মহামারী—এ সবই ইসরায়েলের গণহত্যামূলক কৌশলের সৃষ্টি। আমাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই, পর্যাপ্ত খাবার নেই, নেই শীত নিবারণের হিটিং ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ কিংবা পানের উপযোগী বিশুদ্ধ পানি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, এখন শীত নিজেই মানুষকে হত্যা করছে।

মধ্য গাজার আল-বুরাইজ ক্যাম্পে ছেলে আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে আগুনের পাশে সালাহ আল-মাবহু। ছবি: আল-জাজিরা
মধ্য গাজার আল-বুরাইজ ক্যাম্পে ছেলে আব্দুর রাজ্জাককে নিয়ে আগুনের পাশে সালাহ আল-মাবহু। ছবি: আল-জাজিরা

সম্প্রতি গাজায় আরেকটি ঝড় বয়ে গেল। আমাদের দুর্বল তাঁবুগুলো বন্যায় প্লাবিত হলো, প্রবল বাতাসে উড়ে গেল সহায়-সম্বল। ৩০ বছর বয়সী আলা জুহা বৃষ্টির তোড়ে ধসে পড়া এক দেয়ালের নিচে চাপা পড়ে মারা গেলেন। মাত্র দুই মাস বয়সী শিশু আরকান মুসলেহ মারা গেল হাইপোথার্মিয়ায় বা তীব্র ঠান্ডায় জমে গিয়ে। সব মিলিয়ে, কেবল এই মাসেই ঠান্ডাজনিত কারণে ১৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বন্যায় আমার নিজের পরিবারের তাঁবুও আবার তলিয়ে গিয়েছিল। চারদিকে যখন থৈ থৈ পানি আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, এবং পালাবার কোনো পথ খোলা থাকে না—তখন যে অসহায়ত্ব গ্রাস করে, তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

ত্রাণ ও সহায়তার ওপর নীরব অবরোধ

ইসরায়েল কেবল সামরিক হামলার মাধ্যমেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে না, তারা তাদের মানবিক বাধ্যবাধকতাগুলোও নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করছে। আলোচনায় ঠিক করা ত্রাণবাহী ট্রাক, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র, তাঁবু, এবং আশ্রয়ের সরঞ্জাম প্রবেশের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা তারা মানছে না।

গাজার মানুষকে একটু স্বস্তি দিতে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থা চেষ্টা করছে, তাদের কার্যক্রমেও বাধা সৃষ্টি করছে ইসরায়েল। নতুন সব নিয়মকানুনের বেড়াজালে এনজিওগুলোর নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠিন করে তোলা হয়েছে। এমনকি ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’-এর মতো বড় সংস্থাগুলোও এই জটিলতায় পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এনজিওগুলোর ত্রাণের অনুরোধ প্রতিনিয়ত প্রত্যাখ্যান করার ইসরায়েলি নীতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেটুকু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে চায়, তাও নির্মমভাবে আটকে দেওয়া হচ্ছে।

একই সময়ে, স্থানীয় ফিলিস্তিনি সংগঠনগুলো, যারা আমাদের দুর্ভোগ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করে আসছিল, তারা এখন তহবিল সংকটে ধুঁকছে। উদাহরণস্বরূপ, ‘সামির প্রজেক্ট’-এর কথা বলা যায়। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এই প্রজেক্টটি তাদের বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত দাতা এবং অনুসারী হারিয়েছে। কারণ দাতারা ভাবছেন, যুদ্ধ তো শেষ, আর সাহায্যের দরকার কী? এই প্রকল্পের পরিচালক ডা. ইজ্জেদিন আল-লুলু আমাকে নিশ্চিত করেছেন, অনুদানের প্রবাহ কমে যাওয়ায় তাদের পক্ষে এখন আর অত্যাবশ্যকীয় সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না।

রাফাহ সীমান্ত: এক মরণফাঁদ

এদিকে ইসরায়েল রাফাহ সীমান্তও বন্ধ করে রেখেছে। এখান থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, যদি না আপনি ইসরায়েলি-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধ-মুনাফাখোরদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিতে পারেন ও অঙ্গীকার করেন যে আর কখনোই ফিরে আসবেন না। ১৬ হাজারের বেশি মানুষ, যাদের জরুরি ভিত্তিতে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, তাদের আটকে রেখেছে ইসরায়েল। এই রোগীদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ফলে অপেক্ষারত অবস্থায়, চিকিৎসার অভাবে হাজারের এরও বেশি মানুষ ইতিমধ্যেই মারা গেছেন। এও কি হত্যার সামিল নয়?

গাজা এখন ‘লো-গ্রেড ম্যাস কিলিং’ বা ধীর গতির গণহত্যার ধাপে প্রবেশ করেছে। কার্পেট বোম্বিংয়ের মতো যা বিশ্ব গণমাধ্যমের ব্রেকিং নিউজ হয় না, কিন্তু এর চূড়ান্ত ফলাফল একই—গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের জীবন ও অস্তিত্ব মুছে ফেলা।

এ কারণেই অবাক হওয়ার কিছু নেই যখন আমরা দেখি ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরা এখনো আমাদের ভূমি দখলের ও বসতি স্থাপনের কথা বলে যাচ্ছেন। বিশ্ব হয়তো ভাবছে যুদ্ধ শেষ, কিন্তু ইসরায়েলিরা এখনো বিশ্বাস করে, ফিলিস্তিনিমুক্ত গাজা গড়া সম্ভব ও সেই লক্ষ্য তাদের নাগালের মধ্যেই রয়েছে। যুদ্ধবিরতি ছিল কেবল সেই লক্ষ্য পূরণের পথে বিশ্বের চোখকে অন্ধ করে দেওয়ার একটি চতুর কৌশল মাত্র।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় প্রকাশিত মতামত। অনুবাদ করেছেন তুফায়েল আহমদ।

Ad 300x250

সম্পর্কিত